Showing posts with label carl sagan. Show all posts
Showing posts with label carl sagan. Show all posts

Saturday, April 21, 2018

ফিফটি টু – পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম এক তিমির গল্প


সমুদ্রের অতল জলরাশির জগতটাকে আমাদের মতো স্থলচারী প্রাণীদের কাছে মনে হয় নিঃশব্দ, ভুতুড়ে। কিন্তু সত্যি কথা হলো, অতল জলরাশির এই জগতটাতে আসলে আলোর চেয়ে শব্দেরই প্রাধান্য বেশি। আমাদের হয়তো শোনার মতো কান নেই, কিন্তু এই জগতে বেশিরভাগ সময়ে চারপাশে নানা রকমের শব্দরাই শুধু খেলে বেড়ায়। শব্দময় এই জগতটায় সবচেয়ে বিখ্যাত সম্ভবত তিমি মাছদের মুখ নিঃসৃত শব্দ। জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগানের এতই পছন্দ ছিলো তিমিদের এই শব্দময় জগতটাকে যে, ১৯৭০-এর দশকের শেষে যখন ‘ভয়েজার’ প্রজেক্টের জন্যে গোল্ডেন ডিস্ক তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয় তাঁকে, তখন সেই ডিস্কে ‘সাউন্ড অব আর্থ’ ক্যাটাগরিতে পিঠকুঁজো তিমির গান জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

কথা হলো, কী ঘটবে, কোনো একদিন যদি দেখেন আপনি কারো সাথে কথা বলে আর মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছেন না?  আপনি কথা বলতে পারছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার ভাষা কেউ বুঝতে পারছে না এবং আপনার হাতে অন্য কোনো উপায়ও নেই ভাব বিনিময় করার। কী অবস্থা হবে আপনার?

পরিস্থিতিটা উপলব্ধি করতে হলে আসুন জানি এক রহস্যময় শব্দের কথা। সেই সাথে জেনে নিই দুনিয়ার নিঃসঙ্গতম তিমি সম্পর্কে, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ফিফটি টু (52)’। আমাদের আজকের আর্টিকেলের আরেক নাম দেয়া যেতে পারে, ‘দ্যা লিজেন্ড অব ফিফটি টু’।

ফিফটি টু – প্রথম আবির্ভাব
কাহিনীর শুরু ১৯৮৯ সালে। আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে আমেরিকান নেভি কিছু স্থাপনা বানিয়েছিলো যেখান থেকে সোভিয়েত সাবমেরিনের গতিবিধি লক্ষ্য করা যায়। সোভিয়েত সাবমেরিনগুলো যাতে কারো অগোচরে আমেরিকার সীমানার ভিতরে ঢুকে পড়তে না পারে, সেজন্যে এই সব স্থাপনায় এমন সব যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছিলো যা দিয়ে সমুদ্রের অত্যন্ত গভীরের মৃদু হতে মৃদুতম শব্দও রাডারে ধরা পড়ে। সোভিয়েতের সাবমেরিনগুলো সাধারণত ২০-৫০ হার্জের মধ্যে শব্দ উৎপাদন করে চলাচল করতো গভীর সমুদ্রে। যন্ত্রপাতিগুলোও তাই বসানো হয়েছিলো সেভাবেই। আমেরিকার উপকূলে হঠাৎ এই রেঞ্জের মধ্যে শব্দ রাডারে ধরা পড়লে শব্দের উৎসটাকে ট্র্যাক করা হতো। সেটা কোন পথ দিয়ে কোথায় যাচ্ছে, তা মনিটরিং করা হতো। চলাচলের প্যাটার্নে সন্দেহজনক কিছু পেলেই কেল্লা ফতে। রিপোর্ট চলে যেতো উপর মহলে।

এই কাজ করতে গিয়ে আরেকটা বোনাস দিক খুঁজে পেলো আমেরিকান নেভি। তারা আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলের তিমি মাছদের ট্র্যাক করতে সক্ষম হলো তাদের রাডারে। তিমি মাছেরা প্রজাতি ভেদে ১০ হার্জ থেকে ৪০ হার্জের মধ্যে শব্দ উৎপাদন করে। সোভিয়েতদের সাবমেরিনও এই রেঞ্জেই কাজ করে। ফলে, সেই সব শব্দ দিয়ে তিমি মাছদের উপরে গবেষণার এক নতুন দুয়ার খুলে গেলো তাদের সামনে। ১৯৮০-এর দশকের শেষে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ির ইতি ঘটলে নেভির তৈরি এই সব লিসেনিং পোস্টকে দিয়ে দেয়া হয় মেরিন লাইফের গবেষণার জন্যে।

এমনই এক মেরিন লাইফ নিয়ে গবেষণাকারী স্থাপনা হচ্ছে ম্যাসাচুসেটসে। এটার বর্তমান নাম ‘Woods Hole Oceanographic Institution’। এখানে ১৯৯২ সালের ৭ ডিসেম্বর ‘বিল ওয়াটকিনস’ নামের এক গবেষক অদ্ভুত এক সিগন্যাল ধরে ফেলেন রাডারে। তরঙ্গটার কম্পাংক ছিলো ৫২ হার্জ। ততদিনে সোভিয়েতের সাবমেরিন ট্র্যাক করার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। তার মানে এটা ঐ অঞ্চলের জলচর কোনো প্রাণীরই তৈরি করা শব্দ। বিল দেখলেন, শব্দের উৎসটার চলাচলের পথের সাথে তিমি মাছের চলাচলের পথের মিল আছে। ঐ অঞ্চলে নীল তিমি (Blue Whale) এবং ফিন তিমি (Fin Whale) যে প্যাটার্নে চলাফেরা করে, ঠিক সেই প্যাটার্নেই ঘুরেফিরে চলছে এই শব্দের উৎসটা। কিন্তু সমস্যা বাঁধছে একটা জায়গায়। ৫২ হার্জ মানুষের কানে শুনার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণে শক্তিশালী শব্দতরঙ্গ না। কিন্তু তিমি মাছেদের জন্যে এটা অনেক বেশিই বলা চলে। ঐ অঞ্চলের নীল কিংবা ফিন তিমিরা সাধারণত ৪০ হার্জের উপরে শব্দ উৎপাদন করতে পারে না। নীল তিমির শব্দের রেঞ্জ ১০ হার্জ থেকে ৪০ হার্জ। আর ফিন তিমির শব্দের রেঞ্জ মোটামুটি ২০ হার্জ।

52-loneliest-whale2-600x459

 

বিল ওয়াটকিনসকে নেশায় পেয়ে বসলো। তিনি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই ৫২ হার্জের শব্দটাকে ট্র্যাক করে চললেন। ট্র্যাক করে দেখলেন, ৫২ হার্জের এই শব্দটা শুধু অদ্ভুতই নয়, বরং বেশ ইউনিক। এটা শুধু একটা মাত্র উৎস হতেই আসছে। আর সেই শব্দ উৎসের মালিকটার সাথে মিলছে নীল এবং ফিন তিমির চলাচলের প্যাটার্ন। তার মানে এই শব্দ উৎসের মালিক একটা তিমি মাছ। এমন এক তিমি মাছ, যেটা ৫২ হার্জের শব্দ উৎপাদন করতে পারে। এই শব্দ তৈরি করে সে যোগাযোগ করতে চাইছে তার প্রজাতির অন্য কোনো সদস্যের সাথে। কিন্তু প্রত্যুত্তরে আর কোনো ৫২ হার্জের শব্দ ভেসে আসছে না। ফলে ৫২ হার্জের শব্দের মালিক নিঃসঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের অতলে। তবে সে টের পাচ্ছে না, সে আসলে একা নয়। মাইল কয়েক দূরের উপকূলে এক রিসার্চ সেন্টারে বসে জীবন সায়াহ্নে উপনীত হওয়া এক ব্যক্তি গভীর মুগ্ধতায় সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে তাকে। শুনে যাচ্ছে তার আরেকজন সঙ্গী খুঁজে পাবার আকুতি।

বিল ওয়াটকিনসের পুরো নেশা ধরে গিয়েছিলো ব্যাপারটায়। রাতের পর রাত তিনি একটা পাকা দালানের ভিতরে ল্যাবরেটরিতে বসে গভীর মনোযোগে শুনে চলতেন আর রেকর্ড করতেন ৫২ হার্জের শব্দটাকে। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি মুগ্ধ বিস্ময়ে যতটুকু সম্ভব ডেটা রেকর্ড করেছিলেন এই শব্দ উৎসটার। ২০০৪ সালে এই শব্দটার প্রতি এক বিশাল মুগ্ধতা নিয়েই তিনি ৭৮ বছর বয়সে বিদায় নেন পৃথিবী হতে। রেখে যান এই শব্দ উৎসের ব্যাপারে করে যাওয়া তাঁর সকল গবেষণাপত্র। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পরেই সেগুলো প্রকাশিত হয় জার্নালে। হৈচৈ পড়ে যায় মিডিয়ায়। পত্রপত্রিকায় চলে আসে এক নিঃসঙ্গ তিমি মাছের কথা, যে ৫২ হার্জের শব্দ উৎপাদন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার মতো আরেকজন সঙ্গীকে। কিন্তু তার কথা তার প্রজাতির আর কেউ বুঝতে পারে না। ফলে আসে না কোনো প্রত্যুত্তর। আর সেই তিমিটা নিঃসঙ্গ ঘুরে বেড়ায় প্রশান্ত মহাসাগরের সুবিশাল জলরাশির এমাথা-ওমাথায়। শব্দের উৎসটার নাম হয়ে যায় ‘ফিফটি টু – দ্যা লোনলিয়েস্ট হোয়েল অন আর্থ’।

লিজেন্ড অব ফিফটি টু
সব পত্রপত্রিকা ফলাও করে প্রচার করে এটা একটা নিঃসঙ্গ তিমি মাছের গান। তার ভাষা কেউ বুঝতে পারছে না, ফলে তার সঙ্গী খুঁজে পাবার আহবানে কেউ সাড়া দিতে পারছে না। ইংল্যান্ডের ‘দি এক্সপ্রেস’ তো ছাপিয়েই দিয়েছিলো, “পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম তিমি মাছের অনন্য সুরটাই তাকে তার ভালোবাসা খুঁজে পেতে বাধা দিচ্ছে”। (নিচের পত্রপত্রিকার লিংকে সর্বশেষ এড্রেসটা দ্রষ্টব্য)

কিন্তু সত্যিটা আসলে কী? ফিফটি টু কি আসলেই কোনো তিমি মাছ?

বিল ওয়াটকিনস এবং তার আরেক সহ-গবেষক তাদের জার্নালে উল্লেখ করেছিলেন, “এটা আসলেই যদি একটা তিমি মাছের গান হয়, তবে মেনে নেয়া খুবই কঠিন হবে যে, এই বিশাল মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই ধরণের প্রাণী শুধুমাত্র এমন একটাই আছে। তা সত্ত্বেও বছরকে বছর সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে পুরো এলাকা জুড়ে এই বৈশিষ্ট্যের ডাক এমন একটাই পাওয়া গেছে। প্রতি মৌসুমে একটা উৎস হতেই এমন ডাক ভেসে আসে”। (২ নং লিংক দ্রষ্টব্য)

ঘটনা আসলেই তাই। বিল এবং তার সহ-গবেষকদের প্রকাশিত জার্নাল অনুযায়ী প্রতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ ৫২ হার্জের এই সুরটা ভেসে আসতো তাদের রাডারে। এটা চলতো জানুয়ারির শেষ হতে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এরপরে শব্দ উৎসটা আবার উপকূলের সীমানার বাইরে চলে যেতো। ঠিক প্রশান্ত মহাসাগরের ঐ অঞ্চলে তিমির ঝাঁকেরা যেভাবে ঘুরে বেড়ায়, সেই প্যাটার্নের সাথে মিল রেখে। পুরো ১২ বছর এই ধাঁচেই সুরটা রেকর্ড করেছিলেন বিল ও তার সহযোগীরা। কিন্তু ট্যুইস্ট একটা জায়গাতেই। প্রত্যেকবার ৫২ হার্জের শব্দ একটা উৎস থেকেই পেয়েছিলেন বিল।

ট্যুইস্টের উপরে ওভার ট্যুইস্ট দিতে সাম্প্রতিক কালের আরো কিছু কথা যোগ করা যায়। বিল ২০০৪ সালে মারা যাবার পরে ফিফটি টু-কে ট্র্যাক করা এক প্রকার বন্ধই হয়ে গিয়েছিলো। বিল ওয়াটকিনসের মতো মুগ্ধতা নিয়ে আর কেউ দিনের পর দিন এই কাজ চালিয়ে যাননি। খুবই ছাড়া ছাড়া ভাবে এই গবেষণাটা চালিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেটুকুতেই ধরা পড়ে আরেক চমকপ্রদ ব্যাপার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৫২ হার্জের সুর উৎপাদনকারী উৎসটা মোটামুটি ৪৭-৪৯ হার্জের সুর তৈরি করে যাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ‘স্ক্রিপস ইন্সটিটিউশন অব ওশেনোগ্রাফি’-র গবেষক জন হিলডাব্র্যান্ড বলছেন, এই ব্যাপারটা তিমি মাছদের শিশু হতে প্রাপ্তবয়স্ক হবার সময়ে গলার টোন পালটে যাবার সাথে মিলে যায়। অর্থাৎ, ধারণা করা হচ্ছে, আমাদের সেই শিশু তিমিটা এখন আর শিশু নেই। অনেক বড় হয়ে গেছে! তবে হিলডাব্র্যান্ড তার এক গবেষণাপত্রের ফলাফল উল্লেখ করে আরো জুড়ে দিয়ে বলেন, “তিমি মাছেরা, বিশেষত নীল তিমিরা ১৯৬০ সালের পর থেকেই গভীর হতে গভীরতর পিচে গলার সুর ছেড়ে চলছে। হয়তো সেটাও ফিফটি টু-এর গলার সুর পালটে যাবার আরেকটা ব্যাখ্যা হতে পারে”। এভাবেও হয়তো তিমি মাছের সাথে রহস্যময় শব্দ উৎসটার আরেকটা যোগসূত্র দাঁড় করানো যায়। কিন্তু চাক্ষুষ প্রমাণ এখনো কারো হাতে নেই।

কথা হলো, আমাদের ফিফটি টু যদি একটা তিমি মাছই হয়, তবে তার এমন অনন্য সুর উৎপাদনের কার্যকারণটা কী?

এখন পর্যন্ত, কয়েকটা হাইপোথিসিস দাঁড় করানো হয়েছে। একটা ধারণায় বলা হচ্ছে, এটা সম্ভবত নীল এবং ফিন তিমির সংকর। এমন সংকর তিমির শরীরের গঠন হবে পুরোই অন্যরকম। ফলস্বরূপ, তার গলার সুর পালটে ৫২ হার্জের সুর তৈরি হতে থাকাও বিচিত্র কিছু নয়। এই ধরণের সংকর তিমিদের শারীরিক গঠন হয় অনেকটা ফিন তিমির মতো, কিন্তু গলার সুর এবং অন্যান্য আচার-আচরণ হয় নীল তিমির মতো। সিয়াটলের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের প্রফেসর ‘কেইট স্টাফোর্ড’ এর মতে, “ফিফটি-টু এর আচরণও পুরোই নীল তিমির মতো। এর বিভিন্ন মৌসুমে এক এলাকা হতে অন্য এলাকায় মাইগ্রেশন করার প্যাটার্নটা নীল তিমির সাথে মিলে যায়। সুতরাং আমার ধারণা, এই প্রাণীটার কিছু অংশ অবশ্যই নীল তিমির মতো”।

আরেক হাইপোথিসিসে বলা হচ্ছে, এই তিমিটা সম্ভবত কোনো ভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে থাকতে পারে। সেই প্রতিবন্ধকতার দরুন এমন অনন্য কম্পাংকের এক সুর বের হয় তার গলা দিয়ে।

এদিকে নিউইয়র্কের ইথাকা কর্নেল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ‘ক্রিস্টোফার উইলস ক্লার্ক’ বলেন, “মানুষ ফিফটি টুর ডাককে যতটা অনন্য মনে করছে, ততটা অনন্য হয়তো নয় ব্যাপারটা। এখন পর্যন্ত বহু অঞ্চলের তিমির ডাক রেকর্ড করা হয়েছে। সেখান থেকে দেখা গেছে, একেক অঞ্চলের তিমির একেক রকমের ডায়ালেক্ট আছে। একেক অঞ্চলের মানুষ যেমন একেক ভাষায় কথা বলে, তেমন”। কিন্তু তাতেও এই রহস্যের সমাধান হয় না তেমন একটা। কারণ বিলের রেখে যাওয়া গবেষণা অনুযায়ী, এই শব্দের উৎস কেবল একটাই।

তবে এক্ষেত্রে ২০১০ সালের একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়। বিলের মৃত্যুর পরে আর কেউ তেমন উৎসাহ নিয়ে ফিফটি টুর সুর ট্র্যাক করে যায়নি নিরলস ভাবে। উপরে উল্লিখিত গবেষক হিলডাব্র্যান্ড ২০১০ সালে এই ব্যাপারে পুনরায় কৌতূহল প্রকাশ করলে তার এক সহকারী আবার ট্র্যাক করা শুরু করেন শব্দটাকে। শব্দের উৎসটা বিলের গবেষণা অনুযায়ীই চলাচলের প্যাটার্ন দেখাতে শুরু করে সেন্সরে। হিলডাব্র্যান্ডের অফিস থেকে মাত্র ৫-৬ মাইল গভীর সমুদ্রে অবস্থান দেখাতে থাকে ৫২ হার্জ সুরটা। তবে এবারে একটু ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যায়, যা কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করে সবার মনে। দেখা যায়, সমুদ্রে পরস্পর হতে বহুদূরে অবস্থিত আলাদা এলাকার দু’টো সেন্সর থেকে এই তরঙ্গ ভেসে আসছে। তার মানে, হয়তো আমাদের ফিফটি টু আর আমাদের ধারণা অনুযায়ী নিঃসঙ্গ কোনো প্রাণী নয়। তাছাড়া অনেক বিজ্ঞানী “তার কাছাকাছি প্রজাতির অন্য কেউ ৫২ হার্জ কম্পাংকের সুর বুঝতে পারে না” এমন ধারণাও উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, নীল তিমি হয়তো ৪০ হার্জের বেশি সুর উৎপাদন করতে পারে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ৫২ হার্জের একটা সুর তারা শুনতে পারবে না এবং শুনলেও সেটা বুঝতে পারবে না”।

ফিফটি টু – পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম তিমি মাছ?!
ফিফটি টু কি আদৌ কোনো তিমি মাছ, নাকি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত রকমের কোনো শব্দের উৎস? তিমি মাছ হলে সে পুরুষ না স্ত্রী? কী ধরণের তিমি সে? নীল তিমি, ফিন তিমি, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের নতুন কোনো প্রজাতির তিমি? নাকি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এক নীল তিমি সে, যার কথা কেউ বুঝতে পারছে না? শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দলের বাইরে সঙ্গীহীন অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশিতে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে নিঃসঙ্গ, একাকী! বয়স বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে তার গলার সুরের গভীরতা!

এখন পর্যন্ত এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। তবে ২০১৬ সালে এক গবেষক দল অবশেষে অভিযানে নেমেছেন এই ব্যাপারটার সুরাহা করতে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন আমেরিকান ফিল্মমেকার ‘জশ যেমান’ এবং অভিনেতা ‘আদ্রিয়ান গ্রেনিয়ের’। এই অভিযানে যা কিছুই ঘটবে, সবকিছুই পরবর্তীতে একটা ডকুমেন্টারি হিসেবে রিলিজ দেয়া হবে। এই অভিযানের পেছনে খরচের জন্য ২০১৫ সালে ‘কিকস্টার্টার’ এর মতো সাইটে জনগণের সাহায্য চাওয়া হয়েছিলো। জনগণ বিপুল সাড়া দিয়েছিলো সেখানে। তারপরেও কিছুটা ঘাটতি রয়ে গিয়েছিলো ফান্ড তোলাতে। তখন এগিয়ে এসেছিলেন হলিউড অভিনেতা ‘লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও’। নিরলস ভাবে সুস্থ পৃথিবী ও পরিবেশের জন্যে কাজ করে যাওয়া এই ব্যক্তি ৫০,০০০ ডলার দান করে দিয়েছিলেন তার ফান্ড হতে। ২০১৭ সালের কোনো এক সময়ে ডকুমেন্টারিটা রিলিজ পাওয়ার কথা রয়েছে।

 

52-loneliest-whale3-600x337

ফিফটি টুকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী এখন পর্যন্ত অনেক কবিতা, গান এবং গল্প তৈরি হয়েছে। সবখানেই তাকে নিঃসঙ্গ এক তিমি মাছ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আজকে জুল ভার্ন বেঁচে থাকলে তিনিও হয়তো দুর্ধর্ষ এক কল্পবিজ্ঞান কাহিনী ফেঁদে বসতেন। সেই কাহিনীতে থাকতো বিল ওয়াটকিনসের ফিফটি টুর ব্যাপারে অসামান্য মুগ্ধতার কথা। ফিফটি টুর পেছন পেছন ধাওয়া করে চলা কোনো এক চরিত্রের রোমাঞ্চকর সমুদ্রাভিযানের কথা। সবশেষে হয়তো তিনি সমাপ্তি টানতেন কোনো এক জোছনা ভরা রাতে। আমাদের চরিত্রটা হয়তো ভেদ করতে পারেনি ফিফটি টুর রহস্য। খুবই কাছাকাছি চলে গিয়েছিলো সে। কিংবা ভেদ করলেও হয়তো সেটা মনুষ্য সমাজ হতে আড়াল করে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সে। কারণ তাতে “নিঃসঙ্গ, শারীরিক প্রতিবন্ধী কিন্তু অনন্য” এই তিমিটার ক্ষতি হতে পারে। সে আর ডক্টর বিল ওয়াটকিনসের অশরীরী ছায়ামূর্তি জাহাজের ডেকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রহস্য ঘেরা পরিবেশে উপভোগ করতে থাকে সমুদ্রের রূপালী জোছনা। তাদের সামনেই সেই জোছনায় প্রশান্ত মহাসাগরের জলের উপরে খানিক ঝিকমিকিয়ে উঠে আবার ডুবে যায় ‘ফিফটি টু’। মানব সভ্যতা তাকে ছুঁতে চায়, কিন্তু সে মানুষের আড়ালে থেকে ৫২ হার্জে গেয়ে চলে তার গান – হয়তো নিজ প্রজাতির কোনো সঙ্গী খুঁজে পাবার আশায়।

Wednesday, March 21, 2018

“আমার পিতা কার্ল সেগান থেকে পাওয়া মৃত্যুর ধারণা” – Sasha Sagan


আমরা থাকতাম একটা বেলে রঙের পাথরের ঘরে যার দরজার উপর একটা পাখা-ওয়ালা সাপ আর একটা সৌরবলয় ছিল। ঘরটাকে দেখে মনে হতো এটা প্রাচীন সুমেরিয়া অথবা ইন্ডিয়ানা জোন্সের কোনো ঘর। ঘরটা অবশ্য দুটোর কোনোটাই ছিলো না। কিন্তু নিউইর্য়কের উত্তর অংশে যেমনটা মানুষ আশা করে, এটা সেরকম কিছুও ছিলো না। আমাদের বাসার সামনে একটা গভীর খাঁড়ি ছিলো, আর তার ওপারে ইথাকা শহর। গত শতকের শুরুর দিকে ঘরটা কর্নেলের একটা সিক্রেট সোসাইটি “Sphinx head Tomb” এর প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অবশ্য গত শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর কয়েকটা শোবার ঘর আর একটা রান্নাঘর যোগ করা হয়। ১৯৮০ সালের দিকে এটাকে পরিপূর্ণ ঘরে রূপান্তরিত করা হয়। আমি আমার অসাধারণ বাবা-মায়ের সাথে থাকতাম এখানেই।

আমার বাবা, জ্যোতির্বিদ কার্ল সেগান, কর্নেলে মহাকাশবিজ্ঞান আর critical thinking শেখাতেন। ১৯৮০ সালের দিকে তিনি জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ঘন ঘন টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে মহাবিশ্বের সংক্রামক কৌতুহল ছড়িয়ে দিতে থাকেন। কিন্তু Sphinx Head Tomb-এর ভেতর তিনি আর আমার মা অ্যান ড্রুয়ান বই-প্রবন্ধ- চলচ্চিত্রের কাহিনী লিখতেন। যে  কুসংস্কার, আধ্যাত্মবাদ, আর অন্ধ বিশ্বাস সমাজকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছিলো, সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দর্শন দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার জন্য কাজ করছিলেন। ওরা একে অন্যকে অনেক ভালবাসতেন, আমি এখন বুঝতে পারছি তাঁদের পেশাদারী সাহায্য তাঁদের ভালবাসারই অন্য এক রূপে প্রকাশ ছিল। এরকমই একটা প্রজেক্ট ছিল ১৯৮০ সালের ১৩ পর্বের পিবিএস সিরিজ কসমস যা ওরা যৌথভাবে লিখেছিলেন, আর বাবা উপস্থাপনা করেছিলেন। অনুষ্ঠানটার পুনর্জন্ম ঘটিয়েছেন আমার মা (নীল ডিগ্রাস টাইসনের কসমস, ২০১৪ সালে)।

Sasha-Sagan-Cosmos-SpaceTime-Odyssey-Premieres-QOM7SAAC2KXl-220x300

 

প্রাথমিক স্কুল শেষ করার পর আমার বাসায় প্রতিরাতে খাবার টেবিলে সংশয়বাদী চিন্তা আর মহাবিশ্বের ধর্ম নিরপেক্ষ ইতিহাসের পরিপূর্ণ শিক্ষা দেয়া হতো। তাঁরা খুব ধৈর্যের সাথে আমার অসীম সংখ্যক “কেন”-র উত্তর দিতেন। কখনো বলেন নি “আমি বলেছি, তাই!” অথবা “এটা এই রকমই”। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সুচিন্তিত আর সৎ জবাব দিয়ে দিতেন তাঁরা; এমনকি সেসব প্রশ্নেরও, যেগুলোর কোনো উত্তর হয় না।

খুব ছোটবেলায় একদিন আমি বাবাকে তাঁর বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমি নানা-নানীকে দেখেছি, কিন্তু দাদা-দাদীকে কেনো দেখিনি – তা জানতে চেয়েছিলাম।

“কারণ তাঁরা মারা গেছেন” তিনি বলেন।

“তুমি আবার তাঁদের দেখতে পারবে?” আমি জানতে চাইলাম।

তিনি খুব ভেবেচিন্তে উত্তর প্রস্তুত করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন,  বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে পারলে তিনি আর কিছু চাইতেন না। কিন্তু তাঁর কাছে এমন কোনো কারণ বা প্রমাণ নাই যা মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে সমর্থন করে, তাই তিনি আবেগের লোভে পড়তে পারেন না।

“কেনো?” আমি আবার জানতে চাইলাম।

তিনি খুব কোমল সুরে বললেন যে কোনো কিছুতে বিশ্বাস করার জন্য তাকে সত্য বলে বিবেচনা করা খুব বিপদজনক। নিজেকে এবং অন্যকে, বিশেষ করে যারা কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার মনোভাব যদি না থাকে তবে একজন মানুষকে খুব সহজেই বোকা বানানো যায়। তিনি আমাকে বলেন – “কোনো কিছুর যদি সত্যতা থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে সেটা সূক্ষ্ম যাচাই সহ্য করার ক্ষমতা রাখে”।

আমার যতদূর মনে পড়ে, সেবারই প্রথম আমি মৃত্যুর চিরস্থায়ী রুপের কথা জানতে পেরেছিলাম। আমি গভীরভাবে নিজের অস্তিত্বের সংকটে পড়ে গিয়েছিলাম। তাঁরা আমাকে স্বান্তনা দিয়েছিলেন, কিন্তু অবশ্যই তাদের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত না হয়েই।

“ঠিক এই মুহূর্তে তুমি কিন্তু জীবিত! এটা কিন্তু মোটেও সাধারণ কিছু নয়” তাঁরা আমাকে বললেন, “একটা মানুষ জন্ম নেয়ার রাস্তায় যে কতগুলো বাঁক আছে, সেই অসীম সম্ভাবনার কথা যখন চিন্তা করবে, তখন এই জীবনের জন্যে আপনাআপনিই কৃতজ্ঞতা অনুভব করবে। ভাবো, অসীম সংখ্যক সেই বিকল্প মহাবিশ্বগুলোর কথা, যেখানে হয়তো তোমার প্র-প্র-পিতামাতার কখনো দেখাই হয়নি। আর সে কারণে হয়তো তোমার অস্তিত্বই নেই! তারপর ভাবো, তুমি এমন একটা গ্রহে বিবর্তিত হয়েছো যেখানে তুমি শ্বাস নিতে পারছো, যার পানি পান করতে পারছো, আর এর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র থেকে উষ্ণতা পাচ্ছো! ডিএনএ জিনিসটার মাধ্যমে কিন্তু তুমি অনেক অনেক প্রজন্মের সাথে সংযুক্ত। আরো বড় ব্যাপার হচ্ছে, তোমার শরীরের প্রতিটি কোষ একটা নক্ষত্রের অন্তরে তৈরি হয়েছিলো। “আমরা নক্ষত্রের টুকরো দিয়েই তৈরি” বাবার এই কথাটা খুব বিখ্যাত হয়েছিলো। এবং তিনি আমাকে এই কথাটার সত্যতা অনুভব করিয়েছিলেন।

13-sasha-sagan-1.w529.h793.2x

 

 

আমার বাবা-মা আমাকে শিখিয়েছেন – জীবন যদিও চিরস্থায়ী নয় এবং এজন্যেই বেঁচে থাকাটা এতো সুন্দর একটা জিনিস; যার জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। জীবন যদি চিরস্থায়ী হতো, তবে এটা এতো সুন্দর হতো না।

আমার বয়স যখন ৭ তখন আমরা আরো বড় একটা বাসায় উঠি, মূলত আমার ভাই স্যামের জন্মের প্রস্তুতি নিতে। বাবা-মা Sphinx Head Tomb উন্নয়ন কাজে হাত দিয়েছিলেন বলে সেটা কিছু দিন খালি ছিলো। তাঁদের পড়া-লেখা আর কাজ করার জন্য একটা আলাদা জায়গা দরকার ছিলো। বাড়ি পুনর্নির্মাণ ব্যাপারটা বেশ একটা লম্বা কাজ, এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পুনর্জন্ম লাভ করা সেই বাসায় খুব একটা কাজ করা হয়নি বাবার। তাঁকে দুর্বল, ম্লান, এবং ফ্যাকাশে দেখাতো। রক্ত পরীক্ষার পর জানা গেলো, তাঁর রক্তে খুব দুর্লভ একটা রোগ হয়েছে।

আমরা সিয়াটলে চলে গেলাম যাতে করে বাবা ভালো ডাক্তার দেখাতে পারে। উপশম, অবনতি, অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন; অবনতি, দ্বিতীয় অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন, উপশম; অবনতি, তৃতীয় অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন…… তারপর ১৯৯৬ সালের দক্ষিণায়নের (winter solstice) মৌসুমে তিনি মারা যান, আমার বয়স তখন ১৪।

 

13-sasha-sagan-2.w750.h560.2x

 

আমাদের Sphinx Head Tomb এর বাসা অব্যবহৃত পড়ে ছিল, ধীরে ধীরে সেটা বাবার লেখা পেপার, নোট, ছবি, কার্যতালিকা, জন্মদিনের কার্ড, ছোটবেলার আঁকা ছবি, আর রিপোর্ট কার্ডে ভরে ওঠে। ১৮ ফুট উঁচু ফাইল ক্যাবিনেটে হাজারো কাগজপত্র জমা হতে থাকে। মা বাবার এসব নথিপত্র রাখার জন্য জায়গা খুঁজতে থাকেন যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে আমার বাবার মহান কর্মজীবনের কথা, কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সংস্থা এই নথিপত্রের সংরক্ষণ আর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি।

মায়ের বয়স বাড়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন – বাবার ঐতিহ্য ধরে রাখবেন; তাঁদের যৌথ প্রযোজনায় করা কাজগুলো তাঁর মৃত্যুর পরও চালিয়ে যাবেন। যখন তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না, ঠিক কিভাবে কসমসের কাজ শুরু করবেন, তখন তিনি চার বছর ধরে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। শেষ পর্যন্ত সেথ ম্যাকফারলেন (ফ্যামিলী গাইয়ের স্রষ্টা, যিনি বাবার কাজের অনেক বড় ভক্ত ছিলেন)-এর সাথে মায়ের দেখা হয়। আর তারপর, নতুন কসমসের কাজ শুরু হয়, সেথের অসামান্য সাহায্যে। আমার মায়ের ধরা হাল আর নীল ডিগ্রাস টাইসনের মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় কসমস কয়েক মিলিয়ন মানুষকে বিজ্ঞানের রাজকীয়তা আর বাবার আনন্দঘন সংশয়বাদ শেখায়।

কিন্তু সেথ আমাদের জন্য শুধু এটুকুই করেননি! তিনি বাবার কাজগুলো রক্ষার জন্য আরও বড় একটা কাজ করেছেন, যেটা সম্পর্কে টুইটারে ঝড় ওঠেনি। তিনি Sphinx Head Tomb-এ রাখা সকল নথিপত্র- পারমাণবিক শীতকাল সম্পর্কে লেখা সকল প্রবন্ধ, শুক্র গ্রহের (ভেনাস-এর) আবহাওয়ার উপর লেখা প্রবন্ধগুলো, বাবার চিন্তাভাবনার সমষ্টি, আর ছেলেবেলায় আঁকা একটা আন্তঃনাক্ষত্রিক মিশনের ছবি- সবকিছু লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে রাখার ব্যবস্থা করে দেন।

এই অসাধারণ সম্মান আমাকে ভাবিয়ে তোলে। বাবা মারা যাওয়ার পর একপ্রকার অমরত্ব লাভ করেছেন – হোক সেটা ছোটো, মানবিক, এবং জাগতিক অমরত্ব। কিন্তু এটাই একমাত্র প্রকার অমরত্ব যা একজন মানুষ পেতে পারে। একদিন হয়তো আমাদের সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। লাইব্রেরী অফ কংগ্রেস অন্য কারো কাছে আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির মত হয়ে যাবে। আমাদের প্রজাতি একটা সময় মারা যাবে, অথবা অন্যকিছুতে বিবর্তিত হবে; আমরা যা শ্রদ্ধা করি, তারা হয়তো সেটাকে শ্রদ্ধা করবে না। আর তারপর কয়েক বিলিয়ন বছর পর সূর্য মারা যাবে, আর সাথে চলে যাবে পৃথিবীতে থাকা সকল প্রাণ।

বড় হওয়ার সময় বাবা আমাকে বুঝিয়েছিলেন কেন অমরত্ব লাভ অসম্ভব। কিন্তু আমি এখন ভাবি, ২৩ অথবা ২৪ শতকের কোনো কিশোর আমার বাবার লেখনীর দিকে তাকিয়ে কী ভাববে না যে, কোনো না কোনোভাবে তিনি এখনো আছেন?

এই নভেম্বরের চঞ্চল আর ধূসর দিনগুলিতে, বাবার ৭৯তম জন্মবার্ষিকীর সপ্তাহে আমার পরিবার, আমাদের বন্ধুরা, আর বাবার ছাত্র ও সহকর্মীরা ওয়াশিংটন ডিসিতে সমবেত হন  The Seth MacFarlane Collection of Carl Sagan and Ann Druyan Archive এর উদ্বোধনে। কিন্তু যখন আমি আমেরিকার ইতিহাসের সেই গির্জায় ঢুকলাম, বেশ অবাক হলাম – অমরত্ব দেখে নয়, বরং এর বৈপরীত্য দেখে। আমার সামনেই ছিল গুটেনবার্গ বাইবেলের আসল কপি আর গেটিসবার্গ এড্রেস! তখনই আমার মাথায় বজ্রপাতের মত আপতিত হলো – এটা চিরস্থায়ী জীবনের স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটা একটা কবরস্থান!

মাঝে মাঝে দম্পতিরা যেভাবে বিয়ের শপথ নবায়ন করেন, আমরাও সেদিন আমাদের দুঃখ নবায়ন করলাম। আর ঠিক সেই মূহুর্তে, বাবা সেই মানুষগুলোর অন্তরে অত্যন্ত তীব্রভাবে জীবিত ছিলেন, যারা তাকে ভালোবাসতো; আবার তার অনুপস্থিতিটাও ছিলো অত্যন্ত দুঃখজনক। সেদিন লাইব্রেরী অফ কংগ্রেসে, নশ্বরতা আর অবিনশ্বরতার এই প্রহেলিকা আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু এটাও সেই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের ছোট্ট অবস্থানের ধাঁধাটার মতোই, যেটা বাবা-মা আমাকে Sphinx Head Tomb-এ বলেছিলেন।

মূল প্রবন্ধ –
Lessons of Immortality and Mortality From My Father, Carl Sagan – Sasha Sagan.

উৎস ঃ http://onubadokderadda.com/mortality_and_immortality_sasha_sagan/

Sunday, January 21, 2018

কার্ল সেগানের “ভুয়া জ্ঞান সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া”


কার্ল সেগানের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিশেষণ ব্যবহার করা যায়- তিনি ছিলেন মহাবিশ্বের জ্ঞান সম্পন্ন এক ব্যক্তি- এক ক্ষুধার্ত পাঠক- একজন প্রেমিক- সর্বোপরি একজন দার্শনিক। আমাদের যুগের সম্মানিত জ্ঞানানুরাগীদের মধ্যে সেগান ছিলেন অন্যতম- মুক্তচিন্তার পথপ্রদর্শক- স্বচ্ছচিন্তা আর সন্দেহবাদীতার অগ্রনী পুরুষ।
১৯৯৬ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে তিনি আমাদের The Demon Haunted World: Science as a Candle in the Dark এর মাধ্যমে আমাদের জনপ্রিয় ছদ্মজ্ঞান আর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রণ কৌশল শিখিয়ে দেন।

02.-onubadokder-adda10

উক্ত বইয়ের The Fine Art of Baloney Detection অধ্যায়ে আমাদের মাঝে প্রচলিত প্রচারণা- ধর্মীয় অপবিজ্ঞান- বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যাসহ বিজ্ঞানীদের ব্যবসায়ী প্রবণতা যাকে সেগান বলতেন- “ক্রেতাদের বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রতারণা” আর “বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্যের আড়ালে লুকিয়ে রাখা দুর্নীতি”।

তবে তাঁর এই শিক্ষা নৈতিকতা আর স্বচ্ছচিন্তার সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে আসেনি- এসেছে তাঁর আবেগী অবস্থান- প্রিয় পিতামাতার প্রয়াণের পর। তিনি আমাদের বলেছেন আবেগের তাড়নায় মৃত্যু পরর্বতী জীবনে বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীনতার কথা- তিনি বলেছেন এতে আমরা বোকা হয়ে যাই না-শুধু আমাদের নিজেকে এসব ভিত্তিহীন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তৈরি রাখা।

বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অপবিজ্ঞান আর মিথ্যাপ্রচারণার বিরুদ্ধে এসব হাতিয়ার ব্যবহার করা শেখেন- সেগান এই হাতিয়ার গুলোকে বলেন- “ছদ্মবিজ্ঞান সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া”।
এই হাতিয়ার কাজে লাগে তখনি যখন নতুন কোনো ধারনা আমাদের সামনে আসে। নতুন সেই ধারনা যদি আমাদের ছদ্মবিজ্ঞানরোধী ব্যবচ্ছেদের পরও বেঁচে থাকে তবে আমরা তাকে স্বাগত জানাবো। আপনি যদি কোন ভুল না করতে চান- অথবা বোকা না বনতে চান- তবে-পরিক্ষীত ভোক্তাবান্ধব এই অস্ত্র ব্যবহার আপনার শিখতে হবে।”

তবে এই প্রক্রিয়া, সেগান বলেন, শুধু বিজ্ঞানের জন্যই মোক্ষম হাতিয়ার না। আপনি চাইলেই দৈনন্দিন জীবনেও এর ব্যবহারের সুফল পাবেন। এই প্রক্রিয়া জানা থাকলে আপনি প্রমাণহীন ভুলধারনা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত মিথ্যাচার থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেন। সেগানের মতে, এর ৯টি মূলনীতি হচ্ছে-
১) সম্ভবপর হলে সকল “ফ্যাক্টের” স্বাধীনসত্ত্বা থাকতে হবে, কোন “ফ্যাক্ট” অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল হতে পারবে না।

২) প্রাপ্ত প্রমাণের উপর ভিন্ন মতাদর্শের বিষয়গত বিতর্ক হওয়া উচিত।

৩) “কর্তৃপক্ষের মত” কোন মূল্য বহন করে না। “কর্তৃপক্ষরা” অতীতে ভুল মত দিয়েছেন, ভবিষ্যৎেও যে ভুল মত দিতে পারেন না এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। বিজ্ঞানে কোন কর্তৃপক্ষ নেই, বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ আছে।

৪) একের বেশী তত্ত্ব নিয়ে কাজ করুন। ব্যাখ্যাযোগ্য ব্যাপারের একের বেশী ব্যাখ্যা বিবেচনায় রাখুন। কোন কোন পরীক্ষা করে আপনি অন্য ব্যাখ্যাগুলোকে ভুল প্রমাণ করতে পারবেন সেটা ভাবুন। যাই বাঁচে- যে ব্যাখাই এই “ডারউইনিয় নির্বাচনে” টিকে থাকে তার সঠিক হওয়ার সম্ভাব্যনা- পছ্ন্দসই একটা ব্যাখার সঠিক হওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে ঢের বেশী।

৫) নিজের তত্ত্ব বলে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন না। জ্ঞানের যাত্রাপথে আপনার তত্ত্ব একটা স্থান মাত্র। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন কেনো আপনার তত্ত্ব আপনার পছন্দ, বিকল্পগুলোর সাথে আপনার তত্ত্বের তুলনা করে দেখুন। দেখুন তত্ত্বটিকে ভুল সাব্যস্ত করার কোন পথ খুঁজে পান কি না, আপনি না পেলেও অন্যরা ঠিকই পাবে।

৬) হিসাব যোগ করুন। আপনি যা ব্যাখ্যা করতে চান সেটা ব্যাখ্যা করা সহজ হবে যদি আপনি সেটাকে গানিতিকভাবে মাপতে পারেন। বিকল্পগুলোর মাঝে সবচেয়ে ভালোটার দিকে ইঙ্গিত করতে এটা আপনাকে সাহায্য করবে। অবশ্যই এমন ব্যাপার আসবে যেখানে সংখ্যার চেয়ে গুনগতমান বিবেচনা করতে হতে পারে- কিন্তু সে ব্যাপারগুলো খুঁজে বের করা কঠিন হবে।

 ৭) যদি ধারণা/তত্ত্বটি দুই বা ততোধিক বিবেচ্য নির্ভর হয় তবে প্রত্যেকটি বিবেচ্য ব্যাখ্যাযোগ্য হতে হবে- অধিকাংশ বিবেচ্য ব্যাখ্যাযোগ্য হলেই চলবে না।

 ৮) অকাম’স রেজর। দুইটি  সমান কার্যকরী ব্যাখ্যার মধ্যে সহজতর ব্যাখ্যা যা আরো প্রশ্নের জন্ম দেয় না, সেটাই গ্রহণযোগ্য হবে।

 ৯) নিদেনপক্ষে, তাত্ত্বিকভাবে, আপনার তত্ত্ব বিকৃত করা যায় কি না প্রশ্ন করুন। যে ধারণা ভুল প্রমাণ করা যায় না, বিকৃত করা যায় না, সেই তত্ত্বের মূল্য কম। ধরুন-  দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সবকিছু প্রাথমিক কণা- ইলেকট্রনের তৈরী-  যদি বিরাট কসমসের ক্ষেত্রে এ ধারণা ব্যক্ত করা হয়? আমরা যদি দৃশ্যমণ মহাবিশ্বের বাইরেই না যেতে পারি তবে এই ধারণা কি ভুল প্রমাণের অযোগ্য না? সংশয়বাদীরা যেন পরীক্ষা করার সুযোগ পায়- আপনার মত একই ফলাফল পায়- এমন ব্যাখ্যা সৃষ্টি করুন।

এই কৌশলগুলো রপ্ত করার পাশাপাশি পূর্ববর্তী “জ্ঞান”  দিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করার প্রবণতা বাদ দেয়ার কথাও সেগান বলেছেন। সেগান আমাদের মনে করিয়ে দেন ঠিক কোথায় আমরা এই কান্ডজ্ঞান বহির্ভূত কাজগুলোর প্রতি ঝুকে পড়ি।
“যে কোনো ছদ্মজ্ঞান সনাক্তকারী প্রক্রিয়া আমাদের কি করতে হবে শেখানোর পাশাপাশি কি করা যাবেনা সেটাও শেখায়। এটা আমাদের যুক্তি আর বাগ্মীতার দুই সর্বোচ্চ প্রচলিত ভ্রমের শিক্ষা দেয়- এর ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় ধর্মীয় আর রাজনৈতিক পরিমন্ডলে, কারণ এদের পালনকারীরা প্রায়শই দুইটা পরস্পরবিরোধী মতামতকে ন্যায়সঙ্গত করতে চেষ্টা করে।” 

তিনি এরকম ২০টি বহুল প্রচলিত আর বিপজ্জনক মতামত যা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকে সেগুলো উদাহরণসহ বর্ণনা করেছেন-
১) ad hominem “ব্যক্তিকে” এর ল্যাটিন প্রতিশব্দ। বক্তৃতাকে না আক্রমণ করে বক্তাকে আক্রমণ করা।

যেমন-রেভারেন্ড ডাঃ স্মিথ একজন বাইবেল বিশেষজ্ঞ, বিবর্তনতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর মতামত আমলে নেয়ার কোন কারণ নাই।

২) argument from authority-

যেমন-রিচার্ড নিক্সনকে পুনর্নির্বাচন করা হয়েছে কারণ দক্ষিন পূর্ব এশিয়ায় যুদ্ধ বন্ধ করার ব্যাপারে তাঁর গোপন পরিকল্পনা ছিল। যেহেতু সেটা গোপন পরিকল্পনা, তাই এর উপকারিতা বিচারের কোন পথ নাই।

তাঁর রাষ্ট্রপতি পদের জন্য তাঁকে বিশ্বাস করার সিদ্ধান্তটা পরে ভুল হিসেবে প্রকাশ পায়।

৩) argument from adverse consequences-

যেমন-  শাস্তি এবং পুরস্কার প্রদানকারী ঈশ্বর অবশ্যই আছে- তা না হলে  সমাজে অনৈতিকতা আরো বেড়ে যেত।

অথবা,

বহুল জনপ্রিয় হত্যামামলায় অভিযুক্তরা দোষী হোক বা নির্দোষ হোক, তাদের দোষী সাব্যস্ত করতেই হবে- তা না হলে মানুষ তাদের স্ত্রীদের হত্যা করার উৎসাহ পাবে।

৪) Appeal to ignorance- অসত্য প্রমাণ করা হয় নি, বিধায় কোনোকিছুকে সত্য ধরে নেয়া।

যেমন-  UFO আসে না এর কোন প্রমাণ না থাকা প্রমাণ করে UFO আছে। আর মহাবিশ্বে অন্য বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রাণী আছে।

অথবা,

মহাবিশ্বে যদিও ৭০ “ক্যাজিলিয়ন” গ্রহ আছে, তবুও যেহেতু অন্য কোনো সভ্যতার প্রমাণ নাই সেহেতু আমরাই মহাবিশ্বের কেন্দ্রীয় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রাণী।

আমাদের অস্থিরতা থেকে আমরা প্রমাণ না থাকাকে না থাকার প্রমাণ ধরে নিয়েছি।

৫) special pleading প্রায়শই একটা গভীর বাগ্মী বিপদ থেকে বাঁচায়।

যেমন-কিভাবে পিতা-পুত্র এবং পবিত্র আত্মা তিনটি জিনিস কিভাবে এক ব্যক্তি হতে পারেন?

Special Pleading- তুমি Trinity এর ঐশ্বরিক রহস্য বোঝো নি।

অথবা

পরম দয়ালু সবজান্তা ঈশ্বর কেন একজন নারীর (ঈভ) অবাধ্যতার শাস্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেন?

Special Pleading- তুমি স্বাধীনচিন্তার বিষয়টি বোঝো নি।

৬) begging the question উত্তর অনুমান করে নেয়াও বলা হয় একে।

যেমন-সহিংস অপরাধ কমাতে মৃত্যুদন্ড চালু করতে হবে।

সেটা করলে যে সহিংস অপরাধ কমে যাবে সে উত্তর অনুমান করে নেয়া হয়েছে।

৭) Observational Selection পছন্দসই ফলাফলকে উপস্থাপন করা। দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের ভাষায়-  “রাষ্ট্র সবসময় উৎপাদিত রাষ্ট্রপতিতের ব্যাপারে গর্ব করে-  উৎপাদিত খুনিদের ব্যাপারে রাষ্ট্র কথা বলে না।

৮) Statistics of small numbers- Observational Selection এর মত-

যেমন-  প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে গড়ে একজন মানুষ চাইনিজ হয়।  সেটা কিভাবে সম্ভব-  আমি শত শত লোককে চিনি, তাদের কেউই চাইনিজ নন।

৯) Misunderstanding the nature of statistics-

যেমন-  অর্ধেক আমেরিকানদের বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিকের চেয়ে কম- এই পরিসংখ্যানে রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়্যারের বিস্ময় প্রকাশ করা।

১০) Inconsistency

যেমন- মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ কাল অসীম হওয়ার সম্ভাব্যতাকে মেনে নেয়া তবে অসীম অতীত কালের সম্ভাব্যতাকে অযৌক্তিক মনে করা।

১১) Non sequitur- “it doesn’t follow” এর ল্যাটিন পরিভাষা।

যেমন-  আমাদের দেশই উন্নত হবে কারণ মহান ঈশ্বর আমাদের পক্ষে, অথচ সকল দেশই এটা ভাবে। (যারা non sequitur এ পড়েন তারা সাধারণত বিকল্প সম্ভাবনাগুলোর ব্যাপারে অবগত থাকেন না।)

১২) post hoc, ergo propter hoc- ‘ক’  ঘটনা ‘খ’  ঘটনার আগে ঘটেছে সুতরাং ‘খ’  ঘটনার কারণ ‘ক’  ঘটনা।

যেমন-  জ্যামি কার্ডিনাল সিন, ম্যানিলার আর্চ বিশপ বলেন-  “আমার পরিচিত এক ২৬ বছর বয়স্কা আছেন যাকে দেখতে  ৬০ বয়স্কা মনে হয়- কারণ তিনি জন্মনিয়ন্ত্রন বড়ি সেবন করেন।

অথবা,

নারীরা ভোটাধিকার পাওয়ার আগে পারমানবিক অস্ত্র ছিল না।

১৩) meaningless question-

যেমন- যদি অপ্রতিরোধ্য কোন শক্তি অনড় কোন বস্তুকে আঘাত করে তবে কি ঘটবে?

(যদি অপ্রতিরোধ্য কোন শক্তি থেকে থাকে তবে অনড় কোন বস্তু থাকতে পারবে না, এবং উল্টোটাও একইভাবে সম্ভাব্য।)

১৪) Excluded middle or False Dichotomy – আলোচ্য বিষয়কে দুটোমাত্র সম্ভাব্যতায় আবদ্ধ করা।

যেমন- হয় তুমি তোমার দেশকে ভালোবাসো, আর না হয় ঘৃণা করো। *

অথবা,

হয় তুমি সমাধানের অংশ না হয় তুমি সমস্যার অংশ।

১৫) Short term vs Long term- excluded middle এর গুরুত্বপূর্ণ উপপর্যায়-  এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এটাকে আলদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে।

যেমন-  অপুষ্টি আর শিক্ষাহীনতায় ভোগা শিশুদের চেয়ে তৃনমূল থেকে অপরাধ মোকাবেলা করা আমাদের বাজেটবান্ধব হবে।

অথবা,

আমাদের বাজেটের ঘাটতি বিবেচনা করে মহাশূন্য গবেষণা আর মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চা করাটা মূখ্য মনে হয় না।

১৬) Slippery slope –  excluded middle এর সাথে সম্পর্কিত।

যেমন-  যদি প্রথম সপ্তাহে ভ্রূনের গর্ভপাত করা হয় তবে পূর্ণবয়স্ক অভূমিষ্ঠ শিশুহত্যা রোধ করা যাবে না।

অথবা,

যদি নবম মাসেও আমাদের গর্ভপাত করতে না দেয়া হয় তবে কিছুদিন পর আমাদের অন্তঃস্বত্তা হওয়াকালীন দৈহিক ব্যবহারও সরকার বলে দিবে।

১৭) Confusing correlation and causation-

যেমন-  এক সমীক্ষা বলে সমকামিদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতদের আধিক্য আছে আর অল্প শিক্ষিতদের মাঝে সমকামিদের সংখ্যা কম- সুতরাং উচ্চশিক্ষা সমকামিতার কারণ।

১৮) Straw man বা বক্তব্যের মনগড়া ব্যাখা দিয়ে আক্রমন সহজ করা।

যেমন- বিজ্ঞানীরা মনে করেন সবকিছু দৈবাৎ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এটা ডারউইনিও নীতি মেনে সম্ভব না, কারণ সেটা বলে  প্রকৃতি কর্মক্ষম সবকিছুকে টিকিয়ে রাখে আর অকর্মণ্য সবকিছুকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়।

অথবা,

এটাকে short term vs long term হেত্বাভ্যাসও বলা যায়-  পরিবেশবাদীরা মানুষের চেয়ে পেঁচা আর শামুকের প্রতি বেশী সহানুভূতিশীল।

১৯) Suppressed evidence or half truths

যেমন-  রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগানকে হত্যা করার পর টেলিভিশনে এক ব্যক্তির চমকপ্রদ ভবিষ্যৎবানী প্রচারিত হয় যা বলে রেগানকে কিভাবে হত্যা করা হবে।

(তবে চিত্রায়ণের তারিখ ছাড়া সকল তথ্যই সঠিকভাবে বলা হয়েছিল। )

অথবা,

সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে-  ডিম না ভেঙ্গে অমলেট বানানো যায় না।

(হ্যাঁ, তবে এই বিদ্রোহ কি সবার জন্য ভাল হবে? এটা কি সরকারী শোষণের তুলনায় কম রক্তক্ষয়ী হবে? অভিজ্ঞতা থেকা পাওয়া জ্ঞান কি তার সায় দেয়?)

২০) Weasel words

যেমন-  আমেরিকার সংবিধানে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের কাছে ন্যস্ত, যাতে রাষ্ট্রপতিরা যুদ্ধ শুরু না করতে পারেন। তবে পররাষ্ট্রনীতি আর যুদ্ধনীতি রাষ্ট্রপতির মর্জি নির্ভর হয়। রাষ্ট্রপতিরা দেশপ্রেমের আড়ালে ভিন্ননামে যুদ্ধ শুরু করতে পারেন- যেমন-  “পুলিশী কর্মকান্ড”, “অস্ত্রসজ্জিত আকস্মিক আক্রমন”, “রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়ায় আক্রমন”, “শান্তকরন”, “আমেরিকার স্বার্থরক্ষা”। যুদ্ধের এসব প্রতিশব্দ ব্যবহার করা রাজনৈতিক কারণে ভাষাকে ব্যবহার করার নজীর । Talleyrand বলেন-  “রাজনীতিবিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা কলা হচ্ছে নতুন নামে পুরোনো এবং জনস্বার্থবিরোধী কাজ করার পথ খুঁজে নেয়া।”

সেগান একটা সতর্কবাণী দিয়ে অধ্যায়টি শেষ করেন-
 “সব অস্ত্রের মত এই ছদ্মজ্ঞান সনাক্তকরণ প্রক্রিয়ারও অপব্যবহার আছে- প্রাসঙ্গিকতার বাইরে ব্যবহার করা-  অথবা চিন্তা করার বিকল্প হিসেবেও একে ব্যবহার করা যায়। নিজের মত অন্যকে জানানোর আগে নিজে যাচাই করে নেয়া ছাড়াও বিজ্ঞ ব্যবহারে এই প্রক্রিয়া পৃথিবী বদলে দেয়ার ক্ষমতাও রাখে।” 

The Demon Haunted World বইটি একটি কালজয়ী রচনা। এর বিষয়বস্তু যেন এই ছদ্মবিজ্ঞান আর অপপ্রচারের যুগের জন্যই সেগান লিখে গিয়েছিলেন।

উৎস ঃ http://onubadokderadda.com/baloney_detection/

Thursday, December 21, 2017

বিলিওন এবং বিলিওন


আমি এই কথা কখনো বলিনি। সত্যি বলছি। ও আচ্ছা, আমি বলেছিলাম সেখানে হয়তো ১০০ বিলিওন গ্যালাক্সী এবং ১০ বিলিওন ট্রিলিওন নক্ষত্র আছে। আসলে কোনো বড় সংখ্যা ব্যবহার ব্যতীত মহাশূন্য নিয়ে কথা বলা খুবই কঠিন। আমি ‘কসমস’ টিভি সিরিজে “বিলিওন” কথাটা বহুবার বলেছি, যেটা বহু মানুষ দেখেছিলো। কিন্তু আমি কখনোই বলিনি “বিলিওন এবং বিলিওন”। এর একটা কারণ হচ্ছে, এটা খুবই অস্পষ্ট। কত বিলিওনে আসলে “বিলিওন এবং বিলিওন” হয়? অল্প কিছু বিলিওনে? বিশ বিলিওনে? একশ বিলিওনে? “বিলিওন এবং বিলিওন” আসলে খুবই ভাসাভাসা। যখন আমরা সিরিজটাকে পুনর্বিন্যস্ত এবং আরো উন্নত করে সাজিয়েছিলাম, আমি তখনো যাচাই করে দেখেছি- এবং আমি নিশ্চিত, আমি এটা কখনো বলিনি।

কিন্তু জনি কারসন- যার ‘টুনাইট শো’ তে আমাকে এতগুলো বছরে প্রায় ত্রিশবারের মত উপস্থাপন করা হয়েছে – সে বলেছে। সে একটা মোটা কাপড়ের জ্যাকেট, একটা গলাবদ্ধ সোয়েটার এবং ঘর মোছার ন্যাকড়ার মত কিছু একটা মাথায় পরচুলা হিসেবে পরে উপস্থিত হতো। সে প্রায় আমার কাছাকাছি ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলো, অনেকটা প্রতিমূর্তির মত! সে মধ্যরাতের টিভি অনুষ্ঠানে অনবরত বলে বেড়াতো “বিলিওন এবং বিলিওন”। আমি একটু বিরক্তই হচ্ছিলাম যে আমার ব্যক্তিছবির একটা প্রতিমূর্তি নিজে নিজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর এমন সব কথা বলছে যেগুলো পরদিন সকালে আমার বন্ধু এবং সহকর্মীরা আমার কাছে এসে রিপোর্ট করছে। (ছদ্মবেশ ধারণ সত্ত্বেও, কারসন- একজন একনিষ্ঠ শিক্ষানবীশ জ্যোতির্বিদ- প্রায়ই আমার অনুকরণে বলা কথাগুলোকে সত্যিকারের বিজ্ঞান বানিয়ে ছাড়তো।) বিস্ময়করভাবে, “বিলিওন এবং বিলিওন” প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলো। মানুষেরা কথাটাকে পছন্দ করে ফেললো। এমনকি আজও আমাকে রাস্তায় কিংবা বিমানে কিংবা পার্টিতে দাঁড় করানো হয় আর জিজ্ঞেস করা হয়, একটু বিনয়ের সাথেই, যে আমি কি- শুধু তাদের জন্যেই- একবার শুধু “বিলিওন এবং বিলিওন” শব্দটা বলতে পারবো কিনা।
“আসলে, আমি এই কথাটা কখনো বলিনি”, আমি জবাবে তাদের বলি।
“আরে ব্যাপার না”, তারা প্রত্যুত্তরে বলেন। “তবুও বলুন একবার শুনি”।

আমাকে বলা হয়েছিলো শার্লক হোমস নাকি কখনোই বলেনি, “এতো অতি সাধারণ ব্যাপার, প্রিয় ওয়াটসন” (অন্তত আর্থার কোনান ডয়েলের বইগুলোতে); জিমি ক্যাগনে কখনো বলেনি, “হতচ্ছাড়া ধাড়ি ইঁদুর কোথাকার”; এবং হামফ্রে বোগার্ট কখনো বলেনি, “আরেকবার বাজাও, স্যাম”। কিন্তু তারা হয়তো এগুলো বলেছেও, কারণ এই প্রশ্নসাপেক্ষ বস্তুগুলোই তাদেরকে জনপ্রিয় শিল্পগুলোতে সুকৌশলে প্রতিষ্ঠা পাইয়ে দিয়েছে।

কম্পিউটার ম্যাগাজিন (“যেমনটা কার্ল সেগান বলে থাকেন, এর জন্যে প্রয়োজন বিলিওন বিলিওন বাইট”), অর্থনীতি বিষয়ক পত্রিকা, খেলোয়াড়দের বেতনবিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানগুলোতে এখনো আমার নাম উল্লেখ করে বলা হয় আমি নাকি এই সহজ-সরল কথাটা উচ্চারণ করেছি। একটা সময়, ছেলেমানুষি করে জিজ্ঞেস করা হলেও, আমি এই কথাটা উচ্চারণ করতাম না। কিন্তু আমি এখন সেই জড়তাটা কাটিয়ে উঠেছি। তাই, সেটার প্রমাণ হিসেবেই, এখানে একবার বলা হয়ে যাকঃ

“বিলিওন এবং বিলিওন”

কোন ব্যাপারটা আসলে “বিলিওন এবং বিলিওন” কথাটাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে? এক কালে তো অগণিত সংখ্যক কিছু বুঝাতে বিকল্প হিসেবে “মিলিওন” শব্দটা ব্যবহৃত হতো। ফাটাফাটি ধনীরা ছিলো মিলিওনেয়ার। যীশুর সময়ে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিলো ২৫০ মিলিওন। ১৭৮৭ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় আমেরিকানদের সংখ্যা ছিলো ৪ মিলিওন; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে জনসংখ্যা ছিলো ১৩২ মিলিওন। পৃথিবী হতে সূর্যের দূরত্ব ৯৩ মিলিওন মাইল (১৫০ মিলিওন কিলোমিটার)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৪০ মিলিওন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলো; যেটা ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৬০ মিলিওন। ৩১.৭ মিলিওন সেকেন্ডে এক বছর (খুব সহজেই যাচাই করে নেয়া যায়)। ১৯৮০’র শেষে সারাবিশ্বে মজুদকৃত পারমাণবিক অস্ত্রসমূহের সম্মিলিত বিস্ফোরণ ক্ষমতা ১ মিলিওন হিরোশিমাকে ধ্বংসের জন্যে যথেষ্ট। বহু উদ্দেশ্য সাধনে এবং বহুসময় ধরে “মিলিওন” ছিলো বিশাল বড় সংখ্যার সার্থক উদাহরণ।

কিন্তু সময় বদলে গেছে। এখন পৃথিবীতে মিলিওনেয়ারদের সংখ্যাও আর বেঁধে রাখা যাচ্ছে না- এবং এর কারণ শুধু মুদ্রাস্ফীতি নয়। পৃথিবীর বয়স মোটামুটি ৪.৬ বিলিওন বছর হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। এর জনসংখ্যা এখন ৬ বিলিওন ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা জন্মদিন নির্দেশ করে সূর্যের চারপাশে বিলিওন কিলোমিটার পথ আবর্তনের (ভয়েজার মহাশূন্যযান যত দ্রুত পৃথিবী হতে দূরে সরে যাচ্ছে, পৃথিবী তার চেয়েও দ্রুতগতিতে সূর্যকে পরিক্রমণ করে চলছে)। চারটা বি-২ বোমারু বিমানের মূল্য হচ্ছে বহু বিলিওন ডলার (কেউ কেউ বলেন ২ এমনকি ৪ বিলিওন পর্যন্ত)। আমেরিকার প্রতিরক্ষা বাজেট হচ্ছে, যখন গোপন ব্যয়গুলোও হিসেবে ধরা হয়, বছরে ৩০০ বিলিওন ডলারেরও বেশি। আমেরিকা এবং রাশিয়ায় কোনক্রমে যুদ্ধ বেঁধে গেলে প্রাণহানি ঘটবে প্রায় এক বিলিওন মানুষের। সামান্য ইঞ্চি পরিমাণ দূরত্বে প্রায় এক বিলিওন অণু অবস্থান করে। আর এর বাইরে বিলিওন সংখ্যক সেই নীহারিকা এবং নক্ষত্রগুলোতো আছেই।

১৯৮০ সালে, যখন কসমস টিভি সিরিজ প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিলো, মানুষ বিলিওন এর জন্যে প্রস্তুত ছিলো। গুটিকয় মিলিওন হয়ে পড়েছিলো নগণ্য, কেতাদুরস্তহীন, তুচ্ছ। প্রকৃতপক্ষে, এই দুটো শব্দই উচ্চারণে এমন কাছাকাছি যে তাদের আলাদা করে বোঝাতে আপনাকে খুব সতর্ক হতে হয়। এই কারণেই, কসমসে, আমি “বিলিওন” কথাটা বলেছিলাম “বি” এর স্পৃষ্ট উচ্চারণের মাধ্যমে, যেটাকে অনেক মানুষই ব্যক্তিভেদে আলাদা আলাদা উচ্চারণরীতি হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। এর বিকল্প হিসেবে, যেমনটা টিভি বক্তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বলা হয়, “এটা হচ্ছে বিলিওন যার শুরুর অক্ষর হচ্ছে বি”- তুলনামূলকভাবে অধিক ঝামেলাপূর্ণ।

একটা কৌতুক প্রচলিত আছে যেখানে এক প্লানেটারিয়াম বক্তা তার শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন যে ৫ বিলিওন বছরের মধ্যে সূর্য ফুলে-ফেঁপে উঠে রেড জায়ান্ট হয়ে উঠবে, বুধ এবং শুক্রকে গিলে খাবে আর সেইসাথে সম্ভবত পৃথিবীটাকেও। এরপরেই এক উদ্বিগ্ন শ্রোতা তাকে থামিয়ে প্রশ্ন করলেনঃ
“দুঃখিত ডক্টর, কিন্তু আপনি কি বলেছেন যে সূর্য ৫ বিলিওন বছরের মধ্যে পৃথিবীকে পুড়িয়ে ছাই করে দিবে?”
“হ্যাঁ, এর বেশি বা কমও হতে পারে”।
“সব ঈশ্বরের দয়া! এক মূহুর্তের জন্যে আমি ভেবেছিলাম আপনি বলেছেন ৫ মিলিওন”।

এটা ৫ মিলিওন কিংবা ৫ বিলিওন যাই হোক না কেন, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে এর খুব সামান্য প্রভাবই আছে, তা পৃথিবীর পরিণতি যতই চমকপ্রদ হোক না কেন। কিন্তু মিলিওন এবং বিলিওনের পার্থক্য নিরুপণ জাতীয় বাজেট, বৈশ্বিক জনসংখ্যা এবং পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করার জন্যে অতীব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও “বিলিওন এবং বিলিওন” এর জনপ্রিয়তা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু এই সংখ্যাটাও ধীরে ধীরে নগণ্য, সংকীর্ণ দৃষ্টির এবং উহ্য হয়ে পড়ছে। এর থেকেও কেতাদুরস্ত সংখ্যাটাকে এখন দিগন্তে কিংবা আরও কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। ট্রিলিওন এখন আমাদের উপর প্রায় উপনীত।

উৎস ঃ http://onubadokderadda.com/billions_and_billions_01/

Tuesday, November 21, 2017

কার্ল সেগানের বিখ্যাত Pale Blue Dot স্পিচের অনুবাদ


১৯৯০ সাল, ১৪ই ফেব্রুয়ারি। ততদিনে কার্ল সেগান একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। ভয়েজার-১ যখন আমাদের সৌরজগত ছেড়ে আরো বাইরে চলে যাচ্ছিলো, তখন সেগান নাসাকে অনুরোধ করলেন, যাতে যাওয়ার আগে পৃথিবীর একটা ছবি তোলা হয় ঐ দূরত্ব থেকে। বিশাল সেই দূরত্ব থেকে ভয়েজার-১ এর তোলা পৃথিবীর ঐ ছবি দেখে Carl Sagan এটার নাম দিয়েছিলেন Pale Blue Dot

pale-blue-dot-wallpaper-1900x1200

মলিন নীল বিন্দু

এই সুবিশাল দূরত্ব থেকে, পৃথিবীকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হওয়ার কথা না। কিন্তু আমাদের জন্য ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।

বিন্দুটির দিকে আরেকবার তাকান – এটাই পৃথিবী, আমাদের বসত, আমরা এটাই। এখানেই ওরা সবাই, যাদের আমরা ভালোবেসেছি, যতজনকে আমরা চিনি। যাদের যাদের কথা আমরা শুনেছি, তাদের সবাই এখানেই তাদের জীবন কাটিয়েছে। আমাদের সারা জীবনের যত দুঃখ কষ্ট, হাজার হাজার ধর্ম, আদর্শ আর অর্থনৈতিক মতবাদ, যত শিকারী আর লুণ্ঠনকারী, যত সাহসী-ভীরু, সভ্যতার নির্মাতা-ধ্বংসকারী,যত রাজা আর প্রজা, যত প্রেমিক-প্রেমিকা, যত বাবা মা, স্বপ্নে বিভোর শিশু, আবিষ্কারক, পরিব্রাজক, যত নীতিবান শিক্ষক, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, যত সুপারস্টার, যত জাঁহাবাজ নেতা, মানব ইতিহাসের সকল সাধু আর পাপী, সবাই তাদের জীবন কাটিয়েছে আলোয় ভেসে থাকা ধূলোর ঐ ছোট্টো কণাটিতে।

অসীম এই মহাবিশ্বে…… খুব ছোট একটা মঞ্চ…… আমাদের এই পৃথিবীটা।

ভাবুন তো, সেনাপতি আর দিগ্বিজয়ী বীরের দল কত রক্ত ঝরিয়েছে – ক্ষুদ্র এই বিন্দুর ক্ষুদ্র একটা অংশ জয় করে, মহান হবার আশায়। ভাবুন তো, সেই সীমাহীন হিংস্রতার কথা; ছোট্টো এই বিন্দুর আরো ছোটো এক প্রান্তের মানুষ যা ঘটিয়েছে, অন্য প্রান্ত জয় করবে বলে।

কী দ্বন্দ্ব তাদের নিজেদের মাঝে! রক্তের জন্য তাদের কী পিপাসা! কী প্রকট তাদের জিঘাংসা! আমাদের নাক-উঁচু ভাব, আমাদের কাল্পনিক অহমিকা, ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আমরাই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছি, সেই বিভ্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয় এই ঝাপসা নীল আলো দিয়ে।

আমাদের এই গ্রহ, মহাজাগতিক অন্ধকারের মধ্যে নিতান্তই ক্ষুদ্র একটা বিন্দু। আমাদের অজ্ঞানতায়, এই বিশালতায়, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে কেউ আসবে, আমাদেরকে নিজেদের হাত থেকে রক্ষা করতে।

আমাদের জানামতে পৃথিবীই একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ। অন্য কোথাও, অন্তত নিকট ভবিষ্যতে, আমাদের প্রজাতি আস্তানা গাড়তে পারবে না।

ভ্রমণ? সম্ভব।

বসতি, এখনো নয়।

ভাল লাগুক আর নাই লাগুক, এই মুহূর্তে পৃথিবীই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।

বলা হয়ে থাকে জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের বিনয়ী করে তোলে, চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। মানুষের অহংকারকে ধূলিস্যাৎ করার জন্য দূর থেকে তোলা ছোট্টো পৃথিবীর এই ছবিটার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হয় না। আমার মতে, এটা মনে করিয়ে দেয়, কতটা জরুরি পরস্পরের প্রতি আরেকটু সহানুভুতিশীল হওয়া; এই ছোট্টো নীল বিন্দুটাকে, আমাদের একমাত্র বসতটাকে, সংরক্ষণ করা, উপভোগ করা।

উৎস ঃ http://onubadokderadda.com/pale-blue-dot-speech/

Thursday, September 21, 2017

কেন কার্ল সেগান সত্যিই অতুলনীয়



আমরা বাস করি সেগানের মহাবিশ্বে- শ্রদ্ধায় মাথা নত করে দেয়া অনন্য বিশাল মহাবিশ্বে। এই মহাবিশ্ব, যা সেগান বারবার বলতেন, আমাদের উদ্দেশ্যে তৈরি নয়। আমরা এর ক্ষুদ্রতর উপাদান। আমাদের উপস্থিতি ক্ষণস্থায়ী- আঁধারের মহাসাগরে আলোর ক্ষণিক ঝলকের মত। অথবা হয়তো আমরা এখানে টিকে থাকতেই এসেছি; আমাদের কুপ্রবৃত্তি এবং প্রাচীন ঘৃণার উর্ধে উঠে হয়তো একদিন ছায়াপথে বিচরণকারী প্রজাতিতে পরিণত হতে পারবো। হয়তো একদিন আমরা অন্যদেরও পেয়ে যেতে পারি। হয়তো মিলিত হতে পারি দূরের অতি উন্নত সভ্যতার কারো সাথে- সেগান যেভাবে হয়তো বলতেন, প্রাচীন কারো সাথে।

Monday, August 21, 2017

অন্য যে জগত হাতছানি দেয়



মূল রচনা The Other World That Beckons
লেখক— কার্ল সেগান
“কর্তৃত্বের প্রতি আমার অবজ্ঞার কারণে আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নিয়তি খোদ আমাকেই কর্তৃত্বে পরিণত করেছে।” —আইনস্টাইন

আলবার্ট আইনস্টাইন ঠিক এক শতাব্দী আগে ১৮৭৯ সালে জার্মানির উল্‌মে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যে কোনো কালের অল্প সংখ্যক প্রতিভাধর মানুষের মধ্যে অন্যতম যিনি গতানুগতিক বিজ্ঞতার প্রতি নিগূঢ় আপত্তি জানানোর জন্য পুরাতন জিনিসকে নতুন করে হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমে বিশ্বকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। বহু দশক ধরে তিনি ছিলেন একজন সাত্ত্বিক ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, একমাত্র বিজ্ঞানী যার নাম সাধারণত মানুষ তৎক্ষণাৎ বলতে পারতো। কিছু মাত্রায় অন্তত অস্পষ্টভাবে হলেও জনসাধারণের দ্বারা তাঁর বৈজ্ঞানিক দক্ষতাকে উপলব্ধি করার কারণে; কিছু মাত্রায় সামাজিক বিষয়ে তাঁর সাহসিকতাপূর্ণ অবস্থানের কারণে; এবং কিছু মাত্রায় সাত্ত্বিক ব্যক্তিত্বের কারণে আইনস্টাইন সারা বিশ্ব জুড়ে প্রশংসিত ও সম্মানিত হয়েছেন। অভিবাসী বাবা-মায়ের বিজ্ঞানানুরাগী সন্তান হিসেবে, কিংবা আমার মতোই মহামন্দার সময়ে বেড়ে ওঠা আইনস্টাইনের অর্জিত শ্রদ্ধা প্রমাণ করে যে, এমন বিজ্ঞানীর জন্য বৈজ্ঞানিক পেশা একেবারে আশাতীত ছিলো না। একজন বৈজ্ঞানিক রোল মডেল হিসেবে তিনি অবচেতনভাবে একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আইনস্টাইন না থাকলে ১৯২০ সালের পরবর্তী সময়ের নবীন বিজ্ঞানীরা হয়ত বৈজ্ঞানিক কর্মোদ্যোগের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতেই পারতেন না। আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের যুক্তি
আরো একশ বছর আগে বিকশিত হতে পারতো; কিন্তু অনেকের পূর্বাভাসসূচক অন্তর্দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও আপেক্ষিকতাবাদকে আইনস্টাইনের জন্য প্রতীক্ষায় থাকতে হয়েছে। তথাপি বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের পদার্থবিদ্যা মৌলিকভাবে খুবই সহজ; আর দরকারী ফলাফলের অনেকগুলো হাই স্কুলের বীজগণিত দিয়ে এবং স্রোতের অনুকূলে ও প্রতিকূলে নৌকার বৈঠা চালানোর গণনা থেকে প্রতিপাদন করা যায়। প্রতিভা ও শ্লেষ, তাঁর সময়ের বিচার্য বিষয়ের প্রতি অনুরাগ, শিক্ষার প্রতি সম্যক দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীতির মধ্যে সংযোগ এবং মোটের ওপর ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পারার দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে আইনস্টাইনের জীবন পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।

শৈশবে আইনস্টাইন তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অল্পই আভাস দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছেন,
“আমার বাবা-মা চিন্তিত ছিলেন কারণ আমি তুলনামূলভাবে দেরিতে কথা বলতে শুরু করেছিলাম, এবং এ জন্য তাঁরা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। আমার বয়স তখন কম করে হলেও তিন তো হবেই!”

তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাঝারি মানের ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের কথা স্মরণ করলে ড্রিল সার্জেন্টদের কথা মনে পড়ে যেতো তাঁর। আইনস্টাইনের যৌবনকালে বাগাড়ম্বরপূর্ণ জাতীয়তাবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনমনীয়তা ছিলো ইউরোপীয় শিক্ষার পরিচায়ক। তিনি শিক্ষার প্রাণহীন, যান্ত্রিক পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিলেন। “মুখস্থ করে বকবক করার চেয়ে আমি সব ধরনের শাস্তি সহ্য করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম।” আইনস্টাইন সবসময় শিক্ষায়, বিজ্ঞানে ও রাজনীতিতে কঠোর নিয়মানুবর্তী লোকদের দারুণ অপছন্দ করতেন। পাঁচ বছর বয়সে তিনি একটি কম্পাসের রহস্য দ্বারা আলোড়িত হয়েছিলেন। পরে তিনি আরো লিখেছিলেন,
“১২ বছর বয়সে আমি ইউক্লিডীয় সমতল জ্যামিতির একটি ছোট বইতে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দ্বিতীয় বিস্ময়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম…এখানে কিছু প্রমাণ ছিলো, যেমন কোনো একটি ত্রিভুজের লম্বত্রয়ের একটি বিন্দুতে প্রতিচ্ছেদ সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চয়তার সাথে প্রমাণ করা যায়, যদিও এটি কোনোমতেই দৃষ্টিলব্ধ হয় না। এই স্বচ্ছতা ও নিশ্চয়তা আমার ওপর অবর্ণনীয় প্রভাব ফেলেছিলো।”

আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদান এমন গভীর চিন্তায় কেবল অসন্তোষজনক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলো। আইনস্টাইন তাঁর স্বশিক্ষা সম্বন্ধে লিখেছেন,
“১২ থেকে ১৬ বছর বয়সে আমি ডিফারেন্সিশাল ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসের মূলনীতিসহ গণিতের উপাদানগুলোর সাথে নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলেছিলাম। এটি করতে গিয়ে আমার সেসব বই খোঁজার সৌভাগ্য হয়েছিলো যেগুলো কেবল যৌক্তিক কাঠিন্যে খুব যথাযথ ছিলো না, তথাপি মূল চিন্তাগুলোকে পরিষ্কারভাবে ও সারাংশরূপে প্রকাশ করার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়েছে…চমৎকার নন্দিত বর্ণনায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সমগ্র ক্ষেত্রের দরকারী ফলাফল ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানার সৌভাগ্যও আমার হয়েছিলো, যেগুলো প্রায় গুণগত দৃষ্টিভঙ্গির সর্বত্র জুড়ে সীমাবদ্ধ…এই কাজ আমি রুদ্ধশ্বাস মনোযোগ সহকারে পড়েছিলাম।”

অধুনা বিজ্ঞানের জনপ্রিয়কারীরা স্বস্তি পেতে পারেন। আইনস্টাইনের কোনো শিক্ষক তাঁর প্রতিভাকে ঠাহর করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। মিউনিখ শহরের নেতৃস্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মিউনিখ জিমনেসিয়ামের এক শিক্ষক তাঁকে বলেছিলেন, “তুমি কখনোই কোনো কিছুকে পূর্ণতা দিতে পারবে না, আইনস্টাইন।” আইনস্টাইনের বয়স যখন ১৫ বছর তখন এক শিক্ষক তাঁকে স্কুল ছাড়ার জন্য জোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই শিক্ষক মন্তব্য করেছিলেন, “তোমার উপস্থিতি আমার প্রতি ক্লাসের সম্মানকে নষ্ট করে দেয়।” আইনস্টাইন এই পরামর্শকে সাগ্রহে গ্রহণ করে ইতালির উত্তরাঞ্চলে কয়েক মাস উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন।

পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আইনস্টাইনের কৌতূহল ও নৈসর্গিক মহাবিশ্ব নিয়ে তাঁর বিস্ময় দ্রুতই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণাকে পরাস্ত করে এবং মাধ্যমিক স্কুলের ডিপ্লোমা ছাড়াই সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফেডারেল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। ভর্তি পরীক্ষায় তিনি অকৃতকার্য হয়েছিলেন। ফলে তাঁর ঘাটতি মেটাবার জন্য তিনি একটি সুইস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তালিকাভুক্ত হন এবং পরের বছর ফেডারেল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। কিন্তু তখনও তিনি মাঝারি মানের ছাত্র ছিলেন। নির্দেশিত পাঠ্যক্রমে তিনি বিরক্ত হয়ে যেতেন ও নিজের প্রকৃত কৌতূহল চরিতার্থ করার জন্য লেকচার রুম এড়িয়ে চলতেন। তিনি পরে লিখেছেন, “স্বভাবত এখানে বাধা ছিলো, পছন্দ করলে কিংবা না করলেও পরীক্ষার জন্য এই সমস্ত জিনিস মুখস্থ করতে হতো।”

তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মার্সেল গ্রসম্যান একাগ্র হয়ে ক্লাসে হাজির থাকতেন এবং আইনস্টাইনের সাথে নোট শেয়ার করতেন যে কারণে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। বহু বছর পরে গ্রসম্যানের মৃত্যুতে আইনস্টাইন লিখেছেন,
“আমাদের ছাত্র জীবনের কথা আমার মনে পড়ে। সে ছিলো নিখুঁত ছাত্র, আমি ছিলাম অগোছালো ও স্বাপ্নিক। শিক্ষকদের সাথে সখ্যতা ও সব কিছুর বোঝাপড়ায় সে ছিলো ভালো, আমি ছিলাম অন্ত্যজ, অতৃপ্ত ও অল্প প্রিয়। …তারপর আমাদের পড়াশোনার শেষে– জীবনের প্রারম্ভে খেই হারিয়ে ফেলে হঠাৎ সবার কাছে আমি অপাঙক্তেয় হয়ে গেলাম।”

গ্রসম্যানের নোটে গভীরভাবে মনোনিবেশ করে আইনস্টাইন কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ফাইনাল পরীক্ষার পড়াশোনার
“এমন একটি ভীতিকর প্রভাব আমার ওপর ছিলো যে…পুরো এক বছর ধরে কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যার চিন্তাকে আমার কাছে অরুচিকর মনে হতো। …শিক্ষাদানের আধুনিক পদ্ধতি যে ইতোমধ্যে অনুসন্ধানের পবিত্র কৌতূহলকে পুরোপুরিভাবে স্তব্ধ করে দেয়নি সেটা অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, কারণ প্রারম্ভিক উদ্দীপনা বাদেও এই পলকা ছোট্ট গাছটির জন্য দরকারি স্বাধীনতা ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। …আমি বিশ্বাস করি, ক্ষুধার্ত থাকুক কিংবা না থাকুক, একটি স্বাস্থ্যবান শিকারী পশুকে চাবুক মেরে বিরামহীনভাবে খেতে বাধ্য করা গেলে তাকে তার লোভ থেকে বঞ্চিত করা যায়।”

আমরা যারা বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষায় নিয়োজিত আছি, তাঁর এই মন্তব্য তাদের ভাবনার খোরাক যোগায়। পাঠ্যক্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা জোর করে গেলানোর মাধ্যমে কত প্রতিভাধর আইনস্টাইনকে যে স্থায়ীভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে তা ভেবে আমি অবাক হয়ে যাই।

নৈমিত্তিক কাজ করে নিজের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে এবং আকাঙ্ক্ষিত পদগুলোতে উপেক্ষিত হবার পর মার্সেল গ্রসম্যানের বাবার হস্তক্ষেপে আইনস্টাইন বার্নে অবস্থিত সুইস পেটেন্ট অফিসে আবেদনপত্রের পরীক্ষক হবার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। প্রায় একই সময়ে তিনি তাঁর জার্মান জাতীয়তা ত্যাগ করে সুইস নাগরিক হন। তিন বছর পর ১৯০৩ সালে তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রেমিকাকে বিয়ে করেন।

তাঁর অন্যতম জীবনীকার ব্যানেশ হফম্যান লিখেছেন, পেটেন্ট অফিসে আইনস্টাইন “তাঁর দৈনন্দিন কাজগুলো দ্রুত দক্ষতার সাথে শিখেছিলেন যার ফলে তিনি তাঁর নিজের গোপনীয় হিসাবের জন্য মূল্যবান কিছু সময় বের করতে পেরেছিলেন, যা পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলে তিনি অপরাধীর মতো ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখতেন।” এমনই ছিলো মহান আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের জন্মকে ঘিরে পারিপার্শ্বিক অবস্থা। কিন্তু আইনস্টাইন পরবর্তীতে স্মৃতিকাতর হয়ে বলেছেন, পেটেন্ট অফিসটি “সেই নির্জন সাংসারিক স্থান যেখানে আমি আমার সবচেয়ে সুন্দর ধারণাগুলোকে সৃষ্টি করেছিলাম।” তিনি তাঁর সহকর্মীদের অনেকবার বলেছেন যে, একজন বিজ্ঞানীর জন্য বাতিঘর রক্ষকের পেশা একটি উপযুক্ত স্থান হতে পারে কারণ কাজটি তুলনামূলকভাবে সহজ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় গভীর চিন্তার সুযোগ করে দিতে সক্ষম। তাঁর সহকর্মী লিওপোল্ড ইনফেল্ড বলেছেন,
“একাকীত্ব, বাতিঘরের জীবন আইনস্টাইনের জন্য সবচেয়ে উদ্দীপনাময় হতো যা তাঁকে অনেক বিরক্তিকর দায়িত্ব মুক্তি দিতে পারতো। আসলে এটিই হতো তাঁর জন্য আদর্শ জীবন। কিন্তু প্রায় প্রত্যেক বিজ্ঞানী এর বিপরীতটা চিন্তা করেন। এটি আমার জীবনের অভিশাপ যে দীর্ঘ সময় ধরে আমি বৈজ্ঞানিক হালচালে ছিলাম না, পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে কথা বলার মতো কাউকে আমি পাইনি।”

আইনস্টাইন এও বিশ্বাস করতেন যে, পদার্থবিজ্ঞান পড়িয়ে টাকা কামানোর মধ্যে অসাধুতা আছে। তিনি যুক্তি সহকারে বলেছেন, অন্য কোনো সাধারণ ও সৎ শ্রমের মাধ্যমে নিজের ভরণপোষণ করা এবং অবসর সময়ে পদার্থবিজ্ঞান চর্চা করা একজন পদার্থবিজ্ঞানীর জন্য ঢের ভালো। অনেক বছর পরে আমেরিকায় একই কথা বলার সময় আইনস্টাইন আনমনা হয়ে বলেছিলেন, তিনি প্লাম্বার হতে পছন্দ করতেন এবং অনতিবিলম্বে প্লাম্বার ইউনিয়নের সাম্মানিক সদস্যের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন।

সুইস পেটেন্ট অফিসে তাঁর অবসর সময়ের কাজের ফসল হিসেবে আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে জার্মানির নেতৃস্থানীয় পদার্থবিজ্ঞান সাময়িকী Annalen der Physik এ চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। প্রথমটিতে প্রমাণ করা হয়েছে যে আলোর কণার পাশাপাশি তরঙ্গ ধর্ম আছে, এবং আগেকার বিভ্রান্তিকর আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা করা হয়েছে যেখানে কঠিন পদার্থ আলো দ্বারা উদ্ভাসিত হলে তা থেকে ইলেকট্রন নিঃসৃত হয়। দ্বিতীয়টিতে বাধাপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রাকৃতি কণার সাংখ্যিক “ব্রাউনীয় গতি” ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে অণুর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থটিতে বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়েছিলো বিখ্যাত E=mc2 সমীকরণ যা খুব সচরাচর উদ্ধৃত হয় ও খুব কমই উপলব্ধ হয়।

এই সমীকরণ প্রকাশ করে যে পদার্থকে শক্তিতে ও বিপরীতভাবে শক্তিকে পদার্থে রূপান্তরিত করা যায়। শক্তি ও ভরকে কখনো সৃষ্টি ও ধ্বংস করা যায় না— যদিও শক্তি অথবা পদার্থের এক রূপকে অন্য রূপে রূপান্তরিত করা যায়, যাকে বিবৃত করার মাধ্যমে এটি শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতিকে শক্তি ও ভরের সংরক্ষণশীলতা নীতিতে বিস্তৃত করা যায়। এই সমীকরণে শক্তি E হলো ভর m এর সমানুপাতিক। আদর্শ পরিস্থিতিতে ভর m থেকে mc পরিমাণ শক্তি নিষ্কাশিত করা যায়, যেখানে c হলো আলোর বেগ যা প্রতি সেকেন্ডে ৩০ বিলিয়ন সেন্টিমিটার। আলোর বেগকে কখনো বড় হাতের অক্ষর দিয়ে প্রকাশ না করে ছোট হাতের c দিয়ে প্রকাশ করা হয়। m-কে গ্রাম ও c-কে সেন্টিমিটার/সেকেন্ড দ্বারা পরিমাপ করা হলে E-কে শক্তির একক erg দ্বারা পরিমাপ করা হয়ে থাকে। এক গ্রাম ভরকে সম্পূর্ণরূপে erg-তে রূপান্তর করলে দাঁড়ায় 1 x (3 x 1010)2 = 9 x 1020 ergs যা মোটামুটিভাবে এক হাজার টন টিএনটি (TNT)-র বিস্ফোরণের সমতুল্য। এভাবে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ পদার্থে বিপুল শক্তি মজুদ থাকে, যদি শক্তি নিষ্কাশন করার উপায় আমাদের জানা থাকে। পারমাণবিক অস্ত্র ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে আইনস্টাইনের দেখানো শক্তিকে নিষ্কাশিত করার উদ্দেশ্যে আমাদের দ্বিধাগ্রস্ত ও নীতিগতভাবে সন্দিগ্ধ প্রচেষ্টার সাধারণ পার্থিব দৃষ্টান্ত। একটি তাপ-পারমাণবিক অস্ত্র তথা একটি হাইড্রোজেন বোমা, m ভরের হাইড্রোজেন থেকে এক শতাংশেরও কম mc2 নিষ্কাশন করতে সক্ষম।

১৯০৫ সালে প্রকাশিত আইনস্টাইনের চারটি গবেষণাপত্র একজন পদার্থবিজ্ঞানীর সারা জীবনের পুরো গবেষণাকর্মের চিত্তাকর্ষক ফসল। ২৬ বছর বয়সের একজন সুইস পেটেন্ট কেরানির এক বছরব্যাপী অতিরিক্ত সময়ের কাজ হিসেবে এটি সত্যি বিস্ময়কর। বিজ্ঞানের অনেক ইতিহাসবিদ ১৯০৫ সালকে annus mirabilis বা অলৌকিক বছর হিসেবে অভিহিত করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর আগে কেবল এমন আরেকটি বছর ছিলো: ১৬৬৬ সাল যখন ২৪ বছর বয়সী আইজ্যাক নিউটন বাধ্য হয়ে গ্রামে অন্তরীণ (বুবোনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাবের কারণে) থেকে সূর্যালোকের বর্ণালীগত (spectral) প্রকৃতির ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন, ডিফারেন্সিয়াল ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন এবং মাধ্যাকর্ষণের সর্বজনীন তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছিলেন। ১৯১৫ সালে প্রথমবারের মতো সূত্রবদ্ধ হওয়া সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব এবং ১৯০৫ সালের গবেষণাপত্রগুলো আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক জীবনের প্রধান কাজকে চিত্রিত করে। আইনস্টাইনের আগে পদার্থবিজ্ঞানীরা সাধারণত বিশেষ সুবিধাজনক প্রসঙ্গ কাঠামো (frames of reference), যেমন পরম স্থান ও পরম কালের উপস্থিতিকে ধরে নিতেন। আইনস্টাইনের শুরুটা ছিলো যে, সকল প্রসঙ্গ কাঠামো—স্থান, গতি ও ত্বরণ নির্বিশেষে সকল পর্যবেক্ষক—একই ভাবে প্রকৃতির মৌলিক নীতিগুলো মেনে চলবে। প্রসঙ্গ কাঠামো নিয়ে আইনস্টাইনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্ভবত ১৯ শতকের শেষ দিকে জার্মানিতে সোচ্চার জাতীয়তাবাদ ও উগ্র দেশপ্রেমের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক মনোভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বলে মনে হয়। আপেক্ষিকতাবাদ সেই অর্থে বহুল ব্যবহৃত নৃ-তাত্ত্বিক পরিভাষায় পরিণত হয়েছে এবং সমাজবিজ্ঞানীরা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের ধারণাকে গ্রহণ করেছেন: বিভিন্ন মানব সমাজ দ্বারা প্রকাশিত বিবিধ সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্ববীক্ষা, নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসন বিদ্যমান আছে এবং এগুলোর তুলনীয় ন্যায্যতা আছে।

প্রথম দিকে বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বকে প্রশ্নাতীতভাবে সাধারণত স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। আইনস্টাইন তাঁর কাজের প্রমাণ হিসেবে ইতিপূর্বে প্রকাশিত আপেক্ষিকতাবাদের গবেষণাপত্রটি সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দিয়ে আরো একবার শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করার চেষ্টা চালান। তিনি একে স্পষ্টভাবে একটি সার্থক গবেষণা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। একে দুর্বোধ্য বলে অগ্রাহ্য করা হয় এবং আইনস্টাইন ১৯০৯ সাল পর্যন্ত পেটেন্ট অফিসে কর্মরত থাকেন। কিন্তু তাঁর প্রকাশিত কাজগুলো আর অগোচরে থাকেনি। আইনস্টাইন সর্বকালের অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞানী হতে পারেন এমন সম্ভাবনার কথা কয়েকজন ইউরোপীয় পদার্থবিজ্ঞানী ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলেন। এরপরও আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে তাঁর কাজ বিতর্কিত ছিলো। একজন নেতৃস্থানীয় জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী একটি চিঠিতে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পদে আইনস্টাইনের জন্য সুপারিশ করতে গিয়ে তাঁকে সত্যিকারের একজন উৎকৃষ্ট চিন্তাবিদ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, যদিও তিনি আপেক্ষিকতাবাদকে একটি প্রকল্পিত প্রমোদ ও ক্ষণিকের বিকার হিসেবে ইঙ্গিত করেছিলেন। (১৯২১ সালে প্রাচ্য ভ্রমণের সময় আইনস্টাইন আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ার ওপর লিখিত গবেষণাপত্র ও তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে অন্যান্য অবদানের জন্য তাঁর নোবেল প্রাপ্তির সংবাদ জানতে পারেন। তখনও আপেক্ষিকতাবাদকে এত বিতর্কিত মনে করা হতো যে একে বিশদভাবে উল্লেখ করা হতো না।)

ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে আইনস্টাইনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাঁর বাবা-মা জাতিতে ইহুদী হলেও ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতেন না। “ঐতিহ্যগত শিক্ষাযন্ত্র, রাষ্ট্র ও স্কুলের মাধ্যমে” আইনস্টাইন প্রথমে গতানুগতিক ধার্মিকতার সংস্পর্শে এসেছিলেন। তবে ১২ বছর বয়সে এর আকস্মিক সমাপ্তি  ঘটেছিলো:
“জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক বইগুলো পড়ে আমি অচিরেই বুঝতে পারলাম যে বাইবেলের অনেক গল্প  সত্য হতে পারে না। মিথ্যার মাধ্যমে রাষ্ট্র কর্তৃক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুবকদেরকে প্রতারিত করার প্রভাবের পাশাপাশি নির্দিষ্টরূপে উগ্র যুক্তিবাদ ছিলো এর পরিণাম; এটি ছিলো এক হৃদয়বিদারক অনুভূতি। এই অভিজ্ঞতা থেকে সব ধরনের কর্তৃত্বের প্রতি সন্দেহ, যেকোনো সামাজিক পরিবেশে ক্রিয়াশীল বিশ্বাসের প্রতি এক ধরনের সংশয়ী মনোভাব গড়ে ওঠেছিলো—এই মনোভাব আর কখনো আমি ত্যাগ করিনি, যদিও পরে কার্যকারণ সংযোগের প্রতি আরো ভালো সূক্ষ্ম দৃষ্টির দরুন এর কিছু আসল তীব্রতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হবার ঠিক পূর্বে আইনস্টাইন বার্লিনস্থ সুবিখ্যাত কাইজার উইলহেলম ইনস্টিটিউটে প্রফেসরশিপের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। জার্মান সামরিকতন্ত্রের প্রতি বিরাগের তুলনায় তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের নেতৃস্থানীয় কেন্দ্রস্থলে থাকার অভিপ্রায় অল্প সময়ের জন্য আইনস্টাইনের মধ্যে প্রবলতর ছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামায় আইনস্টাইনের স্ত্রী ও দুই পুত্র সুইজারল্যান্ডে আটকা পড়ে যান, তাঁরা জার্মানিতে ফিরতে পারেননি। এই বাধ্যতামূলক বিচ্ছেদ কয়েক বছর পর তাদেরকে বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যায়; পুনরায় বিয়ে করার পরও আইনস্টাইন ১৯২১ সালে প্রাপ্ত নোবেল পুরস্কারের পুরো ৫০,০০০ মার্কিন ডলার তাঁর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের দান করেন। তাঁর প্রথম পুত্র পরবর্তীতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন; দ্বিতীয় পুত্র আইনস্টাইনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন কিন্তু ছোটকালে ত্যাগ করার কারণে পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁকে দোষারোপ করে নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছেন।

নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলে পরিচয় প্রদানকারী আইনস্টাইন বুঝতে পারেন যে “শাসকশ্রেণী”র কুচক্রীপনা ও অযোগ্যতাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য বহুলাংশে দায়ী। অনেক সমকালীন ইতিহাসবিদ এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করে থাকেন। অন্য জার্মান বিজ্ঞানীরা যখন তাদের দেশের সামরিক অভিযানকে সল্লোসে সমর্থন করেছিলেন তখন আইনস্টাইন শান্তিবাদের পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। আইনস্টাইন যুদ্ধকে “একটি মহামারী মোহ” হিসেবে অভিহিত করে প্রকাশ্যে এর নিন্দা করেন। শুধুমাত্র সুইস নাগরিকত্ব থাকার কারণে তিনি কারাবরণ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু একই সময়ে ও একই কারণে তাঁর বন্ধু দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলকে ইংল্যান্ডে কারাবরণ করতে হয়েছিলো। যুদ্ধ সম্পর্কে আইনস্টাইনের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জার্মানিতে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়নি।

যা-ই হোক, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরোক্ষভাবে আইনস্টাইনের নামকে অধিক পরিচিত করে তুলতে ভূমিকা রাখে। সারল্য, সৌন্দর্য ও শক্তিতে বিস্ময়জাগানিয়া সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে আইনস্টাইন এই প্রস্তাবের (proposition) বিশ্লেষণ করেছেন যে, দুটি ভরের নিকটবর্তী সাধারণ ইউক্লিডীয় স্থানের বিকৃতি সাধন ও বক্রীকরণের মাধ্যমে তাদের মধ্যে মহাকর্ষজনিত আকর্ষণ ঘটে থাকে। যে সঠিকতার মাধ্যমে এই পরিমাণগত তত্ত্বটি পরীক্ষা করা হয়েছিলো, তার মাধ্যমে এটি নিউটনের সর্বজনীন মহাকর্ষ সূত্রকে পুনর্গঠন করেছিলো। কিন্তু পরবর্তী দশমিক স্থানে, নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিউটনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য অনুমান করেছিলো। বিজ্ঞানের ধ্রুপদী ঐতিহ্যে নতুন তত্ত্বগুলো পুরাতনগুলোর দ্বারা প্রমাণিত ফলাফলকে বজায় রাখে কিন্তু এক গুচ্ছ নতুন ভবিষ্যদ্বাণী করার মাধ্যমে দুটো দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি নিষ্পত্তিমূলক পার্থক্য নির্দেশ করে। আইনস্টাইনের প্রস্তাবিত সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তিনটি পরীক্ষায় জড়িত ছিলো বুধ গ্রহের কক্ষপথের ঘূর্ণনে পূর্বের অনুসূর হতে গ্রহটির কৌণিক দূরত্ব, একটি বিশাল নক্ষত্রের বর্ণালী রেখার লোহিত অপসারণ (red shift), এবং সূর্যের নিকটবর্তী স্থানে নক্ষত্রের আলোর বেঁকে গিয়ে ভিন্ন পথে গমন। ১৯১৮ সালে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হবার আগে ব্রাজিলে ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে প্রিন্সিপ দ্বীপে পূর্ণ গ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী নক্ষত্রের আলো ভিন্ন পথে সরে যায় কিনা তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি ব্রিটিশ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিলো। নক্ষত্রের আলো ভিন্ন পথে সরে গিয়েছিলো; আইনস্টাইনের দৃষ্টিভঙ্গি সত্য প্রমাণিত হয়েছিলো। দুটি দেশ যখন অদ্যাবধি যুদ্ধরত অবস্থায় ছিলো তখন একজন জার্মান বিজ্ঞানীর কাজের সত্যতা প্রমাণের জন্য ব্রিটিশ অভিযানের প্রতীকতা জনসাধারণের শ্রেয়তর প্রবৃত্তিকে নাড়া দিয়েছিলো।

তবে একই সময়ে আইনস্টাইনের বিরুদ্ধে জার্মানিতে প্রচুর অর্থায়নে একটি গণ-প্রচারাভিযান শুরু হয়। আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বকে বর্জন করার জন্য বার্লিন ও অন্যান্য স্থানে ইহুদী-বিরোধী গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। আইনস্টাইনের সহকর্মীরা এতে অবাক হন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই রাজনীতিতে এত ভীরু ছিলেন যে এই প্রচারাভিযানের বিরোধিতা করার সাহস তাদের ছিলো না। ১৯২০ এর দশকে ও ১৯৩০ এর দশকের শুরুতে নাৎসীদের উত্থানের সময় আইনস্টাইন গভীর চিন্তার প্রতি তাঁর স্বভাবগত ঝোঁক থেকে বের হয়ে এসে প্রায়ই সাহসিকতার সাথে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলতে শুরু করেন। তিনি জার্মান আদালতে বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। জার্মানিতে ও এর বাইরের রাজনৈতিক বন্দীদের (সাক্কো ও ভিজনেত্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্কটসবরো “বয়েজ” সহ) ক্ষমা প্রদানের জন্য তিনি আবেদন জানান। ১৯৩৩ সালে হিটলার চ্যান্সেলর হবার পর আইনস্টাইন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে সাথে নিয়ে জার্মানি ছেড়ে চলে যান।

নাৎসীরা আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক কাজ ও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লেখকদের অন্যান্য বই জনসমক্ষে আগুন পুড়িয়ে ফেলে। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক কীর্তির ওপর আক্রমণ চালানো হয়। এই আক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফিলিপ লেনার্ড যিনি তাঁর ভাষায় “আইনস্টাইনের গাণিতিকভাবে তালগোল পাকানো তত্ত্ব” এবং “বিজ্ঞানের এশীয় চেতনা”কে বর্জন করেছেন। তিনি আরো বলেছেন,
“আমাদের ফুয়েরার রাজনীতি ও জাতীয় অর্থনীতিতে এই একই চেতনাকে পরিহার করেছেন যা মার্ক্সবাদ নামে পরিচিত। এরপরও, আইনস্টাইনের ওপর অত্যধিক জোর আরোপ করার কারণে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে এই প্রভাব এখনো বজায় আছে। আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে একজন ইহুদীর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসারী হওয়া একজন জার্মানের জন্য অশোভনীয় ব্যাপার। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, যথাযথভাবে বললে, সম্পূর্ণরূপে আর্য-উদ্ভূত।… হাইল হিটলার!”

আইনস্টাইনের “ইহুদী” ও “বলশেভিক পদার্থবিজ্ঞান”-এর বিরোধিতায় অনেক নাৎসী স্কলার যোগ দেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রায় একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিখ্যাত স্টালিনবাদী বুদ্ধিজীবীরা আপেক্ষিকতাবাদকে “বুর্জোয়া পদার্থবিজ্ঞান” হিসেবে অভিহিত করে একে বর্জন করেন।

আইনস্টাইনের নিজের ইহুদী পরিচয়টি, ঐতিহ্যগত ধর্ম থেকে তাঁর অন্তর্নিহিত বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও, ১৯২০ এর দশকে জার্মানিতে ইহুদী-বিরোধী ডামাডোলের কারণে সামনে চলে আসে। এই কারণে তিনিও জায়নবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনীকার ফিলিপ ফ্রাঙ্কের মতে, সকল জায়নবাদী দল আইনস্টাইনকে স্বাগত জানায়নি কারণ তিনি বিজড়িত জটিল আবেগময় বিষয়ের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের প্রতি অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী অনুরাগ হিসেবে– আরবদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে ও তাদের জীবনধারাকে বুঝার জন্য ইহুদীদের প্রচেষ্টার দাবি করেছিলেন। যাই হোক, জায়নবাদের প্রতি তিনি তাঁর সমর্থন অব্যাহত রাখেন, বিশেষ করে ১৯৩০ এর দশকে যখন ইউরোপীয় ইহুদীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্রোধ গোচরীভূত হতে শুরু করে। (১৯৪৮ সালে আইনস্টাইনকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হবার প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন।)

জার্মানি ছাড়ার পর আইনস্টাইন জানতে পারেন যে নাৎসীরা তাঁর মাথার মূল্য ২০,০০০ মার্ক নির্ধারণ করেছে। (“এর দাম যে এত বেশি তা আমার জানা ছিলো না।”) তিনি নিউ জার্সির প্রিন্সটনে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন যেখানে তিনি তাঁর বাকি জীবন অতিবাহিত করেন। কাঙ্ক্ষিত পারিশ্রমিকের পরিমাণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ৩,০০০ মার্কিন ডলারের প্রস্তাব দেন। ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধির মুখে বিস্ময়ের ছাপ দেখে তিনি ভেবেছিলেন যে বেশি চেয়ে ফেলেছেন এবং অপেক্ষাকৃত কম টাকার কথা বলেছিলেন। তাঁর পারিশ্রমিক ঠিক হয়েছিলো ১৬,০০০ মার্কিন ডলার, ১৯৩০ এর দশকে যা ছিলো অনেক টাকা।

আইনস্টাইনের মর্যাদা এত ঊর্ধ্বগামী ছিলো যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে সম্ভাব্য জার্মান প্রচেষ্টাকে পেছনে ফেলার জন্য একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার প্রস্তাব দিয়ে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের কাছে চিঠি লেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য দেশান্তরিত ইউরোপীয় পদার্থবিজ্ঞানীরা ১৯৩৯ সালে তাঁর দ্বারস্থ হন। যদিও আইনস্টাইন পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে কাজ করছিলেন না এবং পরবর্তীতে ম্যানহাটন প্রজেক্টে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিলো না, তবুও তিনি প্রারম্ভিক চিঠিটি লিখেছিলেন যা ম্যানহাটন প্রজেক্ট স্থাপনে পথ দেখিয়েছিলো। সম্ভবত, আর যাই হোক, আইনস্টাইনের আহ্বান ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বোমা তৈরি করে ফেলতো। E=mc2 থাকা সত্ত্বেও বেকেরেল কর্তৃক তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার ও রাদারফোর্ড কর্তৃক পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের অনুসন্ধান— এগুলোর কোনোটিই আইনস্টাইনের মুখাপেক্ষী নয়— খুব  সম্ভবতঃ পারমাণবিক অস্ত্র বিকশিত করার পথ বাতলে দিতে পারতো। বহু দিন ধরে আইনস্টাইন নাৎসী জার্মানির যে আতঙ্ক প্রত্যক্ষ করেন, সেই কারণে তিনি দুঃখের সাথে তাঁর শান্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু পরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে নাৎসীদের অসমর্থ হবার কথা জানতে পেরে আইনস্টাইন আক্ষেপের সুরে বলেছেন, “আমি যদি জানতাম জার্মানরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সফল হবে না তাহলে বোমা নিয়ে কিছুই করতাম না।” ১৯৪০ এর দশকের শেষ দিকে ও ১৯৫০ এর দশকের প্রথম দিকে ম্যাককার্থিজমের অন্ধকার সময়ে আইনস্টাইন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক স্বাধীনতার একজন জোরালো সমর্থক ছিলেন। হিস্টেরিয়ার উত্থিত জোয়ার প্রত্যক্ষ করার পর ১৯৩০ সালে জার্মানিতে একই রকম পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করার অনুভূতি তাঁর মনে জেগে উঠেছিলো। তিনি হাউজের আন-আমেরিকান এক্টিভিটিজ কমিটিতে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য সমর্থকদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের “কারাগার ও আর্থিক ক্ষতির জন্য…তাঁর দেশের স্বার্থে…তাঁর ব্যক্তিগত উন্নয়ন বিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।” তিনি মনে করতেন যে “ব্যক্তিবিশেষের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এমন উদ্যোগে সহযোগিতা না করা একটি কর্তব্য। এটি বিশেষত নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সাথে জড়িত সকল তদন্তের ক্ষেত্রে খাটে…” এই অবস্থান নেওয়ার কারণে আইনস্টাইনকে পত্রিকায় ব্যাপক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিলো। আর ১৯৫৩ সালে সিনেটর জোসেফ ম্যাককার্থি এমন উপদেশ প্রদানকারী ব্যক্তিকে “স্বয়ং আমেরিকার শত্রু” অ্যাখ্যায়িত করে বিবৃতি দেন। প্রিন্সটনে অতিবাহিত বছরগুলোতে সবসময়ের মতো মননশীল জীবন নিয়ে আইনস্টাইনের গভীর আসক্তি ছিলো। মহাকর্ষ, বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বকে একটি সাধারণ ভিত্তির ওপর সংযুক্ত করবে এমন একটি সম্মিলিত ক্ষেত্র তত্ত্বের ওপর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রচুর কাজ করেন; তবে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে সচরাচর বিবেচনা করা হয়। তিনি তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বকে সংঘবদ্ধভাবে বড় মাপের কাঠামো ও মহাবিশ্বের বিবর্তনকে বুঝার জন্য প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখে গিয়েছেন, এবং আজকের দিনে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সবল প্রয়োগ দেখতে পেলে আনন্দিত হতেন। তাঁকে যে পরিমাণ শ্রদ্ধার সাথে অধিষ্ঠিত করা হতো তা কখনো তিনি বুঝে উঠতে পারেননি এবং আদপেই অনুযোগ করেছিলেন যে তাঁর সহকর্মীরা ও প্রিন্সটনের গ্র্যাজুয়েট ছাত্ররা তাঁকে বিরক্ত করার ভয়ে আগে থেকে না জানিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে আসতো না।

তবে তিনি লিখেছেন:
“নারী ও পুরুষের সাথে সরাসরি সম্বন্ধের প্রতি আমার ইচ্ছার ঘাটতি চোখে পড়ার মতো হলেও সামাজিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে আমার আবেগপূর্ণ আগ্রহ রয়েছে। আমি একমাত্র সাজ পরিহিত কোনো ঘোড়া নই যাকে ঘোড়ার গাড়ি ও দলগত কাজের জন্য আলাদা করা হয়েছে। আমি কখনো মনেপ্রাণে দেশ বা রাষ্ট্র, আমার বন্ধু মহল এবং এমনকি আমার নিজ পরিবারের অংশ ছিলাম না। এই সকল বন্ধন সবসময় এক ধরনের অস্পষ্ট নিঃসঙ্গতার সংসর্গে আছে, আর নিজের মধ্যে ডুবে থাকার বাসনা দিনকে দিন আরো বেড়েছে। এমন নিঃসঙ্গতা অনেক সময় বেদনাদায়ক মনে হয়, কিন্তু অন্য মানুষের সহানুভূতি ও বোঝাপড়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য আমি আফসোস করি না। এর মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে আমি অনেক কিছু খুঁইয়ে ফেলি, কিন্তু অন্যদের প্রথা, মতামত ও কুসংস্কার থেকে স্বতন্ত্র প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে আমি নিজের ক্ষতি পুষিয়ে নিই এবং এমন পরিবর্তনশীল ভিত্তির উপর আমার মনের শান্তিকে স্থাপন করার জন্য প্রলুব্ধ হই না।”

সারা জীবন জুড়ে তাঁর প্রধান অবসরকালীন বিনোদন ছিলো বেহালা বাজানো ও নৌকায় ভ্রমণ করা। এই বছরগুলোতে আইনস্টাইনকে ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা বুড়ো হিপ্পির মতো দেখাতো। তিনি তাঁর সাদা চুলগুলোকে বেড়ে উঠতে দিয়েছিলেন, আর গণ্যমান্য সাক্ষাতপ্রার্থীদের আতিথ্য প্রদর্শনের সময়ও স্যুট ও টাইয়ের পরিবর্তে সোয়েটার ও লেদার জ্যাকেট পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। পুরোদস্তুরভাবে কোনো রকম ভণ্ডামি ও ভণিতা ছাড়া তিনি কৈফিয়ত দিয়েছেন, “আমি সবার সাথে একই ভাবে কথা বলি, হোক সে ব্যক্তি কোনো ময়লাওয়ালা কিংবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট।” জনসাধারণের কাছে তিনি ছিলেন খোলামেলা, সবসময় সফলতার সাথে না হলেও মাঝেমধ্যে জ্যামিতির সমস্যা নিয়ে হাই স্কুলের ছাত্রদের সাহায্য করার ইচ্ছা পোষণ করতেন।

ধর্মের বিষয়ে আইনস্টাইন অন্য অনেকের চেয়ে বেশি ভেবেছেন এবং বারবার তাঁকে ভুল বুঝা হয়েছে। আমেরিকায় আইনস্টাইনের প্রথম ভ্রমণের সময়ে, বোস্টনের কার্ডিনাল ও’কনেল আপেক্ষিকতাবাদকে “নাস্তিকতার ভয়ানক অপচ্ছায়া” হিসেবে সতর্ক করেন। নিউ ইয়র্কের এক ইহুদী ধর্মগুরু এতে ভীত সতস্ত্র হয়ে আইনস্টাইনকে তারবার্তায় জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?”  আইনস্টাইন তারবার্তায় উত্তর দেন, “আমি স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাস করি যিনি সকল সত্তার ঐকতানে নিজেকে প্রকাশিত করেন। আমি সেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না যিনি মানুষের ভাগ্য ও কর্ম নিয়ে ভাবিত”— এই অধিকতর কৌশলী ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান সময়ের ধর্মতাত্ত্বিকরা গ্রহণ করে থাকেন। আইনস্টাইনের ধর্মবিশ্বাস ছিলো সত্যিকার অর্থে খুবই অকৃত্রিম। ১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার একটি মৌলিক নীতি নিয়ে তিনি গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করেন: তা হলো পদার্থের সবচেয়ে মৌলিক পর্যায়ে কণাগুলো হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে এক প্রকার অনিশ্চিত আচরণ করে। আইনস্টাইন বলেছেন: “ঈশ্বর মহাবিশ্ব নিয়ে পাশা খেলেন না।” আবার অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন, “ঈশ্বর কৌশলী কিন্তু তিনি বিদ্বেষপরায়ণ নন।” প্রসঙ্গত আইনস্টাইন এমন প্রবচনের প্রতি এত অনুরক্ত ছিলেন যে ডেনিশ পদার্থবিজ্ঞানী নীলস বোর একবার তাঁর দিকে ফিরে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, “ঈশ্বর কী করবেন তা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করুন।”

কিন্তু অনেক পদার্থবিজ্ঞানী মনে করতেন যে একমাত্র আইনস্টাইন-ই ঈশ্বরের অভিপ্রায় সম্পর্কে জানেন। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের অন্যতম একটি নীতি হচ্ছে কোনো ভৌত বস্তু আলোর গতিতে এত দ্রুত ভ্রমণ করতে পারে না। আলোর এই প্রতিবন্ধকতা অনেকের মাঝে বিরক্তির উদ্রেক করেছে, যারা মনে করেন যে মানুষের চূড়ান্তভাবে অসাধ্য কিছু নেই। তবে আলোর সীমাবদ্ধতা বিশ্বের অনেক কিছু আমাদের সহজে ও মসৃণভাবে বুঝতে সাহায্য করে যেগুলো আগে রহস্যময় মনে করা হতো। যা-ই হোক, আইনস্টাইন যেখান থেকে নিয়েছেন সেখানে কিছু দিয়েছেনও বটে। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের কতিপয় ফলাফলকে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বিপরীতে স্বজ্ঞাবিরুদ্ধ (counterintuitive) মনে হয় কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে তা খুব সামান্যই উপলব্ধি করা যায়, আলোর কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করা গেলে এগুলো শনাক্তকারী কায়দায় উদ্ভূত হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ফলাফল হচ্ছে আমরা পর্যাপ্তভাবে আলোর গতির যত কাছাকাছি যেতে পারবো ততই আমাদের হাতঘড়ি, আমাদের পারমাণবিক ঘড়ি, আমাদের জৈবিক বার্ধক্য তথা সময় মন্থর হয়ে আসবে। পরিণামস্বরূপ আলোর গতির খুব কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণকারী কোনো মহাকাশযান যেকোনো দুটি স্থানের মাঝে, দূরত্ব যতই হোক, গ্রহ থেকে নয় বরং মহাকাশযান থেকে হিসাব করলে যেকোনো সুবিধাজনক স্বল্প সময়ে ভ্রমণ করতে পারবে। এভাবে আমরা হয়তো কোনো এক সময় মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ভ্রমণ করতে পারি এবং মহাকাশযান থেকে হিসাবকৃত সময় অনুসারে কয়েক দশকের মধ্যে ফেরত আসতে পারি। কিন্তু পৃথিবী থেকে হিসাব করলে অতিবাহিত সময় দাঁড়াবে ৬০ হাজার বছর, আর আমাদের বিদায় জানানো বন্ধুদের মধ্যে খুব কমজনই আমাদের প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিকে স্মরণ করবে।

আইনস্টাইন শেষ জনহিতকর কাজ হিসেবে বার্ট্রান্ড রাসেল এবং অন্য আরো বিজ্ঞানী ও স্কলারদের সাথে যোগ দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিকাশ ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করানোর জন্য বিফল প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্র আমাদের চিন্তাপদ্ধতি ব্যতীত আর সবকিছু পরিবর্তন করেছে। শত্রুতাপূর্ণ রাষ্ট্রে বিভক্ত এই পৃথিবীতে পারমাণবিক অস্ত্রকে তিনি মানবজাতির টিকে থাকার পক্ষে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদ হিসেবে দেখেছেন। “আমাদের বেছে নিতে হবে”, তিনি বলেছেন, “পারমাণবিক হাতিয়ার বর্জন অথবা সর্বজনীন ধ্বংস।… জাতীয়তাবাদ একটি শিশুসুলভ ব্যাধি।… এটি মানবজাতির জন্য ছোঁয়াচে রোগস্বরূপ। আমাদের স্কুলের বইগুলো যুদ্ধকে মহিমান্বিত করে এর ভয়াবহতাকে আড়াল করে রাখে। এগুলো শিশুদের শিরায় শিরায় ঘৃণার আবেশ ছড়ায়। আমি যুদ্ধের চেয়ে বরং শান্তির শিক্ষা দেবো। আমি ঘৃণার চেয়ে বরং ভালোবাসার শিক্ষা দেবো।”

১৯৫৫ সালে মারা যাবার নয় বছর আগে, ৬৭ বছর বয়সে আইনস্টাইন তাঁর সমগ্র জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য সম্বন্ধে বলেছেন, “এই বিশাল বিশ্ব আমাদের মনুষ্য প্রজাতি থেকে স্বাধীনভাবে, অন্ততপক্ষে আংশিকভাবে, আমাদের পরিদর্শন ও চিন্তাশক্তির সাহায্যে উপলব্ধি করার ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে আমাদের সামনে এক বৃহৎ, শাশ্বত প্রহেলিকা হয়ে দৃশ্যমানতার ঊর্ধ্বে তার অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজমান ছিলো। এই বিশ্বকে নিয়ে গভীর ধ্যান এক রকমের মুক্তির হাতছানি দিয়েছে… এই স্বর্গের পথ ধর্মীয় স্বর্গের মতো আরামদায়ক ও প্রলোভনদায়ক ছিলো না; কিন্তু এটি নিজেকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করেছে, আর এটি বেছে নেওয়ার কারণে আমি কখনো আফসোস করিনি।”

উৎস ঃ http://onubadokderadda.com/the_other_world_that_beckons/

Wednesday, June 21, 2017

চারটি মহাজাগতিক প্রশ্ন – কার্ল সেগান (Billions and Billions এর একটি অধ্যায়)



যখন ওপরে কোনো স্বর্গের নামাঙ্কিত হয়নি,
নিম্নের শক্ত ভূমিকেও ডাকা হতো না কোনো নামে,
নলখাগড়ার কোনো কুঁড়েঘর যখন আচ্ছাদিত হয়নি,
যখন কোন ঈশ্বরও আসেননি স্বমূর্তিতে,
নাম দ্বারা অনুল্লেখিত, অনিশ্চিত তাদের গন্তব্য-
তখনই যা অস্তিত্বে এসেছিলো তারাই ঈশ্বর……

– Enuma elish, ব্যাবিলনীয় সৃষ্টি-পুরাণ (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শেষে)*

* “Enuma elish” হচ্ছে সব পুরাণের প্রথম শব্দ গুচ্ছ, অনেকটা বুক অব জেনেসিসে যেমন বলা হয়েছে “In the Beginning”- যেটা আবার গ্রীক শব্দ “genesis” এর কাছাকাছি অর্থ।