সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ : চেতনাপ্রবাহ রীতির প্রবর্তক
বা ংলা কথাসাহিত্যে একজন অন্যতম দিকপাল হচ্ছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। মাত্র তিনটি উপন্যাস লিখে তিনি বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে অমরত্ব লাভ করেছেন। তার ছোটগল্প, নাটক প্রভৃতির ভেতরে তিনি অস্তিত্ববাদের বিষয়টি প্রকট করে দেখেছেন। ‘চেতনাপ্রবাহ রীতি’ ঝয়ড়পথশ সফ ঈসষঢ়ধমসৎঢ়ষপঢ়ঢ় তার হাতে প্রথম বাংলা সাহিত্যে পরিপূর্ণ সার্থকভাবে ফুটে ওঠে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র জীবনকাল ১৯২২ থেকে ১৯৭১। জীবনের বহু অভিজ্ঞতাকে তিনি সফলভাবে উপস্খাপন করেছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তার উপন্যাসে ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী দর্শন ও চেতনাপ্রবাহ রীতিকে বিশেষভাবে গ্রহণ করেছেন। মূলত অস্তিত্ববাদী দর্শনের বীজ রোপিত হয় জার্মান দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কে গার্দ, হাইডেগার, নিট্শে প্রমুখের হাতে। যান্ত্রিক ও নিরপেক্ষ জীবন-জগতের মাঝে মানুষের মূল্য ও অবস্খান স্পষ্ট করে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। উনিশ শতকের সাহিত্যে অস্তিত্ববাদ বিভিন্নভাবে বিভিন্ন লেখকের হাতে সুবিন্যস্ত রূপ পায়। রুশ কথাসাহিত্যিক দস্তয়েভস্কি, চেক লেখক ফন্সানৎস কাফকার গল্প ও উপন্যাসে এ ধরনের বিষয়ের প্রয়োগ রয়েছে। অস্তিত্ববাদকে সাহিত্যের মাধ্যমে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য সচেষ্ট ছিলেন ফরাসি দার্শনিক-সাহিত্যিক জ্যাঁ পল সার্ত্র ও সিমন দ্য বোভোয়ার, আলবেয়ার কাম্যু, আঁদ্রে মারলো প্রমুখ কথাসাহিত্যিক। ‘চেতনাপ্রবাহ রীতির’ সাথে সিগমুন্ড ফন্সয়েডের ‘অবাধ অনুষঙ্গ’-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে কার্যকারণ সূত্রে গ্রোথিত হয় না। কিছুটা অসংলগ্ন ও বিশৃঙ্খলভাবে ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়। এই রীতি সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন ইংরেজ সাহিত্যিক জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উল্ফ ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রস্তু প্রমুখ। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ই সর্বপ্রথম অস্তিত্ববাদ ও ‘চেতনাপ্রবাহ রীতিকে’ তার উপন্যাস, ছোটগল্প ও নাটকে সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন।
‘লালসালু’ (১৯৪৮) উপন্যাসে দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত ভাগ্যান্বেষী মজিদ জীবিকার সংগ্রামে কিভাবে ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, তা এখানে সুুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অজ্ঞ গ্রামের মানুষের ভেতর কুসংস্কার, ভয়ভীতি, ধর্মীয় গোড়ামি ইত্যাদি ঢুকিয়ে সে লাভবান হতে থাকে। মজিদ এমনই এক গ্রামের মানুষ ‘যেখানে শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের চেয়ে আগাছা বেশি’। সেখানকার অধিকাংশ মানুষই ক্ষুধা-দারিদ্র্যের শিকার। কিন্তু মজিদ সুচতুর, ধুরìধর। সে নিজের অস্তিত্ব বিনাশ করতে চায় না। এজন্য সে নানা রকম কৌশল অবলম্বন করে। অস্তিত্বের জন্য মজিদ কোনো এক অজ্ঞাত কবরকে মোদাচ্ছের পীরের মাজার বলে ঘোষণা দেয়। ‘আপনারা বে-এলেম, আনপড়াহ মোদাচ্ছের পীরের মাজারকে আপনারা এমন করি ফেলি রাখছেন? উনি একদিন আমাকে স্বপ্নে ডাকি বললেন…’। এভাবে সে কৌশল কাজে লাগায়। পরে সে নারী লোভী হয়ে ওঠে। সুস্খ সবল স্ত্রী থাকতেও ছোট্ট এক মেয়ে জমিলাকে সে বিয়ে করে। পুরো গ্রামবাসীকে ধোঁকা দিয়ে সে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা আকাáক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে থাকে। ‘লালসালু’ ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
