Friday, December 1, 2017

সৈয়দ শামসুল হক এর গল্প কানার হাটবাজার


কিছুদিন থেকে এক কিশোর আমাদের সাথ লয়েছে। পাছ ছাড়ালেও সে পাছ ছাড়ে না। আমরা যেখানে যাই, আমরাই তো যাই, সেও যে সাথে আছে ঠিকই ঠিক পাই, পাশ ঘুরলেই দেখি তাকে। মাথায় নারীর মতো লম্বা কেশ, লালিয়া তার রঙ, বুঝি তেল পড়ে নাই বহুদিন, সময়তে বটের ঝুরি ছিঁড়ে তাই দিয়ে বেঁধে কেশ পিঠের পরে গিঁট করে রাখে। কাছে যাও, মুখে বিড়ির তেজালো গন্ধ, গন্ধায় কী কটু, বজবজ করে বাতাসে ভাসে। কিন্তু কখন সে বিড়ি খায় বা খেলো, আমরা দেখি না, চোখে তো পড়ে না। বিড়ির গন্ধে আমাদের ওয়াক ওঠে। আবার চেহারাও দ্যাখো তার - কী চেকনাই! ফুটবল প্লেয়ারের মতো একখানা গোল গলার সবুজিয়া জামা যে তার গায়ে, তার হাতার বাইরে হাত দুখান দ্যাখো - সরু হলেও চামড়ায় রোদ্দুর পড়ে পিছল খায়। মাজা সরু এমন সুন্দর স্বাস্থ্য তার, কিন্তু আমরা দেখি না কখন সে খায়, জানি না কোথায় সে খায়, কে তাকে অন্ন দেয়, স্বাস্থ্য এমন চেকনাই। নামটাও জানা নাই, চ্যাংড়া বলেই ডাকি আমরা। কোথা থেকে এই চ্যাংড়ার আগমন তারও কোনো নির্ণয় না পাই।

টাউনের লোকেরা তাকে দেখেই অনুমান করে, এই চ্যাংড়া আদতে কুষ্টিয়ার বাউল আখরার, অল্প বয়সে ভোগভাগ ত্যাগ করিয়া বাউলের জীবন! আহা বরদাস্ত হয় নাই। খাঁচা ভাঙি উড়াল দিয়া হেথা আসি বাসা নিছে! - আবার অনেকে চ্যাংড়ার ওই চিকনা শরীর, সরু মাজা, কান্তিভরা মুখ আর নারীর মতো ঝুঁটি বাঁধা কেশ লক্ষ করে বলে - ঘেটু যাত্রার ছোকরায় হইবে, বাড়ি হয়তো যমুনার ওপার ময়মনসিং, রাইত বিরাতে রসিয়াজনের দেহ অত্যাচার সইজ্জ কইরতে না পারিয়া পলায়া আইচ্চে হেথার দূরদ্যাশে! - তা হতেও পারে। আমাদের এলাকারও বদনাম আছে মরদে মরদে কায়কারবারের, কিন্তু আমরা এ- সকলের মধ্যে নাই। কিন্তু এ নিয়েই টাউনে কিছু মানুষ ফিসফাস করতে শুরু করে দেয়, আমাদের কানে আসে। আমরাও চ্যাংড়াকে খেদাবার চেষ্টা করি, কিন্তু সে পিছন লেগেই থাকে। অগত্যা আমরা হাল ছেড়ে দেই। কারণ সময় এখন বড় উতলা। শামসুদ্দিনভাই কয়, আবার বুঝি একাত্তরের মতন একখান যুদ্ধ করা খায়! খায় আমাদের অঞ্চলের মুখচলতি একটা ক্রিয়াপদ, অর্থাৎ কিনা আবার বুঝি একাত্তরের মতো একটা যুদ্ধ করতে হয়!

সেই যে একাত্তর সনে এদেশে যুদ্ধ হয়, তার বর্ণনা আমরা শামসুদ্দিনভাইয়ের কাছে শুনি, তার বাবা কলেজের প্রফেসর মহিউদ্দিন, মাজারে শোয়া বাবা হজরত কুতুবুদ্দিনের সাক্ষাৎ বংশধর মহিউদ্দিন, ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আর সেই যুদ্ধে রাজারহাটের কাছে পাকিস্তানের মিলিটারির সাথে সাক্ষাৎ লড়াইয়ে জীবন যায়, এই এতকাল বাদে সেই যুদ্ধের দালাল রাজাকার আলবদরের মাথা-মাথা কয়টাকে ধরে রাজধানীতে বিচার চলছে এখন। এই সেদিন একজনার ফাঁসির হুকুম পরে এখন ফাঁসির দড়ি রেডি, নগদেই যে-কোনো দিন তাকে ঝোলানো হবে - এই নিয়েই সময় এখন উতলা, কারণ রাজাকারের ঝাড় এতদিনেও বিনাশ হয় নাই, তাদের নতুন চেলারা সারা দেশে জ্বালাও পোড়াও শুরু করে দিয়েছে - এ ফাঁসি হওয়া নয়! - রাজাকার কোনো পাপী নয়! - পাকিস্তানই ছিলো হামার ভালো! - তার তাপ জলেশ্বরীতেও টের পাওয়া যাচ্ছে, এখানেও যে সেই রকমের কিছু খচ্চরের দল আছে।

সেদিন তারা শামসুদ্দিনভাইয়ের বাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল মারে, বাজারে গোটা তিনেক মনোহারি দোকানে আগুন দেয়, আর হিন্দু মাঝিপাড়ায় গিয়ে ধমকি দেয় - হয় ইন্ডিয়া যাও কি হেথায় থাকিলে পুতুলপূজা ছাড়ো! দেবি দুর্গা মা কালী তারে কয় পুতুল! বাপোদাদা হামার কতকাল থেকে পুষ্প দিয়া ঘণ্টা বাজায়া ধূপ ধরিয়া পূজা দেয়, ভগমানের পরসাদ পায়, সেই পূজা কি অচল করিতে চান তোমরা! ইয়ারে জইন্যে কি বঙ্গবন্ধু দ্যাশ স্বাধীন করিছিলো? বঙ্গবন্ধু কয় নাই কি হেথায় যার যার ধর্ম তার তার কাছে? শামসুদ্দিনভাই বলে, আমরা মোছলমানও তো এই অপবাদের শিকার! জামাত-শিবিরের দুষ্টগুলা কয়, তোমরা ইন্ডিয়ার দালাল! তোমার বঙ্গবন্ধুর বেটি শ্যাখ হাছিনা ভোটে জিতিবার পর মন্দিরে পূজা দিছে কি দেয় নাই! কইছে কি কয় নাই যে এবার থেকে দ্যাশে আর আজান বাদ হয়া কাঁসর ঘণ্টা বাজিবে! এই ডাহা মিছা কথা আর দুষ্ট অপবাদের ঝড় বাতাস এখন জলেশ্বরীতেও।

অতএব সময় বড় থমথমা উতলা। ওই রাজাকারটার ফাঁসিটা বুঝি এই হয় কি ওই হয়। এ-সময় অচিন এই চ্যাংড়াকে নিয়ে আমাদের ভাবনা নাই যে অপবাদের ঘেটুর ছোকরা নিয়ে আমরা রসে আছি। ইস্টিশানের মিষ্টি দোকানের হানিফভাই বলেন, ভাবিয়া দ্যাখো হে, এও এক চাল চালিছে হামার লোকাল এলাকার দুষ্টগণ, শামসুদ্দিন মিয়া যে রাজাকারের শয়তানি আর জ্বালাও- পোড়াওর বিরুদ্ধে জলেশ্বরীতে রুখি দাঁড়াইতে চায়, তোমরায় তো তার হাতের বল, তোমাদের নিয়াই তো আন্দোলন করিবে তাঁই, এলা যদি তোমাদের কাবু করিতে হয়, টাউনের মানুষের কাছে তোমাদের সুনাম যদি নষ্ট করিতে হয়, তবে ঘেটু চ্যাংড়াকে নিয়া পুটকি মারার দুর্নামটা দিলেই কাম ফতে! বুঝিলেন কি বোঝেন নাই! - অতএব আমরাও আর এসব ফিসফাসে কান রাখি নাই।

তবে চ্যাংড়াকে নিয়ে আমাদের বিস্ময়টাও যায় নাই আজ তিন দিন পরও। কোথা থেকে সে এলো! দিনটা স্পষ্ট আমাদের মনে পড়ে। কিছুদিন থেকে আমরা আধকোশা নদীর পাড়ে বাঁধের ওপর চালার ঘরে কাশেমচাচার চায়ের দোকানে বসছি। জানা আছে কি জানা নাই যে, কাশেমচাচার চায়ের দোকানটা ছিলো ইস্টিশানের রাস্তায়? মনে নাই কি আমরা সেখানে তার নিজের হাতে বানানো ডালপুরিটা কী তোয়াজ করেই না খেতাম! হানিফভাইয়ের মিষ্টির দোকানে তো টেবিল জুড়ে আড্ডা করতাম, সন্ধের দিকে কাশেমচাচার ওখানে চট করে একবার উঠে যেতাম ডালপুরিটার লোভে। আরো স্মরণ করাই - কাশেমচাচার বড়ভাই আমাদের শহরের এক নম্বরের ধনী মানুষ, কিন্তু নিজের ছোটভাই তার গরিবের হদ্দ গরিব, কেন গরিব, কেন ভাই তাকে দেখে না, কেন এতবড় ধনীর ভাইকে চায়ের দোকান দিয়ে পেটের ভাতের জোগাড় করতে হয় - সে বৃত্তান্ত যদি সময় পাই তবে আরেকদিন, কথনের এ- যাত্রায় তার অবকাশ নাই। তবে এতটুকু বলে রাখি, তার সেই ধনীভাইটাও নির্দয়ার এমন নির্দয়া যে ইস্টিশানের দোকান থেকে একদিন তাকে উচ্ছেদ করে দেয় গুন্ডা দিয়ে। তখন কাশেমচাচা নদীর পাড়ে এসে এই চালাঘরটা তুলে চায়ের দোকান বসান।

কাশেমচাচা বলেন, নাহ্, টাউনে আর নয়! জনবিরল হেথায় আমার ভালো! জনের মানুষ তো বহু দেখিলোম! নির্দয়ে দুনিয়া ভরি গেইছে। বুকের রক্তে জমিন ভিজি গেইছে। নমাজ যে পড়েন, নমাজ বাদেই অকাজ করেন! এই আমলে এই তো সংসারের সমুদয় কথা! তাই টাউনে আর নয়, হেথায়! হেথায় আমার সাথি নদীর ঢেউ, নদীর অতলে পুঁটি বুকরঙি খইলসা টাটকিনি আরো আরো বা কত পর্কারের মাছ - তারায় হামার সাথি, আর সাথি খোদাতাল্লার নীল আসমান, আর ওই ওপারের ধু-ধু বালুর চর, কেবল যে নদীর উই বাঁক ঘোড়ার নালের মতন, উয়ার উপরে যে ঝাউয়ের বন - সুইয়ের মতন উয়ার পাতা, সেই পাতায় বাতাসে যখন ফোঁপায় শোসায়, তখন কান্দনটা আসি যায় যে আল্লার দুনিয়া আর আল্লার দুনিয়া নাই! শয়তানেই একালে তার দখল নিছে! তাই নদীর সাথে ঝাউয়ের পাতার সাথে মিতমিতালিতেই টাইম কাটি যায় হামার। নদীর এই বান্ধের উপর এই চালায় বসিয়া খেওয়া পারাপার দ্যাখোঁং, মানুষের কত আগমন পরস্থান দ্যাখোং, কেউ হাসিতে হাসিতে নামিচ্ছে, কাঁইওবা কান্দিতে কান্দিতে খেওয়া ধরি নদীর ওপার যাইচ্ছে। দেখিয়া দেখিয়া একেকখান গল্প ভাসি ওঠে মনে। এই নিয়া নদীর পাড়ে মুঁই ভালোই আছোঁ।

তার এই সজল কথা আমাদের ভিজিয়ে দেয় মায়ায়, আমরা হানিফভাইয়ের মিষ্টির দোকান ছেড়ে আসি, আমরা এখন রোজ বিকেলে কাশেমচাচার চালাঘরে এসে বসি। ডালপুরি খাই, চা খাই, নদীর দিকে তাকিয়ে খেয়া নৌকার পারাপার দেখি। নৌকার যাত্রী আসে-যায়। কাশেমচাচার মতো আমরাও তাকিয়ে দেখি, আনমনেই বা কখন আমরাও তাদের নিয়ে মনে মনে গল্পকথা রচনা করতে থাকি। আর এই মাত্র দিন তিনেক আগেই মনেমন এই গল্পকথার ভেতর থেকেই যেন অচিন চ্যাংড়াটা বেরিয়ে আসে। কিংবা সে-নদীর জল ছিঁড়েই ওঠে। অথবা ওই যে বাঁধের পেছনে ভূতের বাসা শ্যাওড়া গাছটা, তারই ছায়া যেন কায়া ধরে ওঠে চ্যাংড়ার। সে আমাদের সমুখে এসে দাঁড়ায়। দাঁড়ায় কি হঠাৎ তাকে দেখে উঠি, চমকে উঠি আমরা। এর আগে কখনো এই মুখ দেখেছি বলে আমাদের কারো মনে পড়ে না।

তবে শনি-মঙ্গলের হাটে, নিত্যদিনের বাজারে কি খেয়াঘাটে দূরদূরান্ত থেকে কত মানুষই তো আসে, চেনা ও অচেনা আসে, অচেনার ভাগই অধিক, অচেনা তারা অধিক হলেও অচেনা সঠিক নয়, গায়ে তাদের আধকোশা নদীর এপার-ওপার বিশাল মুল্লুক এই জলেশ্বরীরই দশ বিশ মাইলের ঘ্রাণ আমরা পাই, অঞ্চলের ভাষায় তাদের ঠাহর পাই যে অচেনা হয়েও অজানা তারা নয়! কিন্তু এই চ্যাংড়া? এই যে নদীর পাড়ে কাশেমচাচার চা-দোকানের সমুখে হঠাৎ মূর্তিমান খাড়া এইজন! এখনো বাক্য বলে নাই, তবু আন্দাজ হয় ভাষা তার জলেশ্বরীর মতো নয়, কারণ আমরা তার ঘ্রাণে জলেশ্বরীকে পাই নাই।

না, জলেশ্বরীর সে কেউ নয়।

আমরা ঈষৎ সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ি। আমাদের মুখভাবেই প্রশ্নটা ফুটে ওঠে কিনা কে জানে। যেন আমাদের মনেমন প্রশ্নটা আন্দাজ করে উত্তর দিতে সে গান ধরে ওঠে -

পরিচয় কিবা আমার ও ও ও কিবা পরিচয়,
মাটিতে জনমও আমার মাটিতেই লয়!
মানুষেরে জিগ্যাস করো মানুষ ছাড়া কী?
মানুষ বলে এ কী কারবার!
বাক্য নাই জবাব দিবার ­-
দানব দ্যাশে মানুষ বোবা জন্ম লয়াছি!

আহাহা কী কথা, কী ভাব। আসমান জমিন মুছে যায় মুহূর্তে, সরব নীরব হয়ে যায়, নদীর ঢেউ থেমে যায়, নদী কান পেতে শোনে। কী চিকন মিষ্টি গলা, নদীর ওপর দিয়ে বহে যায়, দূরদূরান্তে যায়, তবুও মিলায় না স্বর, তবু শোনা যায়। সুরের লহরী আর কথার রহস্যে আমরা আপ্লুত হয়ে যাই। জগৎ আমাদের চারদিকে ছলছল করে ওঠে।

এই ছলছল করা তো শুধু চ্যাংড়ার গানে নয়, আরো আছে, সেদিন আরো ছিলো। আমরা আমাদের প্রাণের বন্ধু উদ্ভ্রান্ত আবুল মনসুরকে ঘিরে বসেছিলাম কাশেমচাচার চায়ের দোকানে। নদীর দিক মুখ খোলা চালাঘর, নদীর দিকেই তো মুখ করে আমরা নিত্য বসি, নদীর হাওয়া খাই। কাশেমচাচার নিপুণ হাতে আটার লেচি পাতলা হয়ে বেলোনচাকিতে গড়ে ওঠে, পোড়া লাল লংকা ডলা সেদ্ধ ডালের পুর তাতে পড়ে, অচিরে শুকনো খোলায় হয়ে ওঠে রাঙা মচমচে, আমরা খাই। কখনো বা খেয়ার যাত্রী কেউ নৌকার দেরি দেখে আমাদের পাশে বসে পড়ে, কখনোবা দু-একটা কথা হয়, সুখ-দুঃখেরই তো কথা, দুঃখের কথাই অধিক, এমন কথার বিরাম নাই। নদীর বুক থেকে উঠে আসা শীতল হাওয়ায় জগতের তাপ চাপ খানিক মুছে যায়, খানিক বুকে ধরেই মানুষ যে যার বাড়ি ফিরে যায়। শোক তাপ যদি মুছে যায়, তবে সেদিন নদীর শীতল বায়ের সাথে আমাদেরও নীরব হিম বুকের বাতাসও যুক্ত হয়েছিলো মনসুরকে জুড়োবার ইচ্ছায়, কেননা সেদিন বিকেলবেলাতেই সে এক ঘোর দুঃসংবাদ আমাদের দিয়েছিলো।

আহা, তার ছোট বোনটি আত্মহত্যা করেছে!

ঘণ্টাখানেক আগে খবর আসে। তার বাবা-চাচারা রওনা হয়ে গেছেন লাশ আনতে। মনসুর সাথে যায় নাই, মনসুর গেলে মায়ের রক্ষণ কে করবে? জননী যে সংবাদ পায়াই মূর্ছা গেইছে! পাড়ার পড়শি নারীরা এখন তার শিথান ঘিরে বসে আছে। বুকভাঙা মনসুর ছুটতে ছুটতে আমাদের কাছে চলে এসেছে। আমরা তাকে নিয়ে নদীর পাড়ে এসেছি। আহা, নদীর শীতল হাওয়া, নদীর ওপরে নীল আসমান, ওপার ধু-ধু জগৎ, আর মানুষের ওই আসা-যাওয়া, খেয়াঘাট কি মানব জীবনেরই জন্ম-মৃত্যুর ঘাট। মাঝখানে দুই দিনের এক সংসার রচনা করা।

আহা, তোমার বোনের বিয়ে হয়েছিলো না? মান্দারবাড়িতে না শ্বশুরবাড়ি? হাঁ, হাঁ, কাচভাঙা দর্পণের ছবির মতো আমাদের মনে পড়ে যায়। বছরখানেক আগে বিয়েটা হয়, আমরা সবাই বিয়েতে কত আমোদ করেছি, বরের সাথে কনেকে নিয়ে আমাদের কেউ কেউ মান্দারবাড়িতেও গিয়েছিলাম ফিরন যাত্রায় - সবই মনে পড়ে। আহা, কী হয়েছিলো হে? কিসের দুঃখ? কোন দুঃখ? এত দুঃখ যে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ পায় নাই আয়েশা? আহা, আয়েশার টলটলে মুখখানা যে এখনো ভাসে। বোবা হয়ে থাকা আমাদের চোখ যে নদীর দিকে, সেই আধকোশা নদীর বুকে আয়েশার মুখখানা পদ্মের মতো ভাসে এখন ভেসে যায়।

মনসুর বলে, সংসারের কথা তোমাদের বলি নাই। - আহা, ও মনসুর কেন বলো নাই! - সকল কথা তো কওয়া যায় না, বিশেষ যদি ফুলের বনে অগ্নি ধরি যায়! মনসুর বলতে থাকে আমাদের কাছে এতদিন না-বলা সকল কথা। যৌতুকের চাপ! - এই যৌতুকের জন্যে ভাইরে কত নিজ্জাতন করিছে হামার বইনটারে। হারামজাদা তার জামাই দিনের পর দিন কয়, ট্যাকা আনি দে! আরো কয়, তোর রূপ দেখিয়া যে ভুলিছিলোম, গু খাইছিলোম! হরিষালের সোনা মিয়া হামাকে জামাই করিতে চাইছিলো, ট্যাকাও বিস্তর দিবার কথা কইছিলো, ক্যাবল পাত্রী খানিক কালা বলিয়া যে রাজি হঁও নাই, হইলে আইজ হামার টাউনে যায়া বাজারে দোকান খুলিয়া বসিবার জো হইতো। দোকান দিতে দুই লক্ষ ট্যাকা! তুই বাপের বাড়ি হতে আনি দে!

মনসুরের কাছে তার ঘন ঘন ফুঁপিয়েওঠা ধরা গলায় বিবরণ শুনে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। জামাইয়ের আবদারের চাপে নাচার হয়ে মনসুরের বাবা জোত বিক্রি করে হাজার পঞ্চাশেক জোগাড় করতে পারেন, তাই নিয়ে তিনি মেয়ের বাড়ি যান, আশা যে জামাই হয়তো হাজার পঞ্চাশেকেই তুষ্ট হবে। জামাই সে-টাকা নেয় না, রুমালে বাঁধা টাকার গোছ ছুড়ে ফেলে দেয়, বলে - এই ট্যাকায় কী হইবে! একখান বলদগাড়িও করা যাইবে না! এই ট্যাকা ফিরৎ নিয়া যান, আর সাথে সাথে আপনার বেটিকেও নিয়া যান, তাল্লাকের চিঠি পাছে পাছে পাঠেয়া দেমো! - এ-কথা শুনে জামাইয়ের পা ধরেছিলেন শ্বশুর - না বাবা, এমন কথা না কন, আল্লা-রসুলের দোহাই, পুষ্পের মতন বেটিকে হামার ছাড়ি না দেন!

তালাকের কথা শুনেই আয়েশা ক্রন্দন করে উঠেছিলো, শাশুড়ি তখন চুলের মুঠি ধরে তাকে উঠানে ফেলে দিয়েছিলো, আর ওদিকে শ্বশুরের গায়ে লাথি মেরেছিলো হারামজাদা জামাই। লাথির চোটে দাওয়ায় ফেলে দিয়ে শয়তানের বাচ্চা বলে ওঠে, পুষ্পের মতন! অ্যাতো যদি মায়া তবে পুষ্পের মতন তোমার বেটিকে নিয়া বেটির সাথে চোদন করো যায়া! - আহাহা, এ-বিবরণ শুনে আমাদের চোখের সমুখে যে জগৎ - ধসে পড়ে, বসে পড়ে, বনের বৃক্ষে পাখির বাসা ভেঙে যায়। সে-রাতেই ঘরের বাতায় শাড়ি পেঁচিয়ে আয়েশা তার জীবন দেয়।

এইকালে চ্যাংড়ার উদয় আমাদের সকাশে। আধকোশার জল কি চোখের পানির ঢল ফুড়ে সে ওঠে কি ভুতের বাসা শ্যাওড়া গাছের ছায়াটাই কায়া ধরে ওঠে, কায়া ধরে গান করে ওঠে -

মানুষ বলে এ কী কারবার!
বাক্য নাই জবাব দিবার -
দানব দ্যাশে মানুষ বোবা জন্ম লয়াছি!

গান থেমে যায়, গানের কথা নদীর জলে আর আসমানে আছড়ায়, থামে না তো থামেই না, চ্যাংড়ার চোখ থেকে চকচক আলোটাও মুছে যায় না, সে আমাদের দিকে রহস্যের হাসিভরা মুখখানা মেলে ধরে অপলক চেয়ে থাকে। দিনের আলো রাঙা হয়ে পড়ে, নদীর পানি মরা রক্তের মতো কালচে ধরে ওঠে, খোদার আসমানে ফেরেশতার চোখের পানির মতো এক ফোঁটা একটা তারা ওঠে। আমরা পুবের দূর গারো পাহাড়ের মতো চেপে ধরা বুক নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরি। চ্যাংড়াও আমাদের সাথ লয়।

এতকাল নদীর পাড় থেকে হাই ইশকুলের কাছ বরাবর এসে যে যার বাড়ির পথ নিতাম, আজ এক যোগে হাঁটতে থাকি সড়কে সড়কে, যেন আমাদের বাড়িঘর নাই, যেন মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়ে এমনই আমরা অন্ধকারের মাথায় ওই এক ফোঁটা টলটলে তারাটিকে নিয়ে হাঁটছি তো হেঁটেই চলেছি। আজ তিনদিন পার, আয়েশার লাশ আনতে যে তার বাপ-চাচা যায়, লাশ তারা পায় না, পুলিশ আটক করে রাখে - নাকি লাশ কাটা হবে, তবে পাবে পরিবার। কিন্তু ডোম এখনো পাওয়া যায় নাই, লাশকাটা ঘরে আয়েশা এখনো শুয়ে আছে, যে-ডোম ছিলো জামাত-শিবিরের তাড়া খাওয়ার আগেই সে নিরুদ্দেশে কি হরিষালের বর্ডার পার হয়ে চলে গেছে ইন্ডিয়ায়।

লাশ মান্দারবাড়ি থেকে আধকোশা পার হয়ে জলেশ্বরীর সদর হাসপাতালে আসে। পুলিশ পাহারায় গরুর গাড়ির মাচানের ওপর বাঁশের চাটাই মোড়া আয়েশা আসে তার বাপের বাড়ি জলেশ্বরী টাউনে। আজ তিনদিন লাশকাটা ঘরে আয়েশা শুয়ে আছে ডোমের অপেক্ষায়। ডোমের অপেক্ষায় নাকি মাটির মায়ায় সে পড়ে আছে আর ক্রমেই তার দেহ ফুলছে পচন লেগে। বুঝি আয়েশা এই মাটির মায়া, এই জলেশ্বরীর মায়া, বাপ মা ভাইয়ের মায়া, বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত নিজের হাতে যত্ন করা কাজলি গাইটার মায়া সে ছাড়তে পারে নাই, তাই এখনো শুয়ে আছে। - মুই যাঁও, কাজলিটার যতন করিও মাও গো, ভাইটাকে না বকিও বাপ গো, আর মোর গেন্দা ফুলের ঝাড়টা না কাটিও তোমার কাস্তের ধারে হে কিষান চাচা, পুষ্প হয়া রোজ বিহানে ফুটিবো আমি, হলুদে হলুদে চন্দন করি দেমো সব, যাই গো।

আজ তিনদিন, ডোম পাওয়া যায় নাই, শোনাশোন আরো কথা - ডোম কাটিয়া সারিলেও ডাক্তারের সিলমোহর পত্র পাইতে ট্যাকার খরচ আছে! ফির ট্যাকা? এই ট্যাকার জইন্যেই তো মোর বেটি! আহ! আহ! ট্যাকায় কি দুনিয়া সচল, মনসুর? ট্যাকা না থাকিলেই কি দুনিয়া অচল? ট্যাকা না খরচ করিলে কি মুর্দার মাটিও নাই মাটিতে? খোদা, হামাক কিছু ট্যাকা মরণকালে সাথে দিবেন গো, কাঁই জানে হাশরের মাঠেও বা ট্যাকা খরচ করা লাগে খোদা তোমার বেহেশতে যাইতে!




সড়কে সড়কে আজ তিন দিন আমরা হাঁটছি, বাড়ি থেকে বাবা কুতুবুদ্দিনের মাজার, মাজারে দাঁড়িয়ে বোবা কিছুক্ষণ, দোয়া- দরুদ আজান-নামাজ মিলাদের স্বর, কানে কিছু যায় না, মাথার ওপর দিয়ে কাক কা-কা করে ডেকে উড়ে যায়, লোবানের গন্ধ ভাসে, হাত আমাদের মোনাজাতে ওঠে না, নির্দয়া গো দুনিয়া - কাশেমচাচা বলেন, মাজার থেকে বাঁশবনের মধ্যে লাশকাটা ঘরের পাশ ঘুরে আমরা নদীর পাড়ে কাশেমচাচার চালায় আসি, আমাদের পেছন পেছন অচিন সেই চ্যাংড়াও আছে সে আসে। কিসের আশায় বা কোনো কারণে সে আমাদের পাছ ছাড়ে না, বুঝি না। বোঝার চেষ্টাও করি না। আয়েশার মৃত্যুর পর তেমন মন আর আমাদের নাই। আমরা ভাঙা মানুষ। আমরা হাঁটছি। কখন রাত হয়ে গেছে, ঘন অন্ধকারে মুখ ঢেকেছে আসমান জমিন, হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমরা বিলাপ শুনে উঠি।

এ-বিলাপ আর কোথাও, না আমাদের বুকের ভেতরে? আমরা কান পাতি। কিছু লোকজনকে আমরা কুঞ্জবাবুর বাড়ির দিকে যেতে দেখি। আর দেখি কাঁধের ওপর বাঁশের বাঁকে ঘৃতের ভাঁড় ঝুলিয়ে ঘোষপাড়া থেকে পরপর তিনজন কুলি বাড়িতে ঢুকছে। ক্রমে স্পষ্ট হয়, বিলাপের কান্নাটা কুঞ্জবাবুর বাড়ি থেকেই। আহা, সে-বাড়ির বাংলাঘরের টিনের ছাদের সে যে কী শোভা - আমরা জন্মাবধি দেখে আসছি - ঢালু ছাদের সবটা জুড়ে সবুজ পাতা আর লাল টুকটুকে মরিচের মতো ফুল ফুটে থাকে বারো মাস। হাজারবার দেখার পরেও পথিক পথ চলতে চলতে একটিবার নয়ন তুলে একবার দেখে লয়। আজ সেই ফুলের বাড়ি থেকে বিলাপ কেন?

কুঞ্জবাবু মারা গেছেন! আজ বিকেলেই তিনি ভবপারে চলে গেছেন।

আমরা যে থমকে দাঁড়িয়েছি, আমাদের অবাক হবার কী আছে। বয়স তো তার নববই কি একশই! তবু আমরা সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ি ভিড় করা মানুষের মুখে সংবাদটা শুনে। টাউনের মানুষের মুখে কুঞ্জবাবু তো শুধু কুঞ্জবাবু নয় - কঞ্জুষ কুঞ্জবাবু! কী তাঁর নামের মাহাত্ম্য, নাম করলে হাঁড়ি ফাটে, কাজে বেরুবার মুখে কানে নাম পড়লে - দিন হয় অযাত্রার অযাত্রা। হাটের দিনে এক- দেড় মণ ধান নিয়ে কুঞ্জবাবুর কারবার শুরু সেই কোন বিস্মরণকালে, তারপর এখন তাঁর তিন তিনটে গুদাম, আরো আছে কাঠের ফার্নিচারের একচেটিয়া কারবার জলেশ্বরীতে, তদুপরি নম্বরী সিগারেটের সোল এজেন্ট এ-তল্লাটে, আরো বা কত কি! এইভাবে কারবার বাড়তে বাড়তে, টাকা উপায় করতে করতে. এখন কোটিপতিই বা! থুত্থুরে বুড়ো হয়েছেন, তবু টাকা করার খাঁই তাঁর মেটে নাই, এখনো কারবারের দিকে তাঁর খর চোখ, এখনো লাঠিভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গুদামে যান। তবে, অনেকদিন থেকেই কারবারের ভার তাঁর ছেলে নিতাই সাহার ওপর, নিতাইবাবুও প্রায় বুড়োই এখন কিন্তু শরীরের গঠনে ভারি মজবুত, সহজে তাঁর দিন ফুরাবে না, বাপের মতোই শতবর্ষী হবেন বলে তাঁর নিজেরও আশা।




তবে জোয়ান ছেলের বাপ হয়েও নিতাইবাবু এই বয়সেও বাপের কাছে ধমক খান। টাউনের সবাই কতবার এ-দৃশ্য দেখেছে - হাতের লাঠি তুলে কুঞ্জবাবু তার বুড়ো ছেলেকে তাড়া করছেন আর বলছেন, ট্যাকার কি মায়া নাই তোর? লক্ষ্মী! লক্ষ্মী! আর এক পাইসাও যদি বাজে খরচ দেখি তোর, লাঠি দিয়া তোর মাথা ভাঙিমো! - আর, একদিন তো এমন হলো বাপের নিত্যকার এ- কথা শুনে ব্যাটা খ্যালখ্যাল করে হাসছে আর বলছে, আচ্ছা আচ্ছা পরতিগ্যা করিলোম তোমার চিতার কাঠের বেলাতেও না এক পাইসা বাজে খরচ করিমো, বন হতে মাগনা কাঠ আনিয়া তোমাকে পোড়ামো! - তাই শুনে বাপ বাড়িয়ে দেয় পা আর বলে, তবে চরণ ধরি পরতিগ্যা কর চিতাকালে এক পাইসাও না বাজে খরচ হইবে।

সারা টাউনে কুঞ্জবাবু আর তাঁর ছেলে নিতাইবাবুকে নিয়ে একটাই মজার ছবির প্রচার - লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হয়েও কুঞ্জবাবু এখনো পরেন শস্তা হলদেটে একখান ধুতি যার নামতি হাঁটু পর্যন্ত যায় কি যায় না, গায়েও ওই হলদেটেই শস্তা ফতুয়া, গলায় তামার মাদুলি; আর ওদিকে তাঁর ছেলে নিতাইবাবুর পরনে চওড়া সোনালি পাড়অলা ফিনফিনে পাতলা ধুতি, আদ্দির পাঞ্জাবি, গলায় সোনার মোটা চেন, আর দুই হাতের আঙুলে পাঁচ পাঁচটা ইয়া বড় আঙটি, সবুজ লাল পাথর তাতে ঝিলকায়। কুঞ্জবাবু নিজেই চেয়ে চেয়ে দেখেন আর লোক দেখলে শীর্ণ আঙুল তুলে বলেন - ওই দ্যাখো না কেনে, বাপে শাকভাত খায়া ট্যাকা করে, আর ব্যাটা ঘি ভাত খায়া উড়ায়। নিতাইবাবু বলেন, বাবা, তুমি এমন দরিদ্র সাজিয়া না থাকো, আমার বড় বদনাম করে মানুষ।

কিন্তু মুখে বললেও নিতাইবাবুও কঞ্জুষির ব্যাপারে কম যান না, নিজের দেহ সাজাতে বাবুগিরিটা করেন বটে, অন্য খাতে বাপের মতোই হাতের মুঠো তার গোটানোই থাকে। বাড়ির দুয়ারে হাত পেতে কেউ ভিক্ষা পেয়েছে নিতাইবাবুর কাছে, এমন কখনো দেখা যায় নাই, বরং ফকির ভিক্ষুক অভাবীজন তার সীমানা থেকে শত হাত দূরেই থাকে, কারণ লাঠি মেরে খেদাবার জন্যে তাঁর চাকরও খাড়া আছে। এক বেলা তার বাড়িতে নিমন্ত্রণের রন্ধন হয়েছে এমন সংবাদ বা ব্যঞ্জনের ঘ্রাণ জলেশ্বরীতে কোনোকালে পাওয়া যায় নাই। এমনকি নিজের বউ যে নিজের বউ বড়লোকের বউ, তার পরনেও শস্তার শাড়ি ভিন্ন তিনি ওঠান নাই, নিতাইগিন্নির হাতে সোনায় বাঁধা শাঁখা ভিন্ন আর কোনো অলংকার অন্তত আমরা দেখি নাই। অতএব ওই যে তিনি বলেছিলেন বাপের দেহ সৎকারে মাগনা কাঠ বন থেকে এনে দাহ করাবেন, তাঁর এ-কথা কেউ কথার কথা বলে মনে করে নাই।

কুঞ্জবাবুর বাড়ির ভেতর থেকে নারী-পুরুষের সেই কান্নার শব্দের সাথে আমাদের বিলাপ মিলে যায় না, যার যার শোক তার তার কাছে। সবার শোক যদি একসাথে মিলেছিলো তবে সেটা সেই তখন একাত্তরে যখন পাকিস্তান তার মিলিটারি নিয়ে এদেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো আর নয় মাসে তিরিশ লক্ষ মানুষ খুন করেছিলো। শামসুদ্দিনভাই বলে, আইজ যদি কোটি মানুষের মনের আগুনও এক হইতো রে! তবে এই দ্যাশে রাজাকার একজনার ফাঁসির খবরে শয়তানের দল জ্বালাও-পোড়াও করিবার সাহস না পাইতো, কোটি মানুষের আগুনে তারাই দগ্ধ হয়া যাইতো!

কুঞ্জবাবুর বাড়ির সড়কে জমায়েত লোকজনের মধ্যে - কতকাল আর পরের বাড়ির মৃত্যু নিয়ে বোবা হয়ে থাকা যায়! - দেশের কথাও হয়, রাজাকারের ফাঁসির কথাও আলোচনায় আসে, কুঞ্জবাবুর কঞ্জুষতার গল্প নিয়ে হাসাহাসিও হয়, তাঁর ব্যাটা নিতাইবাবুরও মুঠিবন্ধ হাতেরও খোশগল্পে ভিড়ের মানুষ মেতে ওঠে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবই আমরা শুনি, কিন্তু যোগ দেই না। চ্যাংড়াও শোনে, তার চোখের মণি অন্ধকারে চকচকে থেকে আরো চকচকে হতে থাকে। আমরা তার দিকে অতটা লক্ষ করি না। এরই মধ্যে হঠাৎ মোটরসাইকেলের ভাঁ ভাঁ ঝাঁ ঝাঁ গর্জন শোনা যায়। কী? না, নিতাইবাবুর ছেলে অর্জুন সাহা বেরিয়েছে মোটরসাইকেল নিয়ে, স্টার্ট দিচ্ছে। কী? না, শোনা গেলো অর্জুন সাহা এখন রংপুর রওনা হচ্ছে। হঠাৎ রংপুর? ঠাকুরদার সৎকার নগদ, এর মধ্যে নাতির এখনই রংপুর যাওয়া কেন?

মানুষের কৌতূহল! আমরাও ঈষৎ কৌতূহলী হয়ে পড়ি। তাকিয়ে দেখি অর্জুন সাহা মোটরসাইকেলের ওপর চেপে বসে ওই বেরুলো। তারপর ধাঁ করে কয়েক পলকের জন্যে রাতের সড়ক হেডলাইটের তীব্র শাদা আলোয় ছিঁড়ে ফেলে অর্জুন সাহার মোটরসাইকেল তীরের বেগে ওই ছুটে মিলিয়ে গেলো। আহত রাতটা পলকেই তার অন্ধকারের কম্বলটা দ্রুত টেনে নেয়। আমরাও একটু একটু করে কুঞ্জবাবুর বাড়ির কাছে ঘেঁষে যাই। তৎক্ষণাৎ বাড়ির বাইরে ইলেকট্রিকের আলো আমাদের টের পেয়েই যেন ফটাফট জ্বলে উঠলো।

সমুখের মাঠ আলোয় ভেসে যায়। অচিরে দেখা যায় নিতাইবাবুকে। তিনি এসে বারান্দায় ওই দাঁড়ালেন। ওই তাঁর গলায় সোনার চেন, হাতে আঙটি, সোনার পাড়ের মিহি ধুতি, পায়ের পাম্পশুটাও ঝাঁ-চকচক করছে। মাঠ আর সড়কের ওপর ভিড় করা মানুষজনের দিকে লক্ষ করে ওই তিনি হাত জোড় করলেন। তারপর খুব শান্ত গম্ভীর গলায় ভাষণ দেবার স্বরে বলতে লাগলেন, বাবার দেহান্ত হইছে, হরির নাম করিতে করিতে তাঁই ভগমানের কাছে চলি গেইছে, চন্দনের কাঠ রংপুরে পাওয়া যায়। অর্জুন রওনা হয়া গেইলো চন্দনের কাঠ জোগাড় করিতে। ঘৃতের ভাঁড় আসিবার ধরিছে, তাও আধমণই লাগিবে, দেখি কতকক্ষণে পুরা হয়। তোমরা এলা যাও। কাইল দুফরের আগে তো রংপুর হতে চন্দন আসিয়া পেঁছিবে না। তার বাদে চিতা। শ্মশানঘাটে তখন আসিও। এখন ভিড় করিয়া শোকের বাড়ি না ভার করেন তোমরা।

তাহলে বনের মাগনা কাঠ নয়, চন্দনের কাঠ! আর, মানুষজন যে বলাবলি করতো, কুঞ্জবাবুর দীনদরিদ্র ধুতি ফতুয়া তার ব্যাটার কারণেই, ব্যাটাও যে বাপের বেলাতেও হাত টান করিয়াই রাখিতো, বাহে! - এখন ঘৃত চন্দনের কথা শুনে একজন কেউ বলে ওঠে আমরা শুনতে পাই - বাঁচি থাইকতে দিছে তিতপুঁটি, আর মরি গেইলে দিবে গোস্তরুটি! - এই নিয়ে হাসির সে কী হুল্লোড় পড়ে যায় ভিড়ের মধ্যে। একজন কে তাড়া দিয়ে বলে, কন বাহে আর একবার শোলোকটা কন। - তারপর আস্তে আস্তে মানুষজন সরে যেতে থাকে, ভিড় পাতলা হয়ে আসতে থাকে, যেতে যেতে পথের বাজারি মানুষের জিহবা থেকে বিস্ময়ের আওয়াজ উড়তে থাকে - চন্দনের কাঠ! ঘৃতের ভাঁড়! কুঞ্জবাবু শুনিলে মরার খাট হতে ফাল দিয়া উঠিতো!

বিস্ময়ের আরো বাকি ছিলো, দুইদিন পরে পথে নিতাইবাবুকে দেখে আমরা চিনতেই পারি না। এই মানুষ! সেই মানুষ? এ কী বেশ তার? ময়লা কোড়া সাধারণ ধুতি হাঁটু পর্যন্ত, গলায় নাই সোনার চেন, হাতে নাই একটাও আঙটি, পায়ে নাই পাম্পশু, একেবারে খালি পা, বগলে গোটো করে ধরা চিটা বাঁশের বসার একখান আসন। নিতাইবাবু জলেশ্বরীর বাজার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মাটির দিকে চোখ রেখে। পিতৃদশা চলছে তাঁর। আহা, বাপ বলে কথা, বাপ চলে গেছে, অনাথ এখন! দেখে লোকের উদাস হয়ে যাওয়ারই কথা, উদাস তারা হয়, কিন্তু নিতাইবাবুর কথা ভেবে নয়, কেন এ উদাস বাতাস তাদের মনটাকে ভারি করে তোলে তা নির্ণয় করার মতো মন এখন আমাদের নাই।

আয়েশার লাশ এখনো পড়ে আছে লাল ইটের লাশকাটা ঘরে। বাবা কুতুবুদ্দিনের মাজার ঘুরে আমরা আধকোশার পাড়ে কাশেমচাচার চালাঘরের চা দোকানে এসে যাই। ডোম পাওয়া যায় নাই, হাসপাতালের এক পুরুষ নার্স লাশ কাটতে রাজি হয়েছে, তবে তার আগাম টাকা আর ডাক্তারের খরচ এখনো জোগাড় করা যায় নাই। টাকা! টাকা! হা টাকা! আমরা রব শুনি। আমরা কাতর হয়ে বসে থাকি। এক সময় হঠাৎ আমরা জেগে উঠি। নদীর পাড়ে খেয়াঘাটে রব শুনে আমাদের ঘোর ভাঙে। ওপার থেকে খেয়া নৌকায় আসা এক দল হুজুরের আওয়াজ শুনি - বিচার আমরা মানি না! ফাঁসির রায় মানি না! - আমরা উঠে দাঁড়াই।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে সমস্বরে আওয়াজ দিতে দিতে ওই ওরা নৌকা থেকে লাফিয়ে নামছে, শহরে ঢুকে পড়বার জন্যে হুড়োহুড়ি করছে। আমরা অবাক হয়ে ভাবি, একাত্তর কি এরা ভুলে গেছে? একাত্তরে তো বাংলাদেশে এমন একটিও পরিবার ছিলো না যার কিছু না কিছু ক্ষতি হয়েছে পাকিস্তানের মিলিটারির তান্ডবে - আপনজন খুন হয়েছে, বাড়ি পুড়েছে, বাড়িছাড়া হতে হয়েছে, নারীর ইজ্জত গেছে, মায়ের কোল খালি হয়েছে - কিছুই কি এদের জানা নাই? কিছুই কি শোনে নাই? দেখে নাই?

ঠিক তখনই আরেক রব আমরা শুনতে পাই। আজ কয়দিন থেকে ছায়ার মতো সাথ লওয়া, কয়দিনের এত ঘটনার সাক্ষী থাকা সেই অচিন চ্যাংড়া গেয়ে উঠেছে - চমকে তাকাই তার দিকে, চোখে তার বিষণ্ণ করুণ বিদ্রূপের ছটা - গলা তার ছড়িয়ে পড়ছে আধকোশার এপার ওপার ব্যেপে -

এসব দেখি কানার হাটবাজার।

বারবার সে এই একটি পদই গাইতে থাকে, এই একটি পদই সে হাসপাতালের সমুখ দিয়ে গাইতে গাইতে যায়, কুঞ্জবাবুর বাড়ির পথ দিয়ে চলতে চলতে গায়, কাশেমচাচার বড়ভাইয়ের পাকা বাড়ির সমুখের মাঠে গায়, গাইতে গাইতে কোথায় সে একদিন উধাও হয়ে যায়, আর আমরা তাকে দেখি না, কিন্তু তখনো তার ওই একটিই পদ জলেশ্বরীর আকাশ বাতাসে ভাসতে থাকে।

বোধ করি সে কানার হাটবাজার থেকে বেরিয়ে যাবার ইচ্ছায় পৃথিবীর পথে আবার তার পা রাখে।


 

এইজ অফ ইউরোপিয়ান ডিসকভারি - ১


#১৮২৪
মিশরের ফারাও দ্বিতীয় রামসিসের কফিন যেদিন প্রথম খোলা হয়,সেদিন তার মমির ভেতর দুটো অদ্ভুত জিনিস পাওয়া যায়।এই দুটো জিনিসের সেখানে থাকার কথা ছিল না।
জিনিস দুটো হল তামাক আর কোকোয়া।
আজ থেকে সাড়ে পাচশো বছর আগে ইউরেশিয়া বা আফ্রিকার কোথাও এই দুটো জিনিস ছিল না।তাহলে এই দুটো জিনিস সাড়ে তেত্রিশ শো বছর আগে মিশরে গেল কিভাবে??
¥ ¥ ¥
সাড়ে তিন হাজার বছর পুরানো এক সভ্যতা ছিল মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অংশে।নাম ওলেমাক।
এই সভ্যতার বাসিন্দাদের নাক অদ্ভুত রকম থ্যাবড়া,দাতের সামনের পাটি উচু,কপালটাও উচু থেকে ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে গেছে,অনেকটাই আফ্রিকানদের মত।
কিন্তু সাড়ে তিন হাজার বছর আগে কোন আফ্রিকান লোক সেখানে গেছে বলে জানা যায় নাই।অন্তত লিখিত কোন প্রমান নাই।
মেক্সিকোতে জিনোনি নামে একটা ট্রাইব আছে।এদের জেনেটিক প্রোফাইল টেস্ট করে পিউর জাপানিজ বেশ কিছু জিন পাওয়া গেছে।জিনোনিরা মেক্সিকান অন্যান্য ট্রাইব থেকে সম্পুর্ন আলাদা,তাদের চাল চলন ও আচার আচরনই শুধু নয়,আকার আকৃতিতেও।
¥ ¥ ¥
১৮৮২ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার দক্ষিণ পশ্চিমে একটা খাল খননের সময় শ্রমিকেরা ২৫টি মুদ্রার সন্ধান পায়,মুদ্রার গায়ে লেখা হিজিবিজি ভাষা পড়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না।
একটু একটু করে সেই খবর পোছাল খনন কারীদের সাথে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক
ের কাছে।
তিন বছর পর জানা গেল এগুলো চীনা রাজবংশ শাঙ ডাইন্যাস্টির সম্রাট হুঙেটির মুদ্রা।
সম্রাট হুঙেটির রাজত্বকাল ছিল কবে শুনলে আশ্চর্য হতে হয়।
খ্রিস্টপুর্ব ২৬০০অব্দে,আইমিন আজ থেকে ৪৬০০ বছর আগে,যখন গিজাতে ফারাও খুফু পিরামিড বানাচ্ছিলেন,তখনকার কথা।
¥ ¥ ¥
মানুষ কখনই এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকার মত সুশীল প্রাণী ছিল না।
পৃথিবীর বুকে পা রাখার পর থেকেই সে ঘুরে বেড়িয়েছে এখান থেকে ওখানে,বারবার চিনতে চেয়েছে অজানাকে।
আফ্রিকা বা আরব উপদ্বীপের কাছাকাছি কোথাও থেকে মানুষের ওই যাত্রার শুরু বলে বিজ্ঞানীরা ধারনা করে থাকেন।
সভ্য হবার পর প্রত্যেক সভ্যতাই চেষ্টা করেছে নিজেদের সভ্যতার কথা পৃথিবীর অন্যান্য অংশে নিয়ে যেতে।
আমেরিকা আবিষ্কারের যে গল্প এখন আমাদের শোনানো হয় তা কোনভাবেই আমেরিকা অবিষ্কারের প্রথম গল্প না।সেই গল্পটা বড়জোর প্রথমবারের মত আমেরিকাকে কলোনী বানানোর গল্প।
তার আগে বহুবার দুঃসাহসী মানুষেরা আমেরিকায় গেছেন।
নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের এই রেসে সম্ভবত পাইওনিয়ার ছিল চাইনিজরা।
চাইনিজরা এখন পর্যন্ত দাবি করছে মিং ডাইন্যাস্টির অ্যাডমিরাল ঝেং হোর কথা,কিন্তু ঝেং হো আমেরিকাতে পৌছেছেন তার কোন প্রমান সরাসরি দেয়া সম্ভব হয় নাই।
ঝেং হো একজন মুসলিম ছিলেন।
তার আগেও মুসলিমরা বারবার চেষ্টা করেছে অসীম আটলান্টিক পাড়ি দিতে।এদের মধ্যে একজনের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়,নাম খাসখাস ইবনে সাইদ ইবনে আসওয়াদ,তার সম্পর্কে আল মাসউদী নবম শতাব্দীতে লিখেছেন তিনি আটলান্টিক পেরিয়ে ওপারে গিয়েছিলেন এবং তারপর,সেই দেশ থেকে জাহাজ বোঝাই করে প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে এসেছিলেন।আল মাসউদী এই কথা লিখেছেন ৮৮৯ সালে,তার বই মুরুয আদ দ্বোয়াহাব ওয়াল মাদিন আল জাওহারে,কর্দোবার খলিফা আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদের আমলে।
এই দুজনের মাঝখানে চাপা পড়ে গেছে পৃথিবীর সবচাইতে বড় অ্যাডভেন্ঞারার সম্রাঠের কথা।
মালি সাম্রাজ্যের নাম যারা শুনেছেন তারা অবশ্যই জানেন ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে পৃথিবীর সবচাইতে সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য ছিল মালি সাম্রাজ্য।পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে সম্পদশালী ব্যক্তি বলা হয় এই সাম্রাজ্যের সম্রাট মানসা মুসাকে।
মানসা মুসার চাচা দ্বিতীয় আবুবকর এতই অ্যাডভেন্ঞার প্রিয় ছিলেন যে তিনি একবার সিদ্ধান্ত নেন তিনি আটলান্টিক মহাসাগর কোথায় শেষ তা দেখে ছাড়বেন।
এই সিদ্ধান্ত ঠিক রাখতে গিয়ে তিনি নিজের সিংহাসন ছেড়ে চারশো জাহাজের এক বহর নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পশ্চিম আফ্রিকা উপকূল থেকে সোজা পশ্চিমে,সাত বছর পর তিনি ফিরে আসেন,চারশো জাহাজের মধ্যে কেবল একটি নিয়ে,কিন্তু তাতে তিনি অনেক সম্পদ বোঝাই করে নিয়ে এসেছিলেন।
কিন্তু এরাই আমেরিকার মাটি ছোয়া পুরানো দুনিয়ার প্রথম সভ্য মানুষ নন।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতে পাওয়া চীনা সম্রাটের মুদ্রা,ফারাওয়ের মমিতে পাওয়া তামাক আর কোকোয়া এবং ওলেমাক সভ্যতা ও জিনোনি উপজাতির মানুষের দৈহিক গড়ন,এই তিনটি বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দেয়,হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ পুরানো পৃথিবী থেকে নতুন পৃথিবীতে আসা যাওয়া করছে।
খ্রিস্টান ইউরোপ বা মুসলিম মধ্যপ্রাচ্য থেকে নয়,মানুষের আমেরিকার টিকিট কাটা শুরু হয়েছিল জাপান,চীন বা আফ্রিকার কোন কালো মানুষের মাধ্যমেই।
অথবা,শুরুটা পলিনেশিয়ান নাবিকদের দিয়েও হতে পারে,প্যাটাগোনিয়ার মালভুমিতে একবার দুটো মুরগির শুকনো হাড় পাওয়া যায়,কার্বন টেস্ট করে পাওয়া গেছিল,মুরগি দুটো সেখানে এসেছে অন্তত তিন হাজার বছর আগে,এবং সেগুলো পলিনেশিয়ান বনমুরগি।
আমেরিকা আবিষ্কারের পেটেন্ট তাই ইউরোপিয়ান এক্সপ্লোরার বা ইসলামিক মুবাল্লিগ কারোরই প্রাপ্য নয়,সেটা বরং পেতে পারেন কোন আফ্রিকান বা পলিনেশিয়ান নাবিক বা চাইনিজ অভিযাত্রী।
কিন্তু তাদের দুটো ঘাটতি ছিল।
এক নম্বর ঘাটতি ছিল,তারা ঐ জায়গাগুলোকে কলোনাইজ করতে পারেন নি।
দুই নম্বর ঘাটতি হল,তারা কখনোই আসা যাওয়ার রাস্তাকে নেভিগেশন চার্টে নিয়ে আসতে পারেন নি।খাসখাস ইবনে সাইদের চার্ট নাকি ছিল,কিন্তু হালাকু খানের হাতে বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ ধ্বংসের সাথে সাথে সেটাও হারিয়ে গেছে।
তাই, ১৪৯২ সালে কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন,তখন একটা নতুন যুগের শুরু হয়।তিনি শুধু গিয়ে ফিরে আসেন নি,আসা যাওয়ার পুরো পথ নেভিগেশন করে খুলে দিয়েছেন অজানাকে জানার স্থায়ী পথ।
সেই সাথে তিনি জন্ম দিয়েছেন দুটো
শব্দের,কলোনাইজেশান আর গ্লোবালাইজেশান।
ভু-গোলকটা কিভাবে ইউরোপের হাতের মুঠোয় ঢুকলো,সেই গল্পের শুরুটা এখানেই।

 

উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ...

হাচিকো - যে কুকুরটি তার মনিবের জন্যে অপেক্ষা করেছিলো দশটি বছর


ochanahemaloy-1494775943-99c0ff2_xlargeপ্রাণীদের মধ্যে কুকুর সহজেই মানুষের পোষ মানে এবং অল্পদিনের মধ্যেই অনুগত হয়ে উঠে। কুকুরের বিশ্বস্ততা এবং আনুগত্যের অসংখ্য উদাহরণ আছে। তবে তার মধ্যে এমন একটি উদাহরণের কথা আজ তুলে ধরবো, যা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে।
.
১৯২৪ সালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক একটি ‘আকিতা’ কুকুর পালবার জন্যে নেন এবং কুকুরটির নাম রাখেন ‘হাচিকো’। আকিতা কুকুরগুলো খুব সহজেই পোষ মানে। হাচিকোও ব্যতিক্রম ছিলো না। খুব সহজেই সে তার মনিবের কাছের বন্ধুতে পরিণত হয়। প্রতিদিন কুকুরটি তার মনিবের বাড়ি ফেরার সময় হলে ট্রেন স্টেশনে গিয়ে অপেক্ষা করতো, আর বাড়ি ফিরতো তার মনিবকে নিয়ে।
.
এভাবেই চলতে থাকলো। কিন্তু ১৯২৫ সালের মে মাসের একদিন যথারীতি একই সময়ে স্টেশনে গিয়ে হাচিকো দেখতে পায় তার মনিব ফিরেনি। ফেরার কথাও না অবশ্য তার মনিবের। কারণ, ক্লাসে লেকচার দিতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন যে তিনি!
.
মনিব আর ফিরবেন না, অবুঝ প্রাণী হাচিকো সেটা বুঝতে পারেনি। তাইতো তার মনিবের মৃত্যুর পরেও প্রতিদিন সে একই সময়ে স্টেশনে যেতো আর অপেক্ষা করতো- তার মনিব হয়তো ট্রেনে করে আসবে, আর তাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরবে। এভাবে মনিবের মৃত্যুর পরেও প্রায় দশ বছর হাচিকো প্রতিদিন একই সময়ে স্টেশনে এসে তার মনিবের জন্যে অপেক্ষা করেছিলো, যা সবাইকে অবাক করে দেয়।
.
১৯৩২ সালে একজন সাংবাদিক হাচিকোকে নিয়ে সংবাদপত্রে নিউজ ছাপার পর সবাই ঘটনাটি জানতে পারেন। অনেকে স্টেশনে এসে হাচিকোকে দেখে যান, আবার অনেকে তার জন্যে খাবার নিয়ে আসেন। হাচিকো জাপানে ধীরে ধীরে সবার কাছে বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের প্রতীক হয়ে উঠে। তাকে নিয়ে তৈরি হয় ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র; লেখা হয় বই। এভাবে হাচিকোর ঘটনা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
.
.
আরো জানতে - Click This Link
হাচিকোর উইকিপিডিয়া পেইজ - https://en.wikipedia.org/wiki/Hachikō

ইংলিশ চ্যানেলের পানি


যুক্তরাষ্ট্রে সর্দি লেগে বন্ধ হওয়া নাকের দাওয়াই হিসেবে বিক্রি হচ্ছে বিখ্যাত ইংলিশ চ্যানেলের পানি। সেন্ট মালোর উপকুলের কাছে জাহাজ চলাচলের ব্যস্ত নৌপথ এ চ্যানেল থেকে পানি আহরণ করা হচ্ছে। এ পানি বিক্রেতা ওষুধ কোম্পানি শেরিং-প্লাউ জানায়, তাদের আফরিন পিওর সি হাইড্রাটিং নাজাল রিঞ্জ একমাত্র বন্ধ নাক খোলার ওষুধ, যেখানে শতভাগ বিশুদ্ধ পানি রয়েছে। শেরিং-প্লাউয়ের দাবি, এ পানি নাকের শ্লেষ্ক্না পরিষ্ককার ও শ্বাস টানা সহজ করতে বেশ কাজের, আর এরই মধ্যে তা প্রমাণিত হয়েছে।

সিগারেটের ইতিহাস এবং মানুষ কেন সিগারেট খায় ?


মানুষ কেন সিগারেট খায় ? আজব প্রশ্ন ! এ প্রশ্নের উত্তর নিজের মত করে দেবো । আগে সিগারেটের ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেয়া আবশ্যক !

ইউরোপিয়ানদের মধ্যে বিখ্যাত নাবিক এবং আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাসই প্রথম তামাক গাছ দেখেন। ১৪৪২ সালে কলম্বাস যখন সান সালভাদরে গিয়ে পৌঁছান তখন সেখানকার আদিবাসীরা মনে করেছিলো কলম্বাস ঈশ্বর প্রেরিত স্বর্গীয় জীব! তারা কলম্বাসকে উপহার স্বরূপ কাঠের তৈরি যুদ্ধাস্ত্র, বন্য ফলমূল এবং শুকনো তামাক পাতা দিয়েছিলো। অন্যান্য উপহার গুলো নিলেও কলম্বাস ধূমপান না করে তামাক পাতা গুলো ফেলে দিয়েছিলো।
ঠিক ঐ বছরই আরেকজন ইউরোপিয়ান রডরিগো ডি যেরেয (Rodrigo de Jerez) কিউবায় গিয়ে পৌঁছান এবং ইউরোপিয়ান হিসাবে তিনিই প্রথম ধূমপান করেছিলেন। রডরিগো ডি যেরেয ছিলেন স্পেনের নাগরিক। পরবর্তীতে স্পেনে ফিরে গিয়ে তিনি জনসম্মুখে ধূমপান করে মানুষজনকে চমকে দিতেন। এক জন মানুষের নাক এবং মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে এটা দেখে সাধারন মানুষ ভড়কে যেত। একটা সময় অনেকেই ভাবতে শুরু করে যে রডরিগো ডি যেরেযের উপর শয়তান ভর করেছে। তাই রডরিগোকে ৭ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়! কারাগারে রডরিগোর সাথে থেকে অনেকেই ধূমপান শুরু করেন।

তামাক এবং পাইপের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। একসময় জন্ম হয় সিগারেটের। সিগারেট আস্তে আস্তে সবার কাছে গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠে।

১৮১৫ সালে সিগারেট ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়। এমনকি দি হাউস অফ পার্লামেন্টেও সিগারেট খাওয়ার জন্য আলাদা রুম করা হয়।
১৮২৮ সালে নিকোটিনের পিওর ফর্ম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। কিছুদিনের মধ্যেই সবাই বুঝতে পারে এটা মারাত্মক বিষ!
১৮৫২ সাল থেকেই ধূমপান করার সুবিধার্থে ম্যাচ বা দিয়াশলাই এর প্রচলন হয়।
১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ান যুদ্ধ ফেরত সৈন্যরা তুর্কি থেকে সিগারেট নিয়ে আসে। সৈনিকদের মাঝে সিগারেট অনেক জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। অলসতা এবং বিষাদ দূর করার জন্য তখন সৈন্যদেরকে নিয়মিত সিগারেট সরবরাহ করা হতো।
১৮৬৫ সালে আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার ওয়াশিংটন ডিউক নামের এক ব্যাক্তি প্রথম সিগারেট রোল করে বিক্রি করা শুরু করে।
১৮৮৩ সালেজেমস বনস্যাক প্রথম সিগারেট রোল করার মেশিন আবিষ্কার করেন। এই মেশিন দিয়ে দিনে ১০০০ সিগারেট তৈরী করা যেত। বনস্যাক একটা সিগারেট কোম্পানী শুরু করেন যার নাম ছিলো আমেরিকান টোবাকো কোম্পানী। বনস্যাকের মেশিন সিগারেট শিল্পে বিপ্লবের সূচনা করে। তামাক চাষ এবং সিগারেট প্রস্তুত প্রক্রিয়ার উন্নতির সাথে সাথে সিগারেট ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় আর্মিদের রেশনের সাথে সিগারেটও যুক্ত করা হয়।
১৯৫০ সালে সিগারেটের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে প্রথম প্রচারনা শুরু হয়। এই সময়ই ধূমপান এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করা হয়। ড. ওয়াইন্ডার এবং ড. গ্রাহাম একটি গবেষণায় দেখান যে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ৯৫% মানুষই ২৫ বছর বা তার বেশী সময় ধরে ধূমপানে আসক্ত।

এবার আশা যাক কেন মানুষ সিগারেট খায় এ প্রসঙ্গে ! বেশিরভাগ কিশোর বা যুবক সিগারেট খায় হতাশার কারনে। নিজেকে কষ্ট দিয়ে তারা আনন্দ পেতে চায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা নিয়মিত সিগারেট খায় , তাদের জীবনে একটা খারাপ অতীত থাকে। অতীতের কষ্ট বাষ্প করে দিতে সিগারেটে টান ধরায়। আদৌ কি কষ্ট লাঘব হয় ? সম্ভবত না। আবার এক ধরনের মানুষ সিগারেট খায় শখের বশে ! তাদের ধারনা সিগারেট না খেলে স্মার্ট হওয়া যায় না। যাই হোক , যারা সিগারেট খায় তারা এক সময় আফসোস করে। যদি আপনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে থাকেন , তবে বলব হতাশা কাটাতে বই পড়েন , ঘুরতে যান , ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হন। সিগারেট খাবার দরকার কি ! আর যদি আপনি শখের বশে সিগারেট খান , তবে বলব আপনি ভুলের জগতে আছেন। কিছু কিছু লোক আছেন যারা এ খারাপ ত্যাগ করতে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেন না। তাদের উচিত হবে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা। আমাদের সমাজেরও কিছু সমস্যা আছে বলে আমি মনে করি। কোন কিশোর সিগারেট খেলে তাকে ঠেলে দেয় নষ্টের কাতারে। সিগারেট খেলে ফুসফুসের ক্ষতি হয় , চরিত্রের কি হয় ! এ দেশে একজন লম্পট চরিত্রের ছেলের থেকে একজন সিগারেটখোর ছেলেকে বেশি ঘৃণার চোখে দেখা হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মনোভাবও তাদের সিগারেট খেতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি সিগারেট খাওয়াকে সমর্থন করি না। মাত্র অল্প কটাদিন আমরা বাচিঁ। দুঃখ কষ্ট তো থাকবেই ! সিগারেট কখনই দুঃখ লাঘবের হাতিয়ার হিসেবে গন্য হতে পারে না।আরেকবার ভাবুন ! আপনার জীবনের গল্প আপনার হাতে। সুন্দর করে গড়ুন জীবনটা। বেদনাকে এত গাঢ় করে কি লাভ ! জীবনানন্দ দাসের এই কবিতাটা পড়েছেন , " কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে ! "

 

উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ..

জীবনানন্দের কাকাতো বোন শোভনা ছিলেন বনলতা সেন


বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী চরিত্র বনলতা সেন। সুদীর্ঘকাল সকলের ধারণা ছিলো বাস্তবে বনলতা সেন বলে কারোর অস্তিত্ব নেই। ‘বনলতা সেন’ কেবলই কবির কল্পনা। না, বনলতা কবির ভাবনা পটে আঁকা কোনো ছবি নয়। বনলতা বাস্তবেরই এক চরিত্র। যে কিনা কবির মানসজগতকে প্রভাবিত করতে সমর্থ হয়েছিল। কবির ইংরেজিতে লেখা দিনলিপি ’লিটারেরি নোটস’-এ ‘ওয়াই’ হিসেবে চিহ্নিত মেয়েটি ‘শোভনা’-ই বনলতা সেন বলে পাঠোদ্ধার করেছেন জীবনানন্দ গবেষক ও জীবনানন্দের রচনাবলীর সম্পাদক ভূমেন্দ্র গুহ। যার সঙ্গে প্রথম যৌবনেই পরিচয় হয়েছিল কবির। সম্পর্কে তিনি কবির কাকাতো বোন। জীবনানন্দের কাকা ফরেস্ট অফিসার অতুলান্ত দাশের মেয়ে শোভনা। যার ডাক নাম বেবী। জানা গেছে, ১৯৩৩ সাল অর্থ্যাৎ কবির বয়স যখন চৌত্রিশের কোঠায় তখন শুধু শোভনা নয়, কবি আরো তিনটি মেয়ের প্রেমে পড়েন। শোভনাকে তিনি ভালোবেসেছেন ঠিকই কিন্তু জীবনসঙ্গী করতে চাননি। কেননা যখন লাবণ্য দাশের সঙ্গে কবির বিয়ের কথা পাকাপাকি তখনও কবি কোনো অনিচ্ছা প্রকাশ করেননি। অথচ বিয়ের আগে থেকেই তিনি শোভনাকে ভালোবাসতেন। শোভনা যখন বেনী দুলিয়ে হাঁটতেন আর অদ্ভূত বিস্ময়ে মিলুদা মানে কবির কবিতা শুনতেন তখন থেকেই কবির সঙ্গে শোভনার ভাব তৈরি হয়। আর ১৯৩৩ সালেই বনলতা সেন কবিতাটি লেখা হয়। কবির মৃত্যুর পর বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকার পৌষ ১৩৪২ সংখ্যায় (১৯৩৫ সালের ডিসেম্বর মাসে) কবিতাটি প্রকাশিত হয়। শোভনাকে নিয়ে কবির বনলতা সেনই প্রথম লেখা নয়। এর আগে কারুবাসনা নামে যে উপন্যাসটি লেখেন তাতেও অকপটে শোভনা প্রসঙ্গ ব্যক্ত করেন। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ শোভনাকে উৎসর্গ করেছিলেন। তৎকালীন রক্ষণশীল পরিমণ্ডলে বাড়ির অভিভাবকদের নির্দেশ উপেক্ষা করে ডিব্র“গড়ে শোভনাদের বাড়িতে দরজা বন্ধ করে জীবনানন্দ শোভনাকে কবিতা শোনাতেন। বরিশাল ছেড়ে কলকাতায় কবি যখন সিটি কলেজে শিক্ষকতা করছেন তখন শোভনা ডায়োসেশান কলেজে পড়ছেন। এ সময় (১৯৩২ এর আগস্টে) তিনি উপন্যাস লিখলেন ‘কলকাতা ছাড়ছি’। উপন্যাসের নায়িকা শচীও ডায়োসেশানে পড়ে। এছাড়া ‘গ্রাম ও শহরের গল্প’ উপন্যাসটির নায়িকা শচী- জীবনানন্দের শোভনাই। লিটেরেরি নোটস-এ লেখা আছে ওয়াই = শচী। ধারণা করা হয় ‘প্রেম’ কবিতাও তিনি শোভনাকে নিয়ে লিখেছেন।

 

উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ..

মুর্শিদ কুলি খান এর কন্যা আজিমুন্নেছার জীবন্ত সমাধি


বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলি খান এর কন্যা ছিলেন আজিমুন্নেছা বেগম। জনশ্রুতি রয়েছ, কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় নবাবি হেকিম দৈনিক একটি মানবশিশুর কলিজা দিয়ে ওষুধ তৈরি করে দিতেন। অসুখ সেরে গেলেও তিনি মানবশিশুর কলিজায় নেশাগ্রস্ত হয়ে গোপনে নিয়মিত ভাবে শিশুদের কলিজা খেতে থাকেন। এই ঘটনা মুর্শিদকুলি খাঁ জানতে পেরে তাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নির্দেশ দেন। মুর্শিদাবাদ ঘুরতে গিয়ে টাঙ্গার (এক ঘোড়া চালিত গাড়ি) চালকের কাছে এমন মিথ শুনে সত্যিই চমৎকৃত হয়েছিলাম। একতলা পাকা মঞ্চের উপর মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে আজিমুন্নেসার সমাধি। মঞ্চের উপরিভাগে বাম পাশে একটা দেয়াল ছাড়া মসজিদের আর কোন চিহ্ন বর্তমানে নাই। কথিত আছে সাধারণ মানুষের পদধূলিতে তার শিশু হত্যার পাপ মোচনের জন্য মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে তাকে জীবন্ত সমাহিত করা হয়।

 

উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ...

যুক্তরাষ্ট্রে যৌনতা সম্পর্কিত কিছু অদ্ভূত আইন!


পৃথিবীতে আইনের প্রকারভেদ কত, তা বলা আসলে মুশকিল। বিভিন্ন দেশের আইন-কানুন বিভিন্ন রকম। আবার আইনের মধ্যে রয়েছে নানান রকমফের। দেশ ভেদে রয়েছে মজার ও অদ্ভূত আইনও। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে যৌনতা নিয়ে রয়েছে এমন কিছু অদ্ভূত আইন।
আলাবামা
পরিবারের সদস্যকে বিয়ে করা আইন সিদ্ধ।
আরকানসাস
কাউকে নিজের দিকে আকর্ষন করা এবং কামুক দৃষ্টি নিয়ে কারো দিকে তাকানোর কারনে হতে পারে ৩০ দিনের জেল।
টেনেসি
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একে অপরের হাত ধরার অনুমতি নেই।
নিউইয়র্ক
বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক বেআইনী।
মিশিগান
নিতম্বের অন্তর্বাস দেখা যায় এমনভাবে পোশাক পরা বেআইনী।
ওয়াশিংটন
আপনার গাড়িতে কোন যৌন কর্মীকে তার কর্মস্থলে পৌছে দিলে বাজেয়াপ্ত হতে পারে আপনার গাড়ি।
জর্জিয়া
সকল ধরনের যৌন খেলনা বেআইনী।
ক্যালিফোর্নিয়া
প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো পুরুষের নারীর পোশাক পরিধান করার উপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
আলাস্কা
শহরের রাস্তায় হরিনের যৌন মিলন অবৈধ। যদি এরকম কিছু আপনার চোখে পড়ে তবে পুলিশকে ফোন দিলে তারা এসে গ্রেফতার করবে হরিন যুগলকে।
নেবরাস্কা
গনোরিয়ায় আক্রান্ত হলে আপনার জন্য বিয়ে করা বেআইনী এ রাজ্যে।
সাউথ ক্যারোলিনা
আপনি যদি কোন নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সাথে ঘুমান তবে তাকে বিয়ে করা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক।
আইওয়া
পাঁচ মিনিটের বেশিক্ষণ জনসম্মুখে চুমু খাওয়া অবৈধ।
ইন্ডিয়ানা
জনসম্মুখে পুরুষের কামুক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো বেআইনী।



উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ...

ভুট্টার অজানা কিছু পুষ্টিগুণ


ভুট্টা, অতি সাধারণ একটি খাবারের নাম। সহজে চাষযোগ্য হওয়ায় বাংলাদেশে এর ফলন উল্লেখ করার মতো। ভুট্টার দাম হাতের নাগালে থাকায় এর বহুবিধ ব্যবহার চোখে পড়ে। শীতের এই সময়টাই বেবিকর্ণ বা ছোট ভুট্টা তরকারি, পরিপক্ক কাঁচা ভুট্টা পুড়িয়ে খাওয়াসহ ভুট্টার আটা নানা সুস্বাদু রান্নায় ব্যবহার হয়।


ভুট্টার আটার রুটি খাওয়ার প্রচলন আছে অনেক জায়গায়। উচ্চ মাত্রায় পুষ্টি সমৃদ্ধ এ খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। তবু আজ জেনে নেব চেনা ভুট্টার অজানা কিছু পুষ্টিগুণ সম্পর্কে।


* ভুট্টা উচ্চ শর্করা সমৃদ্ধ। অনেকেই তাদের দেহের শক্তি বৃদ্ধির জন্য ভুট্টাকে বেশি প্রাধান্য দেন। সকালের নাস্তায় ভুট্টাজাত খাবার খেলে সারাদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টির যোগান নিশ্চিত হয়।


* ভুট্টাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ খনিজ ও ভিটানের উৎস হিসেবেও ধরা হয়। এতে আছে উচ্চমাত্রার আয়রণ ও ম্যাঙ্গানিজ। আপনার দেহে অনাকাঙ্ক্ষিত জীবানু প্রবেশে বাধা দিয়ে শরীরকে রাখবে সুস্থ-সবল।


* ভুট্টার তেলে প্রচুর পরিমানে এ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে। পশু চর্বির মতো কোনো প্রকার ক্ষতিকারক দিক এই তেলে নেই। দেহের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভুট্টার তেলের তুলনা হয় না।


* এককাপ রান্না করা ভুট্টায় পাবেন ১৭৮ কিলো ক্যালোরি শক্তি। দিনভর সবল থাকতে প্রতিদিন সকালে খেতে পারেন ভুট্টা জাত খাবার। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ভুট্টার তৈরি খাবার খান তাদের শরীরে অতি উচ্চ মাত্রার ক্যালরি জমা থাকে। উদাহরণ হিসেবে আফ্রিকানদের কথা বলা যেতে পারে। তাদের প্রাধান খাদ্য ভুট্টাজাত বলেই এটি সম্ভব হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।


* ভুট্টা পটাশিয়ামের একটি আদর্শ উৎস, অন্যদিকে উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিকারী সোডিয়ামের পরিমাণ আছে খুবই কম পরিমাণ।


* ভুট্টায় পাবেন পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন ‘কে’। আমাদের দেশের বয়স্ক নারীদের কোমরের হাড় ক্ষয়ে যাওয় অতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া প্রতিরোধে দারুন কার্যকর ভিটামিন ‘কে’। তাই নিজেদের সুস্থ রাখতে প্রত্যেক নারীই ভুট্টাজাত খাবার খেতে পারেন।


* ভুট্টায় ভিটামিন বি১২ রয়েছে যা নতুন রক্তকোষ তৈরিতে সাহায্য করে। এতে রক্তস্বল্পতা দূর হয়।


* ভুট্টার ভিটামিন ‘এ’ চুলের হারিয়ে যাওয়া কোমলতা ফিরিয়ে এনে চুলকে আরও উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যকর করে তোলে। এছাড়া দৃষ্টিশক্তি প্রখর করতেও সাহায্য করে।


* ভিটামিন এ, সি ও লাইকোপিন ত্বককে উজ্জ্বল করে ও ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা দূরে রাখে।


* ভুট্টা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও কার্যকরী ভূমিকা রাখে।


যৌনতায় সবচেয়ে বিপজ্জনক পজিশনে হলো ‘কাউগার্ল’


যৌন মিলনের সময় নারীর ওপরে থাকা অনেকের কাছেই আনন্দদায়ক হলেও নতুন গবেষণা তথ্যানুযায়ী, এটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।


গবেষণার তথ্যানুযায়ী, মিলনের সময় নারী ওপরে থাকলে ভেঙ্গে যেতে গোপানাঙ্গের হাড়। সম্প্রতি ব্রাজিলের গবেষকদের প্রকাশিত অ্যাডভান্সেস ইন ইউরোলজি-তে প্রকাশিত গবেষণা ফলাফলে জানা গেছে এ তথ্য।


গবেষকদের মতে যৌনতায় সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থান হলো ‘কাউগার্ল’ নামে পরিচিত একটি পজিশন। অনেকে একে ‘হর্সরাইডিং’-ও বলে থাকেন। এ পজিশনে নারী ওপরে থাকে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ‘কাউগার্ল’ পজিশনে যৌনতার সময় আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এ অবস্থানে পুরুষাঙ্গের হাড় ভাঙার সম্ভাবনাও সবচেয়ে বেশি থাকে।


কাউগার্ল পজিশনে মূল সমস্যাটি হয় নিয়ন্ত্রণের ওপর। এ ক্ষেত্রে নারীর দেহের ওজন পুরুষাঙ্গের ওপর পড়ে, যার ফলে অনেক সময় সঠিকভাবে চাপ প্রয়োগ হয় না। ফলে এদিক-ওদিক হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। অন্যদিকে সাধারণভাবে প্রচলিত যৌনতার আসনগুলো কিছুটা নিরাপদ। বিশেষ করে যে আসনে পুরুষের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাই একে নিরাপদ বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।


যৌনতার সময় যেসব আঘাত পাওয়ার ঘটনা ঘটে, সেগুলো এ গবেষণায় তালিকাবদ্ধ করা হয়। গত ১৩ বছরের পরিসংখ্যান এতে বিবেচনা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আঘাতের ঘটনা ঘটে কাউগার্ল পজিশনে। এ অবস্থানে প্রায় অর্ধেক আঘাত পাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপরের অবস্থান রয়েছে বহুল প্রচলিত ‘ম্যান অন টপ’ অবস্থান। এ অবস্থায় যৌনতায় ২১ ভাগ আঘাত পাওয়ার ঘটনা ঘটে।


যৌনতায় আঘাত পাওয়াদের গড় বয়স ৩৪ বছর। প্রাথমিকভাবে এ সমস্যায় পতিত ব্যক্তিরা হাড় ভাঙার মতো শব্দ ও যন্ত্রণার কথা জানান। এরপর সাধারণত ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যদি অবস্থার উন্নতি না হয় তখন তারা চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন।


Tuesday, November 21, 2017

কার্ল সেগানের বিখ্যাত Pale Blue Dot স্পিচের অনুবাদ


১৯৯০ সাল, ১৪ই ফেব্রুয়ারি। ততদিনে কার্ল সেগান একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। ভয়েজার-১ যখন আমাদের সৌরজগত ছেড়ে আরো বাইরে চলে যাচ্ছিলো, তখন সেগান নাসাকে অনুরোধ করলেন, যাতে যাওয়ার আগে পৃথিবীর একটা ছবি তোলা হয় ঐ দূরত্ব থেকে। বিশাল সেই দূরত্ব থেকে ভয়েজার-১ এর তোলা পৃথিবীর ঐ ছবি দেখে Carl Sagan এটার নাম দিয়েছিলেন Pale Blue Dot

pale-blue-dot-wallpaper-1900x1200

মলিন নীল বিন্দু

এই সুবিশাল দূরত্ব থেকে, পৃথিবীকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হওয়ার কথা না। কিন্তু আমাদের জন্য ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।

বিন্দুটির দিকে আরেকবার তাকান – এটাই পৃথিবী, আমাদের বসত, আমরা এটাই। এখানেই ওরা সবাই, যাদের আমরা ভালোবেসেছি, যতজনকে আমরা চিনি। যাদের যাদের কথা আমরা শুনেছি, তাদের সবাই এখানেই তাদের জীবন কাটিয়েছে। আমাদের সারা জীবনের যত দুঃখ কষ্ট, হাজার হাজার ধর্ম, আদর্শ আর অর্থনৈতিক মতবাদ, যত শিকারী আর লুণ্ঠনকারী, যত সাহসী-ভীরু, সভ্যতার নির্মাতা-ধ্বংসকারী,যত রাজা আর প্রজা, যত প্রেমিক-প্রেমিকা, যত বাবা মা, স্বপ্নে বিভোর শিশু, আবিষ্কারক, পরিব্রাজক, যত নীতিবান শিক্ষক, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, যত সুপারস্টার, যত জাঁহাবাজ নেতা, মানব ইতিহাসের সকল সাধু আর পাপী, সবাই তাদের জীবন কাটিয়েছে আলোয় ভেসে থাকা ধূলোর ঐ ছোট্টো কণাটিতে।

অসীম এই মহাবিশ্বে…… খুব ছোট একটা মঞ্চ…… আমাদের এই পৃথিবীটা।

ভাবুন তো, সেনাপতি আর দিগ্বিজয়ী বীরের দল কত রক্ত ঝরিয়েছে – ক্ষুদ্র এই বিন্দুর ক্ষুদ্র একটা অংশ জয় করে, মহান হবার আশায়। ভাবুন তো, সেই সীমাহীন হিংস্রতার কথা; ছোট্টো এই বিন্দুর আরো ছোটো এক প্রান্তের মানুষ যা ঘটিয়েছে, অন্য প্রান্ত জয় করবে বলে।

কী দ্বন্দ্ব তাদের নিজেদের মাঝে! রক্তের জন্য তাদের কী পিপাসা! কী প্রকট তাদের জিঘাংসা! আমাদের নাক-উঁচু ভাব, আমাদের কাল্পনিক অহমিকা, ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আমরাই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছি, সেই বিভ্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয় এই ঝাপসা নীল আলো দিয়ে।

আমাদের এই গ্রহ, মহাজাগতিক অন্ধকারের মধ্যে নিতান্তই ক্ষুদ্র একটা বিন্দু। আমাদের অজ্ঞানতায়, এই বিশালতায়, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে কেউ আসবে, আমাদেরকে নিজেদের হাত থেকে রক্ষা করতে।

আমাদের জানামতে পৃথিবীই একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ। অন্য কোথাও, অন্তত নিকট ভবিষ্যতে, আমাদের প্রজাতি আস্তানা গাড়তে পারবে না।

ভ্রমণ? সম্ভব।

বসতি, এখনো নয়।

ভাল লাগুক আর নাই লাগুক, এই মুহূর্তে পৃথিবীই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।

বলা হয়ে থাকে জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের বিনয়ী করে তোলে, চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। মানুষের অহংকারকে ধূলিস্যাৎ করার জন্য দূর থেকে তোলা ছোট্টো পৃথিবীর এই ছবিটার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হয় না। আমার মতে, এটা মনে করিয়ে দেয়, কতটা জরুরি পরস্পরের প্রতি আরেকটু সহানুভুতিশীল হওয়া; এই ছোট্টো নীল বিন্দুটাকে, আমাদের একমাত্র বসতটাকে, সংরক্ষণ করা, উপভোগ করা।

উৎস ঃ http://onubadokderadda.com/pale-blue-dot-speech/

Monday, November 13, 2017

সম্রাট হুমায়ূন – সমরেশ মজুমদার


হুমায়ূনকে আমি প্রথম দেখি একুশের বইমেলায়, সাতাশি সালের এক সন্ধ্যায়।

যিনি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘‘ইনি হুমায়ূন আহমেদ। ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি-নাটক লিখেছেন, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামের উপন্যাস লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ান।’’ দেখলাম, একটি শীর্ণ যুবককে, যার পরনে পা়ঞ্জাবি, চোঙা পাজামা গোড়ালির ওপরে। কিন্তু চশমার আড়ালে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ। হেসে বলেছিল, ‘‘আমি আপনাদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি।’’

সে দিন মেলার দর্শক-শ্রোতারা হুমায়ূনকে ঘিরে ভিড় জমায়নি। রথের মেলায় উদাসীন বালকের মতো বইমেলায় ঘুরছিল সে।

বছর পাঁচেক পরে ঢাকার একুশের বইমেলায় ঢুকেই দেখি বিশাল লাইন। বই হাতে মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। প্রশ্ন করে জানলাম ওঁরা হুমায়ূন আহমেদের বই কিনে দাঁড়িয়ে আছেন অটোগ্রাফ করিয়ে নেবেন বলে। অন্তত পাঁচ-ছ’শো মানুষ একই আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন দেখে অবাক হলাম।

আমাদের কলকাতা বইমেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে কি না মনে পড়ল না। সমরেশ বসু-শংকর-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যখন মেলায় আসতেন, তখন তাঁদের ঘিরে ছোটখাট ভিড় জমলেও এমন লাইন পড়ত না।

সময়টা উনিশশো বিরানব্বই। তখনও কলকাতার পাঠকদের নব্বই ভাগ হুমায়ূন আহমেদের নাম শোনেননি, বই পড়া তো দূরের কথা। লাইনের শুরুতে পৌঁছে দেখলাম একটি স্টলের সামনে চেয়ারে বসে হুমায়ূন মাথা নিচু করে একের পর এক সই দিয়ে যাচ্ছে। যে বই এগিয়ে দিচ্ছে তার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না।

আমি একটা ‘গীতবিতান’ এগিয়ে ধরতে সে আমাকে না দেখে বইটি নিল। সই করার ঠিক আগে থেমে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘‘সর্বনাশ, আপনি কি আমাকে দোজখে পাঠাতে চান? এই বই-এ সই করার যোগ্যতা তো আমার—!’’ বলতে বলতে মুখ তুলেই সে আমাকে দেখতে পেল। তার চোখ বিস্ফারিত হল। লাফিয়ে উঠে আমাকে প্রণাম করতে এল সে। বলল, ‘‘ছি ছি, আপনি আমায় এ কী লজ্জায় ফেললেন!’’

গত পঞ্চাশ বছরে আমি বিখ্যাত, অতি বিখ্যাত অনেক লেখকের সংস্পর্শে ধন্য হয়েছি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু তাঁর সঙ্গ যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের মুখে ওঁর কথা শুনেছি। ওরকম নির্লোভ, সরল লেখকের সঙ্গে হুমায়ূনের মিল পেয়েছি। মনে রাখতে হবে, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রকে বাদ দিলে যে বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমরা গর্ব করি, তার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের নাম হুমায়ূন আহমেদ।

চুরানব্বই সালের একুশের মেলার শেষে শোনা গেল, ওঁর সমস্ত বই এক মেলায় কত কপি বিক্রি হয়েছে, তার হিসেব নেই, তবে নতুন বইগুলোর বিক্রির সংখ্যা পঁচিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কলকাতা বইমেলায় যদি কারও দেড়-দু’হাজার বই বিক্রি হয়, তা’হলে তাঁকে আমরা জনপ্রিয় লেখক বলি। হুমায়ূনের সঙ্গে তুলনা করার কথা চিন্তাও করা যায় না।

তখনও পশ্চিমবাংলার বেশির ভাগ পাঠক ওঁর কথা জানে না। যখন  ওঁর একটি টিভি নাটকের চরিত্র, যাঁকে নাটকেই ফাঁসি দেওয়া হবে জেনে হাজার হাজার দর্শক রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছিল, সে দিন পশ্চিমবাংলার কাগজে সেটা খবর হয়েছিল। এরকম হয় নাকি? বিস্ময় ছিল অনেকের।

কলকাতার এক নামী প্রকাশক আমার মাধ্যমে যোগাযোগ করে অনুমতি নিয়ে ওর বিখ্যাত কয়েকটি বই ছাপলেন। আশ্চর্য ব্যাপার, কুড়ি বছর আগে পশ্চিমবাংলায় বইগুলো পাঠক পায়নি। অথচ ঢাকায় বিক্রি হয়েছিল রমরমিয়ে।

হুমায়ূন বয়সে আট বছরের ছোট হলেও বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল। ওর স্ত্রী-ছেলেমেয়ের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছি অনেকবার। হুমায়ূনের বাসনা ছিল চলচ্চিত্র তৈরি করার। অনেকগুলো ছবি তৈরি করেছিল সে। প্রথম দিকের একটি টেলি প্লে ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিল আমাকে। দেখতে দেখতে আমার ঘুম পাচ্ছিল। সে ওটা বন্ধ করে বলেছিল, ‘‘বুঝতে পারছি কিছুই হয়নি। হলে আপনার ঘুম পেত না।’’

যখনই ঢাকায় গিয়েছি, সন্ধে থেকে মধ্যরাত হুমায়ূনের সঙ্গে কেটেছে। এই রকম এক রাতে সে আমাকে বলল, ‘‘সমরেশদা, আমার বহুকালের ইচ্ছে দেশ পত্রিকায় উপন্যাস লিখব। আপনি দয়া করে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন?’’

‘‘কেন এমন ইচ্ছে হল?’’ জিজ্ঞেস করেছিলাম।

‘‘যে কাগজে রবীন্দ্রনাথ থেকে আপনারা লিখেছেন, সেখানে না লিখলে নিজেকে ঠিক—,’’ হুমায়ূন হেসেছিল।

‘‘কিন্তু হুমায়ূন, এখানে একজন প্রকাশক তোমাকে দশ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে অপেক্ষা করে কখন পাণ্ডুলিপি দেবে, আমাকেই অনেকে দুঃখ করে বলেছে যে তোমার একটা উপন্যাসের আশায় কয়েক বছর ধৈর্য ধরে আছে। কলকাতার কাগজে লিখলে তুমি যা পাবে তা তো তুলনায় আসবে না।’’

‘‘না, সমরেশদা, দেশ পত্রিকার বিকল্প হয় না। দেশ ইজ দেশ।’’

হুমায়ূন কলকাতায় এলে সাগরময় ঘোষ মশাই-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। সে অত্যন্ত বিনীত গলায় বলেছিল, ‘‘আমাকে যদি লেখার সুযোগ দেন।’’

সাগরদাও বলেছিলেন, ‘‘দেখি!’’

তারপর বেশ কয়েক বছর হুমায়ূন দেশ পত্রিকার পুজো সংখ্যায় একের পর এক উপন্যাস লিখে গিয়েছে। পশ্চিমবাংলার পাঠক সেই সব উপন্যাস নিয়ে কোনও হইচই করেননি, কিন্তু ঢাকার প্রকাশকরা দশ-বারো লক্ষ টাকা আগাম দিয়ে সেগুলো একুশের মেলাতেই তিরিশ হাজার কপি বিক্রি করেছে।

এক বন্ধু খবরটা দিয়েছিলেন যে হুমায়ূন চট্টগ্রামের কাছে সমুদ্রে একটি দ্বীপ কিনেছেন। শুনে অবাক হয়েছিলাম। কোনও বাঙালি লেখকের পক্ষে কি দ্বীপ কেনা সম্ভব? সেই দ্বীপ কিনে লেখক করবেই বা কী?

দেখা হতেই হুমায়ূনকে জিজ্ঞাসা করতে সে সলজ্জ হাসল, ‘‘আমি সেন্ট মার্টিন দ্বীপে একটি বাড়ি কিনেছি। এমন কিছু ব্যাপার নয়। আসুন না একবার, সামনের ডিসেম্বরেই আসুন, ঘুরে আসি।’

‘‘বর্ষাকালে যাওয়া যায়?’’

‘‘যায়। কিন্তু গিয়ে লাভ নেই। দ্বীপের অনেকটাই জলের তলায় থাকে। শীতে জল নেমে গেলে বাসযোগ্য হয়,’’ হুমায়ূন বলেছিল।

‘‘বাড়িটা কিনেছিলে কেন?’’

‘‘সমুদ্রের মধ্যে বাড়িতে থাকলে খুব মজা লাগে সমরেশদা।’’

গোটা দ্বীপ অবশ্যই নয়। দ্বীপের মধ্যে একটি বাড়ি কিনে যে মানুষ মজা পায়, সে যে জীবনটাকে উপভোগ করতে চায়, তাতে সন্দেহ নেই।

টাকা যেন হুমায়ূনকে তাড়া করত। বাংলাদেশের অন্যান্য নাট্যকারের কল্পনার বাইরে সম্মানদক্ষিণা হুমায়ূনকে দেওয়া হত। বলা ভাল দিতে বাধ্য হতেন প্রকাশকরা। কারণ সেই সব নাটকের দর্শক সংখ্যা ছিল বিপুল। অথচ হুমায়ূনের চালচলন, কথাবার্তা, পোশাক দেখলে মনে হত, পাশের বাড়ির ছেলে যার কোনও অহঙ্কার নেই।

স্ত্রীর সঙ্গে মতান্তর হচ্ছে ওর, খবর পেয়েছিলাম। ঔৎসুক্য দেখাইনি। খারাপ লাগলেও মনে হয়েছিল, এটা ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।

সে সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। আনন্দবাজারের পুজো সংখ্যায় ‘এত রক্ত কেন’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলাম ত্রিপুরার উগ্রপন্থীদের নিয়ে যারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আশ্রয় নিত, তাদের নিয়ে। সেই পুজো সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করেছিল বাংলাদেশ সরকার।

এই সময় হুমায়ূন আহমেদ আমাকে আমন্ত্রণ জানায় ওর এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য।

ঢাকা বিমানবন্দরে পুলিশ আমায় আটক করে। এবং শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে বাইরে যেতে দেয়। সেটা হল আমি ঢাকা শহরে থাকতে পারব না। হুমায়ূন সোজা আমাকে ঢাকা থেকে অনেক দূরে তার নুহাসপল্লিতে নিয়ে যায়। কয়েক একর বাগানঘেরা জমিতে সে তার ফিল্মশ্যুটিং-এর স্টুডিয়ো বানিয়েছিল। গেস্টহাউসে ঘরও অনেকগুলো।

হুমায়ূন এবং তার সর্বক্ষণের সঙ্গীদের সঙ্গে আড্ডা মারার সময় সন্ধের মুখে বৃষ্টি নামল। তুমুল বৃষ্টি। বাইরে ঘন অন্ধকার। গাছগুলো যে ঝড়ে দুলছে তা টের পাচ্ছি। লেখালেখি নিয়ে কথা উঠতে হুমায়ূন হাসল, ‘‘আমার কথা ছাড়ুন। বন গাঁয়ে শেয়াল রাজা। আসলে কী জানেন, পাকিস্তান আমলে কলকাতা থেকে বাংলা বই আসা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাঠক নতুন বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। আমাদের এখানে যাঁরা প্রতিভাবান সিরিয়াস লেখক, তাঁদের লেখা সমালোচকদের শ্রদ্ধা পেলেও আমপাঠক খুশি হতে পারছিলেন না। যাঁরা নীহাররঞ্জন, অবধূত, প্রবোধ সান্যাল পড়তে অভ্যস্ত ছিলেন। যাঁরা সমরেশ বসু পড়তেন, তাঁরা আর কত পুরনো বই পড়বেন! হয়তো আমার লেখায় সেই ধরনের রোম্যান্সের স্বাদ পেলেন এঁরা, যা চেয়েছিলেন। আমি কখনই তারাশংকর, বিভূতিভূষণ বা সমরেশ বসুর কাছাকাছি পৌঁছতে পারব না। আমাকে যাঁরা পছন্দ করেন না, তাঁরা বলেন, পনেরো-ষোলোতে যাঁরা হুমায়ূন পড়া শুরু না করে, তারা পাঠক নয়। আবার চব্বিশের পরে যারা হুমায়ূন পড়ে তাদেরও ভাল পাঠক বলা যায় না। আমি এখনও রবীন্দ্রনাথ পড়ি আর প্রতিদিন কিছু না কিছু শিখি।’’

হুমায়ূনের বেশির ভাগ বইয়ের নামকরণ সে করেছে রবীন্দ্রনাথের গানের লাইন থেকে শব্দ নিয়ে। এমনকী নিজের তৈরি ছবির নাম রেখেছিল ‘আগুনের পরশমণি’। নিজের লেখা নিয়ে সে সব সময় বিনীত ছিল।

সেই বৃষ্টির রাত্রে, প্রায় দশটার মধ্যে, এক হাঁটু জল ভেঙে একটা গোরুর গাড়ি এল নুহাসপল্লিতে। সম্পূর্ণ ভিজে এক তরুণী নেমে এল গোরুর গাড়ি থেকে, নেমে হুমায়ূনকে অনুযোগ করল বড় রাস্তার মোড়ে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করেনি বলে।

মেয়েটি পোশাক পাল্টাতে বাথরুমে গেলে হুমায়ূন সলজ্জ হাসল, ‘‘ওঃ, খুব ভুল হয়ে গিয়েছে।’’ জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‘মেয়েটি কে? এ ভাবে কথা বলল?’’

‘‘ওঁর নাম শাওন, অভিনয় করে। ভাল গান গায়।’’ এর বেশি বলেনি সে।

হুমায়ূনের বিবাহবিচ্ছেদ এবং শাওনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে ওর পাঠক-পাঠিকাদের দুঃখিত করেছিল। আমাকে এ কথা অনেকেই বলেছেন। শাওন বয়সে ওর মেয়ের মতো, রক্ষণশীলরা মেনে নিতে পারেননি। সবাই আশঙ্কা করেছিলেন এই ঘটনার ফলে হুমায়ূন জনপ্রিয়তা হারাবে, তার বই বিক্রি দ্রুত কমে যাবে। প্রথম দিকে সে রকম মনে হলেও দেখা গেল হুমায়ূনের পাঠক কমে গেল না। লেখকের ব্যক্তিজীবন আর তাঁর লেখাকে গুলিয়ে ফেললেন না পাঠকরা।

হুমায়ূনের সঙ্গে ঢাকা বা কলকাতা ছাড়া দেখা হয়েছে আমেরিকায়। পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছি, দেখেছি, বাংলাদেশের মানুষ আর কোনও বই রাখুক বা না রাখুক, হিমু বা মিসির আলি রেখেছে। এই দুটি চরিত্র লিখে হুমায়ূন জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিল। হিমুর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদকে অনেকেই খুঁজে পান। আমার ভাল লেগেছে মিসির আলিকে।

দেশবিদেশের অনেক গোয়েন্দা গল্প আমি পড়েছি। কিন্তু এমন কোনও গোয়েন্দার খবর পাইনি যিনি পেটের গোলমালে ভোগেন। যাঁর কাছে কোনও ক্লায়েন্ট এসে কথা শুরু করার সময় মিসির আলিকে যদি পটি করতে ছুটতে হয় তা’হলে তার পরে আধঘণ্টা না শুয়ে থাকলে কাজ করার উৎসাহ পান না। অপেক্ষা করে করে ক্লায়েন্ট চলে গেলেও মিসির আলি নিয়ম ভাঙেন না। কিন্তু তদন্তে নেমে তিনি যে বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, তার তুলনা খুব কম পাওয়া যাবে।

নিউইয়র্কের কুইন্সের এক হোটেলে আমরা ছিলাম। গিয়েছিলাম এক বইমেলায় অংশ নিতে। রাত্রে আড্ডা হচ্ছিল। সে হেসে বলেছিল, ‘‘যাই বলুন সমরেশদা, পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের চেয়ে বাংলাদেশের পাঠক অনেক উদার। পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র সৈয়দ মুজতবা আলী আর কিছুটা সিরাজভাই ছাড়া আর কোনও মুসলমান লেখককে সেখানকার হিন্দু পাঠক গ্রহণ করেননি। মুজতবা আলী সাহেব গীতা, চণ্ডী, বাইবেল, কোরান পড়ে নিজের মতো লিখেছেন। তাই তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি কেউ। তাছাড়া লেখায় যে রস ছিল, তা মোহিত করত সবাইকে। আমাদের লেখায় নামাজ, আপা, ফুপা, দুলাভাই, দোয়া, রোজা ইত্যাদি শব্দ থাকে বলে হিন্দু পাঠকদের বোধহয় অস্বস্তি হয়। কিন্তু আপনাদের লেখায় তুলসী মঞ্চ, শালগ্রাম শিলা, যাগযজ্ঞ থাকলেও মুসলমান পাঠক তা নিয়ে মাথা ঘামান না। তারা গল্পটাই পড়তে ভালবাসেন। আমি আশা করি, পরিস্থিতির বদল হবেই।

বলেছিলাম, ‘‘কথাটা এখনও পর্যন্ত ঠিক। এটা বোধহয় লেখা এবং পড়ার সময় দীর্ঘদিনের অভ্যেস প্রতিবন্ধকতার কাজ করে। পশ্চিমবাংলার বাংলা সাহিত্যের হিন্দু লেখকদের কলমে মুসলমান নায়ক-নায়িকা উপন্যাসে জায়গা পেয়েছে কি না এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। শরৎচন্দ্র গফুর চরিত্র লিখেছিলেন, কিন্তু তাকে মানুষ হিসেবেই সবাই ভেবেছে। গফুরের গোরুর মুসলমান নাম রাখাটাই তো স্বাভাবিক হত। তবে এই অভ্যেস বদলাচ্ছে। কলকাতার অনেক তরুণতরুণী এখন হিমুর কথা পড়তে চায়। মুশকিল হল বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করেও তোমাদের লেখায় উর্দু আরবি শব্দের প্রাধান্য আজকাল দেখা যাচ্ছে যার সঙ্গে পশ্চিমবাংলার পাঠক আদৌ পরিচিত নয়। যেমন, জিম্মা।’’

হুমায়ূন হাসল, ‘‘আসলে ওই সব শব্দ শুনে শুনে আমরা বড় হয়েছি। তাই কলমে এসে যায়। আমি জল বলি, পানিও। কিন্তু লিখতে গিয়ে পানি লিখি। আপনি জল বলেন। কিন্তু জলে যে ফল জন্মায়, তাকে পানিফল বলেন।’’

পরের সকালে ঘটনাটি ঘটল। হুমায়ূন রাত্রে ঘুমোবার আগে তার ডলারভর্তি মানিব্যাগ বালিশের নীচে রেখে দেয়। সকালে উঠে দেখল সেটা নেই। তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল। পাওয়া গেল না।

হুমায়ূনের মুখ গম্ভীর। বলল, ‘‘আমি কপর্দকহীন।’’

কে নিতে পারে হাজার চারেক ডলার? বাইরের কেউ নেবে, এমন সম্ভাবনা নেই। ওর সঙ্গে যারা ছিল তাদের একজনই কাজটা করেছে। কিন্তু স্বীকার করছে না।

দুপুরে অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখলাম, সে তার দুজন সঙ্গীকে নিয়ে বাইরের ফুটপাথে বসে আছে। হেসে বলল, ‘‘সমরেশদা, যে নিয়েছে সে যেন বিবেকের কামড় খেয়ে ফেরত দিতে না আসে। তা’হলে তাকে কোনও দিন ক্ষমা করতে পারব না। যে নিয়েছে তাকে আমি সন্দেহ করতে পারি, কিন্তু আমার সন্দেহ তো সঠিক নাও হতে পারে। তাই তাকে অপরাধী ভাবছি না।’’

অদ্ভুত ব্যাপার! পরের দিনই হুমায়ূনের বালিশের নীচে মানিব্যাগটি পাওয়া গেল। একটি ডলারও খোয়া যায়নি। হুমায়ূন বলল, ‘‘যে নিয়েছে এবং ফেরত দিয়েছে তাকে ধন্যবাদ, কারণ ফেরত দেওয়ার নাটকটা করেনি।’’

খ্যাতির শিখরে উঠে লিখে প্রচুর অর্থ পেয়েও হুমায়ূনের ব্যবহার ছিল খুব সাধারণ। ঢাকায় গেলেই জিজ্ঞাসা করত, ‘‘সুনীলদা কেমন আছেন?’’ খুব ভক্ত ছিল সে সুনীলদার লেখার। বলত, ‘‘মানুষটার লেখা পড়তে বসলেই একটা অদৃশ্য হাত এসে ঘাড় ধরে শেষ পর্যন্ত  পড়িয়ে নিয়ে তবে ছাড়ে।’’

বললাম, ‘‘লোকে এ কথা তোমার ক্ষেত্রেও বলে!’’

‘‘দূর!’’ হুমায়ূন বলেছিল, ‘‘আমি তো যা লিখতে চাই, তা লিখতে পারি না বলে এই সব লিখি। আমাদের লেখায় কেন সমকালীন রাজনীতির ছাপ থাকে না বলে আপনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, উত্তরটা হল, লিখতে ভয়
করে।’’

হুমায়ূন তখনও অসুস্থ হননি। ঠিক তার আগে ঢাকায় যেতেই ওর ফোন এল, ‘‘সমরেশদা, আসুন, অনেক কথা আছে।’’

সন্ধের পর গিয়ে দেখলাম অনেক মানুষকে নিয়ে সে আড্ডা মারছে। লেখক, প্রকাশক, গায়ক, নায়ক কে নেই! পিনা এবং খানার সঙ্গে লক্ষ করলাম হুমায়ূন ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছে। রাত বাড়তে উঠতে চাইলে সে হাত ধরল, ‘‘আপনার সঙ্গে কথা আছে। সবাই চলে যাক, তারপর—।’’

শাওন তার শিশুদের নিয়ে শোওয়ার ঘরে চলে গেল। অতিথিরা বিদায় নিলেন রাত সাড়ে বারোটায়। আমি আর হুমায়ূন চুপচাপ বসেছিলাম। বললাম, ‘‘বলো।’’

সে শ্বাস ফেলল শব্দ করে। বলল, ‘‘খুব কষ্ট হয় সমরেশদা। জীবনে যা চেয়েছি, তার অনেকটাই পেয়েছি। এই চাইতে গিয়ে অনেক কিছুই হারাতে হয়েছে। কী করি বলুন তো?’’

‘‘আমৃত্যু এই কাঁটা তোমার আমার সবার মনে বিঁধতে থাকবে। এই নিয়েই তোমাকে বাস করতে হবে। তোমার কাজটা তুমি করে যাও, কষ্টটা কমে যাবে।’’

সত্যি কি কষ্ট কমে? সত্যি কি ভুলতে চাইলে ভোলা যায়? আমার তো মনে হয় না। এর কিছু দিন পরে কর্কটরোগে আক্রান্ত হল হুমায়ূন। তা সত্ত্বেও সিগারেট ত্যাগ করল না। সে কি মৃত্যুকে দেখেছিল বলে মাথা নোয়ালো না? নিজের মতো করে চলে গেল?

মধ্য ষাটের সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন মানুষ, যিনি নিজে পাঠক তৈরি করেছেন, সেই পাঠকদের মনে বসত করেছেন, তিনি চলে গেলেও থেকে যাবেন। এটাই তো পরম পাওয়া।

 

উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ..

Tuesday, November 7, 2017

কানাডায় বেড়ানোর সেরা কয়েকটি স্থান



কানাডা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। পূর্বে আটলান্টিক ও পশ্চিমে প্যাসিফিক এই দুটি মহাসাগর থেকে শুরু করে পশ্চিমের বিস্তির্ণ পাহাড়ী এলাকাসহ আরো বহু কিছুই আছে দেশটিতে দেখার। আছে নদী, আছে সুবিশাল বন। অন্টারিওর উত্তরে আছে হাডসন উপসাগর। চার ঋতুতে কানাডার রূপ বদলায় চার রকম। তীব্র শীত থেকে তীব্র গরম সবই অনুভব করা যায় এখানে।
কানাডায় এখন সামার। মাত্র অল্প সময়ের জন্য তার স্থায়িত্ব। সময় ও সুযোগ থাকলে এই অল্প সময়ের মধ্যেই বেড়ানোর কাজটি সেরে নিতে পারেন। ডলারের মান পড়ে যাওয়াতে দেশের বাইরে বিশেষ করে আমেরিকায় বেড়াতে যাওয়ার চেয়ে কানাডার অভ্যন্তরে বেড়ানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
পশ্চিমের সুদর্শন শহর ভেঙ্কুভার, মন্ট্রিয়লের ওল্ড সিটি, কুইবেকের রাজধানী কুইবেক সিটিসহ অন্যান্য শহরগুলোর প্রত্যেকটির রয়েছে আলাদা আলাদা বৈচিত্র। কানাডার নাগরিকেরা বন্ধুবৎসল। দেশটিতে রয়েছে নিরাপত্তার গ্যারান্টি। সুতরাং নির্ভয়ে বেড়াতে যেতে পারেন দেশটির যে কোন প্রান্তে। নিচে জনপ্রিয় কয়েকটি পর্যটন স্থানের বর্ণনা দেওয়া হলো।
নায়েগ্রা ফলস
কানাডায় কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা মনে হলে প্রথমেই আসে নায়েগ্রা ফসল এর কথা। কানাডায় এবং পৃথিবীতেও সবচেয়ে বিখ্যাত কয়েকটি প্রাকৃতিক আকর্ষনীয় স্থানের মধ্যে এই নায়েগ্রা ফসল অন্যতম। কেউ কানাডায় বেড়াতে আসলেন আর নায়েগ্রা ফসল দেখতে গেলেন না এটি হতেই পারে না। নায়েগ্রা ফলস না দেখলে কানাডা দেখা হয় না। প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন পর্যটক আসেন কানাডায় শুধু এই ফলসটি দেখার জন্য।
নায়েগ্রা ফসল টরন্টো থেকে বেশী দূরে নয়। মাত্র এক থেকে সোয়া ঘন্টার ড্রাইভ। যারা প্রথমবার নায়েগ্রা ফলস দেখতে যান তাদের কাছে এটি বাকী জীবনের এক অভাবনীয় স্মৃতি হয়ে থাকে। নায়েগ্রা ফলসটি খুব কাছে থেকে দেখারও ব্যবস্থা রয়েছে। শীপে করে অথবা সুরঙ্গ পথে নিচে নেমে খুব কাছে থেকে জলপ্রপাতের দৃশ্য দেখতে পারেন পর্যটকগণ। হেলিকপ্টারে উঠেও দেখা যেতে পারে জলপ্রপাতের দৃশ্য। নায়েগ্রা জলপ্রপাতটি কানাডা ও আমেরিকার বর্ডারে। তবে কানাডার অংশ থেকে জলপ্রপাতটি খুব ভাল করে দেখা যায়।
নায়েগ্রায় যারা রাত কাটাতে চান তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন হোটেলে থাকার সুব্যবস্থা।
নায়েগ্রায় আরো আছে মেরিনল্যান্ড। এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে নানারকম চিত্তাকর্ষক ও মজাদার খেলা ও প্রদর্শণীর আয়োজন। ডলফিনের মনোমুগ্ধকর খেলা, বিভিন্ন রাইডিং এ উঠার সুযোগ
আপনাকে দিবে দিনব্যাপী আনন্দ। বাচ্চাদের জন্য এটি ড্রিমল্যান্ড। দু/চার ঘন্টার ভ্রমণে আপনার পুষাবে না। সেখানে যেতে চাইলে সারাদিনের পরিকল্পনা নিয়ে যেতে হবে। মেরিনল্যান্ডে ফ্যামিলি পিকনিক করার জন্য নির্দিষ্ট জায়গাও রয়েছে।
সামারে নায়েগ্রার বোটানিক্যাল গার্ডেনও দেখার মত। চারিদিকে প্রকৃতি তার অপার সৈন্দর্য অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছে। ১৯৩৬ সালে পার্কটি গড়ে তোলা হয় ৯৯ একর জমির উপর।
নায়েগ্রাতে আরো আছে বাটারফ্লাই কনজারভেটরী পার্ক। এখানে প্রায় ৪৫ প্রজাতির প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। অসাধারণ এক মোহনীয় দৃশ্য এটি। বাগানের ভিতর ঘুরে ঘুরে খুব কাছে থেকে এই দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

ব্যানাফ ন্যাশনাল পার্ক
প্রকৃতির কোলে যদি দিন কতকের জন্য নিজেকে সপে দিয়ে অপার শান্তি খুঁজে পেতে চান তবে একবার ঘুরে আসতে পারেন আলবার্টায় অবস্থিত ব্যানাফ পার্কে। পশ্চিমের রাজকীয় রকি মাউন্টেনের মাঝে অবস্থান এই ন্যাশনাল পার্কটি। একবার গেলে আর ফিরে আসতে মন চাইবে না এমনি রূপ এই পার্কের। কানাডার সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো এই পার্কেই অবস্থিত।
টরকুয়েসী সবুজ হ্রদ, বরফ আচ্ছাদিত সুবিশাল পাহাড়ের চূড়া, তুষার স্রোত সবই পাবেন এই অত্যাশ্চর্য পার্কটিতে যেখানে আপনি সহজেই প্রবেশ করতে পারবেন। এখানকার লুইসি হ্রদটি দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে একটি। এর সবুজ পানিতে চারপাশে অবস্থিত পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি ফুটে থাকে স্ফটিক সচ্ছতায়। পর্যটকগণ হ্রদের চারপাশে ঘুড়ে বেড়াতে পারেন। পার্কটির একেবারে দক্ষিনে ক্ষুদ্র ব্যানাফ শহরটি অবস্থিত যেখানে থাকা খাওয়াসহ সবরকমের সুবিধা রয়েছে পর্যটকদের জন্য।



সি এন টাওয়ার
টরন্টো শহরের একটি প্রধান প্রতীক এর দৃষ্টিনন্দন ও চমকপ্রদ স্থাপত্য নিদর্শন সি এন টাওয়ার। গত ২৬ জুন ছিল এই টাওয়ারটির ৪০তম জন্মবার্ষিকী। লেক অন্টারিওর পাড় ঘিরে গড়ে উঠা কানাডার সর্ববৃহৎ শহর টরন্টোর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই টাওয়ারটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু যে কয়টি টাওয়ার রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।  সি এন টাওয়ারের উচ্চতা ৫৫৩ মিটার। এই টাওয়ারে রয়েছে একটি ঘূর্ণ্যমান রেস্টুরেন্ট। এতে বসে অতিথি বা পর্যটকগণ খাবার গ্রহণের পাশাপাশি শহরের নজরকারা দৃশ্য অবলোকন  করতে পারেন। টাওয়ারে আরো আছে একটি গ্লাস ফ্লোর। এই ফ্লোরে দাড়িয়ে কাচের ভিতর দিয়ে সরাসরি নিচের দৃশ্য দেখা যায়। রাতের বেলা টাওয়ারটি বৈদ্যুতিক আলোর মাধ্যমে নানা রঙ্গে রাঙ্গিয়ে তোলা হয় যা দূরদুরান্ত থেকেও দেখা যায়।


কুইবেক সিটি
কুইবেকের রাজধানী কুইবেক সিটি। কানাডার কুইবেক সিটি সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত আছে। কথাটি এরকম যে, আপনি যদি এই শহরটি ঘুরে ঘুরে দেখেন তবে আপনাকে প্যারিস না দেখলেও চলবে। অবশ্য কুইবেক সিটিতে আইফেল টাওয়ার নেই। কিন্তু এর দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলো আপনাকে মুহূর্তের মধ্যেই নিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। সেন্ট লরেন্স নদীর পার ঘিরে অবস্থিত কুইবেক সিটি কানাডার একটি খুবই জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা।
জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক এই শহরটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এর অংশ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। কানাডার দশম বৃহত্তম শহর এটি এবং উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে পুরাতন শহরগুলোর একটি। লা সিটাডেলি (La Citadelle) দুর্গ এই শহরের ল্যান্ডমার্ক স্থাপনা। এখানে দেখার মত আরো রয়েছে কুইবেক পার্লামেন্ট ভবন। ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস অব কুইবেক আরেকটি দর্শনীয় স্থান কুইবেক সিটির।
পর্যটকদের জন্য কুইবেক সিটিতে আরো আকর্ষন হলো এর উইন্টার কার্নিভাল, সামার মিউজিক ফেস্টিভাল  এবং সেন্ট জিয়েন ব্যাপ্টিস্ট ডে, মন্টোমরেন্সি জলপ্রপাত ও মন্ট সেইন্ট এ্যানি স্কি রিজোর্ট।

অটোয়ার পার্লামেন্ট হিল
কানাডার রাজধানী অটোয়াতে পার্লামেন্ট ভবন একটি দর্শনীয় স্থান। নদীর (অটোয়া রিভার) তীরে অবস্থিত এই ভবনটি পার্লামেন্ট হিল নামেই সর্বাধিক পরিচিত। ১৯ শতকের স্থাপত্য কলার একটি অসাধারণ নিদর্শন এই পালামেন্ট হিল। প্রতি বছর বহুসংখ্যক পর্যটক আসেন এই ভবনটি পরিদর্শনে। ওইকিপিডিয়ার হিসাবে দেখা যায় প্রতি বছর এখানে প্রায় তিরিশ লক্ষ পর্যটক আসেন। এখানে প্রতিদিন ফ্রি ট্যুর গাইড পাওয়া যায়। তবে ‘ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ’ পলিসির ভিত্তিতে এই ফ্রি ট্যুর গাইডের সেবা পাওয়া যায়। পার্লামেন্টে ভবনের পিস টাওয়ারে উঠার সুযোগও পাওয়া যেতে পারে যেখান থেকে অটোয়া সিটির মনোরম দৃশ্যাবলী অবলোকন করা যায়। পার্লামেন্ট ভবনকে কেন্দ্র করে প্রায় সারা বছরই কোন না কোন উৎসব লেগে থাকে। তবে সামারের অনুষ্ঠানগুলো হয় আরো জমকালো। ১লা জুলাই কানাডা ডে উপলক্ষে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে এখানে। ঐ দিন জমকালো ফায়ারওয়ার্কস সহ আরো নানা ধরণের উৎসব পালিত হয়। সামারে প্রতিদিন বিকেলে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক সাউন্ড এন্ড লাইট শো অনুষ্ঠিত হয় মিউজিক সহ। এগুলো ফ্রি অনুষ্ঠান।

আফ্রিকান লায়ন সাফারী
আফ্রিকান লায়ন সাফারী টরন্টোর নিকটবর্তী হ্যামিলটনে অবস্থিত। টরন্টো থেকে এর দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মত। এই লায়ন সাফারীতে আছে শতাধিক প্রজাতির প্রায় এক হাজার প্রাণী। পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্ত থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে এই প্রাণীসমূহ। এই সাফারীর বিশেষত্ব হলো, এখানে খোলা আকাশের নিচে প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণীগুলো ঘুরে বেড়ায়। আর পর্যটকগণ নির্ধারিত রাস্তা দিয়ে নিজের গাড়ি অথবা সাফারীর ট্যুর বাসে করে ঘুরে বেড়াতে পারেন। এই সময় মনে হবে আপনি বন বাদাড়ে পশু-পক্ষীর সঙ্গেই বাস করছেন। প্রাণীগুলো গাড়ির খুব কাছে চলে আসে। মাঝে মধ্যে গাড়ির ভিতরেও চলে আসতে চায়।
লায়ন সাফারীতে নিজের গাড়ি নিয়ে ঢুকতে হলে গাড়ির কন্ডিশন ভাল হতে হবে। বিশেষ করে গাড়ির জানালার কাঁচ যদি ভাঙ্গা থাকে বা ফাটলও যদি থাকে তবে সেই গাড়ি ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। সাফারীতে ট্যুর বাসে ঘোরাই উত্তম।
সাফারী পার্কটি একটি পারিবারিক ব্যবসা। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৯ সালে। কানাডার সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল গর্ডন ডেবেনহাম প্রথমে উদ্যোগ নিয়ে এই পার্কটি স্থাপন করেন।
-সূত্র : অনলাইন

Sunday, November 5, 2017

মারেফতের বাণী - ডাঃ বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী




ডাঃ বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী র  " মারেফতের বাণী  বইটি পড়ুন


মারেফতের গোপন কথা - ডাঃ বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী



ডাঃ বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী র  " মারেফতের গোপন কথা " পড়ুন