Showing posts with label বাংলা ছোট গল্প. Show all posts
Showing posts with label বাংলা ছোট গল্প. Show all posts

Monday, July 1, 2019

ব্যাঘ্র বধের ব্যাপার - হাসান আজিজুল হক


সেবার শীত পড়েছে প্রচণ্ড। এত বেশি ঠাণ্ডা যে সন্ধ্যার পরই নাকের ডগা জমে একেবারে শক্ত হয়ে যায় আর কানদুটো এমন অবশ হয়ে আসে যে ঠেসে কান মলে দিলেও কিছুই টের পাওয়া যায় না। এমনি সময়ে খবর এলো পশ্চিমের শালবনে একটা বিরাট ডোরাকাটা বাঘ এসে আস্তানা জমিয়েছে। বিরাট সেতো বোঝাই যাচ্ছে- কারণ ডোরাকাটা বাঘ তো আর শিয়ালের মতো হয় না। শোনা গেল বাঘটা এসে তিন দিনের মধ্যে সাতটা বাছুর মেরেছে- তার মধ্যে চারটের কোন পাত্তা নেই- নাড়িভুঁড়ি, হাড়গোড়, শিং খুর অর্থাৎ একটা বাছুর হতে গেলে যা যা দরকার হয় তার সবই একদম বিনাশ করে দিয়েছে, কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই। যাদের বাছুর শুধু তারাই বলছে, বাছুরগুলো একদিন পৃথিবীতে বেঁচেছিল। আমার মনে হয় বাঘটা নিজেও এখন আর একথা বিশ্বাস করে না। সত্যি বলতে কি যদি এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়, প্রমাণ করা শক্ত হবে যে বাছুরগুলো আসলে কোনদিন বেঁচে ছিল। তবে বাকি তিনটে বাছুরের কিছু কিছু প্রমাণ মিলেছে, কারো ঠ্যাং কারো শিং বা লেজ পাওয়া গেছে।

এসব কথাকেও আমরা গুজব বলে উড়িয়ে দিতাম। এরকম গল্প প্রায়ই শোনা যায়। বাড়িয়ে বলতে তো সবাই ওস্তাদ। কিন্তু যেদিন মনি পাগলার কান পাওয়া গেল শালবনের একটা খালের ধারে আর সেই কান ধরে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত বেচারার মাথাটাও বিগড়ে যায়।
এই ঘটনার সংবাদ যখন গাঁয়ে এসে পৌঁছল, আমরা তখন মস্তান ভাইয়ের সঙ্গে ইয়ার্কি দিচ্ছিলাম। কথাটা শুনে তিনি কপালের রগ টিপে বসে রইলেন পুরো ছ’মিনিট। ঝলকে ঝলকে রক্ত আসতে লাগল তার মুখে, কান লাল হয়ে উঠল, কপালের দু’পাশের শিরা ফুলে উঠল- চোখ করমচা ফলের বর্ণ ধরলো।
তোদের কি লজ্জা করছে না? মস্তানভাই জিগগেস করলেন। এই ঘটনার পর, মনি পাগলের এই মহান আত্মদানের পরও আমরা চুপচাপ বসে থাকবো?


বাস্তবিক জিনিসটা খুবই লজ্জার- আমরা স্বীকার করলাম। একজন শুধু বলল, কিন্তু বাঘ যে! কথায় বলে সাপের লেখন আর বাঘের দেখন। দেখলেই তো কাবার! আরে বাবা বাঘ তো এক ধরনের বেড়াল। তাছাড়া আবার কি? না হয় একটু বড়ো, ধর অই উদবেড়ালের চাইতে এক আধটু বড়ো- দরান ভাই বললেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ- আমি সায় দিয়ে বললাম, ওদের হাড্ডি তো একেবারে নরম- বন্দুক লাগবে না- লাঠি দিয়ে এক ঘা কষাতে পারলেই ব্যস হয়ে গেল।
না, না, নখ আছে তো! আঁচড়ে টাঁচড়ে দিতে পারে- মস্তান ভাই-ই কথাটা বললেন।
কিন্তু চার চারটে বাছুরের নাকি কোনো পাত্তাই পাওয়া যায়নি-
একজন একটু সন্দেহ প্রকাশ করল।
তার দিকে চেয়ে রইলেন মস্তান ভাই, চেয়েই রইলেন, তারপর আস্তে আস্তে বললেন, বাড়ি যা। এ্যাঁ?
বাড়ি যা। এইসব হয়ে গেলে ঠিক হলো বাঘটাকে কোনরকম দয়া দেখানো চলবে না। ওটাকে মেরে ফেলা হবে- পিছনের ঠ্যাং-এ দড়ি দিয়ে বেঁধে টানতে টানতে গাঁয়ে আনা হবে। তারপর যার যা ইচ্ছা- মারতে পারে, চড় বা ঘুষি চালাতে পারে, গুঁতিয়ে দিতে পারে, তলপেটে লাথি দিতে পারে। চামড়াটা নষ্ট করতে দেওয়া হবে না। কারণ বাঘটার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে মস্তান ভাইয়ের ঘরে তার টানিয়ে সামনে দেয়ালে টানিয়ে রাখা হবে। আমাদের মধ্যে যখন জল্পনা কল্পনা চলছিল, মস্তান ভাই একবার আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, এই ধরনের জাঁক আমরা করতে পারি কিনা। যেমন আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলেন, তুই আজ পর্যন্ত- মানে এই চৌদ্দ বছরের মধ্যে কটা পিঁপড়ে মেরেছিস? আমি ঠিক সংখ্যাটা বলতে পারলাম।


তাহলে চুপ করে থাক। বাঘটাকে আমিই মারব। তারপর ওটাকে নিয়ে কি করা হবে না হবে আমিই ঠিক করব।
একথা বলা অবশ্য মস্তান ভাইয়ের সাজে। কারণ তার নিজের বন্দুক আছে আর আজ পর্যন্ত তাঁকে আমরা কেউ মিস করতে দেখিনি। আর আমি বন্দুক ছুড়েছি ঠিকই, কিন্তু পাখি উড়িয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারিনি। কাজেই মস্তান ভাইয়ের বলার পর আমরা সবাই- প্রায় পনেরো ষোলোজন বিনা দ্বিধায় তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিলাম। বলা যায় তার পতাকাতলে দাঁড়িয়ে গেলাম। ঠিক হলো, সে রাত চারটেয় আমরা বেরোব। বন প্রায় ছ’মাইল দূরে, পশ্চিমে। অন্ধকার থাকতে থাকতেই পৌঁছুতে হবে যাতে কাজ শেষ করে বেলা দশটার মধ্যেই ফিরে আসা যায়।
সব ব্যবস্থা শেষ হয়ে এসেছে, আমরা যে যার বাড়ি যাব যাব করছি এমন সময় খবর পেয়ে এমন চিৎকার করে বসলাম যে মস্তানভাই কানে তালা লেগে সেখানেই আবার ধপ করে বসে পড়লেন।


শীতে হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে সবাই উঠে এসেছি। স্কুলের মধ্যে জমা হয়েছি। আকাশ তখনো অন্ধকার আর ভোরের বাতাসে কনকনে ঠাণ্ডার দাঁত। মস্তান ভাই কোথা থেকে একটা খাঁকি প্যান্ট জোগাড় করেছেন- তার ভেতরে গুঁজে দিয়েছেন পুরনো ময়লা একটা শার্ট- কি রং এর বলা খুব মুশকিল- শাদাও হতে পারে বেগুনিও হতে পারে। শার্টের কলারের কাছে লাল সুতো দিয়ে লেখা মিয়া মস্তান। সব চাইতে মজার ব্যাপার তার মাথায় একটা তোবড়ানো টুপি। জিগগেস করতে বললেন ফেল্ট হ্যাট। টুপিটা মাথায় দিয়ে মুরুব্বিয়ানা চালে যখন তিনি দল গোছাচ্ছিলেন, বড়ো চমৎকার দেখাচ্ছিল তাকে। এক নিমিষে মনপ্রাণ দিয়ে তাকে নেতা বলে মেনে নিলাম।


বাঘ সাধারণত কাপুরুষ- আমদেরকে দাঁড় করিয়ে মস্তান ভাই বক্তৃতা শুরু করলেন, শোনা যায়, তেমন ভয় পেলে সে অনেক সময় কাপড় নষ্ট করে ফেলে। সামনাসামনি সে কোনোদিন মানুষের চোখের দিকে তাকাতে পারে না এমন কি ঠিকমত তার চোখের দিকে চোখ রেখে চেয়ে থাকতে পারলে বাঘের সমস্ত অঙ্গ আস্তে আস্তে অবশ হয়ে যায়। তবে এ সবই শোনা কথা- ঠিকমত বিশ্বাস করা কঠিন। আমাদের ধরে নিতে হবে বাঘ অতি দুর্ধর্ষ প্রাণী। সে পিছন থেকে লাফিয়ে পড়তে পারে, ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারে ঝোপের মধ্যে সে আমাদের চিৎকার করে ভয় পাইয়ে দেবার চেষ্টা করতে পারে। অত্যন্ত শীত বলে আমি আর কিছু বলতে চাই না। যদি বাঘ সম্বন্ধে আর কারো কিছু জানা থাকে- তবে এসে বলতে পারে। ক্লাশ নাইনে পড়ে রাহা লাইন থেকে বেরিয়ে গিয়ে বলল, মস্তান দাদা বলছেন বলে বলছি। বাঘ সম্বন্ধে আমি বিশেষ কিছু জানি না। তবে আমাদের রচনা বই-এ পড়েছি যে বাঘ বিড়াল জাতীয় একরকম জানোয়ার।


তবে একটু বড়ো। তার বড়ো বড়ো নখ আছে- ইচ্ছে করলে সেগুলো গুটিয়ে নিতে পারে- এই পর্যন্ত বলতেই মস্তান ভাই খেঁকিয়ে উঠলেন, মুখস্থ বলিস তোর মাস্টারের কাছে- আসল কিছু জানিস তো বল। রাহা বলল, বাঘ মাংসাশী প্রাণী হরিণ, ছাগল, গরু-বাছুর খায়- পেলে মানুষও খায়- কিভাবে খায়- কোন কোন জাতের মানুষ খায় এসব আমি ঠিক জানি না।
যা, ভাগ- মস্তান ভাই বলল এবং দেখা গেল বাঘের ওপর আর কেউ বক্তৃতা করতে বা শুনতে চায় না। কারণ তখন প্রায় ছটা বেজে গিয়েছিল- টকটকে লাল সূর্য উঠছিল। সেই জন্যে আমি বললাম, বাঘটা মারা দরকার, তার সম্বন্ধে কিছু জানার দরকার নেই।
এরপর আমাদের দল বেরিয়ে পড়ল। লাইনের সামনে মস্তান ভাই, তাঁর হাতে দোনলা বন্দুক- টোটা ভরাই আছে।


কাঁধ থেকে ঝুলছে একটা ব্যাগ- তার মধ্যে পনেরোটা বুলেট- একটা ছোরা। একটা বেঁটে মোটা লাঠি আর একটা পুরনো ক্যামেরা। তাতে ফিল্ম নেই, তবু নাকি মরা বাঘের একটা ছবি তোলার চেষ্টা করতে হবে- মস্তান ভাইয়ের পিছনের লাইনে দু’নম্বর লোক হলো ধবলা শেখ- তার এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে কুড়ুল। তার পেছনের লোকের হাতে শাবল। তার পিছনে রাহা- একহাতে রচনা বই- মিলিয়ে দেখবে বলে- অন্য হাতে দা। এমনি করে চলছে- লাঠি, বল্লম, টাংগি চলতে চলতে সবার শেষে যে তার হাতে বিরাট একটা খুন্তি। অবশ্য তার পেছনেও একজন আছে- তার হাতে কিছু নেই- সে শুধু বগল বাজানোর জন্যে এসেছে। বাঘ না মারা পর্যন্ত তার কোনো কাজ নেই- তবু সে বগল বাজিয়েই যাচ্ছে- মস্তান ভাইয়ের বারণও শুনছে না। এমনি বিরাট মিছিল করে আমরা এগুতে লাগলাম।


বনের কাছাকাছি যখন এসে গেলাম, দেখলাম শালগাছের পাতা ঝকঝক করছে। সূর্য একটু উপরে উঠেছে- পেছনের মাঠটা সোনালি আলোয় যেন ভেসে যাচ্ছে আর শালগাছের বড়ো বড়ো পাতায় আলো পড়ে এমন ঝিকমিক করছে যে আমরা সেদিকে তাকাতে পারছিলাম না…। নিচে কিন্তু চমৎকার ভিজে ভিজে লাল মাটি- পুরনো শালপাতায় ঢাকা। আর শিশির পড়ে স্যাঁতসেঁতে করে দিয়েছে পাতাগুলোকে। একটা সরু রাস্তা ধরে আমরা বনের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। এত সরু রাস্তা যে দু’জন পাশাপাশি দাঁড়ানোর উপায় নেই। কাজেই একজনের পিছনে আর একজন এই লম্বা লাইন করে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ চারদিকে যেন অন্ধকার নেমে এলো। শালগাছগুলো এমন গায়ে গায়ে ঠাসা যে তাদের মধ্যে গলে যাওয়াই দুষ্কর। আর এতক্ষণ অন্তত মাটিতে শালপাতা ছাড়া আর কিছু ছিল না- এখন দারুণ ঝোপজঙ্গল শুরু হলো। শুধু আমাদের সামনে সরু ফিতের মতো রাস্তাটা পড়ে রয়েছে।


কেই ভয় পাসনে- মস্তান ভাই বললেন, ভয় পেলেই বাঘ জানতে পারে- আর জানতে পারলেই চটপট চলে আসে- ধবলা শেখ বাকিটা বলে দিল। রাহা বলল, আচ্ছা, যদি একটু দৌড়টৌড় দিতে ইচ্ছে হয়- অমন ইচ্ছে তো হতেই পারে হাত পা থাকলে- তাহলে কিভাবে দৌড়ানো যাবে?
হঠাৎ বনের মধ্যে দৌড়ানোর দরকারটা কি? চুপচাপ থাকলেই হয়- মস্তান ভাই বললেন। না, আমি তা বলছি না, মানে, হঠাৎ যদি ধরো-
বেশি কথা বলিস না- শীত করছে- মস্তান ভাইয়ের দাঁতের ঠকঠকানি শুনতে পেলাম আমি। এমন সময় চিল গোছের বড়ো একটা পাখি ঝটপট করে সামনের গাছ থেকে উড়ে গেল। সেই জন্যেই আরো বেশি শীত করে উঠল মস্তান ভাইয়ের, কারণ তাঁর দাঁতের ঠকঠক আওয়াজ এত বেড়ে গেল যে কথাই জড়িয়ে গেল তাঁর। বেশি কথা আ- আ- মি পছন্দ করি না- কি যেন উড়ে গেল ওটা ওঃ হ্যাঁ চিলই তো। কি বিপদ। যাইহোক, কোনো কারণেই কেউ ভয় পাবি না। কারণ ভয় পেলেই-
বাঘ এসে হাজির হয়- আবার কথাটা শেষ করে দিল ধবলা শেখ। তোমার মাথা- চেঁচিয়ে উঠল মস্তান ভাই, খালি বাঘ এসে হাজির হয়। বাঘ লাফাচ্ছে। যখন আসবে তখন আসবে।
রাহা আমতা আমতা করে কি যেন বলতে গেল।
কি- মস্তান ভাই জিগগেস করেন। একটু দাঁড়াবো এখানে। একটু- এই এক মিনিট। কেন?
এই একটু-
একটু একটু করছিস কেন? কি বল না?


দাঁড়াবে তো দাঁড়াও, নইলে আমার প্যান্ট- রাহা চীৎকার করে বলল মরিয়া হয়ে। ও- তাই বল। আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেল। মস্তান ভাই বললেন।
কিন্তু ঘণ্টা পাঁচেক কেটে গেল; মজার ব্যাপার হচ্ছে এই : এতক্ষণের মধ্যে বাঘ দূরের কথা খরগোশ পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। সত্যি বলতে কি কিছুই দেখা গেল না। বন বিড়াল, শিয়াল, সজারু কিছুই না। শুধু গায়ে লাগালাগি লম্বা আর খাড়া খুঁটির মত শালগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে। কারো কারো ঝাঁকড়া- বিরাট পাতা, বন একেবারে অন্ধকার করে আছে। চারদিক একদম কোন শব্দ নেই।
একটা পাতা পড়লেও আওয়াজ হয় ঠক করে- আর বাতাস দিলেই শুকনো খড়মড় করে ওঠে। কি রকম বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করতে লাগল আমার। তখন ঝিঁ ঝিঁ ডেকে চলেছে ছাই- ঝিম ঝক ঝিম ঝক করে শব্দ হচ্ছে।


কোথায় বেলা বারোটা বাজতে চলল, ক্ষিধেয় পেট চোঁ চোঁ করছে- বাঘ মারার শখ আমার প্রায় মিটে গেল। আসল কথা হলো বাঘটাগ কিছু নেই এই বনে।
সবার সঙ্গে অল্পস্বল্প যা খাবার ছিল তাই যখন খাচ্ছিলাম তখন আমার কথাটাই বললেন মস্তান বাঘ-ফাগ নেই এখানে কেন মিথ্যে খুঁজে মরা। আর থাকলেও ভেগেছে। জানে তো, আজ এসেছি বনে। সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক কররাম, বাঘ একটা ঠিকই ছিল এই বনে, সেটা ডোরাকাটা বাঘও বটে- কিন্তু যেহেতু বাঘটার প্রাণ পুঁটি মাছের মত সামান্য, আর ভয়ানক ভীতু জানোয়ারটা, তখন আমাদের এই দলের বিশেষ করে মস্তান ভাইয়ের আঁচ পেয়ে এ তল্লাট থেকে চম্পট দিয়েছে।


তবু আরো কিছুক্ষণ খুঁজে দেখতে হবে- উদাসীন গলায় বললেন মস্তান ভাই। অতএব আমরা পথ চলতে লাগলাম। এবারে একটু অসুবিধা হলো। সামনে চার পাঁচটা সরু সরু রাস্তা। কোনদিক দিয়ে যাওয়া যায় কিছুতেই ঠিক করা গেল না। যেদিকে যাব বাঘটা যদি অন্যদিকে থাকে। ব্যাটা তাহলে বেঁচে যাবে। অথচ ওর আজকেই মরে যাওয়া উচিৎ এবং মস্তান ভাইয়ের হাতেই সে কাজটা করা উচিৎ তার। কোন রাস্তায় যাব এই নিয়ে আমাদের মধ্যে তর্কাতর্কি যখন চরমে উঠল ঠিক সেই সময়- না, ঠিক সেই সময় কিছুই হলো না, মস্তান ভাই বললেন, জীবনে চিরদিন সিধে হেঁটেছি। আজও তাই হবে। কাজেই আমরা আবার সোজা রাস্তাটা ধরেই চললাম।


শীতের দিনের বেলা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে এলো। লাল হয়ে গেল রোদের রং। এই সময়েই আমরা দেখলাম বন পাতলা হয়ে এসেছে। বলতে কি আমার বুক থেকে একটা পাথর যেন নেমে গেল। কোথায় কোন অন্ধকার ঝোপ থেকে কে যে লাফ দেয়, এ বিষয়ে সন্ত্রস্ত ছিলাম আমি। তোমাদের কাছে স্বীকার করতে আর লজ্জা কি এখন দেখলাম শালগাছগুলো অনেক দূরে দূরে- মাটির উপর মরা ফ্যাকাশে ঘাস আর একটু দূরে একটা শুকনো পুকুরের ওপাড়ে একটা নালা বেরিয়েছে পুকুর থেকে- সরু একটা খাঁড়ির মতো সিধে বনের ভিতর দিয়ে চলে গেছে। খালে পানি নেই- পুকুরের যেখান থেকে খালটা বেরিয়েছে সেখানে মানুষ সমান বড়ো বড়ো শুকনো ঘাস। শুকনো ঘাসগুলো দেখে এতো লোভ হলো আমাদের যে ইচ্ছে করল ওখানে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ি। মস্তান ভাই পুকুরের এ পাড়ে উঠেছেন- তিনি বোধ হয় সমস্ত পুকুরটা দেখতে পাচ্ছিলেন আর ফাঁকা জায়গা পেয়ে মনটা তাঁর এমন খুশি খুশি হয়ে উঠেছিল যে গুনগুন করে গান শুরু করেছিলেন। আমরা তখনো তাঁর পিছনে লাইন দিয়ে বনের মধ্যে দাঁড়িয়ে।


এই সময়ে হঠাৎ গান বন্ধ হয়ে গেল। মস্তান ভাইয়ের দিকে চেয়ে দেখলাম তিনি ঠিক গোল পোস্টের মত নিথর দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি দাঁড়িয়ে পড়ায় সমস্ত লাইন থমকে থেমে গেল। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে না পেরে আবার আমি মস্তান ভাইয়ের দিকে চাইলাম। ঠিক তেমনি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন। ডান হাতে বন্দুকটা আড়াআড়ি ধরা- কাঁধে ব্যাগ বাঁ হাত বুকের উপর। আমি দেখতে লাগলাম প্রথম তার হাঁটু দুটি কাঁপতে শুরু করল- পরনে প্যান্ট থাকা সত্ত্বেও বুঝতে পারলাম আমি, লটপট শব্দ হতে লাগল কাপড়ের। তারপর বন্দুক ধরা হাতটা কাঁপতে লাগল- সবশেষে তার বাঁদিকের গোঁফ- একবার উঠছে একবার নামছে আর দাঁত বেজে চলেছে ঠকঠক। তাঁর বন্দুক ধরা হাত সামান্য দুলল আর তাঁর গোঁফের পাশ দিয়ে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এলো, বা- বা- বা।


হাত থেকে বন্দুক পড়ে গিয়ে কান ফাটানো আওয়াজে গুলি বেরিয়ে গেল। তখন আমরা দেখতে পেলাম পুকুরটার উত্তর পাড়ে বড়ো বড়ো শুকনো ঘাসের মধ্যে গা ডুবিয়ে প্রকাণ্ড একটা জানোয়ার। বন্দুকের শব্দে সেটা উঠে দাঁড়াল। তখন আর আমাদের কোন সন্দেহ থাকল না। পাটকিলে রং তবে ডোরা টোরা নেই, পেল্লায় বুকের কাছটা লাল, বেড়ালের মতো দেখতে। মস্তান ভাই আমার বু-বু-বু করে একটা আওয়াজ দিয়ে আরম্ভ করে বা-বা বাঘ বলে শেষ করলেন এবং সেখানেই ধপাস করে পড়ে গেলেন মাটিতে। আমার কিন্তু অত্যন্ত অবাক লাগল। বাঘটা আমাদের দিকে চেয়ে আছে। কিন্তু তার চাউনিতে একটুও রাগ নেই। মনে হলো আমাদের ঠিক চিনতে পারছে না। মস্তান ভাইয়ের সঙ্গেও তার কোনো পরিচয় আছে এরকম মনে হলো না। খুব মিষ্টি মিষ্টি করে আমাদের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে আর লাল লম্বা জিভ ঝুলিয়ে বিরাট হাই তুলে বাঘটা খাঁড়ি বেয়ে পুকুরের পাড়ে উঠল যেন বিকেলে বেড়াতে বের হয়েছে এরকম একটা বাবু বাবু গোছের ভাব করে হেলে দুলে হেঁটে চোখের আড়ালে চলে গেল। ঠিক তখুনি ওপাড়ের ঘাসের বনের পাশ দিয়ে বন্দুক হাতে যিনি বেরিয়ে এলেন তাঁকে আমরা সবাই চিনি। পাশের গাঁয়ের শিকারি মফিজ সাহেব। ইয়া লম্বা দশাসই চেহারা। বেশি চলাফেরা করতে গেলে হাঁফিয়ে ওঠেন- আজকাল বেশ মোটা হয়ে গেছেন তো! তাঁর সঙ্গে মাধাই উরি। কালো কুচকুচে শরীর যেন পাথর থেকে কুঁদে তোলা। রাতদিনই প্রায় ধেনোমদ খেয়ে পড়ে থাকে। তবে লোক খুব ভালো। যে ডাকে তার সঙ্গেই যায়- দুআনা পয়সা না হলে চারটে ভাত দিলেই সে মাধাইকে যেখানে যেতে বলবে ব্যস- সে রাজি। সবাই খাটিয়ে নেয় ওকে।


ওপাড় থেকে চিৎকার করে মফিজ সাহেব বললেন, দিলিতো বাঘটাকে খেদিয়ে? ইস, একটু হলেই খতম হয়ে যেতো ব্যাটা। যাকে বলা হলো সেই মস্তান ভাই তখন মূর্ছা গেছেন। এমন চমৎকার হাসিখুশি আর ভরাট গলায় মফিজ সাহেব কথাগুলো বললেন যে আমরা ধবলা শেখকে মস্তান ভাইয়ের খবরদারির জন্যে রেখে দিয়ে ওপাড়ে মফিজ সাহেবের কাছে চলে গেলাম।
তখন মাধাই বলল, বন্দুক ফন্দুক রেখে দ্যানতো আপুনি- বাঘটাকে একটু আছড়িয়ে লোব। জালাইছে কদিন।
এই সময় দেখা গেল একটু দূরেই খাঁড়ির মধ্যে বসে আছে বাঘটা। ব্যাটার যেন বদহজম হয়েছে, নড়তে চড়তে বিশেষ ভালো লাগছে না। আমাদের সেখানে দাঁড়াতে বলে মফিজ সাহেব মাধাইকে নিয়ে গাছের আড়ালে আবডালে এগোতে লাগলেন।


শোন মাধাই, আমার পেছনেই তুই দাঁড়িয়ে থাকবি। আর গুলি হবার সঙ্গে সঙ্গে তুই সরে যাবি। আমিও গুলি করে সরে যাব। বুঝতে পেরেছিস? যেখান থেকে গুলি করা হয়, বাঘ ঠিক সেখানেই লাফ দিয়ে পড়ে। দাঁড়িয়ে থাকলেই জানে শেষ।
চলেন দিকিন আপুনি। মাধাই বলে।


আমরা দেখতে লাগলাম, বাঘটার কাছে গিয়ে- সে তখন রাগে ল্যাজ আছড়াচ্ছে আর গর গর করে- মফিজ সাহেব বন্দুক তুললেন। তাঁর ঠিক পিছনে মাধাই। তারপর চারদিক কাঁপিয়ে গুড়ুম করে বন্দুকের আওয়াজ হলো। সে শব্দ মিলিয়ে যেতেই যেন কড় কড় করে বাজ ফেটে পড়ল। মাধাইও তাকে নিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর আরম্ভ হলো জড়াজড়ি। সব ক’টা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে মাধাই বাঘটাকে বেধড়ক ঘুষি চালাচ্ছে। ভারি মজা লাগল আমাদের। একটু পরেই বাঘটা চুপচাপ হয়ে গেল। আর একটুও নড়ল না। মাধাই মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল। তার কালো কাঁধ বেয়ে রক্ত ঝরছে। কিন্তু তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই তার বিরাট বিরাট শাদা দাঁত বের করে প্রচণ্ড হাসি হাসছে সে। সে হাসিতে কোন শব্দ নেই। যেন সব ক’টা দাঁত বের করে নিঃশব্দে অট্টহাসি হাসছে মাধাই। হাসি আর থামে না। আমরা দৌড়িয়ে ওদের কাছে গেলাম। হাসছিস কেন দাঁত বের করে? গুলি হবার সাথে সাথে তোকে সরে যেতে বললাম না? দিলে তো একটা থাবা? মফিজ সাহেব ধমক দিয়ে উঠলেন। উত্তরে তেমনিই হাসতে লাগল মাধাই। তখন ভালো করে চেয়ে দেখি বাঘ এক থাবায় তার ডান কান আর ডান গালের সবটা মাংস তুলে নিয়েছে। কাজেই সব দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। মাংস চামড়াই নেই, দাঁত ঢাকবে কী দিয়ে?
ভালো হয়ে গিয়েছিল সে তিন মাস পর। গালের চামড়া টান টান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হাসি আর থামাতে পারেনি সে। হেসেই গেল চিরদিন। বোধ হয় মরবেও হাসতে হাসতে।