Thursday, November 1, 2018

"ঘোর" - আবদুশ শাকুর


বেরুনোর মুখে মায়ের চোখের স্থিরদৃষ্টির মুখোমুখি এক যুগ তাকিয়ে থাকল ইশরাত,অতঃপর মুখ খুলল :
আমি তোমাদের সৃষ্টি ঠিকইতবে ঘটনাচক্রে। সুতরাং আমার ওপর কর্তৃত্ব করতে চেও না।
তার মানে?’
মানে তোমাদের চান্স-মিটিংয়ের ফসল আমি - 
তার মানে?’
মানেটা গভীরনিগূঢ় -
তবু আমার জানতে হবে - এত বড় একটা আদেশ দিয়ে ফেললি যখন।
প্যানপ্যানে মা পেছনে লেগেই পড়েছেন যখন মেয়ের শেষ কথাটা আজ তাঁকে শুনতেই হবে। কুপিতা কন্যার শেষ কথাটি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত :
মানেটা হচ্ছে - তোমাদের দুজনেরই যার যার সঙ্গে প্রেম ছিল তাদের সঙ্গে বিয়ে হলে সে-মিলনের সন্তান আমি হতাম না। সে অর্থে আমি তোমাদের পালিতা কন্যামাত্র। ভালোভাবে পালিতাও নই। তোমার হা পুত্র! হা পুত্র!’-ব্যারামের ঘোরে আমি এক উপেক্ষিতা কন্যামাত্র। অতএব আমার ওপর মালিকানা ফলাতে যেও না।
মালিকানা ফলাতে চাইলে তোকে ওই ঘরটিতে তালাবন্ধ করে রেখে দিতামসিনেমার মতো। কিন্তু এখন এটুকু তো অন্তত জানতে হবে - আমরা কখনো জন্মনিয়ন্ত্রণ করিনিতাহলে তৃতীয় সন্তান তুই আমাদের আকস্মিক মিলনের ফসল হলি কীভাবে?’
আকস্মিকমানে ঘটনাক্রমিক’ আরকি। তোমাদের এই তৃতীয় সন্তানটি কি আমি হতাম?তোমার মিলনটা খালেদ আংকেলের সঙ্গে হলে?কিংবা বোরহান আংকেলের সঙ্গে হলেযাদের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলবিয়ের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছিল বলে বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করেছিলে?’
অন্যদের সঙ্গে বিয়ের সম্ভাবনা কি শুধু আমার জীবনেই সৃষ্টি হয়েছিলতোর বাবার জীবনে হয়নি?’
হয়েছিল। সেও আমি তোমাদের গল্পগাছা থেকেই জেনেছি - সালমা অ্যান্টির সঙ্গেরেশমা খালার সঙ্গে।
তবে?’
তবেই তো বলছি - সালমা ী বাবার বা রেশমা ী বাবার তৃতীয় সন্তানটি আমি’ ইশরাত হতাম না। অর্ধেক হতাম আমি আর বাকি অর্ধেক হতো সালমা অ্যান্টির তৃতীয় সান এলিজা বা রেশমা খালার তৃতীয় সন্তান ফারিহা। তেমনি হাজেরা ী খালেদ আংকেলের বা হাজেরা ী বোরহান আংকেলের তৃতীয় সন্তান আমি হতাম না। অর্ধেক হতাম আমি আর বাকি অর্ধেক হতো খালেদ আংকেলের তৃতীয় সন্তান রেহানা বা বোরহান আংকেলের তৃতীয় সন্তান বারখা - 
এসব কথার তাৎপর্যটা কী রেঠিক কী বলতে চাচ্ছিস তুই ইশরাত?’
হুবহু লেবাননের বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর ও কবি খলিল জিবরান বা কাহলিল জিবরান যা বলেছেন তা-ই। বিষয়টির ওপর চমৎকার একটা পরোক্ষ আলোকপাত আছে তাঁর অন চিলড্রেননামক কবিতাটিতে :Your children are not your children.They are the sons and daughters of Life’slonging for itself.



আমি কি ইংরেজি পড়িনা পড়াই। আমি পড়াই বাংলা এবং পড়িও বাংলা -
তাহলে বাংলাতেই বলি। জগজ্জীবনে মনুষ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর এমন আশ্চর্য আলোকপাত আমার পড়াশোনায় আমি আর কোথাও পাইনি। তাই এ মহৎ কবিতাটি আমি নিজেই অনুবাদ করছিকোথাও ছাপানোর জন্য - যাতে আমাদের জীবনের এই পরম সত্যটি এ-সমাজের যথাসম্ভব বেশি পাঠকের বোধে গিয়ে হানা দেয়। তুমি শুনবে তো মা আমার অনভ্যস্ত অনুবাদ?’
না শুনলে তোর ওই কঠিন কথাগুলো আমি বুঝবো কী করে -
তবে শোন :
তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের নন।
পুত্র-কন্যা তাঁরা জীবনের নিজেরই ব্যাকুলতার।
তাঁরা আসেন তোমাদের থেকে নয়তোমাদের তৎপরতাতে,
তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নন তাঁরাযদিও তোমাদের পরিবারভুক্ত।
তোমরা তোমাদের ভালোবাসা দিতে পার তাঁদের,ভাবনা নয়,
কারণতাঁদের আছে নিজস্ব চিন্তা।
তোমরা তাঁদের দেহের নিবাস দিতে পারঅন্তরের নয়,
কারণ তাঁদের অন্তর বসত করে আগামীর ঘরে,
যে-ঘরে অভ্যাগমন তোমরা তোমাদের স্বপ্নেও করতে পার না।
তোমরা আপ্রাণ চেষ্টা করতে পার তাঁদের মতো হতে,
কিন্তু কখনো তোমাদের মতো করতে চেয়ো না তাঁদের।
কারণ জীবন পেছনে চলে নাঅধিষ্ঠান করে না গতকালে।
বাকিটা অনুবাদ এখনো হয়নি। কী বুঝলে মা?’
কী আর বুঝবো। আমি করি ঘর-সংসার। বুঝিও সংসার আর  পরিবার --’
না মাপরিবারও বোঝ না তোমরা। বুঝলে সন্তানদের তোমাদের ভাবতে না।
তোরা আমাদের না?’
না।
কবি বলেছেন বলে?’
হাঁ। কবি-সাহিত্যিকগণ মৌল সত্যটি সম্যক উপলব্ধি করতে পারেন। তাই তাঁরা জানেন --সন্তানেরা তোমাদের দ্বারা এ-সংসারে আসে বটে। তবে তারা তোমাদের কেউ নাতারা কেবল নিজেদেরই। এই সহজ সত্যটাই উপলব্ধি করতে পার না বলেই তোমরা ভাইয়াদের ওপর এত রাগ করতাদের এত ভুল বোঝ। অবশ্য ভুল বোঝার খুব জোর কারণও আছে তোমাদের। জন্ম থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছর পর্যন্ত সন্তানদের বুকের ভেতর আগলে রেখে একটা ঘোরের মধ্যে থাক তোমরা। জানতেও পার না কবে থেকে তাদের নিজেদের মুক্ত পরিবারের নেশা ডেকে চলেছেতোমাদের যুক্ত পরিবারের ঘোরটা কাটিয়ে।
বাহ্! আমাদের ঘোর কাটিয়ে তবেই তোদের নেশার ডাকে সাড়া দেওয়া!
নেশাটা একেবারে অকাজের জিনিস নয় মাবেশ কাজের জিনিসও হতে পারে। যেমন প্রেমের নেশা,বিত্তের নেশামদের নেশাব্যবসার নেশা - এমনকি ধর্মের নেশাও। জীবনটা তার প্রতিটি পর্বেই একটা নেশার ঘোরে চলে। আসলে বাঁচাটা আগাগোড়া একরাশ নেশারই যোগফল। সে-অর্থে নেশা নিজেতে তেমন খারাপ কিছু নয় মা। যেমন সন্তান ধারণ এবং লালনপালন জীবনের পর্ববিশেষের একটা স্বাস্থ্যকর নেশা। কিন্তু সে-নেশার ঘোরটা একটা রোগবিশেষ - যেটা থেকে নিরাময় প্রয়োজন। তোমাদের এই রোগ-নিরাময়ের অপরিহার্য প্রয়োজনের কথাটাই আজ আমি তোমাকে আমার ভাষায় এবং আমার অভিব্যক্তিতে বলতে বাধ্য হলাম। তোমাকে বলা এজন্যে যেতুমিই আমাকে গর্ভে ধারণ এবং লালন করেছ।
এ ব্যাপারে এই বয়েসেই এত বিদ্যা তুই পেলি কোথায় রে মেয়ে?’
বিদ্যালয়ে মা। ভুলে যাও কেনআমি সামাজিক নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী। আমাকে সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনগুলি নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা আর গবেষণা করতে হয়।
তোর বাবাও আমার মতো জয়েন্ট ফ্যামিলির ঘোরের মধ্যে আছে। কবির ওই নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির মূলতত্ত্বটা সংক্ষেপে আবার বল তো শুনি - তাঁর চিকিৎসাটা আমিই করতে পারি কি নাআমারটা যেমন তুই করলি?’
সন্তানেরা তোমাদের দ্বারা এ সংসারে আসে বটে। তবে তোমাদের থেকে আসে না। তারা ভ্রƒণ থেকেই নিজেদের মতো করে বেড়ে ওঠে। ফলে তারা কেবল নিজেদেরইতোমাদের কেউ না।
বিব্রতবিচলিত মাতা মুদ্রাদোষের মতো বেখেয়ালে আবারও বলে বসলেন :
তার মানে?’
মানেটা প্রায় অজ্ঞেয় বলেই দীর্ঘ ব্যাখ্যার ব্যাপার। আপাতত শুধু এ-কথাটি মনে রেখো যে,মানবসভ্যতার বিকাশে দুটি শক্তির সংঘর্ষের চেয়ে দুটি ব্যক্তির সঙ্গমের ফলাফলই অধিক স্থায়ী অবদান রেখেছে। কবি তাই মানবসভ্যতার মৌল সত্যরূপে দম্পতি-কেন্দ্রিকতার প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন।
মাতার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা দৃষ্টি উপেক্ষা করে ইশরাত আকরাম হনহন করে বেরিয়ে গেল,যেন মানবসভ্যতার বিকাশে নিজের ওই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটিরই কোনো কাজে। অধিকারিণী’-নামের নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠাকামী বিদেশি সাহায্যে পরিচালিত এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আধিকারিক তাঁর এই একরত্তি মেয়েটির এই সব কিসের উদ্গারহাজেরা আকরাম তা পুরোপুরিই জানেন। তার নিত্যনতুন ছেলেবন্ধু নিয়ে ফেরা এবং ঘরে ঢুকে রুম বন্ধ করা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রচলিত মাতৃ-অধিকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার নিত্যনতুন অধ্যায়ের সম্ভবত অন্তিম কিস্তি এটি।
বস্তুত পরিণত বয়সের মেয়েটির এত উৎকট-উদ্ভট কথা এতক্ষণ ধরে ধৈর্য সহকারে শোনার কারণ হলো প্রশ্নসংকুল মেয়েটি মায়ের প্রশ্নহীন মনটিকে অবশেষে বিচলিত করে তুলতে পেরেছে। এমনকি এরপরে হাজেরার শান্ত-সুখী জীবনটি যে চেনামহলে কখনো কখনো খুবই অস্বস্তিকরই হয়ে উঠতে পারে -- এও তিনি এ মুহূর্তেই উপলব্ধি করছেন।
সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির ছাত্রীটির মাতাও তো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরই ছাত্রী ও শিক্ষয়িত্রী - সাহিত্যের। তিনিও তো অধ্যয়ন এবং অধ্যাপন সূত্রে নর-নারীর শারীরিক-মানসিক সম্পর্কের জটাজাল-বেড়াজাল নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে থাকেন এবং সে সূত্রেই বুঝতে পারেন যেবদ্ধঘরে যুবক-যুবতীর নামাজে রত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু অন্য কোনো কাজে রত হওয়ার অব্যক্ত সন্দেহ সম্পর্কেও জাগ্রত চেতনা-ধন্যা কন্যার ভাষণ শুনতে হয়েছিল মাতাকে আরেকদিন।
সেটার তাপমাত্রা ছিল আরো উচ্চ - এক শব্দেবিপজ্জনক’ ভল্টেজের। কন্যার বিপজ্জনক জীবনযাপন দিন দিন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে চলেছে দেখে সেদিন একটা ভাষণদানের খেয়ালে হাজেরা সবে উচ্চারণ করেছিলেনমহাপুরুষগণ বলেছেন - যৌবনের উদগ্র কামনা আর ব্যগ্র বাসনার যাবতীয় জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে নির্বাণলাভের পথ যথাসময়ে অবলম্বন করাটাই শ্রেয়। অমনি শুরু হয়ে গিয়েছিল কন্যার প্রশ্নের বন্যা আর তর্কের ঘূর্ণাবর্ত :
কিন্তু কোন পথটি অবলম্বনে বিশ্বাসী তুমি?নির্বাণলাভের পথ তো বিভিন্ন মহাপুরুষের মতে বিভিন্ন। অস্তিত্বকে আনন্দ-বেদনার ওপারে নিয়ে যাবার উপায় নাকি একাধিক - বোধগুলিকে এড়িয়ে অথবা বোধগুলিকে ছেদিয়ে। অর্থাৎ সভয়ে সংবেদনগুলির পাশ কাটিয়ে গিয়ে কিংবা নির্ভয়ে বেদনগুলির মধ্য দিয়েই পেরিয়ে গিয়ে। কোন পথটি ধরবে তুমি?’
আমি তো দেখতে পাই যে প্রথম পন্থাটি অবলম্বন করে স্বস্তি পায় প্রাচ্য আর দ্বিতীয় পথটি গ্রহণ করে তড়পায় প্রতীচ্য -
প্রথমত প্রাচ্যের পথটি মানবিকই নয়যেহেতু ওটা স্রেফ ইন্দ্রিয়-ভয়। দ্বিতীয়ত প্রতীচ্যের পথটি সত্যিকারের ইন্দ্রিয়-জয় বলে সঠিক অর্থেই মানবিক। কারণ ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে সাড়া দেওয়া যেমন মানবিকতেমনি তাকে গ্রহণ-চর্বণ ও আস্বাদনশেষে চূড়ান্ত বিকর্ষণে পর্যবসিত করা - অর্থাৎ আক্রমণকারী শিঙেল মোষটির শিঙ ধরে লড়ে শেষ পর্যন্ত তাকে ভূলুণ্ঠিত করে ফেলাটাও মানবের প্রজাতীয় বৈশিষ্ট্য। তাই আমার মতে,সকল অর্থে ওটাই মানবিক।
আমার কোনো কোনো বান্ধবী কিংবা তাদের কোনো কোনো বান্ধবীর ইন্দ্রিয়জয়ের সরজমিন দৃষ্টান্তগুলি দেখে এবং শুনে এ যাবৎ আমি নিজের মনে অন্তত প্রাচ্য পথটিকেই শ্রেয় জ্ঞান করে এসেছি। ভেবেছি যেঅন্তিম উদ্দেশ্যটি যখন আনন্দ-বেদনার অপর পারে পৌঁছে গিয়ে মানবিক দুর্বলতাগুলিকে কোনোমতে পেছনে ফেলে দেওয়াতখন মেঠোপথের দীর্ঘযাত্রায় নিজেকে ক্লেদাক্ত না-করে নভোপথে উড়ে গিয়ে পরিচ্ছন্ন শরীরে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়াটাই তো শ্রেয়।
তাহলে কামনাগুলির কী হবে?’
সীমাবদ্ধ থাকবে।
হোয়াইজীবন তো একটাই।
জীবনের পাত্রটা যখন সসীমতখন প্রাপ্যটাকেও সসীমই থাকতে হবে।
ডিজগাস্টিং!’ বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঘড়ি দেখে বেরিয়ে গিয়েছিল মেয়ে। হয়তো বাইরে অপেক্ষমাণ তার কাম্য কোনো ছেলেবন্ধু বিরক্ত হচ্ছিল।


 


সেদিনটি থেকেও অশান্ত হয়ে গেল এদিনটি। নষ্ট হয়ে যাওয়া ধৃষ্ট দুটি ভাইয়ের পিতা-মাতার প্রতি অমানবিক আচরণের সমর্থনে মেয়েটির পণ্ডিতি ফলিয়ে জোর ওকালতি করা হা পুত্র! হা পুত্র!’-করা এই মাতাটিকে এতটাই বিচলিত করেছে যে,স্বামী ঘরে ফিরতেই তাঁকে মেয়ের আজকের সকল সীমা লঙ্ঘন করা তাবৎ বয়ান হুবহু শুনিয়ে তবেই আত্মস্থ হতে পেরেছিলেন তিনি।
স্বস্থ হতে পেরেছিলেন বটেকিন্তু থাকতে পারলেন কোথায়এদিনটি যে আবার শনিবার! প্রতি শনি-রোববার আকরাম-দম্পতির একজোড়া সাপ্তাহিক ঝগড়াকে বিশেষত্বের মর্যাদা দিতেই হয়। জোড়া বলা এজন্য যেকলহের বিষয়বস্তু অভিন্ন। আর সাপ্তাহিক তো বটেই যেহেতু খিটিমিটি-দুটি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে নির্দিষ্ট দুটি দিনের নির্ধারিত দুটি ক্ষণে -  মৃদুতর্জনে,মন্দগর্জনেতবে সাড়ম্বরে নয় কখনো। প্রতি শনিবার রাত আটটা আর প্রতি রবিবার রাত দশটার দিকে নাজুক সংলাপটি শুরু করেন বেগম ওয়াসিফযদিও প্রায়শই শেষ হয় তাঁরই নিঃশব্দ বিলাপেআর বিপক্ষের অনুচ্চ বিক্ষোভে।
সমাজগণ্য এই সচ্ছল দম্পতি স্ব-স্ব নামে হাজেরা আর ওয়াসিফ। সরকারের কুলীন চাকরি থেকে,সময় হতেইস্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে সংরক্ষিত কর্মশক্তি ব্যবসায় বিনিয়োগ করে পড়তি যৌবনের উঠতি ধনের যোগে জীবনের বিকেলটি অনবসর কাটিয়ে জনাব ওয়াসিফ স্বনামধন্য না হলেও সমাজগণ্য হয়েছেন। ফলে বেগম ওয়াসিফও তাঁর শখের শিক্ষকতায় ইস্তফা দিয়ে সমাজসেবিকার ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। অতঃপর নর-নারীর এই সুসংসারী জুটিটি তাঁদের গুলশানের আলিশানআশিয়ান’ ভাড়া দিয়ে বনানীর কোজি কর্নারেবিরামহীন বিশ্রাম আর অনুক্ষণ বিনোদনেই দিনযাপন করতে পারছেন।
উত্তরপঞ্চাশের হলেও জীবন তাঁদের সম্পূর্ণ সপ্রেম এবং সময়ও সম্পূর্ণ ভরপুর - বাহুল্য-বাতুল সামাজিক অনুষ্ঠানের বর্ধিষ্ণু জৌলুসে। সর্ব অর্থের এই-যে জমাট জীবনএর একমাত্র ফাঁকটি হচ্ছে আকরাম-দম্পতির দুটি পুত্রের দুটিই প্রবাসী - যাদের প্রত্যাবাসনও আর প্রত্যাশিত নয়। বড় ছেলে ইউনুস গিয়েছে নিজের উদ্যমেইতবে পিতার পকেট থেকে পথভাড়া আর মাতার আঁচল থেকে হাতখরচা নিয়ে। ছোট ছেলে ইউসুফও বিভুঁই পাড়ি দিয়েছে যথাসময়েইঅগ্রজের স্পন্সরশিপ আর মেয়াদি ধারের হাতখরচায় - অর্থাৎ জনক-জননীকে এক্ষেত্রে কেবল রাহাখরচই মেটাতে হয়েছে।
এরা গিয়েছে বস্তুত ইদানীংকালের নিত্যশ্রত ফ্যালাসির ঠ্যালাতেই। কীএদেশে লাইফে শাইনকরার সুযোগই নেইথাকলেও নিতান্তই সীমিত,অতিমাত্রায় নিয়মশাসিত ইত্যাদি। ওদেশে লাইফ এনজয়’ করার সীমা সিম্পলি ঊর্ধ্বে আকাশ আর নিম্নে পাতাল। আর সর্বোপরিওখানে সবকিছুই লাগামছাড়া -- যা খুশিযেমন খুশিযত খুশি,যখন খুশি প্রভৃতি। তবে বহুল পরিচিত এই শ্রেণীটির দেশত্যাগের গূঢ়তর হেতুটি খুলে তুলে ধরলে বলতে হয় যেএদেশে সুখী শূকর’ হওয়া প্রায়শই অসৎ তরিকাসাপেক্ষ আর ওদেশে অবস্থাটা ঠিক অতটা পতিত নয় -- যদিও পন্থাটার ব্যবহার ওখানেও সমানই উদার। বিকল্পেশুচিশুভ্র মনুষ্য’ হবার উপকরণ এবং উপায় দুয়েরই উপস্থিতি এদেশে যথেষ্ট থাকলেও - লক্ষ্যটি যেমনি নিরামিষওটির অর্জনও তেমনি কৃচ্ছ্রসাধনাসাপেক্ষ।
যাহোকআকরাম-পুত্রদ্বয় গিয়েছে যথাস্থানেই,মানে বিপুল বিজ্ঞাপিত মার্কিনধামে। প্রায় বছরদশেক হচ্ছে মন্টু আছে ইস্টকোস্টে,নেওয়ার্কের কাছেএমবিএ-কিসিমের কিছু একটা পড়েছে বা পড়ছেগোমস্তা-মার্কা কিছু একটা করেছে বা করছে। সে সাদা মার্কিন বিয়ে করেছে অনেকদিনতবে তার মাতা বীথির ব্যথার দিকটি হচ্ছে তাঁর অপছন্দ কীর্তিটি টিকেও রয়েছে এতদিন। ঝন্টু গিয়েছে প্রায় সাত বছর আগে,আছে মিড্ওয়েস্টে উইস্কন্সিনের ম্যাডিসনে। বিয়েটি এখনো নিষ্পন্ন না হলেও জনৈকা ফরাসিনীর সঙ্গে ডেটিং স্টেডি’ যাচ্ছে দীর্ঘদিন। এ-বৎসটির শিক্ষা এবং জীবিকানির্বাহও ওই অগ্রজের ধরনেরই। তবে বিবাহোত্তর জীবনের জন্যে অপরিহার্য অধিক আয়ের পেশা হিসেবে নাকি লিমুজিন-ড্রাইভিংয়ের পাবলিক সার্ভিসে জব সুইচ’ করেছে সম্প্রতি।
স্পষ্টতই এসব অকালবিদেশযাত্রীদের অভিযাত্রা সাধারণত বডিড্রেন’ মাত্র - কদাচিৎই ব্রেন্ড্রেন্। বিশেষ কোনো শিক্ষা কিংবা ক্রিয়ায় কৃতবিদ্য হওয়ার বদলে এই শরণার্থীদলের অনতিসচেতন লক্ষ্য : কঠোর মূল্যবোধ কর্ষণ থেকে মুক্তি এবং ভৌত সুখসমৃদ্ধির প্রয়োজনাতীত প্রাপ্তি। এই প্রাপ্তিযোগপুষ্ট আকরাম-পুত্রগণ তাদের সুসময়ে,অনর্থক হলেওপিতামাতাকে কিছু অর্থও প্রেরণ করে থাকে। প্রয়োজন না থাকলেও পিতা মানা করেন না এজন্যে যেএতে মাতার একরকমের সান্ত্বনা আছেএমনকি গর্বও। তা প্রকাশ করার জন্যেই গরিব আত্মীয়স্বজনকে দান-খয়রাতও তিনি ওই ফান্ড থেকেই করে থাকেন।
এসবেতে আকরাম সাহেবের তেমন কিছু আসে-যায় না বটেতবে হাজেরা বেগমের অনেক কিছুই আসেও এবং যায়ও। আসার খাতে আছে : তাঁর দু-দুটি পুত্রই পবিত্র পশ্চিমভূমে বাড়ি বাগিয়েছে,প্রচুর অধ্যয়ন’ করছেউপার্জন করছে প্রচুরতর প্রভৃতি। আর যাবার খাতে থাকে : দুটি ছেলেই বহুকাল যাবৎ চোখের আড়ালেমনে হচ্ছে আসবেও না কোনো কালেপৌত্রপৌত্রীসহ বউমায়েদের সম্মিলনে চাঁদের হাটটি তাঁর এ জীবনে আর মিলল নাঅর্থাৎ পরিণত বয়সের শেষ শখটাই অপূর্ণ রয়ে গেল -- ইত্যাকার বঞ্চনাযাতনা।
বয়েসে সবার নিচে এবং মেধায় সবার ওপরে ইশরাত-নামের একমাত্র কন্যাটির ওপরই বা আর ভরসা কিসের - মাস্টার্স পাশের পর থেকে কথায় তো সারাক্ষণই উড়ু-ড়ুকাজেও যে-কোনো মুহূর্তেই ফুড়ুৎ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। সে গিয়ে ওয়েস্টকোস্টে অবতরণ করলে আকরাম-সন্তানেরা তাদের স্বর্গরাজ্যের এপার-ওপারময় হয়ে যায়। গর্বের কথাই বটে - অন্তত তাদের মাতার কষ্টকল্পিত সান্ত্বনাসূচক বিবেচনায়।
যোগ-বিয়োগের এ-জাতীয় অনুকূল জরিপের জের হিসেবে মিসেস আকরামের পুত্রগর্বের দ্রুততানটি থিতিয়ে গিয়ে সেখানে ইদানীং শুধু পুত্রশোকের গভীর মীড়ই মোচড় দিয়ে ওঠেথেকে থেকে। বোধের এ-বদলটা ঘটেছে দ্বিতীয় ছেলেটিরও বিদেশিনী বিয়ে করে বিভুঁইয়ে থিতু হয়ে যাবার পরিচিত প্রক্রিয়াটি গোচরীভূত হবার পর থেকে। সচ্ছলতা বাড়ামাত্রই উভয় পুত্রের ক্ষেত্রেই নিয়মিত লিখিত পূর্ণপৃষ্ঠা পত্রের বদলে চালু হয়ে গিয়েছিল অনিয়মিতকৃত ক্ষণকালীন টেলিফোন। তাও দিনদিন ক্ষীণ হতে হতে একদিন কেবল এ-পক্ষের ওপর এসেই বর্তে গিয়েছে অনুষ্ঠানটি সংঘটনের একতরফা প্রয়োজন। কেননাপ্রয়োজনটি পরিহার্য বিবেচিত হওয়ায় এমন ভাবপ্রবণ অপচয় তো সুহিসাবী পশ্চিমবাসীদের প্রান্ত থেকে আশা করা যায় না।
এই পটভূমিতেই বেগম আকরাম তাঁর অনাগ্রহী স্বামীকে ফোনের প্রয়োজনটি নিয়মিত স্মরণ করিয়ে থাকেন - বারো ঘণ্টা পেছনের ছোট ছেলেটির বেলায় প্রতি শনিবার রাত আটটায়এই অভিজ্ঞতায় যে অবিবাহিত পুত্রটির কেনাকাটার বহর কম থাকায় তাকে সপ্তাহান্তের শপিংয়ের দিনেও ঘরেই পাওয়া যায়বিশেষত ভোরবেলায়। আর এগারো ঘণ্টা পেছনের বড়ো ছেলেটির ক্ষেত্রে দুপুর বারোটা পর্যন্ত ওয়ার্কিং উইকের বকেয়া ঘুম উশুলের সময় দিয়ে রোববার রাত এগারোটায় - এই অনুমানে যে বিবাহিত ছেলেটি শনিবারে সাপ্তাহিক বাজার সেরে সারাটা রোববার ঘরেই কাটায়। বিশেষত বাড়িটি নিজের হওয়াতে ঘরের কিছু না-কিছু কাজ এই দিনটির জন্যে সারা সপ্তাহ ধরে জমতেই থাকে - যা ওই বেনিয়াদের দেশে পরকে দিয়ে করাতে হলে নিজের গলাটাই কাটা পড়ে বেঘোরে।
আকরাম সাহেবের এই দূরালাপন অনুষ্ঠানে অনাগ্রহ ততটা বিত্তঘটিত নয়যতটা চিত্তজনিত। তবু সন্তানশোকে কাতরা মাতার যাতনার বহর মেপে ডিরেক্ট ডায়েলিংয়ে সহৃদয় পিতা লং কল উভয়পুত্রকেই করে থাকেন মাঝেমধ্যে। বিধুরা মাতাকে পুত্রদের অমূল্য এই শারীরসান্নিধ্যটুকু উপহার দিতে গিয়ে টেলিফোনের প্রাণরাসায়নিক এই উপঢৌকনের ক্ষমতাটি - সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সুদীর্ঘ তালিকায় কেন-যে এখনো একক বলে বিজ্ঞানী মহলেই স্বীকৃত তা -  আকরাম তাঁর মৃতবৎ অনুভবেও বোধ করে থাকেন। বোধটিকে যদিও ক্ষণিকেই বধ করে ফেলে অপরপ্রান্তে সহানুভবের অগোপন অভাব। সেই অভাবের প্রকাশটা যে এবারে একেবারে শনির দশাতেই গড়াবেসেটা স্নেহান্ধ মাতার পূর্বাহ্নে জানা থাকলেও হয়তো তিনি তাঁর চিরায়ত ভূমিকাটি থেকে বিরত না-হয়ে আলোচ্য শনিবারের রাত আটটায় স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত এই সংলাপটি ঠিকই ফেঁদে বসতেন :
ঈদটা যত ঘনাচ্ছেছেলেদুটির জন্যে বুকটাও যেন ততই তড়পাচ্ছে। ঈদে-চাঁদেও কি ওদের ফোন-টোন একটু করবে না তুমি?’
বুকটা যখন তোমারই তড়পাচ্ছেটেলিফোনটাও তখন তুমিই করতে পারো।
ওসব কান্ট্রিকোড-এরিয়াকোড-লোকাল নম্বরের লটবহর ভয়ংকর ভজকট লাগে আমার। তাছাড়া তোমার মনটা কি মোটেই জ্বলছে না?’
না। এতকাল ধরে মনটা কেবল জ্বলতেই থাকলে মানুষের জীবনটাই কি অচল হয়ে যেতো না?’
আচ্ছাতুমি কি একটা পিতা নও?’
আমি তো অনেক দিন ধরে শুধুই-পিতাওরাই বরং আর শুধুই-পুত্র নেই বহুদিন থেকে।
তোমাকে বোঝার ক্ষমতা বিধাতা অন্তত কোনো সন্তানের মাতাকে দেননি। কী-যে তুমি বলতে চাও -
বলতে চাই - পুত্র হয়ে জন্মেছিলাম আমিও,স্বভাবতই থাকতে পারিনিপিতাতে পরিণত হতে হয়েছে। প্রক্রিয়াটি অপরিবর্তনীয়। ফলে এ ধরাধাম থেকে আমাকে চলে যেতে হবে কেবল পিতা হিসেবেই। তেমনি আমার পুত্রদ্বয়েরও পুত্রত্বের পুনরাবৃত্তি আর আদৌ সম্ভব নয়। বরং পিতৃত্বের ভূমিকাটি প্রাপ্তিই ওদের এখন একমাত্র সম্ভাব্য বাস্তব -
সম্ভাব্য তো রইল দূরেউপস্থিত-বাস্তব থেকেই বিদায় নিয়ে বীথি তাঁর স্বপ্নের-বাস্তবে চলে গেছেন চলতি সংলাপের কোন ফাঁকে কে জানে। তবে সেটা মাতার নয়নের দর্পণে দর্শনমাত্রই কর্ডলেস ফোনের বেস সেট থেকে হ্যান্ডসেটটি পিতার হাতে উঠে এলো সন্তর্পণেকানে বেজে উঠল ডায়েল-টোন এবং ডজনখানেক ডিজিট ঘুরে গেলে পরে তাঁর ছোট ছেলে ইউসুফের স্পষ্ট কণ্ঠও ভেসে এলো পিতার পেতে-রাখা সটেনশন কর্ণে :
হ্যালো! কেবাবা?’
হাঁ। ঝন্টু তোরা কেমন আছিস?’
ভালো। তোমরাও ভালো তো?’
ভালোই - 
ফোন করলে কী জন্যে?’
তোর মায়ের জন্যে। ঈদের মৌসুম বলে তোদের খুব বেশি করে মনে পড়ছে তাঁর -
কেনআমাদের গ্রিটিং কার্ড পাওনিতোমাদের কার্ড তো পেয়ে গিয়েছি আমরা।
পেয়েছি বটেতবে সে-মুদ্রিত কার্ড তো মৃত হরফের। এই কণ্ঠস্বর তো আস্ত জ্যান্ত এবং একমাত্র তোরই অংশ -
কত-কী-যে ভাবতে পারো তোমরা বাবা! শুধু এটুকুর জন্যই কি এত খরচ করে টেলিফোনটা করলেআমি ভাবলাম কোনো দরকারি খবরটবরই বুঝি -
এটুকু দরকারি না হলেতোর ওই বারোয়ারি গ্রিটিং তো নয়ই - মহার্ঘ্য ডলার পাঠানোও দরকারি নয়। তাই ওসব আর পাঠালে অবশ্যই ফেরত যাবে। তোর মাকে দিলাম।
কি রে টাকার কথা আবার কী হলোবুঝলাম না তো!
রাখো মাবাবার কথার আমি অনেক কিছুই বুঝি না। বুঝতে চাইও না বেশি। কোথা থেকে কোথা চলে যায়। তাতোমার কথা কী বলো।
আমার আবার কথা কী রেআমি যে তোর মা,আমার তো শুধু ব্যথা -
তবে কি অযথাই এই কস্টলি টেলিফোনটা করলে?’
অযথা কেনতোরা কেমন আছিস?’
ভালোমা ভালো। এদেশে মানুষ সাধারণত ভালোই থাকে। একমাত্র অ্যাকসিডেন্ট ছাড়া -
খুব তাড়া আছে মনে হচ্ছে তোর কথার ধরনে?’
হাঁমা। দূরের একটা ওপেন মার্কেটে’ যাচ্ছি। ইজাবেলের কিছু স্পেশাল শপিং আছে। বাইরে দাঁড়িয়ে বেচারী ভারি বিরক্ত হচ্ছে -
বিরক্ত হচ্ছে! দুনিয়ার আরেক প্রান্ত থেকে ফোন করে মা-বাবা তাদের সন্তানের সঙ্গে দুদণ্ড কথা -
কথা তো হয়েই গেল। তবু যদি আরো বাকি থাকে,সে আরেক দিন বলা যাবে। এখন রাখি মাচলি।
ছেলে ফোনের কথা ছেঁটে মাঝপথে রেখে দেওয়াতে মায়ের নিরুদ্ধ নিঃশ্বাসের বাষ্প হঠাৎ হিমেল প্রবাহে গলে গিয়ে টলটল করতে থাকল ছলছল চোখের ক্লান্ত দুটি পাতায়। অশ্রর উৎস চক্ষুকর্ণের পুরোপুরি অগোচর ছিল না পিতারও। তাই পত্নীকে     সান্ত্বনা দান কর্তব্যজ্ঞান করলেন দায়িত্বশীল পতি :
বীথিতুমি অযথা এত ব্যথা পাও কেন বলো তো?এরা আমাদের সোনালি অতীত। আমাদের ভবিষ্যৎ আর রূপালীও নয় বলেই আমরা বারে বারে এদেরই দিকে ফিরে ফিরে যাই। তাই বলে,ভবিষ্যতের পিতৃত্বের জন্যে যুধ্যমান বর্তমান নিয়ে ব্যতিব্যস্ত এসব সন্তানেরা আমাদের মতো অস্পষ্ট অতীতের দিকে ফিরতেই বা চাইবে কেন -- সময় অপচয়ের কথা বাদ দিলেও।
চোখ দুটি বারবার মুছলেন বটেতবে নিজের মনটাকে একবারও চোখ ঠারতে না পেরে বীথি আজ আচমকা এক অভূতপূর্ব অনুরোধ করে বসলেন তার ঘরেতে পরবাসী’ স্বামীকে :
আচ্ছাতোমার ওই প্রিয় গানটা একবার গাও দেখি আজ - সন্তানে কুকর্ম করে/ ভোলে তারে পিতামাতা/ -
আরেওসব তো  হলো ভক্ত রামপ্রসাদের ভিন্নমাত্রার কথাজগৎমাতার কথা - 
তবু গাও না একটু শুনিসকল মাতার কথাও তো হতে পারে।
গানটি ওয়াসিফ গাইলেনতবে যেখান থেকে কণ্ঠে আপনা-আপনি এসে পড়লো : দশমাস দশ দিন/ যাতনা পেয়েছেন মাতা/ -।’ চিরনবিশ ওয়াসিফ গান কিছুক্ষণ প্রতি রাতেই করে থাকেন প্রাণ ভরে,তবে শুধু নিজেরই তরে - যার মারফত অতুলপ্রসাদী আর্তিও ঝরে : দগ্ধ যবে চিত্ত হবে এ মরুসংসারে/ স্নিগ্ধ করো মধুর সুরধারে
কিন্তু স্নিগ্ধ হয়েছিল না বলেই সম্ভবত পরদিন রোববার রাত দশটায় বীথির নিত্যকার মিনতি বিনেই জ্যেষ্ঠ পুত্রটিকে ফোন করতে বসে গেলেন ওয়াসিফ। বীথিও কেন জানি গুটিগুটি এসে পাশে বসে গেলেনহয়তো প্রেরণা আজ দুজনারই একই বেদনাপ্রসূত। হঠাৎ অপর প্রান্তে রিং হতে শুনেই ওয়াসিফ কেন যেন আঁতকে উঠে ফোনটি স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে সরে গিয়ে বসে গেলেন তাঁর হারমোনিয়ামের পাশে। এ-শার্পের সুরটি টেনে দিয়ে বেদনাবিধুর একটি বিখ্যাত তালছাড়া গান গুনগুন স্বরে ভাঁজতেও শুরু করে দিলেন -পাগলা মনটারে তুই বাঁধ
বস্তুত চাইছিলেনও তিনি মনটাকে বাঁধতেইবিগত রাতের জীবন্মৃত মনটাকে। বাঁধতে কিন্তু পারছিলেন নাযেহেতু মাতা-পুত্রের দূরালাপনের ক্রমবর্ধমান সুরচ্যুতি মর্মগোচর হয়ে যাচ্ছিল --বিশেষত হ্যান্ডসেট হাতে বিব্রত বীথির ত্বরিতে দূরে সরে যাওয়ার কসরত দেখে। গানের ভান ছেড়ে ওয়াসিফকে তাই ফোনের প্যারালাল সেটটাই বরং কানে তুলে নিতে হলো। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলেন যে ভুল করলেন - মহাভুল। কেননা না-তুললে তো তাঁকে এসব শুনতে হতো না :
কী রে মন্টুতোদের কি এখনো কোনো খবরটবর নেই?’
সন্তানের কথা বলছ তোনামা। তবে আইরিন এ ব্যাপারে কথা বলার সিদ্ধান্ত শিগগিরই নিতে পারে বলে জানিয়েছে।
সে কী রেএত বছর পরেও আবার কথা বলার কী আছে! এটা তো একটা চিরন্তন বিষয় -
চিরন্তন হলেওবিষয় তো। আর বিষয়মাত্রেই এসব দেশে আগে আলোচনামধ্যে বিবেচনা,অন্তে সম্পাদনা। তুমি অতসব বুঝবে না মা। মূলত রীতিনীতিপদ্ধতির প্রতি এই বিশ্বস্ত আনুগত্যই এদের এতখানি উন্নত করেছে।
তাহলে নাতি-নাতনির মুখ আমাদের আর দেখা হলো না।
নাতি-নাতনি হলেও তো দেখা হতো নাহতো বড়জোর শোনা। দেখার সম্ভাবনার কথা তো আপাতত ভাবাও যায় না মা - যা খর্চা!
খর্চাটা আমরা জোগালেযাবারটার মতো আসারটাও না-হয় তোর বাবাই - 
তোমরা তো করবে শুধু টাকা খরচকিন্তু সময়টা খরচ করবে কেজানো না তো এখানে সময়ের দামটা কত বেশি -
তার মানে আমরা দুনিয়া থেকে চলে যাবার আগে একবার দেখা দিয়ে যাবার বাসনাও তোদের নেই!
ব্যসঅমনি অভিমান করে বসলে। কোনো সাবস্ট্যানশ্যাল কথা নাএসব সেন্টিমেন্টাল কথার জন্যে উইকেন্ডের ঘুমটা-যে ইতিমধ্যেই ছেঁটে দিয়েছ সেও তো বলিনি শুধু অযথা রাগ করবে বলেই। এসব কাজের সমাজে সপ্তাহটা যে কি কঠিন শ্রমে কাটেসে তোমাদের বোঝারই কথা নয় মা। তবে আজকে ঘুম কমিয়ে দিয়ে কিন্তু ভালোই করেছো -- আইরিনের ওয়ালপেপার বদলানোর শখটা এ-রোববারে একেবারে মিটিয়েই দেওয়া যাবে।
‘(
ব্যাকুল কণ্ঠে) আমি তোর স্বল্প শিক্ষিতা মা,অতশত বুঝি না। একা হলেও একটিবার অন্তত দেখা দিয়ে যা না বাবা। আজকাল খালি ভয় হয় : তোদের বুঝি আর এক নজরও দেখে যেতে পারব না। তুই-যে আমার প্রথম সন্তান রে মন্টু!
মাএইটুকু শুধু বোঝার চেষ্টা করো যেএত বড় একটা অপচয় বাঁচাতে পারলে ওটা দিয়েই তো চট করে ইশরাতকে নিয়ে আসা যাবে এদেশে -
অতঃপর নিজেকে আর সামলাতে না-পেরে মাতার পক্ষে অগত্যা পিতাই কথা বলে উঠলেন --শীতল কণ্ঠে এবং নির্মম শব্দে :
তোদের টাকা ছাড়াই ওই মূঢ়ের স্বর্গে মেধাবিনী ইশরাত সসম্মানেই পৌঁছে যাবেস্কলারশিপ নিয়ে। ভাইদের মতো ডাল্ সে নয়। বরং বাপের চেয়েও শার্প্। তাই মা-বাপের কাছেও হাত পাততে হবে না ওরতোদের মতো -
পিতার অপমানকর কথাবার্তা আর বাড়তে না দিয়ে স্বভাবতই টেলিফোন রেখে দিলো পুত্র। পিতা ওয়াসিফ যেন পুঞ্জীভূত গ্লানির দুঃসহ বোঝাটা নামাতে পেরে এবারে পূর্ণপ্রাণে গানে বসতে পারলেন। দীর্ঘক্ষণ নিভৃতে রোদনের পরে স্খলিতপদে এসে পতির পাশে আসন টেনে বসে ব্যথাতুর বীথি কালকের মতো অভিনব অনুরোধটি আজও করে বসলেন :
আজো না-হয় রামপ্রসাদীই গাও। ওই-যে আরেকটা আছে না - কুপুত্র অনেক তো হয় মা/ কুমাতা নয় কখনো তো।
না বীথিওই গানের মেজাজ আজ পাওয়াই যাবে না।
তাহলে একটু আগে-যে গুনগুনাচ্ছিলেসেই অতুলপ্রসাদীটাই একটু প্রাণ খুলে গাও -- ‘এবার তুই একলা ঘরে নয়ন ভরে কাঁদ।/ পাগলা মনটারে তুই বাঁধ ॥
তাই গাইলেন ওয়াসিফ এবং পূর্ণ প্রাণেই গাইলেন। হাজেরাও মগ্ন হয়েই শুনলেন কিছুক্ষণ। পরে বোধহয় শ্রবণের চেয়ে নয়ন ভরে ক্রন্দনেরই প্রয়োজন বেশি বোধ করলেন এবং যেন কাকে খুঁজতে খুঁজতে উঠে চলে গেলেন ধীরে ধীরে,আরেক অতুলপ্রসাদী ক্রন্দসী পথচারিণীর মতোই -- ‘তুমি কোথা যাওতুমি কারে চাও?’অতঃপর নিজেকে নিয়ে একাকী হতে পেরে পীড়িত ওয়াসিফ তাঁর সংগীতসরোবরে এবারে পুরোপুরিই নিমজ্জিত হতে পারলেন। সে-নিমজ্জন এমনি সংজ্ঞাহরণ যেকালজ্ঞান তাঁর একদম রহিত হয়ে গিয়েছিল। তাই ঠিক কতক্ষণ পর ধিকৃত পুত্রটি জ্বালা জুড়ানো কিংবা ক্ষোভ মেটানোর জন্য টেলিফোনটা করল -- ওয়াসিফ ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। বুঝতে অবশ্য চাইলেনও না তেমন করে।
কিন্তু বীথি যেন আহত পুত্রের জরুরি শুশ্রুষার সুযোগটির অপেক্ষাতেই রাতের দুটো পর্যন্ত নিদ্রাহীন প্রহর গুনছিলেন ফোনের জন্যে উৎকর্ণ হয়ে। তাই রিং একবার বাজতেই শয্যা থেকে ছুটে এসে ফোন ধরলেন তিনি। ছেলে কিন্তু মায়ের সঙ্গে একটি কথাও বললো নাবলতে থাকলো শুধু বাবাকে দিতে। এদিকে স্ত্রীর অধীর তাগিদও স্বামীর সুধীর সংগীত থামাতে পারলো না। শুধু মাঝে মাঝে শুনলেন - আগে তোমাদের কথা শেষ হোক। অবশেষে বিব্রত মাতাকে বলতেই হলো ফোনের মুখ চেপে ধরে - মায়ের কথা শেষ হবে কীছেলে তো কথা শুরুই করলো না। কেবল পীড়াপীড়ি করতে থাকলো - বাবাকে দাও,বাবাকে দাও। ফোনটা হাতে নিতে বাধ্য হলেন নির্যাতিত পিতা। ফোনের কাছে মুখ নিয়ে শুধু একটা ফরমানই জারি করলেন অবসন্ন ওয়াসিফ :
ওকে বলে দাও বীথি : ওই জড়জগতের একটি জড়পিণ্ডের সঙ্গে কথা বলে অপচয় করার মতো সময় আমার এক মুহূর্তও নেই। কারণ আমি এখন মনোজগতের আনন্দমার্গে বিচরণ করছি।
ক্ষুব্ধ জনকের এই কঠোর উত্তর অবাধ আকাশপথে রুষ্ট পুত্রের কর্ণগোচর হতেই টেলিফোনটা সে রেখে দিলো সশব্দে। আহত মাতাও সশব্দেই জুড়ে দিলেন ক্রন্দন। থেমে গেল ওয়াসিফের শান্তরসমণ্ডিত সংগীতের সপ্রাণ সেবনও। কিছুক্ষণ সমস্তটা ঘর যেন শ্মশানই হয়ে রইল। অবশেষে বীথির ক্রন্দনমথিত নিন্দাবাদেই নীরবতাটা ভাঙলো :
তুমি কি একটা পিতানা এক টুকরা পাথর?স্বভাবগত পুত্রস্নেহও কি পিতার মনে অবশিষ্ট নেই যৎসামান্য?’
যৎসামান্য কেনঅসামান্যই আছে -- তবে আছে কেবল পুত্রেরই জন্য। আমার পুত্রদ্বয় এত কাল আগে গত হয়েছে যে ওদের প্রতি স্নেহবোধও কালে কালে সম্পূর্ণই লোপ পেয়ে গিয়েছে বলতে পারো। আর তুমিও যা! যারা চলে গিয়েছে তাদের জন্য অযথা অশ্রপাত না করেযে আছে তাকে দিয়ে তোমার মাতৃমনের চাহিদা মিটিয়ে যাও না কেনআমার মেধাবিনী ইশরাতকে দিয়ে?’
তার মানে মন্টু-ঝন্টুকে তুমি কাল ঈদের দিনেও আর ফোন করবে নাঅন্তত ঈদ মোবারক জানাবার জন্যেও নাএমন একটা খুশির ঈদের মুখে অমন সব দুখের কথায় সন্তানদের দোষী সাব্যস্ত করে কি সুখে থাকতে পারবো আমি?’
তা না পারোতবু ফোন আমি তোমার জন্যও আর করবো না - যার জন্য এতদিন করে এসেছি। আমার জন্য কোনোদিনই করিনি।
জঙ্গম পশুও নওতুমি একটা স্থাবর পাষাণ - সন্তানের টান থেকে পশুও বঞ্চিত নয় তোমার মতো।
শ্বেত ঘৃণায় পাষাণের মতোই জমাট বেঁধে-যাওয়া স্বামী আর একটা কথাও বাড়ালেন না দেখে স্ত্রীও ইতি টানলেন -  তাঁর অতি-উগ্র ওই উপসংহারেই। কিন্তু বিন্দুমাত্র স্বস্তি নেই যে-মায়ের মনেতার পক্ষে ইতি টানা কি সম্ভবদ্রুতপদেই চলতে থাকলেন বীথি - যাকে বলেডাউন দ্য মেমারি লেন। পৌঁছে গেলেন প্রথম বিপর্যস্ত ঈদের সেই চারচোখে বান-ডাকা চাঁদরাতটিতে - যে রাতে হৃদয়হীন বড় ছেলেটির যান্ত্রিক আচরণের প্রথম আঘাতটি পেয়েছিলেন তার হার্দিক পিতা এবং মাতা দুজনেই।
বিনিদ্র রজনীশেষে ঈদের ময়দান থেকে ফিরে এসে স্বামী নিজের ঘরের কোণে বসে আছেন শুনে সেবারের অতি সুন্দর ঈদী শাড়িখানি পরে আনুষ্ঠানিক দাম্পত্য কর্তব্য পালন করতে গিয়ে এক অদৃষ্টপূর্ব দৃশ্য দেখে চমকে উঠেছিলেন স্ত্রী। ওয়াসিফ তাঁর ঈদের লেবাসেই হেলান চেয়ারটায় যেন জীবনের হালটাই ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পিত হয়ে পড়ে রয়েছেন। অবিশ্রান্ত অশ্রধারে ফুরফুরে পাঞ্জাবিটির সমস্ত বক্ষটাই ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে। তবু বুকের অগ্নি-যে নেভেনিতার প্রমাণ - চোখের পানি থামেনি। ঘাবড়ে গিয়ে জরুরি কণ্ঠে জানতে চাইলেন বীথি :
কাউকে কাছে না ডেকে একা-একা এখানে হচ্ছেটা কীকী হয়েছে তোমার?’
চিরনির্বিকার পুরুষটি নিরুত্তর। চোখের জলের জোয়ারেই কেবল তরঙ্গভঙ্গ বেড়ে গেল।
শুধু এটুকু তো বলতে পারো যে আমার সর্বনাশের কি আরো কিছু বাকি ছিল?’
হাঁকাল পর্যন্তও হয়তো ছিল। আজ আর কিছুই বাকি নেইসবই শেষ। তবে এটুকু ভেবে সান্ত্বনাও পেতে পারো যেহারাবার মতো কিছুই আমাদের আর বাকি রইলো না -- বাকি পুত্রটিও আজ হারিয়ে গেলো চিরতরে।
কে হারিয়ে গেলোসব খুলে বলে ফেলছো না কেন তুমিকালরাতের পর সইতে না পারার মতো কোনো কষ্টই আর থাকতে পারে না আমার -
তাহলে দুঃসংবাদটি দুঃসহতম হলেও সহজেই নিতে চেষ্টা করো। সবে ধন যে-নীলমণিটি কাল পর্যন্ত আমাদের পূর্ণ করে রেখেছিলসেই শেষ পুত্রটিও তার পিতামাতাকে সম্পূর্ণ শূন্য করে দিয়ে চিরতরে বিদায় হয়ে গেল -
কী বললেতোমার সঙ্গেই তো ঈদের জামাতে গিয়েছিল ঝন্টু -
গিয়েছিল এবং ফিরেওছিল। ওকে নিয়ে বরাবরের মতো প্রথমেই বড় ভাইকে ঈদের সালাম করে আসার জন্যে ওর ঘরেও গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু গিয়ে দেখলামপ্রাণের টুকরো ঝন্টু আমার তার আগেই কখন যেন আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চিরতরেই হারিয়ে গিয়েছে -
পাশের শয্যায় ঢলে পড়ে সংজ্ঞা হারাবার আগে কাজের ছেলেটিকে ডেকে ডুকরে উঠলেন বীথি,অস্বাভাবিক চিৎকারে :
হাফিজ রে! আমাকে খুলে বল --  কীভাবে চলে গেলো আমার ঝন্টুকোথায় গেলো?’
সাহেবের কথাবার্তা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে দরজার বাইরে কর্মরত হাফিজ থতমত খেয়ে ছুটে এসে দুচোখ মুছতে মুছতে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বললো :
ভাইয়া তো আমারে বইলা গেলেন যে সাদেক ভাইয়ার বাসায় যাইতাছেন।
ঝন্টুর নিকটতম এ-বন্ধুটির ফোন নম্বর হাফিজ জানতো। সুতরাং উদ্ভ্রান্ত হয়ে কারো অনুমতি ব্যতিরেকেই সে-নম্বরে ফোন করলো সে এবং ভাইয়াকে পেয়ে গিয়ে বাসার কান্নাকাটির উল্লেখটুকু করেই লাইনে থাকেন’ বলে ফিরে এসে খবর দিলো :
ভাইয়া তো যেইখানে গেছেন সেইখানেই আছেন,বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের নাস্তা খাইতাছেন -
হাফিজের শেষের কথাকটি বীথির কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলোঠিক যেন স্বপ্নে :
নাস্তা খাচ্ছে! আমার ঝন্টু ঈদের নাশতা খাচ্ছে?’
হাঁ খালাম্মাঈদের নাস্তা। বইলা যাওয়ার পরেও ডিস্টার্ব করাতে একটু রাগও করছেনতবু কান্নাকাটির কথা শুইনা ফোন ধইরা আছেন। এই যে ফোন নেনকথা বলেন!
হাফিজ হ্যান্ডসেটটি বীথির কানে ধরিয়ে দিতেই অধৈর্য ঝন্টু বিরক্ত স্বরে বলে উঠলো :
আমাকে নিয়ে হঠাৎ কান্নাকাটির কী হয়ে গেল মা?’
আগে বল বাবা তুই কেমন আছিস -
ভালো আছি। কিন্তু এবার তুমি বলো এইসব হচ্ছেটা কী?’
ওয়াসিফ সবকিছু জেনেশুনেও নির্বিকার বসে আছেন। তাঁর মুখে কোনো কথাই সরছে না,চোখের পানিও থামছে না। ঝন্টুর সকারণ বিরক্তির মুখে বলার মতো তেমন কথা আর না-পেয়েচিরতরে হারিয়ে যাওয়া পুত্রটিকে মুহূর্তে ফিরে-পাওয়া মাতা তাঁর হর্ষোজ্জ্বল কণ্ঠে কেবল বাড়তি কিছু আদর ছড়িয়ে অবশেষে বললেন :
কিন্তু তোর বাবা-যে ঈদের লেবাসে বসে আছেন প্রতিবারের মতো তোকে নিয়েই ঈদ-বেড়াতে যাবেন বলে। প্রত্যেক বছর  সেই-যে তোর বড় চাচার বাসা থেকে শুরু করে -
মায়ের বক্তব্য পূর্ণ শুনতে না চেয়ে ঝন্টু আজ নিজের মন্তব্যই পূর্ণ শোনাতে শুরু করলো :
সব সময় আমি কি খালি বাবার সঙ্গেই বেরুবো?কোনোদিনই কি আমি নিজে-নিজে বেরুবো না?নিজের বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াবো না?’
প্রশ্নের বহরেকণ্ঠের স্বরে ঝন্টুকে আজ অতিসচেতন বোধ হওয়াতে আরো নরম সুরে,আরো আদরভরে - বরং আদরের সঙ্গে অনেকখানি আবদার মিশিয়েবীথি এবার মিনতি করেই বললেন :
হলো তো বাবাসবই তো হয়ে গেল। নিজে-নিজে বেড়ালিবন্ধুর বাড়ি গেলিসকলে মিলে খেলি। এবার চলে আয়! বাবারও তো একটু পাওয়া চাই আমাদের কলজের টুকরো ঝন্টু মিয়াকে --’
না মাএখন আসা যাবে না। মেলা দেরি হবে। আমাদের আরো অনেক প্রোগ্রাম আছে। বাবাকে বলো এবার একা-একা বেরুতে,  না-হয় তোমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরুতে।
সে কি করে হয় রেআমিও না থাকলে বাসায় ঈদের গেস্ট রিসিভ করবে কে?’
উত্তর না দিয়ে টেলিফোনই রেখে দিলো ঝন্টু। এতক্ষণে মুখ খুললেন ওয়াসিফতবে কণ্ঠে তাঁর বিদ্রƒপের রেশ বেশ অপ্রচ্ছন্নই শ্রত হলো :
কী বললো তোমার পুত্র?’
সদ্যমাত্র শঙ্কামুক্ত মাতার জবাবে বরং ক্ষাণিকটা প্রগলভতারই ছটা :
বললোবাবাকে এবারে মাকে নিয়ে বেরুতে বলো -
মাকে তাঁর কথা আর শেষ করতে হলো না,বাকিটুকু বাবাই বলে গেলেন :
শুধু এবারেই নয়এখন থেকে প্রতিবারেই - তাই না?’
সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে হেলান-চেয়ার থেকে উঠে পড়ে সাদরে বীথির হাতখানি ধরে উঠে দাঁড়িয়ে চলতে চলতে বলতে লাগলেন ওয়াসিফ :
চলোতোমাকে আজ দেখিয়েই দিই : আমাদের পুত্রগণ জনক-জননী থেকে কীভাবে বিচ্ছিন্ন হন,কখন বিগত হনযার পরে তাঁরা আর পুত্ররূপে থাকতেই পারেন না - রূপান্তরিত হতে থাকেন পিতৃরূপে।
বিভ্রান্ত বীথিকে ঝন্টুর কক্ষে নিয়ে গিয়ে তার পড়ার টেবিলের দেরাজটা দেখিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন ওয়াসিফকিছুটা যেন রহস্য করেই :
ঝন্টুর দেরাজটা খোলো তো দেখি।
বীথি টেনে দেখলেন যে ওটা তালা-মারা। ওটার খুলে না যাওয়াটাই যেন মাতার গোটা মাথাটাই খুলে-যাওয়া। সুতরাং এই স্বতঃসিদ্ধটিরই শুধু স্বীকৃতি চাইলেন ঝন্টুর পিতা :
এবার বুঝলে তো?’
এতে আবার বোঝার কী হলো?’
কাল পর্যন্তও যা ছিল মুক্ত-দেরাজ -- তার পিতামাতারসহ সকলেরই কমন ভুবন। আজ থেকে বন্ধ-দেরাজটি শুধু ঝন্টুরই আপন ভুবন হয়ে গেলো।
সে তো বটেই। কালই তো মনুমিস্ত্রিকে ডাকিয়ে নিয়ে ঝন্টু তার দেরাজটিতে তালা লাগিয়ে নিয়েছে।
আমিও তো তাই বলছি : ঠিক তখন হতেই আমাদের শিশুপুত্র ঝন্টু মিয়া তার মাতা-পিতা থেকে চিরবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে কেবল নিজের জন্যে জনাব ইউসুফ আকরাম হয়ে গিয়েছে। গোটা পরিবারের এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি আমি তো মাত্র কিছুক্ষণ আগেই আবিষ্কার করলাম : সামান্য একটা দরকারে ওর ড্রয়ার থেকে একটা হাইলাইটার নেবার জন্য ওর ঘরে গিয়েছিলাম বলে। ওটা নিতে             না-পারাটাই যে এমন অসামান্য একটা ব্যাপারের হাইলাইটার হয়ে যাবে,সেটা যে আগে ভাবাই যায়নি।
তা ভাবা না-ই বা গেল। কিন্তু হাইলাইট হলো কোন পয়েন্টটা?’
পয়েন্টটা এই যেঅবশেষে আমাদের শেষ পুত্রটিও তার মনের কুঠুরিতে নিজস্ব তালাটি লাগিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎপিতামাতার সঙ্গে কমন জীবনের মেয়াদ তার এ-জন্মের মতো ফুরিয়ে গিয়েছে : তার বদলে জন্ম নিয়েছে আরেকজনসে’, আরেকজন পিতা - পুত্র আর নেই আমাদের ঝন্টু।
বীথি কিন্তু আরো একজন সাবালক পুত্রের মাতা হয়ে যাবার সুসংবাদে হৃষ্টস্বরে সুখের লহর তুলেই যেমন সংবাদটির সমর্থনে প্রমাণ জোগান দিলো :
তাই তো মনে হয় আমি’-শব্দটির ব্যবহারও ঝন্টু যেমন আজ একটু বেশি-বেশিই করছিল -- আমি,আমিআমি।
তবেই বোঝোপ্রবাসী মন্টুর ক্ষেত্রে পুত্রশোক আমাদের কতখানি বাসি।
মন্টু-নামটি মনে মনে উচ্চারিত হতেই স্মৃতিপথটির ঠিক এইখানটায় হোঁচট খেয়ে বারান্দার সোফা-দুটির একটিতে হাজেরা যেনঠিক বসে নয় - একেবারে উলটেই পড়ে গেলেন                        বাস্তবজগতের এবারের ঈদের সকালটিতে। ঘোর-লাগা স্ত্রীকে এভাবে বসে পড়তে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওয়াসিফও পাশের সোফাটিতে বসে পড়লেন। বিষণ্ন তার অভিব্যক্তিতে এখন আর কোনোই ভিন্নতা নেই - প্রায় বিপরীত প্রকৃতির এই দুটি ব্যক্তিতে। নব-আবিষ্কৃত এই হৃতসর্বস্বতা একটা একমুখীনতা এনে দিয়েছে বিষম দৃষ্টিভঙ্গির দুটি নরনারীর মধ্যে। এ মুহূর্তে দুজনের দৃষ্টিও প্রসারিত একই দিকেসম্মুখেনাসিকাপ্রান্ত থেকে সুদূর দিগন্তের  যে-দূরত্বেই হোক : তা যেন স্থাপিতও আজ একই স্থানে।
ঠিক এমনি একটি নতুন মৈত্রীবন্ধনে একসময় সুস্থির বোধ করলে জননীর কাছে জানতে চাইলেন জনক :
কার জন্য কাঁদছোবড় আর ছোট ছেলের জন্য?’
হ্যাঁ। আমার কাছে তাদের অন্তত একটিবার এনে দাও টেলিফোনের লাইনে।
ওরা তো হাজার-হাজার মাইল দূরে। সরাসরি শ্রবণ-দূরত্বের তোমার পাশের কামরার ইশরাতকেও তো আর কখনোই আমাদের কাছেআনা যাবে না বীথি। এ দুঃসহ শোকই তো জগজ্জীবনে মনুষ্যলোকের জন্য বরাদ্দকৃত গুরুতম দণ্ডটি।
তবে দণ্ড গুরুতম হলেও - তরতাজা শরতের এই ঝকঝকে সকালের সন্তানশোক আকরাম-দম্পতিকে এমন এক নিবিড় বন্ধনে একাত্ম করে তুলছিলযেমন একাত্ম বন্ধনে এককালে তাঁরা এই          সন্তানদের জন্ম দিয়েছিলেন।


 

ও হেনরীর গল্প : ভালোবাসার জন্য


শিল্পকে ভালোবাসলে, তার জন্যে কোনো কাজই তেমন কঠিন বলে মনে হয় না। এই হচ্ছে আমাদের ধারণা। এই ধারণা থেকেই এই কাহিনীটা একটা পরিণতিতে পৌঁছুবে এবং সেই সঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দেবে যে, ধারণাটি আসলে ভুল। যুক্তির দিক দিয়ে এটা নতুন, কিন্তু গল্পের দিক দিয়ে চীনের পাঁচিলের চাইতেও পুরনো ।


চিত্রশিল্পে এক চনমনে প্রতিভা নিয়ে মিডল-ওয়েষ্টের এক জীর্ণ ফ্ল্যাটে জন্ম নিয়েছিলো জো লারাবি। ছ বছর বয়সে সে একটা ছবি এঁকেছিলো—শহরের জলের পাম্পটার পাশ দিয়ে একজন বিশিষ্ট নাগরিক বাস্তসমস্ত ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছেন। শসা খেতের পাশে ওষুধের দোকানটার জানলায় এলোমেলো ভাবে টাঙানো ছবির সারির মধ্যে তার ওই প্রচেষ্টাটিকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঝুলিযে রাখা হয়েছিলো। বিশ বছর বয়সে গলায টাই উডিয়ে আর একান্ত সঙ্গোপনে কিছু টাকা নিয়ে নিউ ইয়র্কের পথে রওনা হযেছিলো সে ।

ওদিকে দক্ষিণের এক পাইন-ঘেরা গ্রামে ডেলিয়া ক্যারাথার্স তিন সপ্তকে এমন প্রতিশ্রুতিময় গান গাইতো যে আত্মীয়স্বজনরা ওর তালপাতার টুপির তলায় শুধু মন্ত্র গুজতো, যাতে ও উত্তরের শহরে গিয়ে গান শেখা শেষ করে। শেষটা তারা দেখেনি, তবে এই কাহিনীতে সেটা আছে।

জো আর ডেলিয়ার দেখা হলো এক শিল্পশালায়। শিল্প আর সঙ্গীতের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী সেখানে ছবির আলো-আঁধারি, হ্বাগনার, সঙ্গীত, রেমব্রান্টের ছবি, ওয়ালফেল, প্রাচীরপত্র, শপাঁ এবং উলাও সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করার জন্যে সমবেত হয়েছিলো ।

- জো এবং ডেলিয়া একে অন্যকে কিংবা দুজন দুজনকে দেখে মুগ্ধ হলো । এবং সামান্য কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের বিয়ে হয়ে গেলো। কারণ ( ওপরে দ্রষ্টব্য), শিল্পকে ভালোবাসলে তার জন্যে কোনো কাজই তেমন কঠিন বলে মনে হয় না।
মি. ও মিসেস লারাবি একটা ফ্ল্যাটে ঘর-সংসার করতে শুরু করলো । ফ্ল্যাটটা নিরিবিলি, যেন পিয়ানোর বাঁদিকের শেষ চাবিটি। ওরা সুখী, কারণ ওরা দুজন দুজনকে পেয়েছে। তাছাড়া আছে ওদের শিল্প। ধনী তরুণদের প্রতি আমার উপদেশ–তোমার যা কিছু আছে তা বিক্কিরি করে গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দাও, তারপর তোমার শিল্প আর তোমার ডেলিয়াকে নিয়ে একটা ফ্ল্যাটে সংসার পেতে বসো।

ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা আমার সঙ্গে একমত হয়ে বলবে, একমাত্র তারাই সত্যিকারের সুখী। সুখী গৃহকোণ হলে সেটা কখনই অতিরিক্ত ছোটাে বলে মনে হয় না। সাজগোছের টেবিলটাকে উলটে নিলেই বিলিয়ার্ড খেলার টেবিল। ভাপচুল্লির তাকটাকে করে নেওয়া যায় গুছিয়ে রাখার যন্ত্র আর লেখার টেবিলটা একটা বাড়তি শোবার ঘর। মুখ ধোবার বেসিনটাকে মনে করা যায, যেন একটা সোজা দাঁড় করিয়ে রাখা পিয়ানো। ঘরের চারটে দেয়াল আসুক না কাছাকাছি এগিয়ে—যদিও বা আসে, তুমি আর তোমার ডেলিয়া তো তার মধ্যেই আছো ! কিন্তু বাড়িটা যদি অন্য রকম হয়—হোক না লম্বা-চওড়া। তাহলে তুমি গোল্ডেন গেট দিয়ে ঢুকে, হাটেরাগে কোট আর কেপ হনে টুপিটা রেখে, সোজা বেরিয়ে যাবে লাব্রাডর দিয়ে।নামজাদা লোক ম্যাজিস্টারের কাছে আঁকতে শেখে জো। নিজের বৈশিষ্ট্যের জন্যেই ম্যাজিস্টারের অতো খ্যাতি। ওঁর দক্ষিণা বেশি, কিন্তু উনি শেখান কম। ডেলিয়া সঙ্গীতের পাঠ নেয় রোজেনস্টকের কাছে—পিয়ানোর চাবিতে এলোমেলো ঝড় তোলার জন্যে র্তারও খ্যাতি অনেক ।

টাকাকডি যতোদিন অব্দি ছিলো ততোদিন ওদের সুখও ছিলো নিবিড়। সর্বত্র তাই-ই হয়। কিন্তু আমি দুঃখবাদীর মতো কথা বলবো না। ওদের লক্ষ্যটা ছিলো ভীষণ স্বচ্ছ আর সুনির্দিষ্ট। জো মনে করতো, খুব শীগগিরি ও এমন ছবি আঁকতে পারবে যে তা কেনার জন্যে পাতলা জুলপি আর মোটা পকেটবুকওয়ালা বৃদ্ধ ভদ্রলোকেরা তার স্টুডিয়োতে হাতাহাতি শুরু করে দেবে। আর ডেলিয়া ভাবতো, ও-ও নাম করবে এবং তারপর গান বাজনার ব্যাপারে ওর এতোই নাক উচু হয়ে উঠবে যে তখন বাদকদলের আসন ভরাট না হলে আর বক্সের টিকিট বিক্রি না হলে, ওর গলায় ব্যথা হবে এবং মঞ্চে যাবার বদলে ও তখন ব্যক্তিগত খাওয়ার ঘরে বসে গলদা চিংড়ি চিবোবে ।

কিন্তু আমার মতে ছোট ফ্ল্যাটের গার্হস্থ্য জীবনই সব চাইতে সেরা।

দিনভর শিক্ষা গ্রহণের পালা শেষ করে দুজনার আকুল-উচ্ছল আলাপ" রাতে সাধারণ খাবারদাবার আর সকালে সতেজ হালকা প্রাতরাশ•••আশা-আকাঙ্খার ভাব বিনিময়-একের সঙ্গে অন্যের আশা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া কিংবা না হওয়া-পারস্পরিক সহায়তা আর অনুপ্রেরণা এবং রাত এগারোটায়—আমার নীরসভাকে উপেক্ষা করবেন-জলপাই আর পনিরের পুর দেওয়া স্যাণ্ডুইচ।

কিন্তু কিছুদিন বাদেই শিল্প একটু দূরে সরে গেলো। মাঝে মাঝে তাই হয়, কেউ প্রত্যক্ষভাবে কিছু না করলেও হয়। স্থুল রুচিসম্পন্ন মানুষের ভাষায— সবই বেরিযে যাচ্ছে, ঘরে কিছুই আসছে না। মি. মাজিস্টার আর কের রোজেনস্টকের মাইনে বাকি পড়েছে। কিন্তু শিল্পকে ভালোবাসলে কোনো কাজই তেমন কঠিন বলে মনে হয় না। তাই ডেলিয়া বললো সংসারের হাল ঠিক রাখায় জন্য ও গান শেখানোর কাজ নেবে।

দু তিন দিন ছাত্র খুঁজে বেড়াবার পর একদিন সন্ধাবেলা ও উৎফুল্প হয়ে বাডিতে ফিরলো।

'জানো জো, আমি একটা ছাত্রী পেয়েছি!" উচ্ছ্বলস্বরে ডেলিযা বললো, "ওরা ভীষণ ভালো লোক ! জেনারেল এ. বি. পিঙ্কনির মেয়ে— সেভেনটি ফাস্ট’ স্ট্রীটে বাড়ি। কি দারুণ বাডিটা ! সদর দরজাটা যদি তুমি দেখতে বলতে একেবারে বাইজানটাইন। আর ভেতরটা। ওহ, জো, এমন সুন্দর বাড়ি আমি কোনোদিনও দেখিনি। “জেনারেলের মেয়ে ক্লিমেটিন আমার ছাত্রী। আমি এর মধ্যেই মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি। ভারি নরম-শরম মেয়ে-সর্বদা সাদা পোশাক পরে থাকে—ভারি মিষ্টি আর সাদাসিধে। মাত্র আঠারো বছর বয়েস। সপ্তাহে তিনদিন শেখাবো। আর ভেবে দ্যাখো জো, একদিনের মাইনে পাঁচ ডলার। এমন কাজ করতে আমার একটুও আপত্তি নেই। কারণ আরও দু-তিনটে ছাত্রী যোগাড় করতে পারলেই আমি আবার হের রোজেনস্টকের কাছে গান শেখা শুরু করতে পারবো। এবারে তোমার ওই কোঁচকানো ভ্রঁজোড়া একটু সোজা করে নাও, লক্ষ্মীটি – তারপর এসো, আমরা মজা করে খেয়েনি।'

তোমার দিক দিয়ে তুমি ঠিকই করেছে, ছুরি আর কাটা দিয়ে একপাত্র কড়াইশুটি আক্রমণ করতে করতে জো বললো, "কিন্তু আমার দিকটা একবার ভেবে দ্যাখো তো! তুমি কি মনে করেছে, তোমাকে রোজগারের জন্যে খাটাখাটনি করতে দিয়ে আমি উচ্চতর শিল্পের রাজত্বে ছিনালি করে বেড়াবো ?

কক্ষণো না। আর কিছু না হোক, খবরের কাগজ বিক্রি করে বা রাস্তায় খোয়া বিছিয়ে দু-এক ডলার তো ঘরে আনতে পারবো।

ডেলিয়া এগিয়ে গিযে জোর গলা জডিয়ে ধরলো, 'বোকামো করে না, জো ! তোমাকে শেখার পালা চালিয়ে যেতেই হবে। এমন তো না যে আমাকে গান-বাজনা ছেডে দিয়ে অন্য কোনো কাজ করতে যেতে হচ্ছে । শেখাতে শেখাতেও আমি শিখবো । সব সময় আমি তো গান বাজনার মধ্যেই থাকছি। সপ্তাহে পনেরো ডলার দিয়ে আমরা লাখোপতির মতো সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারবো। মি. মাজিস্টরকে ছাড়ার কথা তুমি কিছুতেই ভাববে না।’

‘বেশ, গোল গোল করে কাঁটা নীল রঙের সবজির থালাটার দিকে হাত বাড়ালো জো । 'কিন্তু তোমার ওই গান শেখানোর ব্যাপারটা আমার বিচ্ছিরি লাগছে। ওটা শিল্প নয়।’

'শিল্পকে ভালোবাসলে কোনো কাজই তেমন কঠিন বলে মনে হয় না, ডেলিয়া বললো ।

পার্কের মধ্যে আমি যে ছবিটা এঁকেছিলাম তাতে আকাশের দৃশ্যটা দেখে ম্যাজিস্টার খুব প্রসংশা করেছেন, জো বললো। আর টিংকল তার দোকানে কাচের জানলায় গোটা দুই ছবি টাঙিয়ে রাখার অনুমতি দিয়েছে। তেমন কোনো পয়সাওলা গবেটের চোখে যদি ওগুলো ধরে যায়, তাহলে হয়তো ওর মধ্যে একটা ছবি আমি বিক্কিরি করতে পারবো।’

‘নিশ্চয়ই পারবে, আমি জানি, ‘ডেলিয়া মিষ্টি করে বললো। ‘এবারে এসো, জেনারেল পিঙ্কনি আর এই মাংসের রোস্টটার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া যাক।

' পরের সপ্তাহে ল্যারাবিরা রোজই বেশ সকাল সকাল প্রাতরাশ সেরে নিয়েছে। সকালবেলাকার পরিবেশে সেন্টাল পার্কে গিয়ে ছবি আঁকায় জোর খুব উৎসাহ। ডেলিয়া তাকে খাইয়ে দাইয়ে, আদর করে, উৎসাহ দিয়ে, সাতটার সময় চুমু দিয়ে বিদায় জানাতো। শিল্পের আকর্ষণ বড়ো তীব্র। তাই জোর বাড়ি ফিরতে প্রায়ই সন্ধ্যা সাতটা বেজে যেতো।

সপ্তাহের শেষে ডেলিয়া ওদের ৮ x ১০ (ফুট ) বৈঠকখানা ঘরের ৮ x ১০ (ইজ্ঞি) সেন্টার টেবিলে মধুর গর্ব আর ইষৎ ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিজয়িনীর মতো তিনটে পাঁচ ডলারের নোট ছুড়ে দিলো ।

'মাঝে মাঝে ক্লিমেন্টনা আমাকে বড় খাটায়, সামান্য অবসন্ন সুরে ডেলিয়া বললো। 'বোধহয় যথেষ্ট রেওয়াজ করে না। প্রায়ই একটা জিনিস বার বার করে দেখাতে হয়। তাছাড়া সব সময়েই একেবারে সাদা পোশাক পরে থাকে-দেখতে বিশ্রী একঘেয়ে লাগে। কিন্তু জেনারেল পিঙ্কনি ভারি ভালো মানুষ! তোমার সঙ্গে আলাপ হলে বুঝতে পারতে। ক্লিমেন্টনাকে পিয়ানো শেখানোর সময় মাঝে মাঝেই উনি ঘরে এসে হাজির হন। জানোই তো, ওঁর স্ত্রী মারা গেছেন । দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উনি নিজের সাদা ছাগুলে-দাড়িগুলো টানেন আর সব সময় শুধু জিজ্ঞেস করেন, কি, গলা-কাঁপুনি কেমন এগুচ্ছে । ওদের বৈঠকখানার দেয়ালে কাঠের কাজগুলো যদি তুমি দেখতে! অ্যাস্ট্রাকান গালচেগুলোরই বা কি বাহার । জানো জো, ক্লিমেন্টনার ছোটো ছোটো কাশিগুলো ভারি মজার। ওকে দেখে যেমন মনে হয়, আশা করি ও তার চাইতে বেশি শক্তপোক্ত । আমি কিন্তু সত্যিই ওকে ভালোবেসে ফেলেছি। মেয়েটা ভারি ভদ্র -অতো উঁচু বংশের মেয়ে । জেনারেল পিঙ্কনির ভাই তো এক সময় বলিভিয়ার মন্ত্রী ছিলেন '

জো তখন মণ্টেক্রিস্টোর মতো মেজাজে পকেট থেকে একটা দশ, একটা পাঁচ, একটা দুই আর একটা এক ডলারের বৈধ নোট ডেলিয়ার নোটগুলোর পাশে নামিয়ে রেখে উচ্ছল সুরে বললো, জলরঙে আঁকা সেই ওপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়া চৌকো স্তম্ভের ছবিটা পিয়োরিয়ার এক ভদ্রলোকের কাছে বিক্রি করে দিলাম !"

'আমার সঙ্গে তামাশা করো না, জো—সে পিয়োরিয়ার লোক নয়।’

পুরোপুরিই তাই। তুমি যদি তাকে দেখতে, ডেল ! ইয়া মোটা চেহারা, গলায় পশমী মাফলার আর হাতে একটা পালকের খড়কে । টিংকলের দোকানের জানালায় ছবিটা দেখে সে প্রথমে ভেবেছিলো, ওটা একটা উইগুমিলের ছবি । যাই হোক, ছবিটা সে কিনেছে এবং আরও একটা ছবির ফরমাশ দিয়েছে। লাকাওয়ানার গুদামঘরের ছবি—তেলরঙে আঁকতে হবে—ওটা সে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। আর গান শেখানো ! হ্যাঁ, আমার ধারণা ওর মধ্যেও শিল্প আছে।’

‘তুমি যে শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছো, এজন্যে আমি ভীষণ খুশি’ ডেলিয়া আন্তরিক সুরে বললো, ‘তুমি জিতবেই। ওহ, তেত্রিশ ডলার! খরচ করার জন্যে এর আগে আমরা কোনোদিনও এতো টাকা হাতে পাইনি। আজ রাত্তিরে আমরা ঝিনুক খাবো।’

'আর ফিলি মিনিয়ঁর সঙ্গে শ্যাম্পেন," বললো জো ।

পরের শনিবার সন্ধাবেলা জো আগে বাড়িতে ফিরলো। বৈঠকখানার টেবিলে আঠারোটা ডলার রেখে, সে হাত থেকে বেশ খানিকটা কালচে রঙ ধুয়ে সাফ করে নিলো। আধ ঘণ্টা বাদে ডেলিয়া এসে পৌছলো। ওর ডান হাতে একটা বেঢপ আকৃতির ব্যাণ্ডেজ।

এসব কি করে হলো ? যথারীতি প্রতি সম্ভাষণ জানাবার পর জিজ্ঞেস করলে জো ।

ডেলিয়া হাসলো, তবে খুব একটা খুশির হাসি নয়।

'গান বাজনা শেখার পর ক্লিমেটিনা আমাকে ওয়েলস রাবিট খাওয়াবার জন্যে পীড়াপীডি করছিলো। এমন অদ্ভুত মেয়ে, বিকেল পাঁচটা বলে কিনা ওয়েলস রাবিট খেতে। জেনারেলও ছিলেন। চাটু আনার জন্যে ভদ্রলোক কিভাবে ছুটে গেলেন, তুমি যদি দেখতে—যেন বাডিতে চাকরবাকর কেউ নেই । আমি জানি ক্লিমেটিনার শরীরটা ভালো নয়—আর ও ভীষণ নার্ভাস। পরিবেশন করতে গিয়ে ও বেশ খানিকটা ফুটন্ত ঝোল চলকে আমার হাতে ফেলে দিয়েছে। ভীষণ যন্ত্রণা হয়েছিলো। বেচারী মেয়েটাও খুব দুঃখ পেয়েছে। আর জেনারেল পিঙ্কনি-- তার তো প্রায় মাথা খারাপ হবার মতো অবস্থা ! এক ছুটে সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে উনি এক ধরনের তেল আর ব্যাণ্ডেজ বাঁধার জিনিসপত্তরগুলো আনার জন্যে কাকে যেন ওষুধের দোকানে পাঠিয়ে দিলেন। এখন আর ততোটা যন্ত্রণা হচ্ছে না।’

এগুলো কি ? আলতো করে ডেলিয়ার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে, ব্যাণ্ডেজের তলায় কয়েকটা সাদা ফেঁসো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো জো ।

"কি যেন একটা নরম জিনিস-ওগুলোতেই তেলটা লাগিয়ে নেওয়া হয়েছিলো। আচ্ছা জো, তুমি আরও একটা ছবি বিক্রি করেছো নাকি ? টেবিলে রাখা টাকাগুলো ও আগেই দেখতে পেয়েছিলো ।

"বিক্রি করেছি কি না ?’ জো বললো, ‘তা ওই পিওরিয়ার ভদ্রলোককেই জিজ্ঞেস করে দেখো। আজ সে ওই গুদামঘরের ছবিটা নিয়েছে। এখনও কিছু ঠিক করেনি, তবে একটা পার্ক আর একটা হাডসন নদীর দৃশ্যও নেবে বোধহয়। কিন্তু আজ বিকেলে কটার সময় তোমার হাতটা পুড়লো, ডেল ?

‘পাচটা বোধ হয়, ডেল চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো। "ইস্ত্রিটা” মানে ঝোলটা মোটামুটি ওই সময়েই উনুন থেকে নেমেছিলো। তখন জেনারেল পিঙ্কনির অবস্থাটা তুমি যদি দেখতে জো, যখন. .

' এখানে একটু বসে, ডেল। হাত ধরে ডেলিয়াকে সোফায় বসিয়ে, জো ওর পাশে গিয়ে বসলে। তারপর নিজের একখানা হাত ওর কাঁধে রেখে জিগেস বললো, গত দু সপ্তাহ ধরে তুমি কি কাজ করছো, ডেল ?

দুচোখ ভরা প্রেম আর দৃঢ়তা নিয়ে এক মুহূর্তের জন্যে স্তব্ধ হয়ে রইলো ডেলিয়া। তারপর জেনারেল পিঙ্কনির সম্পর্কে অস্ফুটে কি যেন বললো। কিন্তু শেষ অব্দি মাথা নিচু করে চোখের জলে সত্যি কথাটাই বলে ফেললো ও ।

‘আমি কোনো ছাত্রী পাচ্ছিলাম না, জো ।" ডেলিয়া স্বীকার করলো, ‘তুমি আঁকতে শেখা ছেড়ে দেবে, তাও সহ্য করতে পারছিলাম না। তারপর টুয়েন্টি-ফোর্থ স্ট্রিটের ওই বুড়ো লন্ড্রিটাতে পোশাক-আশাক ইস্তিরি করার একটা কাজ পেয়ে গেলাম। জেনারেল পিঙ্কনি আর ক্লিমেণ্টেনের ব্যাপারটা আমি বোধহয় ভালোই বানিয়েছিলাম, তাই না? আজ বিকেলে লন্ড্রির একটা মেয়ে একটা গরম ইন্ত্রি আমার হাতের ওপরে নামিয়ে রেখেছিলো। বাড়িতে ফেরার সময় সারা রাস্তা ধরে আমি ওই ওয়েলস র্য়্যাবিটের গল্পটা বানাতে বানাতে এসেছি। তুমি রাগ করোনি তো, জো ? আমি যদি কাজটা না নিতাম তাহলে তুমিও হয়তো পিওরিয়ার ওই ভদ্রলোকের কাছে তোমার ছবিগুলো বিক্রি করতে পারতে না ।”

"তিনি পিওরিয়ার লোক নন, জো আস্তে আস্তে বললো ।

তিনি যেখানকার লোকই হন, তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু তুমি কি চালাক, জো “আমাকে একটা চুমু দাও! ”আচ্ছা, তোমার কেন সন্দেহ হলো যে আমি ক্লিমেটিনাকে গান শেখাই না ?

"আজ রাত অব্দি আমি তেমন কোনো সন্দেহ করিনি।” জো বললো, 'তবে আজ বিকেলে ওপরের তলায় একটি মেয়ে ইস্ত্রিতে হাত পুড়িয়ে ফেলেছে শুনে, আমিই এঞ্জিন ঘর থেকে ওপরে ফেলো তুলো আর তেল পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। গত দু সপ্তাহ ধরে ওই লন্ড্রির এঞ্জিনটা আমিই চালাচ্ছি।

'তাহলে তুমি ছবি'?

'আমার পিওরিয়ার খদ্দের আর তোমার জেনারেল পিঙ্কনি-দুজনে একই শিল্পের সৃষ্টি। তবে তা অঙ্কন বা সঙ্গীত শিল্প নয়।

’ ওরা দুজনে হাসলো। তারপর জো বলতে শুরু করলো, ‘শিল্পকে ভালোবাসলে, তার জন্যে কোনো কাজই. .

'না, জোর ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে তাকে থামিয়ে দিলো ডেলিয়া, শুধু 'ভালোবাসলে।’




তুমি কার জন্যে লেখো? - ওরহান পামুক


অনুবাদ: মোজাফ্ফর হোসেন

তুমি কার জন্যে লেখো? গত ত্রিশ বছর ধরে—যখন থেকে লেখালেখি শুরু করেছি— এই প্রশ্নটা আমি পাঠক ও সাংবাদিকদের কাছ থেকে হরহামেশা শুনে আসছি। উদ্দেশ্যটা স্থান-কালের ওপর খানিকটা নির্ভর করে, কিন্তু তারা সবাই একই রকম সন্দেহবাতিক ও অনুসন্ধিৎসু ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করেন।


সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে—যখন আমি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা আঁটছি—প্রশ্নটার একটা প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল সামগ্রিক ফিলিস্তিনের শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কিত ধারণার ওপর। তারা বিশ্বাস করতো—শিল্প ও সাহিত্য সৌখিনতার প্রতীক। ইউরোপের বাইরের দরিদ্র দেশগুলোর আধুনিকতার দিকে যে যাত্রা তা বড্ড

বেমানান। মানে তার উপযুক্ত সময় হয়ত এখনো আসেনি। সেখানে পরামর্শ দেওয়া হতো যারা শিক্ষিত ও কিছু করবার মতো ক্ষমতা রাখে তাদের জাতির জন্যে দরকারি কিছু করা উচিৎ; যেমন ডাক্তাররা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন, ইঞ্জিনিয়াররা সেতু বানিয়ে যেমনটি করছেন। (দার্শনিক সাঁৎ ১৯৭০-এর গোঁড়ার দিকে এই কথায় কান দিয়ে বলেছেন যে তিনি উপন্যাস লেখার কারবারে জড়াতেন না যদি তিনি বায়াফ্রার্ন বুদ্ধিজীবী হতেন)।

বিগত কয়েক বছরে এই প্রশ্নটা নিয়ে অনেক ভেবেছি কোন শ্রেণির পাঠক আমার বই পড়বেন এবং প্রশংসা করবেন সেটা নির্ণয় করতে। আমি জানতাম প্রশ্নটার মধ্যে একটা রাজনৈতিক গন্ধ আছে। যদি-না আমি বলতাম যে আমি সমাজের সবচেয়ে গরীব ও অবহেলিত মানুষদের জন্যে লিখি তাহলে সবাই ধরে নিতো আমি তুর্কির ভূস্বামী ও ধনিক শ্রেণিদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার জন্যে লিখি। এবং আমাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো যে শুদ্ধ চিন্তার ও মহৎ মনের অধিকারী লেখকরা যারা দাবী করেন যে তারা শ্রমজীবী ও নিুবিত্তদের জন্যে লেখেন তারা কেবলই কোনো রকমে লিখতে পড়তে জানে তাদের জন্যে লেখেন। সত্তর দশকে, যখন আমার মা জানতে চাইলেন আমি কার জন্যে লিখি—তাঁর থমথমে ও ভুরুকুচকানো ভাব দেখে মনে হল বিষয়টা তার কাছে বেশ গুরুত্বের—আরও জানতে চাইলেন আমি কীভাবে নিজেকে চালানোর কথা ভাবছি। এবংযখন বন্ধুরা জানতে চাইতো আমি কার জন্যে লিখি—তাদের বিদ্রুপটাকণ্ঠস্বরই বলে দিতো যে তারা বলতে চাইছে কেউ কোনদিন আমার মতো মানুষের লেখা বই পড়বে না। ত্রিশ বছর থেকে এই প্রশ্নটা আমি আরও বেশি করে শুনে আসছি। এটার কারণ হলো আমার উপন্যাস ইতোমধ্যে চলি−শটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিশেষ করে গত দশ বছরে আমার অসংখ্য সাক্ষাৎকার গ্রহীতা ভেবেছেন যে আমি তাদের প্রশ্নটা ঠিকভাবে নাও নিতে পারি তাই তারা যোগ করেছেন—আপনি তো তুর্কি বসে লেখেন, কাজেই আপনি কি শুধুই তুর্কিদের জন্যে লেখেন নাকি এখন যেহেতু নানান ভাষায় আপনার লেখা অনুবাদ হচ্ছে কাজেই সেই সব পাঠকদের কথাও আপনাকে ভাবতে হচ্ছে? আমরা তুর্কির ভেতর কিংবা বাইরে যেখানেই বসে বলি না কেনো প্রশ্নটা সবসময় সেই সন্দেহ ও অনুসন্ধিৎসু ভঙ্গিমায় আসে বলে বলতে বাধ্য হয় যে, যদি আমিপ্রার্থনা করি আমার লেখা সত্যি এবং খাঁটি শিল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাক তাহলে আমাকে বলতেই হবে যে, আমি শুধুমাত্র তুর্কিদের জন্যে লিখি।

এখন শুধু প্রশ্নটাকে একটু খুঁটিয়ে দেখার আগে—আমাদের মনে রাখতে হবে যে উপন্যাসের উত্থানের সাথে সাথে জাতি-সত্তার বা রার্ষ্টের ও উত্থান ঘটেছে। যখন উনবিংশ শতকের মহৎ উপন্যাসগুলো লেখা হয়েছে, সবদিক থেকেই উপন্যাসের শিল্পটা ছিল একটা জাতীয় শিল্প। ডিকেন্স, দ¯য়— ভস্কি এবং তল¯য়— লিখেছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণিদের জন্যে। উনিশ শতকে গুরুত্বপূর্ণ লেখদের উপন্যাসগুলো জাতীয় দৈনিকগুলোর শিল্প ও সাহিত্য পাতায় প্রম প্রকাশিত হতো কারণ মনে করা হতো তাঁরা সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে কিছু বলছেন। তাঁদের উপন্যাসের বক্তাদের মধ্যে একধরনের সচেতন দেশপ্রেমিকের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায় যাদের মূল কামনা হল দেশ ও দশের সমৃদ্ধি। উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে উপন্যাস লেখার ও পড়ার বিষয়টা হয়ে দাঁড়ালো জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আজ উপন্যাস লেখার অর্থ সম্পূর্ণ ভিনড়ব। পড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

পরিবর্তনের সূচনাটা হয় বিংশ শতকের প্রম অংশ জুড়েই, যখন উপন্যাস হয়ে উঠলো আধুনিক এবং শিল্পের সর্বচ্ছ মর্যাদা পেল। যেভাবে গত ত্রিশ বছরে যোগাযোগের তাৎপর্য পাল্টে গেছে—বিশ্ব গণমাধ্যমের যুগে সাহিত্যিকরা আর প্রম শ্রেণির বক্তা হিসেবে বিবেচিত হয় না। তাঁরা আজ আর শুধু নিজ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বক্তা হিসেবেই বিবেচিত হন না, বরং তাঁরা এখন বিশ্বের সমগ্র পাঠকদের বক্তা। আজ সাহিত্য পাঠকরা

অপেক্ষা করেন মার্কেজ, কোয়েৎজি, অস্টারের একটি নতুন বইয়ের জন্যে যেভাবে তাদের পূর্বসূরিরা অপেক্ষা করেছে নতুন ডিকেন্সের। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় একজন উপন্যাসিকের বাইরের পাঠকের সংখ্যা তাঁর নেটিভ পাঠকের থেকে অনেক বেশি। যদি সাধারণ অর্থে বলি—লেখকরা কার জন্যে লেখেন?—তাহলে বলতে হয় তাঁরা

তাঁদের আদর্শ ও যোগ্য পাঠকদের জন্যে লেখেন, তাঁদের কাছের মানুষ ও নিজেদের জন্যে লেখেন, আর কারও জন্যে নয়। এটাই সত্য, তবে আংশিক সত্য। কেননা আজকের সাহিত্যিকরা যারা তাঁদের পড়ে তাদের জন্যেও লেখেন। এখান থেকে বলাযেতে পারে, আজকের বিশ্বের সাহিত্যিকরা তাদের স্বদেশী মেজোরিটির জন্যে ণমেই

কম লিখেছেন (যারা তাদের পড়ে না)। তাঁরা লিখছেন বিশ্ব ব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাঠককুলের জন্যে যারা তাঁদের পড়ে।

বিষয়টাকে যারা বাঁকা চোখে দেখছেন তারা হলেন মতাদর্শ আরোপকারী এবং পশ্চিমের বাইরের মানুষ দ্বারা গঠিত বিভিনড়ব সংগঠন। বিশ্বে নিজেদের অবস্থান নিয়ে তারা যেমন অনিশ্চিত, তেমনই তারা চলমান জাতীয় সমস্যা বা ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় নিয়ে আলোচনায় বসতে অনিচ্ছুক—উপন্যাসিকদের মধ্যে এই দলের প্রতিনিধি যারা, যারা মনে করেন ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদকে বাইরে থেকে দেখতে হবে তারা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহবাতিক। তাদের মতে, যে সকল উপন্যাসিকরা তাদের জাতীয় পাঠকদের জন্যে লেখেন না তারা নিজেদের দেশকে অপরিচিত করে তুলে ধরে অন্যদেশের ভোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এবং তারা এমন কিছু সমস্যার উত্তরণ ঘটাচ্ছে যার কোনো বা¯ব— ভিত্তি নেই। একই ধরনের সন্দেহ পশ্চিমেও আছে যেখানে অনেক পাঠক মনে করে যে সাহিত্য আঞ্চলিক, শুদ্ধ ও জাতীয় কেন্দ্রভিত্তিক হওয়া বাঞ্জনীয়। তাদের গোপন শঙ্কাটা হবে পৃথিবীর লেখক হয়ে অন্যদের ঐতিহ্য থেকে উপাদান সংগ্রহ করে নিজের খাঁটি হওয়ার সম্ভাবনা বানচাল না হয় সেই দিকে। এইভয়ে সবচেয়ে বেশি ভীত হয় একজন পাঠক যে বই খোলার সময় মনে মনে প্রার্থনা করে এবং পৃথিবী থেকে বিচ্ছিনড়ব একটা জগতে প্রবেশ করে, সে সেই জগতেরমানুষগুলোর হট্টগল এমন করে দেখতে চায় যেমন করে একজন পাশের বাড়ির বিবাদশোনে। যদি কোনো লেখক অন্য কোনো ভাষাভাষী পাঠকদের উদ্দেশ্য করে কিছুলেখেন তাহলেও এই ফ্যান্টাসিটা আর থাকে না।

কেননা প্রত্যেক লেখকের ভেতরে আকাঙ্ক্ষা থাকে খাঁটি হওয়ার, তাই এত বছরপরেও আমি খুশি হই কেউ জিজ্ঞেস করলে—আমি কার জন্যে লিখি। কিন্তু একজন লেখকের খাঁটি হওয়া না হওয়া নির্ভর করে সে তার পাশের জগতের সাথে কতটা মানিয়ে নিতে পারলো তার ওপর, মানে সে যত বেশি তার নিজের অবস্থান পরিবর্তন সম্পর্কে সজাগ হবে সে তত বেশি খাঁটি হবে। একজন আদর্শ পাঠক বলে আসলে কিছু নেই, ঠিক তেমনি একজন আদর্শ উপন্যাসিক বলেও কিছু নেই। কিন্তু সে স্বদেশী বাভিনদেশী যেখানকারই হোক না কেন, একজন উপন্যাসিক তার আদর্শ পাঠকদের জন্যেই লেখেন। প্রথমে তার অস্তিত্ব মনে মনে কল্পনা করে নেন এবং পরে মনের ভেতর তার উপস্থিতি ধরে নিয়ে লিখতে থাকেন।

 

উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ...

Sunday, October 7, 2018

মাইকেল ফ্যারাডে – যে বিজ্ঞানীর কাছে পুরো মানবজাতি কৃতজ্ঞ!


এলবার্ট আইনস্টাইন তার পড়ার ঘরের দেয়ালে কেবল তিনজনের ছবি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন – আইজ্যাক নিউটন, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, আর তৃতীয় জন – যাকে নিয়ে আজ আমাদের গল্প – মাইকেল ফ্যারাডে। মহান বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডকে চেনেন তো? তিনি মাইকেল ফ্যারাডেকে নিয়ে বলেছিলেন, “তার আবিষ্কারগুলোর মাত্রা আর ব্যাপকতা, বিজ্ঞান আর শিল্পকারখানার জগতে সেগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করলেই বোঝা যায় – এই লোকটাকে যত বড় সম্মানই দেয়া হোক না কেন, সেটা যথেষ্ট নয়।”

michael-faraday-1241x763

ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিজ্ঞানী, আবিষ্কারক মাইকেল ফ্যারাডের জীবনীতে সবাইকে স্বাগতম। শুরুতেই এক নজরে দেখে নিই সাধারণ কিছু তথ্য –

জন্ম – ২২শে সেপ্টেম্বর, ১৭৯১, জন্মস্থান – লন্ডন, ইংল্যান্ড
শৈশব – কী অদ্ভুত কষ্টে আর সমস্যায় যে কেটেছে এই লোকটার শৈশব!
স্ত্রী – সারাহ বার্নার্ড
সন্তান – নেই
ঝোঁক – পদার্থ (বিশেষ করে তাড়িৎ-চৌম্বক), রসায়ন
আবিষ্কার – ওরে বাবা! এখানে লিখে শেষ করা যাবে না। পাবেন নিচের দিকে, গল্পে গল্পে আসবে। শুধু একটা জিনিস বলে রাখি, তার কাজের মাহাত্ম্য বোঝানোর জন্য – আধানের একক ফ্যারাডে (অবশ্য এখন কুলম্ব ব্যবহার করা হয়), আধান সংরক্ষণ ক্ষমতার একক ফ্যারাড (Farad, ফ্যারাডে নয়), এক মোল ইলেকট্রনে আধানের পরিমাণকে বলে ফ্যারাডে ধ্রুবক বা Faraday Constant.
পুরষ্কার – Royal Medal (দুইবার), Copley Medal (দুইবার), Rumford Medal, Albert Medal
মৃত্যু – ২৫শে আগস্ট, ১৮৬৭, মৃত্যুস্থল – ইংল্যান্ড

এই লোকটার আবিষ্কারগুলোর গুরুত্ব এতো বেশি যে, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান “কসমস”-এর (২০১৪ সালের) সিকুয়েলে গোটা একটা পর্ব উৎসর্গ করা হয়েছিলো তার জন্য। এই পোস্টে সেই পর্বটি থেকে অনেক গল্পই থাকবে।

শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা


ফ্যারাডের উচ্চারণে সমস্যা ছিলো। তিনি “র” উচ্চারণ করতে পারতেন না। এটা নিয়ে সবখানে হাসাহাসি হতো, স্কুলেও। তিনি বেশিদূর পড়াশোনা করেননি, সামান্য যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ শেখা পর্যন্তই ছিলো তার গণিতবিদ্যার দৌড়! তার পরিবারও ছিলো দরিদ্র। চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। স্কুলেও আর গেলেন না, পড়াশোনাও করলেন না। তাকে লেগে পড়তে হলো জীবিকার কাজে, মাত্র ১৩ কি ১৪ বছর বয়সে! স্থানীয় একটা বই বাঁধাই করার প্রতিষ্ঠানে কিশোর ফ্যারাডে যোগ দিলেন। বস্তুত, এখানেই তিনি নিজেকে স্বশিক্ষিত করেছিলেন। দিনের বেলায় বই বাঁধাই করতেন, রাতের বেলায় বই পড়তেন বসে বসে।

বই বাঁধাইয়ের কারখানা থেকে রয়েল ইন্সটিটিউট


লন্ডনের বিখ্যাত রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে তিনি একবার আবিষ্কারক হামফ্রে ডেভি’র বিজ্ঞান প্রদর্শনীর অনুষ্ঠান দেখতে গেলেন। সবাই যখন অনুষ্ঠান উপভোগে মত্ত, ফ্যারাডে তখন নোট নিতে ব্যস্ত। পুরো অনুষ্ঠানের কথাগুলোই লিখে ফেললেন তিনি! নিজে থেকে এতো এতো নোট যুক্ত করলেন যে শেষ পর্যন্ত বইটার পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়ালো ৩০০! বই বাঁধাইয়ের অভিজ্ঞতা তো ছিলোই! সেটাকে কাজে লাগিয়ে, নোটগুলোকে একটা বইয়ের মত বানিয়ে সেটা পাঠিয়ে দিলেন স্যার ডেভি’কে। হামফ্রে ডেভি মুগ্ধ হলেন ফ্যারাডের স্মৃতিশক্তি দেখে। এমন সময় তার গবেষণাগারের একটা দুর্ঘটনায় তিনি সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গবেষণায় অক্ষম হয়ে গেলেন। লেখালেখি করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিলো না। তখন, তিনি ফ্যারাডেকে ডেকে পাঠালেন, নিজের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার জন্য। দিনের বেলায়, রয়েল ইন্সটিটিউটে স্যার ডেভির গবেষণাগারে সাহায্য করতেন ফ্যারাডে। সাহায্য বলতে বিশেষ করে গবেষণার নোট নেয়া, এটা সেটা এগিয়ে দেয়া, পরিষ্কার করা, আগে থেকে দেখিয়ে দেয়া নিরীক্ষাগুলোর প্রস্তুতি করা ইত্যাদি।

ডেভির স্ত্রী ফ্যারাডেকে অবজ্ঞা-অবহেলা করতেন। তখনকার সমাজটাই এমন ছিলো যে অর্থনৈতিকভাবে নিচু স্তরের মানুষকে হেয় করা হতো। ডেভি যখন ফ্যারাডেকে নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ভ্রমণে দূর-দূরান্তে (এমনকি অন্য দেশে) যেতেন, তখন ডেভির স্ত্রী তাকে ঘোড়ার গাড়ির ভেতরে বসতে দিতেন না। তিনি ফ্যারাডেকে অন্যান্য চাকরদের সাথে খাওয়াদাওয়া করাতেন। এতো অপমান করতেন যে মাঝে মাঝে ফ্যারাডের ইচ্ছে হতো, একা একা আবার ইংল্যান্ডে চলে যেতে।

কর্মচারী থেকে আবিষ্কারক


অবশ্য স্যার হামফ্রে ডেভি নিজে খারাপ ব্যবহার করতেন না ফ্যারাডের সাথে। এমনকি নিজের লেখালেখির মধ্যে তিনি ফ্যারাডের অবদানের কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করতেন।

কোনো ধাতব বস্তুতে বিদ্যুৎ চালনা করলে সেটা একটা অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়। এটা তখনকার বিজ্ঞানীদের জানা ছিলো না। হামফ্রে ডেভি এবং তার সহ-গবেষক বিদ্যুতায়িত বস্তুর এই চৌম্বকক্ষেত্র ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে খাবি খাচ্ছিলেন। এই ধর্মটাকে কাজে লাগিয়ে কোনো ধাতব দণ্ডকে ক্রমাগত ঘোরানো যায় কিনা, সেই চিন্তা করছিলেন। তখন মাইকেল ফ্যারাডে, গবেষণাগারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কর্মী, সারা দিন রাত এটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। তিনি এটা সেটা নিয়ে টুকটাক প্রচেষ্টা চালাতে লাগলেন। এবং একদিন, সত্যি সত্যি তিনি বিদ্যুৎকে কাজে লাগিয়ে একটা ধাতব বস্তুকে ঘোরাতে সক্ষম হলেন। এই প্রথমবারের মত কেউ বিদ্যুৎকে যান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত করলো। আবিষ্কৃত হলো ইলেকট্রিক মোটরের মূলনীতি।

আজ আমরা আশেপাশে যত যন্ত্রকে বিদ্যুৎ দিয়ে চলতে দেখছি, সেটার সূত্রপাত হয়েছিলো মাইকেল ফ্যারাডের এই গবেষণার হাত ধরে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর কথা বলতে গেলে এটা একদম ওপরের দিকে থাকবে। তখনই মানুষ এটার আশু গুরুত্বের কথা বুঝতে পেরেছিলো। মাইকেল ফ্যারাডে প্রায় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন। ১৮২৪ সালে, মাত্র ৩২ বছর বয়সে, তাকে রয়েল সোসাইটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হলো। এটা একটা স্বীকৃতি ছিলো যে, ফ্যারাডে নিজ যোগ্যতায় একজন বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন। পরের বছর তাকে রয়েল ইন্সটিটিউটের গবেষণাগারের পরিচালক বানিয়ে দেয়া হলো।

একটি কাঁচের বিস্কিট


নিজের অধীনের এই খ্যাতি হামফ্রে ডেভি হয়তো খুব একটা ভালো চোখে দেখেননি। তিনি ফ্যারাডেকে ধরিয়ে দিলেন একটা কাজ, যেটা ফ্যারাডে কখনোই পেরে ওঠেননি। কাঁচ জিনিসটা তখন অনেক মূল্যবান ছিলো। অপটিকস (optics) এর জগতে তোলপাড় হচ্ছিলো, শুধুমাত্র উন্নতমানের কাঁচের কারণে। আর এই কাঁচ যারা আবিষ্কার করেছিলো, তারা সেই আবিষ্কারের সূত্র লুকিয়ে রেখেছিলো সবার কাছ থেকে। তাদের বানানো কাঁচ গবেষণা করে সেই সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করলেন ফ্যারাডে। এবং চার বছর ধরে চেষ্টা করার পর রণে ভঙ্গ দিলেন, যখন হামফ্রে ডেভি মারা গেলেন। নিজের ব্যর্থতার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, ঘরের তাকে একটি কাঁচের বিস্কিট রেখে দিলেন তিনি। চার বছরের ব্যর্থতার এই স্মৃতিচিহ্ন একদিন চরম একটা আবিষ্কারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই কাহিনী আরো পরে!

বার্ষিক সায়েন্স লেকচারের আয়োজন


স্যার হামফ্রে ডেভি মারা যাওয়ার পর গবেষণাগারের পরিচালকের পদে আসীন হলেন মাইকেল ফ্যারাডে। জীবন তাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এলো! নতুন এই ক্ষমতা পেয়ে তিনি অত্যন্ত চমৎকার একটা কাজ করলেন। তরুণদের জন্য বার্ষিক সায়েন্স লেকচারের আয়োজন করলেন রয়েল ইন্সটিটিউটে।

Faraday_Michael_Christmas_lecture_detail

প্রথম সেই আয়োজন হয়েছিলো ১৮২৫ সালে, এবং আজও সেটা চলছে। এই আয়োজনে বাচ্চাদের সামনে গল্পের ছলে বক্তৃতা দিয়েছেন ইতিহাসের বিখ্যাত সব ব্যক্তিরা। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ১৯৭৩ সালে এসেছিলেন ডেভিড এটেনবরো, ১৯৭৭ সালে এসেছিলেন কার্ল সেগান, আর ১৯৯১ সালে এসেছিলেন রিচার্ড ডকিন্স।

জেনারেটর আবিষ্কার


জেনারেটরের মূলনীতি (গতিশক্তি থেকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রুপান্তর) আবিষ্কার করলেন মাইকেল ফ্যারাডে।

early

একটা তারের কুণ্ডলীর মধ্য দিয়ে চুম্বককে আনা-নেওয়া করার মাধ্যমেই অসম্পূর্ণ বর্তনীকে সম্পূর্ণ করলেন। সোজা বাংলায় (!), “he invented the switch”. অর্থাৎ, বিদ্যুতের শক্তিকে সাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কাজে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিলেন তিনি।

স্মরণশক্তি আর বিষণ্ণতা সংক্রান্ত সমস্যা


৪৯ বছর বয়সে ফ্যারাডে স্মৃতিশক্তিজনিত অসুস্থতার মুখোমুখি হলেন। তার স্মরণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লো। অনেক সময় অনেক কিছু তিনি মনে করতে পারতেন না। এজন্য তার মধ্যে প্রচণ্ড বিষণ্নতা তৈরি হলো। হবারই কথা! তিনি একজন বিজ্ঞানী, মস্তিষ্ক তার হাতিয়ার। আর সেই হাতিয়ারই কিনা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলো। ফ্যারাডে কি এখানেই দমে যাবেন?

তিনি সম্পূর্ণ সেরে ওঠেননি কখনোই। কিন্তু তার সবচেয়ে মহান আবিষ্কারগুলো, যেগুলো আমরা এখনো পড়ি, সেগুলো কিন্তু আরো পরের কথা!

তিন শক্তির বন্ধন


ইতোপূর্বে আমরা জানলাম যে, ফ্যারাডে বিদ্যুৎ আর চৌম্বক বলের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করেছিলেন। এই দুটো বল (force) মিলে হচ্ছে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বা তাড়িত-চৌম্বক বল। কিন্তু এই দুই বল কি অন্য কোনোকিছুর সাথে সম্পর্কিত? তিনি তিন ধরনের শক্তির (energy) মধ্যে সম্পর্ক আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। তৃতীয় শক্তিটার নাম ছিলো আলো। তিনি দেখতে চাইলেন ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বল প্রয়োগ করে পোলারাইজড আলোকরশ্মিকে বাঁকিয়ে দেয়া যায় কিনা। তিনি একের পর এক পরীক্ষা করলেন। তিনি দেখলেন, সাধারণ বায়ু বা শূন্য মাধ্যমে চলা আলোকে বাঁকানো যাচ্ছে না। তাই তিনি আর অনেক অনেক মাধ্যম ব্যবহার করলেন। আলোকে সেগুলোর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করে চৌম্বকক্ষেত্র দিয়ে বাঁকাতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। বিভিন্ন গ্যাস নিয়ে চেষ্টা করলেন, তরল (এমনকি অ্যাসিড) নিয়ে চেষ্টা করলেন; পারলেন না। অনেকটা বেপরোয়া হয়ে, মাধ্যমের জায়গায় বসিয়ে দিলেন নিজের ব্যর্থতার স্মৃতিচিহ্নটিকে, সেই কাঁচের বিস্কিটটিকে। মনে আছে তো সেটার কথা? যাই হোক, সেটার মধ্যে দিয়ে গমন করে আলো তার গতিপথ পালটে নিলো! এই পরীক্ষার ফলাফল কেন মানবজাতির জন্য মহা গুরুত্বপূর্ণ?

এই কারণে যে, এর মাধ্যমেই আমরা প্রকৃতির উপাদানগুলো যে আসলে একে অপরের সাথে কতটা গভীরভাবে সংযুক্ত, সেটা বুঝতে পারলাম। ব্রহ্মাণ্ডের আদি শক্তিগুলোর মধ্যে যে কী লীলাখেলা চলে, তা তিনি দেখিয়ে দিলেন। এই আবিষ্কারটাই আইনস্টাইন, হাবল, লেমিত্রের আবিষ্কারগুলোর পথ সুগম করে দিয়েছিলো।

চৌম্বকক্ষেত্র এবং চৌম্বক বলরেখার আবিষ্কার


কেন চুম্বক জিনিসটা সবসময় উত্তর-দক্ষিণ হয়ে থাকে – এটা নিয়ে মানুষ ভেবেছে সবসময়ই। লোহার গুঁড়াকে চুম্বকের ওপর ছড়িয়ে দিলে যে এমন একটা আকৃতি ধারণ করে, এটাও জানা ছিলো।

magneticfields

কিন্তু কেন এমন হয়, কেউ জানতো না। ফ্যারাডে জানতেন, ইলেকট্রিসিটি প্রবাহিত করলে তারও চুম্বকে পরিণত হয়। তিনি সেটাকে দিয়ে একই পরীক্ষা করলেন। ফলাফল আসলো এরকম।

faraday

এবার তিনি বুঝতে পারলেন, চুম্বক জিনিসটা সবসময়েই নিজের চারপাশে একটা ক্ষেত্র তৈরি করে। প্রথমে তিনি এটাকে চৌম্বক বলরেখা (magnetic lines of force), পরবর্তীতে শুধু বলরেখা (lines of force), এবং আরো পরে চৌম্বকক্ষেত্র (magnetic field) বলা শুরু করলেন।

তিনি এমন এক প্রশ্নের সমাধান দিলেন যা আইজ্যাক নিউটনকেও হতবাক করে দিয়েছিলো। নিউটন মহাকর্ষের সূত্র দিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি জানতেন না, এতো দূর থেকেও স্পর্শ না করেই মহাকর্ষ কিভাবে কাজ করে? ফ্যারাডে বললেন, ওদের মহাকর্ষের ক্ষেত্র কিন্তু ঠিকই একে অপরকে স্পর্শ করে। এজন্যেই চুম্বক, পৃথিবী নামক দানবীয় চুম্বকের বলরেখা দ্বারা প্রভাবিত হয়, এজন্যেই সে উত্তর-দক্ষিণে মুখ করে থাকে।

জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, পুরনো অতীতের ভূত


নিজের আবিষ্কারটাকে তিনি সবার কাছে প্রচার করলেন। কিন্তু সেটার পেছনে কোনো গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না। কারণ, সেই যে ছোটোবেলায় তিনি দারিদ্র্যে ভুগেছিলেন, ঐ যে তিনি স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন। গণিতের জটিলতা তিনি কখনোই বুঝে উঠতে পারেননি। তাই প্রায় সবাই ফ্যারাডের কথাগুলোকে প্রমাণ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো। কেউ কেউ খোঁচা মারতেও ছাড়লো না। এমন সময় তার সাহায্যে এগিয়ে এলেন মোটামুটি সুপরিচিত একজন তরুণ গণিতবিদ, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।

maxwell

তিনি মনে করলেন, ফ্যারাডের এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে চোখ ধাঁধানো। তিনি বসে গেলেন, এই চৌম্বকক্ষেত্রের বিস্তারটাকে একটা গাণিতিক রুপ দেয়ার জন্য। লিখে ফেললেন, On Physical Lines of Force.

Untitled

সেটার পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলেন মাইকেল ফ্যারাডের কাছে। ঠিক যেভাবে, সূদূর অতীতে স্যার হামফ্রে ডেভির কাছে তারই কাজ নিয়ে একটা বই পাঠিয়েছিলেন ফ্যারাডে। ম্যাক্সওয়েল যে ফ্যারাডের অতীত, ফ্যারাডের ভূত!

আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি, কী ভয়াবহ আবেগময় একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো তখন ফ্যারাডের মনে। কী চিন্তা করছিলেন তখন তিনি? তিনি কি কেঁদে ফেলেছিলেন? তিনি কি তার ভুলোমনের বিষণ্ণতা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়ে প্রশান্তি পেয়েছিলেন?

এই আবিষ্কারটার আরো ব্যাপকতার কথা শুনবেন? খুব শীঘ্রই ম্যাক্সওয়েল দেখলেন যে এই ক্ষেত্রটা স্থির নয়, বরং সবসময়েই ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি মুহূর্তে। সেই ছড়িয়ে পড়া প্রবাহটাকে কাজে লাগিয়েই আজ আমরা যেকোনো কিছু সরাসরি সম্প্রচার করি, তথ্য বিনিময় করি ইন্টারনেট দিয়ে। আপনি যে আমার লেখা পড়ছেন, সেটাও ঐ প্রবাহটাকে কাজে লাগিয়েই আপনার কাছে পৌঁছাচ্ছে। একটু চিন্তা করুন তো, মাইকেল ফ্যারাডে নামের এই লোকটা না জন্মালে কী হতো? বিদ্যুৎ, মোটর, অন্যান্য মেশিন হয়তো আবিষ্কার হতো একসময় না একসময়, কিন্তু আপনি বা আমি হয়তো পেতাম না।

মৃত্যু


জীবিত থাকা অবস্থায় মাইকেল ফ্যারাডেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো যে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবি (Westminster Abbey)-তে তার কবর দেয়া হবে। সেখানে ব্রিটেনের রাজা-রাণীদের কবর দেয়া হয়। সেখানে আইজ্যাক নিউটনের মত বিজ্ঞানীর মৃতদেহ রাখা আছে। তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ৭৫ বছর বয়সে, ১৮৬৭ সালের আগস্টের ২৫ তারিখে, মারা যাওয়ার পর তাকে লন্ডনের হাইগেইট সেমেটারিতে কবর দেয়া হয়। সেখানে স্ত্রী সারাহ এবং তার কবর পাশাপাশি।

মাইকেল ফ্যারাডে, আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/michael_faraday/

Tuesday, October 2, 2018

সিংগুলারিটি কি?


“Singularity” শব্দটি এসেছে ‘Singular’ শব্দ থেকে। ইংরেজী ব্যাকারণে সিংগুলার শব্দটি দ্বারা একটি ক্রিয়াশীল কর্তা-কে বুঝায় (‘one subject acting’)। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহবর এর ব্যাখ্যায় সিংগুলারিটি বলতে বুঝায় এমন একটি অবস্থা বা পয়েন্ট যেখানে সবকিছুই হয়ে যায় ‘এক’, একটি সংখ্যা; ‘একীভুতকরণ ও ফিউশান এর একটি অবস্থা’।স্পেস, টাইম এবং ম্যাটার (Unification of space, time and matter) অর্থাৎ স্থান, কাল ও বস্তুর একীভুতকরণের একটি অবস্থা; মহাবিশ্বের মৌলিক চারটি বল (Fundamental forces)গ্র্যাভেটি, ইলেকট্রো ম্যাগনেটিং ফোর্স ও শক্তিশালী এবং দূর্বল নিউক্লিয়ার ফোর্স একীভুত হয়ে তৈরী হয়ে রূপান্তরিত হয় একটি চুড়ান্ত বল-এ, যাকে বলা যায় ‘ইউনিভার্সাল প্রাইম এ্যানার্জী’ (Universal Prime Energy)। আমরা বলতে পারি, সিংগুলারিটি দ্বারা তথ্যের একটি সংখ্যাকে বুঝায়।


wormhole

 

আমরা জানি, ব্ল্যাকহোল হলো একটি নক্ষত্রের মৃত্যু বা ধ্বংসের ফলাফল। আমাদেরকে যদি সেই মৃত নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্য বা তার প্রপারটিজ খুঁজে বের করতে হয় তাহলে আমরা নিশ্চই তার ধ্বংসাবশেষ খুজঁবো। এটা বলা হয় যে ব্ল্যাকহোলের একেবারে নীচের দিকের সিংগুলারীটি হলো সেই মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ। এই সিংগুলারীটির অনেক ভর! কারণ এটি সেই নক্ষত্রের অদৃশ্য শক্তিকে ধারন করে। বস্তুত, ব্ল্যাকহোলের আকৃতি নির্ভর করে তার এই সিংগুলারীটির ভরের উপর। কাজেই সিংগুলারীটির ভর যতো বেশী হবে ব্ল্যাকহোলের আকৃতি ততো বড় হবে। ধরা যাক, প্রকৃতিতে একটি বিড়ালের মৃত্যু ঘটেছে; আমরা এটির দেহাবশেষ ঘাটাঘাটি করব বা ডিএনএ (সিংগুলারীটি) নমুনা সংগ্রহ করব সেই বিড়ালের (নক্ষত্র) ইউনিক বৈশিষ্ট্য বা প্রপারটিজ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। আরো সহজ ভাবে বলা যায়, সিংগুলারীটি হলো একটি বাক্স যেখানে একটি ব্ল্যাকহোল বা কিষ্ণগহবর তার গহবরে কি কি বস্তু গিলেছে সে সম্পর্কিত তথ্য একটি সংখ্যা (ONE NUMBER only) হিসাবে সংরক্ষিত থাকে।

কাজেই, সিংগুলারীটি হলো একটি সংখ্যা যা একটি বস্তু সম্পর্কে তথ্য ধারন করে।

কিভাবে একটি সিংগুলারীটি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে? কিভাবে হলোগ্রাফিক নীতি বা সূত্র বা নিয়ম পূর্ণভাবে কাজ করে থাকে? (একটি সিংগুলারীটি থেকে তথ্য নিয়ে একটি দ্বিমাত্রীক তলে একমাত্রিক স্ট্রিং এ বিন্যস্ত করে একটি ত্রিমাত্রীক বস্তু তৈরী করা হয়!)

এবিষয়ে ভবিষ্যতে আরও সহজ ভাষায় মজার করে লিখবার আশা রাখি……..।।।

মূল গবেষণা ও ইংরেজী ভাষায় প্রবন্ধটির স্বত্বাধিকারীঃ Jacques Lutia

Jacques Lutia দ্বারা প্রদত্ত অনুমতিতে, সহজ বাংলা ভাষায় প্রত্যয়গত অনুবাদের সর্বসত্ব সংরক্ষণেঃএ.এম. আহাদ (লিও)

black-hole-signalএখানে ব্ল্যাকহোল এর একটি ছবি দেওয়া হলো যা গুগল থেকে সংগৃহীত। ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে আরও মজার তথ্য হলো একটি ব্ল্যাকহোল এর কেন্দ্রে গ্র্যাভেটি এতো থকে যে মহাবিশ্বের কোনোকিছুই কেন্দ্রের এই গ্র্যাভেটিকে এড়িয়ে যেতে পারে না; এমনকি আলোও এই প্রবল গ্র্যাভেটি এড়িয়ে যেতে পারে না! একারণেই ব্ল্যাকহোল এর কেন্দ্র সবসময় অন্ধকার!

উৎস ঃ https://www.aparajito.com/barta/%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A6%BF-what-is-a-singularity/

Monday, October 1, 2018

আনিসুল হকের গল্প : পোস্টমাস্টার ২০১০



৬২ বছর বয়সে ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হোসেন সাহেব আবিষ্কার করলেন, বালিকা রতন আর বালিকা নেই, রমণী হয়ে গেছে। এটা আবিষ্কার করবার জন্য তাকে সেই অপরাহ্ণের জন্য অপেক্ষা করতে হলো, যখন তিনি দোরঘণ্টি বাজিয়ে নিজবাড়ির দরজা খোলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন, আর রতন স্নানঘরে ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে ভিজছিল, হঠাৎ কলবেল বেজে ওঠায় তড়িঘড়ি করে একটা জামা গায়ে চাপিয়ে সে ছুটে এসেছিল, ভেজা গায়ে পাতলা জামা ভেদ করে তার কিশোরী শরীর দুধে ভেজা পাউরুটির মতো ফুলে উঠেছিল এবং পোস্টমাস্টার জেনারেল আবুল হোসেনের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল।
কে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার গৃহপরিচারিকা রতন, নাকি কোনো অপ্সরী, আবুল হোসেন সাহেবের ধন্দ লেগেছিল। আজ থেকে আট বছর আগে আট বছর বয়সী রতন এ-বাড়িতে এসেছিল, তখন শামীমাও এ-বাড়িতেই থাকতেন। ৫৪ বছরের ডাক-কর্মকর্তা আবুল হোসেন এই নবাগতা গৃহকর্মী রতনকে নিতান্ত শিশু ছাড়া আর কিছুই ভাবেননি। তিনি শামীমাকে বলেছিলেন, ‘এই বাচ্চা মেয়েটাকে দিয়ে ঘরের কাজ করানো কি ঠিক হবে? এটা কি শিশুশ্রম হয়ে যায় না?’ শামীমা বলেছিলেন, ‘শোনো, ময়লার ঝুড়িটা নিয়ে বের হবে, রাস্তার ডাস্টবিনে তুমি ফেলবে, আমি রতনকে দিয়ে এ-কাজ করাব না। শিশুশ্রম একটু কম কম হোক।’ ওই একদিনই বিবেকের তাড়না বোধ করেছিলেন আবুল হোসেন সাহেব, এরপরে আট বছরের শিশুটি যে তাদের বাসায় রয়ে গেল, মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে ঘুমায়, এটা-ওটা কাজ করে, মেঝেতে পিঁড়ি পেতে বসে ভাত খায়, সেটা তার কাছে হয়ে গেল একটা স্বাভাবিক দৃশ্য। একটা ছুটা বুয়াও ছিল, সকালে এসে ঘরদোর ঝাড়মোছ করত, কাপড়চোপড় ধুয়ে দিয়ে যেত।বছরছয়েক আগে, আবুল হোসেনের বয়স তখন ৫৬, আর হিসাব করলেই বেরিয়ে আসে যে, রতনের বয়স তখন ১০, শামীমা আমেরিকা চলে যান। আমেরিকায় তার একমাত্র ছেলে মিল্টন আছে, লস অ্যাঞ্জেলেসে, মিল্টনের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে, তাকে দেখভাল করার কেউ নেই। কাজেই ‘মা আসো মা আসো’ বলে মিল্টন, আর ‘মা আসেন মা আসেন’ বলে মিল্টনের বউ সাবরিনা শামীমার কান ঝালাপালা করে ফেলতে থাকলে শামীমা ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়ান এবং একদিন ভিসা পেয়ে গেলে শামীমা স্বামীকে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম ভিসা পাব না, কতজনই তো ভিসা পায় না, তাই ভেবেছিলাম আমারটাও হবে না, আমার আমেরিকা যাওয়াও লাগবে না; এখন ভিসা হয়ে গেছে, এখন আমি কী করি?’ কী আর করবেন শামীমা, আমেরিকা চলে যান নাতির মুখ-দর্শনের জন্য। বলে যান, ‘চিন্তা করো না, বুয়া আসবে সকাল-বিকাল, আমি বুয়াকে বলে যাচ্ছি, আর রতন তো রইলই। ও এখন অনেক কাজ পারে, তোমাকে চা করে দিতে পারবে, লাগলে ভাতও রাঁধতে পারবে, খুব সুন্দর ডাল রাঁধে জানো!’সেই থেকে শ্যাওড়াপাড়ার এই দোতলার বাসার দোতলায় আবুল হোসেন সাহেব একাই থাকেন। আর সঙ্গে থাকে বালিকা রতন। এক মাসের জন্য গিয়েছিলেন শামীমা, আজ ছয় বছর, তিনি আর ফিরে আসেননি। রতনটাও যে বড় হয়ে গেছে, সেটাও আবুল হোসেন সাহেব বুঝতে পারেননি।

কিন্তু একদিন, খুবই হঠাৎ করেই, পেনশনের টাকা তুলে বেলা ৩টার দিকে বাসায় ফিরে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে দোরঘণ্টি বাজিয়ে সামনে একটা অপ্সরা, তার সাদা ভেজা জামা, আর জামার আড়ালে স্তনাভাস, কালো ঘের, বৃন্ত-উন্নতি ইত্যাদি তাকে এক নতুন উপলব্ধির জগতে নিয়ে যায়।

তিনি বুঝতে পারেন, তার শরীর শিরশির করছে।

কিন্তু বালিকা রতন রমণীর স্থান অধিকার করলেও জননীর স্থান অধিকার করে না। কারণ আবুল হোসেন সাহেবের জ্বর আসে না। তার ললাট তপ্ত হয় না, কাজেই শাঁখাপরা হাতের স্পর্শ পাওয়ার প্রয়োজন হয় না। ঘটনা ঘটে উলটো। রতনেরই একদিন জ্বরজ্বর লাগে, প্রথমে হাঁচি আর পরে সে কাশি দিতে থাকে, তখন সে দুপুরবেলায় মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে পড়ে, আর অনেকক্ষণ পড়ে থাকে, রোদ মরে আসে পশ্চিমের জানালায়, তবু সে ওঠে না। তখন আবুল হোসেন সাহেবই রতনের কাছে যান, রতনের শয্যাপাশে মেঝেতে বসেন, হাত দিয়ে রতনের কপালের জ্বর অনুভব করার চেষ্টা করেন, রতন চোখ মেলে না, অস্ফুট স্বরে বলে, নানা...

আবুল হোসেন সাহেব প্রথমে কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপেন, তারপর রতনের গলায় হাত দেন, এখানে তাপ আরেকটু বেশি, তারপর জামার ভেতরে হাত দিয়ে দেখেন, সেখানটা একেবারে গরম ভাতের হাঁড়ির মতো গরম, তিনি হাতটা রতনের একটা স্তনের ওপরে রেখে দেন, তার মনে হয়, তার হাতের মধ্যে একটা কবুতরের বুক কাঁপছে। তারপর হুঁশ হলে তিনি ছুটে যান প্যারাসিটামল কেনার জন্য।

আবুল হোসেন খুব যতœ করেন রতনের। রতনকে এমনকি ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে স্পঞ্জ পর্যন্ত করে দেন। তারপর তাকে বলেন, এই জ্বর নিয়ে তোকে আর মেঝেতে শুতে হবে না, তুই আমার সঙ্গে আমার ঘরে শো, না হলে কারেন্ট চলে গেলে জেনারেটরের লাইন এইখানে থাকবে না, জ্বরের মধ্যে তোর কষ্ট হবে।

রতন আবুল হোসেন সাহেবের শোবার ঘরের মেঝেতে নিজের জায়গা করে নেয়। জ্বর সেরে গেলে প্রায় প্রতিদিনই আধঘণ্টার জন্য আবুল হোসেন সাহেবের বিছানাতেও তার জায়গা হতে থাকে। আবুল হোসেন সাহেবকে এই সময় জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে হয়। স্ত্রী বিদেশে থাকা অবস্থাতেও একটা পুরো বাক্স কনডম কিনে আনতে হয়। ওষুধের দোকানের ছেলেটা অবশ্য কোনো প্রশ্ন করে না। প্রশ্ন যাতে সে না করতে পারে সেজন্যেই তিনি তার বাসা থেকে দূরবর্তী একটা অপরিচিত দোকানেই গমন করেন।

রতন তার নতুন মর্যাদা ভীষণ উপভোগ করে। কাজের বুয়াটা বদলে গেছে, নতুন বুয়াটা আরো বৃদ্ধা, তাই তার কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই এ-বাড়িতে, যেটা কিনা রতনের আছে। নানা তাকে কানের দুল কিনে দিয়েছেন, তাকে শাড়ি কিনে দেন, তার জন্য ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি কিনে আনেন, এমনকি তার পিঠে ব্যথার কথা জানতে পেরে পিঠও টিপে দেন।

আবুল হোসেন সাহেবও ৬২ বছর বয়সে ১৬ বছরের কিশোরীর প্রেমে পড়ে আকাশে উড়তে থাকেন। তার দিনরাত্রিগুলো রতনময় হয়ে ওঠে।

শামীমা যে ফিরতে পারেন না, সেটা তার নিজের ইচ্ছায় নয়। মিল্টন তার পাসপোর্ট আটকে রাখে, এবং বারবার করে তার ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করে এবং সফল হয়। শামীমা প্রতি রোববার রাতে ঢাকায় ফোন করেন এবং খোঁজখবর নেন। স্বামীকে কতদিন দেখেন না তিনি, তার খুব কান্না পায় এবং ফোনে তিনি কান্নাকাটিও করেন। তিনি বলেন, মিল্টন বলেছে, তার মেয়েটাকে স্কুলে দিলেই আমার ঢাকা যাওয়ার টিকিট করে দেবে। আর তিন মাস।

আবুল হোসেন মনে মনে বলেন, সাবরিনার আরেকটা বাচ্চা হোক, শামীমা আরো অনেকদিন থাকুক আমেরিকাতেই, রতনকে নিয়ে রিটায়ার্ড পোস্টমাস্টার জেনারেল মহাসুখে আছেন। এমনকি তিনি একদিন ভায়াগ্রা কিনে এনে তার সিকিভাগ খেয়েও দেখেছেন। জীবনটা বড়ই সুখেই যাচ্ছে।

সুখ চিরস্থায়ী হয় না। শামীমা ফিরে আসেন। রতন আবার ডাইনিং রুমের মেঝের দিনগুলোয় ফিরে যেতে বাধ্য হয়। আর আবুল হোসেন রাতের বেলা ঘুম ভাঙলে দেখেন একজন মোটা বৃদ্ধা চিৎ হয়ে মৃত তেলাপোকার মতো তার পাশে শুয়ে আছে। তিনি অস্থির বোধ করেন।

প্রেম এমন একটা জিনিস, যা গোপন করে রাখা যায় না। রতনের সঙ্গে আবুল হোসেনের পরিণয়টা শামীমা অচিরেই আবিষ্কার করে ফেলেন এবং কান্নাকাটি করতে থাকেন। আবুল হোসেন বাথরুমে গিয়ে রতনের জন্য অশ্র“ বিসর্জন করেন। সেটা শামীমা টের পান না। কিন্তু রতনের ট্রাংক খুলে শাড়ি-গয়নার বাহার দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। মোটা মানুষ! পড়ে যাওয়ার শব্দটা এত জোরে হয় যে, নিচতলার ভাড়াটের বউ পর্যন্ত দৌড়ে আসে দোতলায় কী ঘটল তা জানার জন্য।

এ পর্যন্তও হয়তো সহ্য হতো। একদিন রাত ৩টায় ঘুম ভেঙে গেলে শামীমা দেখেন তার পাশে তার স্বামীধন নেই, তিনি বিছানা ছাড়েন, রান্নাঘরের দিকে যান, এবং দেখতে পান, ডাইনিং স্পেসের মেঝেতে অর্ধনগ্ন আবুল হোসেন ও রতন বিভোর হয়ে গলা জড়াজড়ি করে ঘুমুচ্ছে।

তিনি রতনকে পরের দিন সকালবেলা পত্রপাঠ বিদায় করেন।

আবুল হোসেন প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। তিনি চুপচাপ বসে থাকেন। এবং খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করেন। তার মনে হয়, যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে নিয়ে আসি। তখন ফ্যানের বাতাসে তার মনে একটা চিরপুরাতন তত্ত্ব উদিত হয়। তিনি নিজেকে বলেন, গিয়া ফল কী? জগতে কে কাহার?

কিন্তু রতন এত সহজেই দমিত হয় না। সে তার নানাকে ভীষণ ভালোবাসে। নানাকে কতদিন দেখি না, তিনদিনের দিনই তার মনে এ-হাহাকার তীব্রভাবে দেখা দেয়। সে নানাকে ফোন করে। নানা তখন রতনের নানির সামনে। তিনি ফোন কেটে দেন। পরে তিনি আবারো বাথরুমে গমন করেন এবং কমোডের ওপরে বসে সর্বশেষ আসা নম্বরটায় কল করেন।

‘হ্যালো নানা!’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি কেমন আছেন?’

‘খুব খারাপ! তোর জন্য মনটা পোড়ে। তুই কেমন আছিস?’

‘নানা, আপনারে ছাড়া আমি বাঁচুম না।’ মোবাইল ফোনে রতনের কান্না শোনা যায়।

‘তুই এখন রাখ। তোর নানি আছে।’

আবুল হোসেন সাহেব ঘেমে-নেয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসেন।

তারা গোপনে গোপনে কথা বলা ও এসএমএস চালাচালি করতে থাকেন। রতন অশিক্ষিত হলেও কীভাবে টেক্সট মেসেজ পাঠাতে সক্ষম হয়, তা সে জানে।

কিন্তু এইখানে, প্রিয় পাঠক, আমরা একবার শামীমার কথাটাও ভাবিব। শামীমা বড় আশা করিয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল স্বামীর নিকট। আমেরিকার দিবস-রজনীগুলি তাহার নিকট বিষবৎ বোধ হইত। সারাদিন ওই অচেনা-অজানা পরিবেশে একা একা থাকা তাহার অসহ্য বোধ হইত। মিল্টনের ছেলে আসওয়াদ ও মেয়ে আবরিনা একটু বড় হইলে পরে তবু তাহাদের লইয়াই ব্যতিব্যস্ত থাকা যাইত। তাহা সত্ত্বেও শামীমার নিকট নিজেকে কাজের মেয়ে ছাড়া আর বেশি কিছু মনে হয় নাই। বহুদিন মনে হইয়াছে, তিনি নাইন ওয়ান ওয়ানে ফোন করিবেন, পুলিশ আসিলে তিনি বলিবেন, তিনি বন্দিনী, তাহার মুক্তির একটা ব্যবস্থা পুলিশ করিয়া দিক। আমেরিকায় বহু বছর থাকিয়া তিনি নাইন ওয়ান ওয়ানে ফোন করিবার মতো কেতাও কিছু শিখিয়া ফেলিয়াছিলেন। তিনি সর্বদা স্বপ্ন দেখিতেন, দেশে ফিরিয়া যাইবেন, নিজের সংসারের হাল ধরিবেন। এইখানে পুত্রবধূর সংসার তাহার কাছে কারাগারের মতো মনে হইত।

আমেরিকায় পুত্রের বাটিতে নিজেকে তাহার মনে হইত ক্রীতদাসী, আর এখন এইখানে নিজের সংসারে ফিরিয়া আসিয়া তাহার মনে হইল, তাহার জীবন দাসীরও অধম। একজন দাসীর যাহা আছে, তাহা তাহার নাই। যৌবনই কি তাহা হইলে নারীর একমাত্র সহায়। যৌবন নাই তো নারীর কিছুই নাই?

অতঃপর শামীমা ও তাহার স্বামী পোস্টমাস্টার জেনারেল (রিটায়ার্ড) আবুল হোসেন দুজনেই জায়নামাজে বসিয়া একই প্রার্থনা করিতেন, হে পরওয়ারদিগার, উহাকে তুলিয়া লহো। কতজনেই তো মরে। আমার স্বামী/স্ত্রী কেন মরে না?

আবুল হোসেন মারা গেলে বিষয়-সম্পত্তি যা আছে, তা দিয়ে শামীমার দিন ভালোই চলে যাবে, শামীমা হিসাব কষেন। শামীমা মারা গেলে রতনকে নিয়ে এসে আমি স্বর্গখেলনা রচনা করতে পারব, আবুল হোসেন আকাশকুসুম চয়ন করেন।

রতনের ফোন আসে। আবুল হোসেন সকালবেলা হাঁটতে গিয়ে কলটা রিসিভ করেন। রতন বলে, নানা, আমারে বিয়া করেন।

আবুল হোসেন জবাব দেন, সে কী করে হবে?

ব্যাপারটা যে কী কী কারণে অসম্ভব কিশোরীকে বোঝানোর প্রয়োজন তিনি বোধ করেন না। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে তিনি পরিষ্কার, বাংলাদেশের আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করা অসম্ভব। একটা উপায় আছে, শামীমাকে ডিভোর্স দেওয়া। কিন্তু এ-বয়সে এসে মানী লোকের মান তো আর বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া চলে না।

কাজেই আবুল মোনাজাত করেন, হে আল্লাহ, শামীমারে তুলে নাও।

কাজেই শামীমা জায়নামাজে বসে কান্নাকাটি করেন, হে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, বুড়াটা মরে না কেন?

এই দুই প্রার্থনার মধ্যে আল্লাহতালা শামীমার প্রার্থনাটাই পূরণ করেন। কেন করেন, তা আমরা জানি না। আর আবুল হোসেনের মোনাজাত কেন তিনি পূর্ণ করেন না, তিনিই জানেন। বিধাতার লীলা আমাদের পক্ষে অনুধাবন করা সত্যিই কষ্টকর। তবে, আমাদের মনে হয়, আল্লাহ যা করেন ভালোই করেন। শামীমা আগে মারা গেলে আবুল হোসেন রতনকে ঘরে আনতেন। ঘরে আনলে রতন বিয়ের জন্য চাপ দিতে পারত। বলা যায় না, কনডম ফুটো করে পেটে বাচ্চা বাঁধিয়ে ফেলে শেষমেশ বিয়ের পিঁড়িতে বসতে আবুল হোসেনকে বাধ্য করেও ছাড়তে পারত।

আমরা রতনকে এ-কথা জিগ্যেস করি নাই, রতন হয়তো তার প্রিয় নানাকে ব্ল্যাকমেইল নাও করতে পারত। তবে প্রেমে ও যুদ্ধে নৈতিকতা বলতেও তো কিছু নাই।

আবুল হোসেন সকালবেলা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। শ্যাওড়াপাড়ার আকাশে ছিল কালো মেঘ, দোতলা বাড়ির পেছনের নিমগাছগুলো বাদল-বাতাসে মাথা দোলাচ্ছিল। সামনের বড় রাস্তায় পানি জমে গিয়েছিল।

রতন টেলিভিশনে একটা বাংলা সিনেমা দেখছিল তার বস্তিঘরে বসে। সিনেমার নাম বাবা কেন চাকর। ছবির নিচে স্ক্রলে হঠাৎ খবর ওঠে, সাবেক পোস্টমাস্টার জেনারেল আবুল হোসেন আজ সকালে হৃদরোগের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)।

রতনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তখন সত্যি সত্যি ভীষণ জোরে দেওয়া ডেকেও ওঠে। একহাঁটু পানি মাড়িয়ে রতন শ্যাওড়াপাড়ার ওই দোতলা বাড়ির দিকে রওনা হয়।

লাশ তখন বাড়ির নিচতলার গ্যারাজে রাখা হয়েছে। পাড়ার মসজিদ থেকে আনা খাটিয়ায় যে-চাদরটার নিচে আবুল হোসেন শুয়ে আছে, সে-চাদরটা রতনের খুব চেনা। আগরবাতি জ্বলছে। দু-একজন আত্মীয়স্বজন ও পাড়ার লোকজন ভিড় করতে শুরু করেছে। একটা আরএফএল প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে একটা অল্পবয়সী হুজুর দুলে দুলে কোরান শরিফ পাঠ করছে।

রতন চাদরটা সরিয়ে তার নানার শরীরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সে বলতে থাকে, নানা, নানা, আপনি চইলা গেলেন, নানির জন্য বাড়ি রাইখা গেলেন, আমার লাইগা কী থুয়া গেলেন। আপনি যান, আমার দুঃখ নাই, খালি আমারে আপনার সাথে নিয়া যান। আমি আপনার সাথে কবরে যাইতে চাই।

নিচতলার ভাড়াটে কাশেম সাহেব রতনের ডানা ধরে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। রতন বাধা মানতে চায় না। ‘আমি আমার নানার লগে যামু। আমি আমার নানার লগে যামু।’ রতন ডুকরে কেঁদে ওঠে।

কাশেম সাহেব চোখ মোছেন। আহারে, পোস্টমাস্টার সাব তার এই নাতনিটারে একেরে নিজের নাতনির মতোই আদর করত।

রতন ফিরে আসে। বৃষ্টি আরো বেড়ে গেছে। শ্যাওড়াপাড়ার রাস্তা জলে থইথই করছে। একটা রিকশা একটা ড্রেনে পড়ে কাত হয়ে গেছে, তার সিট সমান পানি।

কোমরপানি মাড়িয়ে রতন ফিরে আসে, তার মনে কোনো তত্ত্বের উদয় হয় কি-না, আমরা জানি না। আকাশে তখন বিজলি চমকায়। ইলেকট্রিক তারে কাক কা-কা করে ডেকে ওঠে।




জেরোম কে জেরোমের গল্প : ঘড়ি


অনুবাদ // এমদাদ রহমান

 

দুই জাতের ঘড়ি আছে। তাদের মধ্যে এক জাত, সব সময়ই ভুল সময় নির্দেশ করে, এবং এই ভুল সম্পর্কে তাদের থাকে নির্ভুল ধারণা। সময়কে ভুল করে দেখাবার মধ্যেই যেন তাদের সমস্ত মহিমা। অন্য জাতের ঘড়িগুলো, যখনই তাদের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়, তখনই তারা ভুল করতে থাকে। ঘড়িগুলি আরও বেশি ভুল করবে যখন কেউ এই কথা ভাববে—সভ্য দেশগুলির ঘড়ি সব সময়ই নির্ভুল।


ঠিক এরকমই একটা ঘড়ির কথা আমি মনে করতে পারি। যখন আমি নিতান্তই এক বালক। এক প্রচণ্ড শীতের রাতে ভোর তিনটের দিকে ঘড়িটা চিৎকার করে আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল। আমরা সকালের জলখাবার শেষ করেছিলাম দশ মিনিটের জায়গায় মাত্র চার মিনিটে, পাঁচ মিনিটের একটু পর পৌঁছে গিয়েছিলাম আমার ইশকুলে, বসে পড়েছিলাম সিঁড়ির ধাপে আর ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করছিলাম। মনে হয়েছিল পৃথিবী তার অন্তিমে পৌঁছে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে; চারপাশের সবকিছু ছিল মৃতদেহের মতো নিশ্চুপ, দণ্ডায়মান।

আমাদের পরিচিত একজনের ঠিক এরকম একটি ঘড়ি ছিল। স্বর্গ-বিষয়ে তার মারাত্মক ধরনের বিপন্নতা ছিল, যে-বিপন্নতা তাকে মাসের পর মাস আচ্ছন্ন করে রাখত। যখন সে তার স্বপ্নগুলোর বর্ণনা দিত, শুনে মনে হত বাস্তব পৃথিবীটা তার কাছে এক ঘোরলাগা আচ্ছন্নতা ছাড়া আর কিছু নয়। তার কাছে জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল— শুধুমাত্র একটা ঘড়ির কারণে— চলন্ত রেলগাড়িকে ধরার জন্য বিধ্বস্ত হতে হতেও ধরবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে লোকটির স্বপ্ন দেখার নির্দিষ্ট সময় বজায় থাকল। সূর্য যেভাবে সকাল-সন্ধ্যা-বিকেল-রাত্রি নির্দেশ করে, ঠিক সেভাবে তার অদ্ভুত ঘড়িটি তার স্বপ্ন দেখবার সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল।

বিষয়টি শিশুদের পবিত্র হাসির কথা মনে করিয়ে দিত, যার মাঝে আত্মার শুদ্ধতা আছে। যেমন, কোন একদিন সকালে, বাড়ির প্যাসেজে তোমার চারপাশে পরিবারের সবাইকে জড়ো করলে, চুম্বন করলে তোমার সন্তানদের কপালে, হাতের আঙুল ছোঁয়ালে তাদের চোখে, তারপর প্রতিজ্ঞা করলে যে আর কোনদিনই রান্না করবার কয়লা আনতে ভুলে যাবে না। অবশেষে হাত নেড়ে, মমতাময় দৃষ্টিতে তাদের বিদায় জানালে আর ছাতামাথায় স্টেশনের উদ্দ্যেশে চলে গেলে।

অথচ আমি কখনই এই বিষয়টা ভাবতে পারি না,-- আমার পক্ষে এই গোঁ ধরা, যা অস্বস্তিকর— তোমার গতির চেয়ে দুই মাইলের বেশি এগিয়ে গিয়ে এটা আবিষ্কার করাঃ এক ঘণ্টার চারভাগের তিনভাগ সময়ের আগেই তুমি স্টেশনে পৌঁছে গেছ (প্রত্যাশার চেয়ে কতই-না দ্রুত!), অথবা ধীরে সুস্থ্যে ব্যস্ততাহীন পদচারণা করেছ পুরটা পথ, এবং স্টেশনের বুকিং অফিসের বাইরে ইতস্তত কালক্ষেপন করছ, নয়তো আশেপাশে ঘুরতে-থাকা স্থানীয় কিছু নির্বোধ লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলছ, অসতর্ক হামবড়া ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ প্ল্যাটফরমে আর কেবল তখনই তুমি দেখতে পেলে— ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে! অন্য জাতের ঘড়িগুলি— খুবই সাধারণ কিংবা সব সময়েই ভুল করে যারা— যথেষ্টই শান্তশিষ্ট। তারা তোমার ক্ষতি করবে না। তুমি তাদের দম দিয়ে, —যখন ঘড়িগুলি যাপন করছে জীবনের প্রকৃত অবসর— সপ্তায় এক বা দুইবার ঠিকঠাক করে চলতে পারার মত ‘জীবন্ত’ করে রাখো (এবং তুমি যেভাবে লন্ডন টম-ক্যাটটাকেও ‘নিয়মিত’ চলার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাও।) কিন্তু তুমি যে এসব করছ, তা কোনও আত্মপরায়ণ অভিপ্রায় থেকে জেগে উঠে না, এটা তৈরি হয় ঘড়িগুলির নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে, তুমি এটা শুধু অনুভবই করতে পার, যে-কোনকিছুই ঘটতে পারে, তুমি এর দ্বারা যথোপযুক্ত কাজটিই করেছ, তাতে তোমার ভিতর কোনও অপরাধবোধ জেগে উঠবে না বা অপরাধী হিসাবে শাস্তিও ভোগ করতে হবে না।

যতদূর বোঝা যায়, কোন কিছু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য— যা তুমি কখনই কল্পনা কর না এবং তাতে তুমি বিন্দুমাত্র দুঃখিত বা হতাশও নও— তুমি মেয়েটির কাছে জানতে চাইলেঃ এখন কয়টা বাজে?

মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে জানাল— হ্যা, খাবারঘরের ঘড়িতে দেখতে পাচ্ছি দুটো বেজে পনের মিনিট।

এরকম উত্তরে তুমি কিন্তু কোনভাবেই বিভ্রান্ত হবে না। খুবই মামুলি একটা বিষয় হিসাবে এটাকে বিবেচনা করবে। হয়তো কোন এক জায়গায় তখন সবেমাত্র বিকাল হয়েছে। শুধু এটা মনে করবে যে তুমি কৌতূহলোদ্দীপক পারিপার্শ্বিক অবস্থার সবকিছু সম্পর্কেই যথেষ্ট সতর্ক আছ আর ঘড়িটি চারটা থেকে মাত্র চল্লিশ মিনিট এগিয়েছে। তুমি খুব শান্তভাবে তার শক্তি ও ক্ষমতাকে শ্রদ্ধা জানাবে এবং অবাক হবে এই সবকিছু কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে সেই কথা ভেবে।

স্বয়ং আমি এমন একটি ঘড়ির অধিকারী হয়েছিলাম, যা ছিল জতিলতায় পূর্ণ, দুর্বোধ্য, গতানুগতিকতা মুক্ত এবং আনন্দচ্ছ্বল। আমি ভেবেছিলাম ঘড়িটা দ্রাঘিমারেখার যেকোনো অবস্থানকেই নির্দেশ করতে পারে। উপকূল থেকে জলপথে যাত্রার উপযুক্ত মুহূর্ত-নির্ণায়ক ঘড়ি হিসাবে তার কাছে আমার যতটুকু প্রত্যাশা, তা না মিটিয়ে সে কাজে বিরত থাকত, তবে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, সে তার কাজকে কেবল এক স্বয়ংক্রিয় ধাঁধা হিসাবেই বিবেচনা করত। ধাঁধাগুলি বিচিত্র কৌতূহল ও আকর্ষণে ভরপুর।

একবার আমি এক লোকের কাছে শুনেছিলাম যে তার এমন একটি ঘড়ি ছিল, শুধু সে ছাড়া আর কারো জন্যই সেটা উপকারী যন্ত্র ছিল না। সে-ই ছিল সবচে ব্যতিক্রমী মানুষ, যে ঘড়িটার মতিগতি সম্পর্কে ধারণা করতে পেরেছিল। লোকটা আমায় বলেছিল— এটা এমন এক চমৎকার যন্ত্র, যার ওপর তুমি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নির্ভর করতে পারবে, তবে তোমাকে এর চারিত্রিক কায়দা সম্পর্কে অর্জন করতে হবে পর্যাপ্ত জ্ঞান। কোনও আগন্তুক ঘড়িটির দ্বারা খুব সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে, যেমন ধরেন, সে বলে চলল, ঘড়িটা যখন পনের বার অ্যালার্ম দেয় কিন্তু তার কাঁটাগুলি নির্দেশ করে এগারটা বেজে বিশ, আমি বুঝতে পারি, সে আসলে নির্দেশ করছে আটটা বাজতে আর মিনিট পনের বাকি। ঘড়ি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দায়সারা গোছের যেকোনো পর্যবেক্ষকের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা দিতে পেরেছিল লোকটিকে।

কিন্তু আমার ঘড়িটি নিয়ে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর বিষয় হল এর বিশ্বাসযোগ্য অনিশ্চয়তা। সুশৃঙ্খল কোন নিয়মেই সে কাজ চালাতে পারত না, তাতে এই জগৎসংসারে যত উলটপালটই ঘটুক না কেন। তাকে মনে হত বিশুদ্ধ আবেগে আক্রান্ত একটা ঘড়ি! একদিন আমার অদ্ভুত ঘড়িটা লীলাচঞ্চল হয়ে পড়েছিল। পৃথিবীতে স্বাভাবিক নিয়মে ভোর হবার তিনঘণ্টা আগেই রাতটাকে সে ভোর করে দিয়েছিল!

সে ছিল ভোর থেকে তিন ঘণ্টা এগিয়ে আর এটা নিয়ে তার মনে কোনও বিকার ছিল না। পরের দিন সে ইচ্ছা করল নিজেকে আর বাঁচতে দিবে না। পরিকল্পনামত কাজও শুরু করে দিল সে। প্রতি চার ঘণ্টার ভিতর থেকে দুই ঘণ্টা সময় সে হারিয়ে ফেলল, যা ছিল অপ্রত্যাশিতরকম শোচনীয় একটা ব্যাপার। বিকালের দিকে তার যাবতীয় কাজকর্ম বন্ধ হল। তারপর, সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে আসছিল, ঘড়িটি হঠাৎ আনন্দে অস্থির—স্বতঃপ্রণোদিত যন্ত্রটি পুনরায় কালের চক্রে আবর্তিত হতে শুরু করল।

ঘড়ি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আমি কোনোকিছুকেই গ্রাহ্য করব না, কারণ যখনই এই ব্যাপারে আমি আমার সাদামাটা উপলব্ধি প্রকাশ করতে যাব, আমি নিশ্চিত যে লোকে বলবে আমি অতিরঞ্জন করছি।

কোনোকিছুকে খুঁড়ে খুঁড়ে বের করার পক্ষে এটা খুবই হতাশাজনক, কারণ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য তোমার স্নায়ুগুলি এমনভাবে উন্মুখ হয়ে থাকে যে লোকে তোমাকে বিশ্বাসই করবে না। তোমার শুধু মনে হবে অতিরঞ্জন করছ।

এটা আমি প্রায় সময়ই অনুভব করি— ভিতরে প্রলোভন জাগছে। স্বয়ং নিজের জন্যই এই জেগে-ওঠা। এ হল নিজেকে বাঁচাবার একটা কৌশল, যা জন্মের পরেই মানুষ আত্মস্থ করে নেয় আর সারাজীবন বয়ে বেড়ায়।

আমরা সব সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকি যেন কোনভাবেই অতিকথন বা অতরঞ্জনের পথ উন্মুক্ত না হয়। এটা এমন এক আচরণ, যা যেকোনো মুহূর্তে নিজেদের ভিতর থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেগে উঠতে পারে। এটা অবশ্যই কুরুচিপূর্ণ আচরণগুলিরও একটি। পুরনো দিনগুলোয় কবি আর ব্যবসায়ীরা অতিকথন করত। তাতে লুকানো থাকত কিছুটা চাতুরী এবং অতিকথনের শিল্পটাকে প্রকাশ করবার খ্যাতি। আরও যথাযথভাবে বলতে গেলে, স্রেফ বাস্তবতার নগ্নতাকে অগ্রাহ্য করা। আজ কিন্তু সকলেই অতিকথনে ব্যস্ত।

অতিকথনের সৌন্দর্য প্রকাশের বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকার মত কোনও বিষয় নয়, বরং জীবনের পক্ষে জরুরি একটা উপাদান, যা কি-না জীবনে টিকে থাকার যুদ্ধে আবশ্যকীয় বিষয় হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

পুরা দুনিয়াটাই অতিরঞ্জত। সব কিছুকেই অতিরঞ্জিত করা হয়েছে— সাইকেল বিক্রির পরিমাণ থেকে বাৎসরিক ধর্মান্তরিতকরণ— সবকিছুকেই, এমনকি পাপের অনিবার্য পরিণাম থেকে উদ্ধার পাওয়া এবং হুইস্কির মত কড়া মদকেও।

অতিকথনই আমাদের যাবতীয় ব্যবসায়-বাণিজ্যের বুনিয়াদ। আমাদের শিল্পসাহিত্যের পতিতজমি। সামাজিক জীবন-সূচনার মূল অংশ। আমাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ভিত্তি। বিদ্যালয়পড়ুয়া বালক হিসাবে আমরা অতিরঞ্জিত করি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে, আমাদের ফলাফলকে, আমাদের ঋণ-জর্জরিত পিতাদের। মানুষ হয়ে জন্মানোর পরও আমরা অতিরঞ্জিত করি আমাদের উৎপাদিত পণ্যগুলিকে। অতিরঞ্জিত করি আমাদের অনুভবগুলিকে, এমনকি অর্থের উৎসকেও। শুধু কর আদায়কারীর বিষয়টা ব্যতিক্রম। তার কাছে অতিরঞ্জিত করি আমাদের যাবতীয় ব্যয়কে। আমরা অতিরঞ্জিত করি আমাদের গুণগুলিকে, এমনকি আমাদের যাবতীয় ব্যভিচারকেও।

অতিকথনের অভিনয় করতে করতে আমরা পঙ্খিলতার অতলে তলিয়ে গেছি, জীবন ভরে ফেলেছি ঝুরি ঝুরি মিথ্যা দিয়ে, পরম আনন্দের সঙ্গে। আমরা এর নাম দিয়েছি ‘যা ইচ্ছা করো এবং তা বজায় রাখো’।

যদি আমরা বছরে একশো পাউন্ডের মালিক বনে যাই, তাহলে কি দুইশ পাউন্ড বলব? ধরা যাক, আমাদের ভাঁড়ারঘর খালি হয়ে গেছে আর উনুনও জ্বলছে না, তবু আমরা সুখি হব ‘পৃথিবী’ (মানুষের অভিজ্ঞতা এবং অন্যের প্রতি প্রচণ্ড কৌতূহলী এক প্রতিবেশী) আমাদের দেড়শ পাউন্ড ধার দেবে। যেদিন এর পরিমাণ হবে পাঁচশো, আমরা লোকের কাছে গল্প করব এক হাজারের, আর অতিগুরুত্বপূর্ণ ও ভালোবাসার ‘পৃথিবী’ (ছয় বন্ধু, যাদের দুজন এখন রয়েছে ঘোড়ায়টানা গাড়িতে) সম্মত হল যে আমরা এখনি সাতশো পাউন্ড খরচ করে ফেলব, তাতে বিশ্বসংসারে যে-ঘটনাই ঘটুক না কেন, এটা বিবেচিত হবে চলতি ঋণ হিসাবে। পরিচিত কসাই আর রুটির কারিগররা খবরটি জানতে পারবে আমাদের গৃহপরিচারিকার মাধ্যমে।

কিছুক্ষণ পর, — যখন আমরা চাতুরী সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী —আমরা উচ্চাভিলাষী কাজটা করতে শুরু করলাম। আমরা ভারতীয় রাজকুমারদের মত খরচ করতে লাগলাম, অথবা, আরও যথার্থভাবে বলতে গেলে —কীভাবে টাকাকড়ি খরচ করতে হয় তার ধারণা লাভ করলাম। কারণ আমরা জানতাম সময়ের ভিতর দৃশ্যের বিদ্যমানতা —কীভাবে নিজেদের বিত্তশালী হিসাবে প্রদর্শন করা যায় আর দেখানো যায় কাড়ি কাড়ি মুদ্রা ঝকমক করছে। হে সুপ্রিয় প্রাচীন পৃথিবী, বালজিবাব তোমাকে আশীর্বাদ করুন। এই আশীর্বাদ দরকার তার পুত্রকন্যাদের জন্য।

এ হল গতি লাভ করার রঙ্গচিত্রের নমুনা। অভিনন্দন জানানো এবং হাসিমুখে তাকিয়ে থাকা মিথ্যের দিকে, লোকের সঙ্গে আলাপ করা যা প্রতারণায় পূর্ণ, বেদমভাবে মার খাওয়ার চিন্তার দিকে সংকীর্ণ চোখে তাকিয়ে থাকা, যা এটাই জানায় যে দেরিতে ঘটুক বা দ্রুতই ঘটুক না কেন, আমাদেরকে আঘাত করা হবে প্রচণ্ড হাতুড়ি দিয়ে, এবং এটা শীঘ্রই রূপান্তরিত হবে কুহকবিদ্যার এক প্রাণবন্ত খেলায়, যতক্ষণ না ধূসর ঊষালোকের আলো ফুটে উঠেছে।

‘সত্য’ ও ‘প্রকৃত’ হচ্ছে পুরনোদিনের কেতা। অসৎ উপায়ে কড়ি কামানোর জন্য ‘সত্য’ ও ‘প্রকৃত’ এখন স্থূল ও কুরুচিপূর্ণ পদ্ধতির সঙ্গে মানানসই। আসলে প্রথম দেখায় কোনোকিছুকে যা মনে হয়, আসলে তা ‘প্রকৃত’ নয়, তা হচ্ছে চতুর কুকুরটি সেইসব চতুর দিনগুলিতে যা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেছিল। আমরা নীরস পিচ্ছিল কঠিন মাটি থেকে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি, আমরা ঘরবাড়ি গড়েছি রামধনুশোভিত মাটিতে এবং অলীক কল্পনায়। আমরা ঘুমিয়েছি এবং হেঁটে বেড়িয়েছি রামধনুর নিচে। আমাদের ঘরগুলির ভিতর সৌন্দর্য ছিল না, কেননা, তারা ছিল কনকনে ঠাণ্ডা আর কুয়াশায় স্যাঁতস্যাঁতে। যখন সোনালি মেঘদল গলে একাকার হয়, রুক্ষ পৃথিবীর অধোদেশে নামতে থাকে প্রবল বৃষ্টিধারা, তখন ঘুরে ফিরে আমাদের মনে জেগে উঠত কেবল ভয়।

কিন্তু সেখানে আমাদের এত দুর্ভোগ আর আতঙ্কের কারণ কী ছিল? যেকোনো আগন্তুকের কাছে আমাদের ঘরবাড়িগুলিকে মনে হত মনোরম আর উজ্জ্বল। যেসব চাষি নিচের মাঠে কাজ করছে, তারা চোখ তুলে দেখছে এবং ঈর্ষা করছে আমাদের —এই ঈর্ষা আমাদের জাঁকজমকপূর্ণ বসতভিটা আর গৌরবের প্রতি। যদি তারা ভাবে যে সত্যিই এগুলি মনোমুগ্ধকর, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমরা পরিতৃপ্ত হব।

বেঁচেবর্তে থাকবার জন্য আমরা অন্য কাউকেই কিছু শিখাইনি, এমনকি নিজেদের জন্যও কোন দৃষ্টান্তের জন্ম দিইনি। বিজয়ীর শক্তিমত্তা নিয়ে দুর্বিষহ আচরণ দ্বারা শিক্ষকের মত আমরা কি বলেছি —এটাই হল বেঁচে থাকবার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক পদ্ধতি? আমরা যথেষ্ট পরিমাণে আত্মবিসর্জনকারী!

আহা! অবশ্যই আমরা ঈশ্বরের প্রতি যথেষ্ট পরিমাণ বিশ্বস্ত, আর আমরা আনুগত্য প্রকাশ করছি আমাদের নতুন অভিষিক্ত রাজার নিকট। আনুগত্য প্রকাশ করছি ছদ্মবেশী রাজপুত্রের কাছে, চতুর রাজকুমারীর কাছে।

মানুষকে —যদি সে টিকে থাকতে চায় —তাকে অবশ্যই স্তুতি করতে হবে। চারপাশের জীবনকে দেখতে দেখতে অবশেষে জীবনের অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে কী আছে মানুষ তা উপলব্ধি করে। সে খুঁজে পায় শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তমকে। তবু মানুষ পতিত হয়, বিস্ময় ও ভয়ের যুগপৎ অনুভব দ্বারা তাড়িত হয় তার প্রতি, যার চোখ উনিশ শতকের ওপর খোলা রয়েছে।

কোনও মহান প্রতিমার জন্ম কি এই ব্রহ্মাণ্ড দিতে পেরেছিল, যা চুরিকরা পদমর্যাদার মত মিথ্যের খোদাইকৃত মূর্তি নয়?

এইসব হল কর্কশ, নির্লজ্জ, উদ্ধত আর কপট, অন্তঃসারশূন্য হৃদয়ের উপলব্ধি। মানুষ এটা উপলব্ধি করতে পারে যে তার আত্মা আর পবিত্র নয় আর সঙ্গে সঙ্গেই সে পতিত হয় আর পদচুম্বন করে; এবং শক্ত হয়ে এঁটে থাকে —চিরকালের জন্য নিজের কাছে নিজেই প্রভুর পদ-লেহনের শপথ করে।

প্রভু, হায়! সে এক পরাক্রমশালী অধিরাজ, সম্রাট। রাবারের তৈরি কিং হামবুর্গ। চলো, আমরা গড়তে বসি হিউনের মন্দির, যে-মন্দিরের ছায়ায় রাজাকে আমরা পূজা করতে পারব, তাকে বাঁচাতে পারব আলোর আক্রমণ থেকে। চলো, রাজাকে আমরা রক্ষাকবজের আড়ালে ঢেকে ফেলি। দীর্ঘজীবী হোক আমাদের কূপমণ্ডূক মেকি শাসক।

আমাদের মত সোলজারদের জন্য উপযুক্ত নেতা ঠিক করতে হবে। অভিষেক-গ্রহণকারী মহামান্য মিথ্যা-রাজাদের জয় হোক! বেচারা রাজা অ্যাপারেন্স দীর্ঘজীবী হোক। তার জন্য আমাদের নতমস্তক বশ্যতা। আমরা কিন্তু রাজাকে উপরে তুলে শক্ত করে ধরে রাখব।

রাষ্ট্রের সৈনিকেরা শুনুন, রাজার বেঁচে থাকবার জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হল তাকে যথেষ্ট উঁচুতে তুলে রাখা। নিজের কাজ নিজে করার পক্ষে প্রয়োজনীয় হাড় ও পেশি তার নেই, সে এমনই এক বেচারা সম্রাট!

তার পদতল থেকে আমরা যদি হাত সরিয়ে নিই, তাহলে এক গাঁদা জীর্ণ ন্যাকড়ার ওপর তার পতন হবে আর ক্রোধান্ধ বাতাস টেনে হিঁচড়ে ঘুরপাক খাওয়াতে খাওয়াতে তাকে বহুদূর উড়িয়ে নিয়ে যাবে। রাজা পরিত্যক্ত হবে। হায়! তার চিরস্থায়ী আসনটির জন্য চলো জীবন উৎসর্গ করি। তার খাবার পরিবেশনে হাত লাগাই। চিরকালীন অস্তিত্বহীনতার বাতাস, মুখ থেকে ছেড়ে দেবার মত চলো তাকে মস্ত আকৃতিতে গড়ে তুলি। বলতে থাকি, বিস্ফোরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা তার সঙ্গেই আছি!

একদিন না একদিন সে সশব্দ ফেটে যাবেই। যেমন যেকোনো বিস্ফোরণের আগেই আমরা বুদ্বুদ দেখতে পাই, তেমনি তাকেও একদিন দেখা যাবে পরিণত হয়েছে এক বিশালাকৃতি দানবে।

ইতোমধ্যেই সে আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে, এখন পর্যন্ত সেই প্রভাব আমরা কাটাতে পারিনি। পৃথিবীর বয়স বাড়ছে অধিক থেকে আরও অধিক কপট ও ছলনাময় পৃথিবী হিসাবে, অতিকথন এবং মিথ্যাচার হিসাবে; এবং সে, যে-ছদ্মবেশ ধারণ করছে, অতিরঞ্জন করছে, মিথ্যা বলছে অবিরাম, সে-ই আমাদের সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম!

পৃথিবী হল আদা দিয়ে তৈরি রুটি কেনাবেচার এক প্রচণ্ড কোলাহল। আমরা প্রতিটি বুথ আর পয়েন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছি জমকালোরঙে-আঁকা চিত্রগুলি। বাজাচ্ছি বিশাল বিশাল ড্রাম আর মেতে উঠছি দম্ভের খেলায়।

কিনুন আমাদের তৈরি সাবান। শুনুন হে জনগণ, আপনাদেরকে কখনোই বুড়ো হাবড়াদের মত দেখাবে না। আপনাদের টেকো মাথা পুনরায় ঢেকে যাবে নতুন গজানো চুলে।

আপনারা আর কোনোদিনও গরিব হবেন না, আগের মত অসুখিও হবেন না আর। আমরাই আপনাদের একমাত্র সত্যিকার সাবান। উফ! মিথ্যা ইমিটেশন থেকে সতর্ক থাকবেন। কিনুন আমাদের তৈরি লোশন। আপনাদের মধ্যে যারা প্রায়ই প্রচণ্ড মাথাব্যথায় ভোগেন, যাদের পাকস্থলী নষ্ট হয়ে গেছে, পা টনটন করে, কিংবা যাদের দুটো হাতই ভেঙে গেছে, অথবা যাদের কোমল হৃদয় ভেঙে গেছে মুহূর্তের এক ঝড়ে আর সেইসব দজ্জাল শাশুড়িরা, আপনাদের কাছে বিনীত প্রার্থনা এই যে, পান করুন আমাদের সালসা। দেখবেন, এই সালসা জীবনের সমস্ত ঝঞ্ঝাট ঝেটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে।

যারা যেতে চান স্বর্গে, তারা আসুন আমাদের গির্জায়। কিনে নিন পয়সা বানানোর গাইড বই। মিটিয়ে দিন গির্জার বেঞ্চের ভাড়া আর শুধু প্রার্থনাই করুন। আপনাদের সেই বিভ্রান্ত ভাইদের কথা স্মরণ করুন, যারা ভুল পথে চলে গেছে। এখন তাদের জন্য আপনাদের আর করবার কিছুই নেই —এ-কথা মগজে নিয়েই চলুন প্রার্থনায় রত হই। এটাই একমাত্র নিরাপদ উপায়।

বুদ্ধিমান নির্বাচকগণ —ভোট দিন আমাদের মার্কায়, যাতে আমাদের দল ক্ষমতায় যেতে পারে। দেখুন, আমরা ক্ষমতায় গেলে পৃথিবী সম্পূর্ণ নতুন হয়ে জন্ম নেবে, যার কোথাও আগের তিল পরিমাণ পাপ কিংবা দুঃখ থাকবে না। প্রত্যেক স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত ভোটারের জন্য থাকবে আনকোরা ইউটোপিয়া, যা তৈরি হবে প্রত্যেকের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে এবং প্রত্যেকের নিজস্ব আইডিয়া অনুসারে। এটা সকলের হাতেই থাকবে, বিশুদ্ধ আকার এবং আত্মার প্রায়শ্চিত্ত বিষয়টি যার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আহা! সুবর্ণ সুযোগটি হেলায় হারাবেন না।

আহা! আমার ফিলোসফিটা লক্ষ্য করুন, কেননা এটাই শ্রেষ্ঠ এবং গভীরতর। আহা! আমার সঙ্গীত শ্রবণ করুন, কেননা এই সঙ্গীতই সবচেয়ে শ্রুতিমধুর। আহা! আমার আঁকা ছবিগুলোই শুধু কিনুন, কেননা শুধু এগুলোই সত্যিকারের শিল্প হতে পেরেছে। আহা! কেবল আমার লেখা বইগুলোই পড়ুন, কেননা শুধু এই বইগুলোতেই মানুষের সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলোকে ধরা হয়েছে।

আমিই একমাত্র শ্রেষ্ঠ পনির ব্যবসায়ী। আমিই সবচেয়ে চৌকশ আর্মি। আমিই শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রনায়ক। আমিই শ্রেষ্ঠতম কবি। আমিই শ্রেষ্ঠতম সার্কাসের সঙ। চটকদার কথা-বলা শ্রেষ্ঠ ধাপ্পাবাজ। আমিই শ্রেষ্ঠতম সম্পাদক। শ্রেষ্ঠতম দেশপ্রেমিক আমিই।

আমরাই শ্রেষ্ঠতম জাতি। একমাত্র আমরাই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম মানুষের দঙ্গল। আমাদের ধর্মই চিরকালীন ধর্ম।

বাহ! আমরা সকলে কী নারকীয় চিৎকারটাই না করছি!

ঠিক কীরকমভাবে আমরা প্রত্যেকে প্রবল উত্তেজনা অনুভব করছি, প্রচণ্ড শব্দে ড্রাম পেটাচ্ছি, উচ্চস্বরে চেঁচাচ্ছি —আমরা তার একটি বর্ণও অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বিশ্বাস করছি না!

লোকে নিজেদের মধ্যে বিনিময় করছে তাদের ভাবনা। তারা বলছেঃ এটা আমরা কীভাবে তীক্ষ্ণস্বরে চেঁচিয়ে আবিষ্কার করতে পারি যে কে এই চিৎকার-করতে-থাকা লোকদের ভিতর শ্রেষ্ঠতম? কোন জন সেই দক্ষতম ব্যক্তি?

উত্তরে তারাই বলছেঃ এখানে কেউই শ্রেষ্ঠতম নয়। কেউই দক্ষতম নয়। সর্বোত্তম দক্ষ লোকটি এখানে নেই। এইসব হৈ চৈ কোলাহল ও বিশৃঙ্খলা যারা তৈরি করেছে, তারা সবাই জ্ঞান-দক্ষতা আর সক্ষমতার ভানকারী হাতুড়ে লোক মাত্র। আমাদের মধ্যে তার কোন আসন নেই। স্থান নেই। যেখানে মোরগ ডেকে ওঠে তাকে সেখানে দেখতে পাবে। আমরা বুঝতে পেরেছি শ্রেষ্ঠতম ও সর্বোত্তম হল তারা, যারা উচ্চস্বরে এবং দীর্ঘসময় ধরে ডাকতে পারে। এটাই আমাদের কাছে উৎকর্ষ নির্ণয়ের শ্রেষ্ঠতম পরীক্ষা। সুতরাং, মোরগের ডাক দেয়া ছাড়া আমাদের করার আর কী বাকি রইল? আমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট তারাই যারা মোরগের উল্লাসময় স্বরে চিৎকার করছে আর দীর্ঘকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট এক গোবরের ঢিবিতে, আমরা যার নাম দিয়েছি পৃথিবী!

আমি এখন আমাদের ঘড়ি সম্পর্কে কিছু কথা বলতে যাচ্ছি।

আইডিয়াটা ছিল আমার স্ত্রীর। ঘড়িটাকে আপন করে পাওয়ার জন্য, হ্যাঁ, প্রথম দর্শনেই তাকে একেবারে নিজের করে পাওয়ার জন্য সে পাগল হয়ে গিয়েছিল।

আমি ও আমার স্ত্রী আমাদের বন্ধু বোগেলের বাড়িতে দুপুরের খাবারে যোগ দিয়েছিলাম। বোগেল এইমাত্র একটা ঘড়ি কিনেছে। একটা পড়ে-পাওয়া পুরাতন ঘড়ি, এসেছে এসেক্স থেকে। এইসব পড়ে-পাওয়া জিনিস কেনায় সে পাকা লোক। সে বসেছিল বিচিত্র নকশা-খোদাই বিশাল পালঙ্কের মত দেখতে একটা ঘড়ির ওপর, যার ওজন প্রায় তিন টন। সে বলল, খুব সুন্দর ছিমছাম এই জিনিশটা সংগ্রহ করা হয়েছে হল্যান্ড থেকে। কথাটা সে এমনভাবে বলল যে মনে হল এটা তার মালিকের ছাতার ভিতর থেকে খসে পড়েছে আর বেচারা বোগেল লোকের নজর এড়িয়ে সেটাকে খুঁজে পেয়েছে রাস্তার পাশে। ব্যাপারটা আর কেউ বুঝতেই পারেনি!

সদ্য-কেনা ঘড়ি নিয়ে সে দারুণ উত্তেজিত ছিল। ঘড়িটা ছিল আগের আমলের পুরনো উঁচু কাঠের বাক্সে রক্ষিত ওজনচালিত ঘড়ির একটি মডেল। খোদাই-করা ওক কাঠের বাক্সের ভিতর তার উচ্চতা ছিল আট ফুট। তার ছিল ধ্বনিময়, গভীর ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলির মত ছন্দময় টিকটিক শব্দ, যেন রাতের খাবারের পর সঠিক তাল-লয়-ছন্দে পরিবেশিত হচ্ছে সঙ্গীত আর ঘরময় তৈরি হয়েছে অনাড়ম্বর সহজতা।

ঘড়িটাকে কেন্দ্র করেই আমাদের আলাপ জমে উঠল। কীভাবে ঘড়িটার প্রলম্বিত ও গুরুগম্ভীর টিকটিক শব্দকে সে ভালবাসতে পেরেছে বোগেল আমাদের তা বলল। রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে কাদা, তখন সে আর তার ঘড়িটা যমজ বন্ধুর মত সময় কাটায়। মনে হয় পুরনো বন্ধুরা তার সঙ্গে কথা বলছে। বলছে পুরনো দিনগুলি কেমন ছিল। কেমন ছিল পুরনো দিনের চিন্তাধারা, কেমন ছিল মানুষের বেঁচে থাকবার পদ্ধতি, এবং কেমন ছিল সেইসব পুরনো আমলের মানুষ, যারা এই দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে!

ঘড়িটা আমার স্ত্রীরত্নের মনে গভীর প্রভাব ফেলল। ঘরে-ফেরার পুরটা সময় সে ছিল গভীর ভাব নায় মগ্ন। যখন আমরা বরাবরের মত সিঁড়ি ভেঙে ঢুকে পড়েছি আমাদের ঘুমাবার গুহায়, সে বলল, আমরা কেন ঠিক এরকমই একটি ঘড়ি কিনছি না? তার বিশ্বাস ঘড়িটা হবে ঠিক একজন মানুষের মত যে আমাদের দেখেশুনে রাখবে। সে এটাও কল্পনা করে নিল যে ঘড়িটা আমাদের অনাগত সন্তানদেরও বিপদাপদ থেকে রক্ষা করবে।

নর্থহ্যাম্পশায়ারের সেই লোকটিকে —যার কাছ থেকে আমরা মাঝেমধ্যে আসবাবপত্র কিনে থাকি— ব্যাপারটা বললাম। সে জানালো আমি ঠিক যেমনটা চাইছি সে ঠিক তেমন একটা জিনিশ আমার জন্য জোগাড় করবে। সুনিশ্চিতভাবে ভাগ্যবান ছিলাম বলেই নর্থহ্যাম্পশায়ারের আসবাবপত্রবিক্রেতা বেশ সময় নিয়ে খুঁজে পেতে অদ্ভুত কিন্তু আকর্ষণীয় এবং বেশ পুরনো কেতার একটা ঘড়ি জোগাড় করল। ঘড়িটার একটা ছবি এবং খুঁটিনাটি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে জানতে চাইল আমাদের ফ্ল্যাটে এটাকে পাঠিয়ে দেবে কিনা। ছবি দেখে, আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে জেনে নিয়ে বললাম, হ্যাঁ, দেরি না করে পারলে আজই পাঠিয়ে দাও।

দিন তিনেক পর কারা যেন দরজার কড়া নাড়ল। নিশ্চয় এর আগেও কয়েকবার নাড়া হয়েছিল কিন্তু আমি ঘড়িটির ইতিহাস নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকায় শুনতে পাই নি। মেয়েটি জানাল বাইরে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খুলতেই পিকফোর্ডের মালামালবহনকারী লোকগুলিকে দেখলাম। তাদের হাতে ঠিকানা-নির্দেশসহ মালপত্রের তালিকা। বুঝতে পারলাম তারা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ঘড়িটি নিয়ে এসেছে। বায়বীয় কণ্ঠে তাদের বললাম— হ্যাঁ, ঠিক আছে। এটাকে ওপরে তুলে আনো।

তারা অপারগতা প্রকাশ করল। নিচ থেকে একটা ঘড়িকে ওপরে তোলা নাকি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়!

নিচে নেমে দেখি সিঁড়ির ধাপে কিলক দিয়ে আটকানো একটা বাক্স, ঠিক যেন লন্ডনের ক্লিয়পেত্রা ওবেলিস্ক, যা ওপরের দিকে ক্রমশ সরু, চতুষ্কোণ দীর্ঘ শিলানির্মিত স্তম্ভ বিশেষ; যার শীর্ষদেশে রয়েছে ছোট্ট একটা পিরামিড।

তারা বলল, এটাই আপনার ঘড়ি।

আমি কাটারি আর লোহার দণ্ড জোগাড় করে, রাফিয়ান মার্কা দুজন লোক ডেকে প্রায় আধঘণ্টা ধাক্কাধাক্কি করার পর ঘড়িটাকে ওপরে উঠাতে পারলাম। এতক্ষণ সিঁড়ি দিয়ে লোকচলাচল বন্ধ ছিল, ওপরে তুলে নেয়ায় ভাড়াটেদের মনে আগের স্বস্তি ফিরে এল। ঘড়িটা রাখলাম দোতলার খাবার ঘরের কোণায়। গোরায় সে এমন ভাব করল যেন সে খুব নড়বড়ে, যেকোনো মুহূর্তে লোকের মাথায় ভেঙে পড়বে। এ অবস্থা ঠেকালাম প্রচুর পেরেক, স্ক্রু আর জ্বালানী কাঠ ব্যবহার করে। ঘড়িটার জীবনের সব ঝুঁকি হ্রাস করে অবসাদ আর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

মধ্যরাতে, হঠাৎ ভীতিকর আওয়াজে স্ত্রীর ঘুম ভেঙে গেল। সে বলল —ঘড়িটা এইমাত্র তেরোবার অ্যালার্ম দিয়েছে! আমি কি এটা ভাবতে পারছি যে কেউ একজন মারা যাচ্ছে? তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম —এসবের কিছুই আমি জানি না। বললাম, হতে পারে পাশের বাড়ির কুকুরটা মরতে বসেছে। আমার স্ত্রী বলল, কিছু একটা ঘটার ইঙ্গিত পাচ্ছে সে। সম্ভবত আমাদের সন্তানটি জন্ম নিতে শুরু করেছে। তার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল। প্রাণ আকুল করা কান্নায় ভেঙে যেতে যেতে সে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল।

অবশ্যই কোথাও তোমার ভুল হচ্ছে —কথাগুলি বলে সকালে তাকে প্রবোধ দিলাম। তাতে সে স্বাভাবিক মানুষের মত খানিকটা হাসতে পারল। বিকালে ঘড়িতে আবার তেরোবার অ্যালার্ম বাজল। তাতে আতঙ্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করল। সে আমাকে বিশ্বস্তভাবে বোঝাতে চাইল, আমাদের অনাগত সন্তান এবং আমি উভয়েই মারা যাচ্ছি আর সে স্বামীসন্তানহীন বিধবায় পরিণত হতে যাচ্ছে। বিষয়টিকে আমি স্রেফ একটা কৌতুক হিসাবে বিবেচনা করলাম। এটা তাকে আতঙ্কিত করে তুলল। বলল, সে বিষয়টাকে ঠিক যেরকম অনুভব করছে দয়া করে আমিও যেন সেরকম অনুভব করি। তার ধারণা হল আমি তাকে সান্ত্বনা দেবার খাতিরে নিরুদ্বেগ থাকবার ভান করছি। সে বলল, এখন যা কিছু ঘটবে সবকিছুকেই সে সত্যিকার সাহসের সঙ্গেই মোকাবেলা করবে। আমার স্ত্রী যে-লোকটিকে এই দুরবস্থার জন্য দায়ী করল, সে হচ্ছে বেচারা বোগেল।

রাতে ঘড়িটি আবারো অ্যালার্ম বাজিয়ে আমাদের সতর্ক করে দিল। আমার স্ত্রী ধরেই নিল যে এই সংকেত তার অ্যান্ট মারিয়ার মৃত্যু-সম্পর্কিত। এই সংকেতকে সে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিল।

পরদিন ঘড়িটা চারবার তেরোটি করে অ্যালার্ম বাজাল। হঠাৎ আমার স্ত্রীকে খুব উৎফুল্ল মনে হল। সে বলল- মনে হয় আমরা সবাই মারা যাচ্ছি! সম্ভবত কালাজ্বর বা প্লেগ এগিয়ে আসছে। আমাদের কারোরই আর নিস্তার নেই। আমরা সবাই প্লেগে আক্রান্ত হব।

‘সবাই একসঙ্গে মারা যাচ্ছি’ এটা ভেবে আমার স্ত্রী-রত্ন প্রফুল্ল হয়ে উঠল আর ঘড়িটাও তার দায়িত্ব এমনভাবে পালন করতে লাগল যে তার অ্যালার্মের কারণে আমাদের যত বন্ধু আর আত্মীয়স্বজন ছিল তাদেরকে —স্ত্রীর বর্ণনা অনুযায়ী— হত্যা করতে লাগল। বন্ধুবান্ধবের মৃত্যুর পর ঘনিয়ে এল প্রতিবেশীদের জন্য মৃত্যুসংকেত।

ঘড়িটা মাসের তিরিশ দিনই একসঙ্গে তেরোবার অ্যালার্ম বাজাল, যতক্ষণ না ব্যাপক গণহত্যায় আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ি। মাইলের পর মাইল জীবিত মানুষের কোনও অস্তিত্বই ছিল না!

তারপর ঘড়িটা চরম যুক্তিবোধের পরিচয় দিল। বন্ধ হল অবিরাম হত্যাযজ্ঞ। ক্ষতিকর চরিত্র পাল্টে স্রেফ ঊনচল্লিশ আর একচল্লিশের ঘরেই বারবার বাজতে থাকল। ঘড়িটার প্রিয় নির্দেশকবিন্দু ছিল বত্রিশ, কিন্তু হঠাৎ একদিন সে ঊনপঞ্চাশের কাছে এসে বাজতে লাগল। ঊনপঞ্চাশের ঘর সে কিছুতেই পেরুতে পারল না। কোনভাবেই বুঝতে পারলাম না সে এমন আচরণ কেন করছে! ঊনপঞ্চাশের ঘর কিছুতেই পেরুল না ঘড়িটা। তার বেজে-উঠার মধ্যে বিরতি খুব কমই ছিল। প্রতি ঘণ্টায় সে তিন থেকে চারবার পর্যন্ত অ্যালার্ম দিত। আবার কখনও দিনের অর্ধেকটাই কাটিয়ে দিত শব্দ না করে।

প্রকৃত অর্থেই ঘড়িটা ছিল এক আশ্চর্য বস্তু!

মাঝে মধ্যে ভাবতাম তার প্রতি সমস্ত ‘মনোযোগ নিবিষ্ট করব’, যাতে প্রতিটি ঘণ্টাকেই সে নিয়মিত আবর্তন করতে পারে। তাকে নিয়ে আমার এই ধারণার জন্ম হল যে, সময়কে উপহাসের ব্যাপারে সে যথেষ্ট সাহসী। সুতরাং, তার প্রতি আমার বিশেষ অনুরাগ জন্ম নিল।

ঘড়িটা সময়ের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল নয়। সে যখন তার কালচক্রপথ আবর্তন করে, তখন সময়কে প্রায় খোলাখুলিই অবমাননা করতে পারে। এই প্রবণতা তার ভিতর প্রবল। সে জানান দেয় দুটো বেজে আটত্রিশ মিনিট, এবং তার ঠিক বিশ মিনিটের মধ্যেই বলে বসে —এখন বাজে মাত্র একটা!

বিষয়টা কি এমন, ঘড়িটা তার মালিকের প্রতি অনুভব করছে সত্যিকার ঘৃণা আর মনে করছে এই ঘৃণাকেই সে সবার সামনে প্রকাশ করবে? তার ঘৃণার অনুভব এটাই বোঝাচ্ছে যে, মালিকের পোশাক-পরিচ্ছদের যত্ন নেবার কাজে নিয়োজিত ভৃত্যের কাছে কোনও মানুষই প্রকৃত নায়ক হতে পারে না। এটা এজন্যই হতে পারে —সময় যেন এক পাথরের মূর্তি, কিন্তু তার স্থায়িত্ব ক্ষণকালের। মুহূর্তেই মরে যায় অন্য মরণশীলদের মত। হয়তো এটাই ‘সময়’-এর সবকিছু, হয়তো পুরাতন ভৃত্যের ছানিপড়া ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকার মত কোনও ব্যাপার। তার শুধু একটাই কাজ —টিকটিক, টিকটিক শব্দে বেজে চলা সারাটা জীবন ধরে। সবশেষে সময়ের সামান্যতা আবির্ভূত হয় আবছাভাবে, ছাপ ফেলে যায় মানুষের আতঙ্কিত চোখে।

ঘড়িটা যেমনভাবে ভয়ানক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আর বারবার আঘাত করে পঁয়ত্রিশ এবং চল্লিশের ওপর, তাহলে কি সে প্রবাদকথার মতই বলে —বাহ, সময়! তোমাকে আমি চিনতে পেরেছি, তুমি ঈশ্বরতুল্য আর কী ভয়ঙ্করই না তোমাকে দেখায়! একটা কিমাকার ভূত ছাড়া আর কী তুমি? একটা স্বপ্ন —এখনও আমরা যারা বেঁচে আছি, ঠিক তাদের মতই বেঁচে থাকবার একটা স্বপ্ন। এছাড়া তুমি আর কী? হ্যাঁ, তুমি ধীরে ধীরে বয়ে যাও। ফেরা আর হয় না তোমার। শাশ্বত মানুষ, সময়কে ভয় নেই।

সময় হল চিরন্তনতার পটভূমির ওপর পতিত পৃথিবীর এক ছায়া।

 

 

 

[জেরোম কে জেরোম, পুরো নাম জেরোম ক্লাপকা জেরোম, জন্ম ১৮৫৯ সালে; ইংল্যান্ডে। ছেলেবেলা কেটেছে প্রচণ্ড কষ্টে। পার্লামেন্টের সদস্য হবার ইচ্ছা ছিল তার, কিন্তু চরম দারিদ্র্য আর মায়ের মৃত্যু তাকে ভীষণ একা করে ফেলে। কাজ করতে শুরু করেন লন্ডন এবং নর্থওয়েস্টার্ন রেলওয়েতে। একসময় বেছে নেন বিচিত্র পেশা। কখনও সাংবাদিকতা, কখনও শিক্ষকতা... আর সবসময়ই প্রচণ্ড হতাশা। তাঁর গল্প আর বিদ্রূপাত্মক রচনাগুলির রয়েছে বিতর্কিত আর বিখ্যাত হবার খ্যাতি। মার্ক টোয়ান, কিপলিং এবং আরথার কোনান ডোয়েলের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধকে নিয়ে লেখা আর কার্টুনের মাধ্যমে বিদ্রুপ আর আঘাত করাই ছিল তার লেখার মূল লক্ষ্য। হাস্যরস সৃষ্টির মাধ্যমে জেরোম কে জেরোম আসলে মানুষের বিষণ্ণতাকেই তুলে ধরেছেন। লিখেছেন বিদ্রূপাত্মক নাটক, উপন্যাস, গল্প আর বিচিত্র বিষয়ে গদ্য। ১৯২৭ সালে এই লেখকের মৃত্যু হয়।]

 

উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ...

রম্য গল্পের রাজা | শিব্রাম চক্কোত্তিমশাই


সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

 

শিবরাম চক্রবর্তী, তিনি বলতেন বা লিখতেন শিব্রাম চক্কোত্তি। নিজের নাম নিয়েই খেলা করতেন।

যখন আমি স্কুলে পড়ি তখন শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা পড়ার জন্য আমরা সকলেই খুব উতলা হতুম।

পরশুরাম বালকদের তেমন বোধগম্য হতেন না। কারণ তাঁর ব্যঙ্গাত্মক লেখা, স্যাটায়ার ছিল বড়দের জন্য। আর ত্রৈলোক্যবাবুর কোনও কোনও লেখা ছোটদের হাত ধরতে চাইলেও তেমন জোরে ধরতে পারতেন না।


শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা যেমন ছোটদের জন্য, সেই রকম বড়দের জন্যও। এমনটা অনেকের ভাগ্যে ঘটে না।

তিনি তো কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলেন। গম্ভীর বিষয়ে প্রবন্ধও লিখেছেন। কিন্তু ব্যক্তি শিবরামের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে। একেবারে অন্য রকমের মানুষ, অন্য রকমের লেখা। কারও সঙ্গে মিলবে না। যদি কেউ প্রশ্ন করেন, তাঁর লেখার আকর্ষণটা কোথায়? তাহলে একটিই উত্তর বলতে পারব না। ভাল রাঁধুনি যেমন বলতে পারবেন না, ঠিক কীসের সঙ্গে কীসের সংযোগে এমন সুস্বাদু একটি পদ তৈরি হল।

তাঁর লেখার মধ্যে একজন মানুষকে দেখতে পাওয়া যেত। না সাধু, না গৃহী সম্পূর্ণ মুক্তমনের একজন। পরবর্তী কালে যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে পত্রিকায় লেখার সূত্রে একটা অন্য রকম সম্পর্ক হল, তখন দেখলুম মানুষটি যেন রাজাধিরাজ। একেবারে বন্ধনমুক্ত। নিজের জীবন নিয়েই কত রসিকতা।

গদ্যে তাঁর অভাবনীয় দখল ছিল। যার ফলে বাক্যকে এমন মোচড় দিতেন যা বিস্ময়কর। তাঁর প্রতিভার এটা একটা মস্ত দিক। সাফল্যের নব্বই ভাগ এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পানিং’। তিনি বলতেন, মুক্তারামবাবুর মুক্ত আরামে আছি। জমিদারের ছেলে। পরিবার-পরিজনের কী হল তা কখনও বলতেন না। একটি প্রাচীন মেসবাড়ির একটি ঘরেই তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তার।

ছেলেবেলার আকর্ষণ দিয়ে লেখার শুরু। হঠাত্‌ একদিন তাঁর সঙ্গে সারাটা দিন কাটাবার সুযোগ হল। নানা রকম খেতে ভালবাসতেন। বন্ধুত্ব করেছিলেন কিশোরদের সঙ্গে।

আমার এক বন্ধুর মা অসাধারণ ভাল রান্না করতে পারতেন। একদিন খবর এল আমার এই বন্ধুর বাড়িতে তিনি দুপুরবেলা আসবেন, আহারাদি করবেন, থাকবেন অনেক ক্ষণ।

জমিদারের ছেলে। সংস্কারে সেই বীজটি রয়েছে। সিল্কের পাঞ্জাবি, সাদা ধবধবে ধুতি। উজ্জ্বল মূর্তি, মাথার চুল বিচিত্র কায়দায় আঁচড়ানো। ফর্সা টকটকে কপালের উপর ঝুলে আছে এক গুচ্ছ চুল। তিনি এলেন। বৈঠকখানায় বসলেন আমাদের নিয়ে। বড়দের খুব একটা পাত্তা দিলেন না।

একটি তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে আধশোয়া হয়ে মজলিসি ঢঙে শুরু হল নানা গল্প। শ্রোতা আমরা কয়েক জন অল্পবয়সি। মাঝে মাঝে বলতে লাগলেন, তোমাদের খুশি করতে পারলে খাওয়াটা জমবে। গন্ধ নাকে আসছে, প্রাণ বড় উতলা। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। ফর্সা মুখে বুদ্ধির আভা। একজন একশোভাগ ইন্টেলেকচুয়াল মানুষ।

সময় সময় কিছু কথা বুঝতে অসুবিধা হলেও বেশির ভাগই বেপরোয়া মজা। অশালীন নয়, ভাঁড়ামি মুক্ত। এই দেখার স্মৃতিটি রয়ে গেল। এর পর জীবনপথে ঘুরতে ঘুরতে দেশ পত্রিকার দফতরে তাঁকে পেলুম একেবারে অন্য ভাবে। এর আগে তিনি অনেক লিখেছেন। সে সব লেখা সোশ্যাল স্যাটায়ার। যার সঙ্গে অনেক তাবড় তাবড় ইংরেজ লেখকের তুলনা করা যায়। সেই সব লেখায় মজার কোনও গল্প থাকত না, থাকত আঘাত। কায়দাটি খুব সুন্দর। এক একটি কথাকে ধরে ধুনুরির কায়দায় তুলোধোনা করা। দেশ পত্রিকায় তখন তিনি লিখছেন, ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’। কী সুন্দর নাম। এটিকে বলা যেতে পারে তাঁর আত্মজীবনী।

একটি কথা এখানে বলা উচিত, তিনি ছিলেন অতি অভিজ্ঞ, অতি সুদক্ষ এক সারথি। নিজের রথ কী ভাবে কোন কায়দায় চালাতে হবে তা তিনি জানতেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর কোনও উচ্চ অ্যাম্বিশন ছিল না বলে। জীবনদর্শন ছিল এই রকম কয়েক দিনের জন্য এসেছি, আনন্দ করতে করতে চলে যাব। এই আনন্দটাও ছিল রিবাউন্স করা। তোমাদের আনন্দ আমার আনন্দ। তোমাদের সঙ্গে খানিক মজা করব। জীবন নিংড়ে এমন কোনও লেখা বের করতে চাই না যার মধ্যে কোনও ইজম আছে।

অথচ একসময়, জীবনের প্রথম দিকে তিনি রাজনীতি ঘেঁষা অবশ্যই ছিলেন। ঈশ্বর-পৃথিবীর ভালবাসা-র শুরুটাই করেছেন এইভাবে “প্রায় লেখককেই নিজের কবর খুঁড়তে হয় নিজের কলম দিয়ে। গায়কের মতো লেখকেরও ঠিক সময়ে থামতে জানা চাই। সমে এসে যথাসময়ে না থামলেই বিষম, সবটাই বিষময় হয়ে দাঁড়ায়। এমনকী কালজয়ী লেখকও যদি যথাকালে না থামেন তো জীবদ্দশাতে জীবন্মৃতের অন্তর্দশা তাঁর বিধিলিপি।

অবশ্য মহাকাল কারও কারও প্রতি একটু সদয়। সময় থাকতে থাকতেই তাঁদের নিরস্ত করেন, নিজের পুনরাবৃত্তির পথে আত্মহননের ভোগান্তি তাঁদের আর পোহাতে হয় না। যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, শরত্‌চন্দ্র। বিস্ময় থাকতে থাকতেই, রাখতে রাখতেই তাঁরা অস্ত গেছেন।”

এই দুটি প্যারা পড়লে বোঝা যায় গদ্যের ওপর তাঁর বাঁধুনিটা কত মজবুত ছিল। এই আত্মজীবনীতেই দেখতে পাওয়া যাবে সব লেখকই যে যে দুস্তর বাঁধা অতিক্রম করেন তাঁকেও তা করতে হয়েছে। যেমন, জীবনের প্রথম দিকে প্রবাসীতে একটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন। এবার নিজেই লিখছেন, দিন কতক বাদে লেখাটা ফেরত এল। সঙ্গে চারুদার এক চিরকুট। এই হলেন শিবরাম। চারুদার চিরকুট। শব্দ যেন তাঁর সঙ্গে খেলা করত।

চিঠির বক্তব্য, কবিতাটি মন্দ হয়নি কিন্তু এটি প্রবাসীতে ছাপিয়ে তোমাকে উত্‌সাহ দিতে চাই না। সম্পাদক উপদেশ দিয়েছিলেন, এই বয়সে লেখাপড়া করে মানুষ হও আগে। তারপর না হয় লিখো। সঙ্গীত, কবিত্ব আর ল্যাজ কারও ভিতরে থাকলে তা আটকানো যায় না। তোমার মধ্যে যদি তা থাকেই তা প্রকাশ পাবেই। যথাকালে দেখা দেবে অযথা জোর করে অসময়ে তাকে টানাটানি করে বার করার কোনও দরকার নেই। শিবরাম লিখছেন, কথাগুলো আমার মর্মে মর্মে গাঁথা হয়েছিল অনেক দিন।

এই সময় একদিন দেশ পত্রিকার অফিসে একজন লেখক এসে জানালেন, সেন্ট্রাল এভিনিউ-এর ফুটপাথে শিবরামবাবু চিত হয়ে শুয়ে আছেন।

সম্পাদক শ্রদ্ধেয় সাগরদা আমাকে ডেকে বললেন, ওর তো আজ লেখা দিতে আসার কথা। ফুটপাথে শুয়ে আছে কেন! দেখে এসো তো।

আমি গিয়ে দেখি, ‘চাংওয়া’র সামনে তিনি আরামে শুয়ে আছেন। একটা হাত কপালে, আর একটা হাত সিল্কের পাঞ্জাবির পকেটে। একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি। ডান হাতটা পাঞ্জাবির পকেটে। পকেট থেকে তেলেভাজা বের করে মাঝে মাঝে মুখে দিচ্ছেন।

এই বার আমি গিয়ে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলুম, এইখানে এইভাবে শুয়ে আছেন কেন! আমাকে নিচু হতে ইশারা করলেন।

ফিসফিস করে বললেন, চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে কোঁচা জড়িয়ে পড়ে গেছি। একটা ধেড়ে মানুষের পড়ে যাওয়াটা লজ্জার, না শুয়ে থাকাটা লজ্জার! আমি বললুম, এর উত্তর দেবেন সাগরদা। আপনি এখন উঠুন। সিল্কের পাঞ্জাবির পিছনে ধুলো। মাথার পেছনে ধুলো। আমি ঝাড়ার চেষ্টা করতেই বললেন, তুমি কিছুই জান না। এক সময় কলকাতার বাবুরা ভোরবেলায় খানা থেকে উঠে প্রাসাদে প্রবেশ করত। পাঞ্জাবির পেছনে ধুলো এটা একটা অ্যারিস্টোক্রেসি।

একদিন মুক্তারামবাবুতে গেছি। একটা সভায় যাওয়ার কথা। আমাকে বললেন, আমার এই তক্তাপোশে পা তুলে বসো। কারণ এর তলায় কী কী জন্তু জানোয়ার আছে তা আমি জানি না। ঘাঁটাইনি কোনও দিন। সাপও থাকতে পারে। আমি আমার ড্রেসিং রুম থেকে আসছি। জিজ্ঞেস করলুম সেটা কোথায়? বললেন, ওই যে রাস্তার ওপারে যে লন্ড্রিটা রয়েছে ওইটা। আমি ওখানে গিয়ে আমার এই ধুতি আর পাঞ্জাবিটা ছেড়ে দেব। আর যেটা কেচে এসেছে সেটা পরে চলে আসব। দুটো সেট। কোনও ঝামেলা নেই। বাক্সপ্যাঁটরা নেই। বুঝলে, একেই বলে আপনি আর কোপনি। জীবনটাকে হালকা করো। রেল কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখেছ? ট্রাভেল লাইট।

হাসির লেখার একটা অ্যানাটমি আছে। প্রথম কথা, ‘হাসির লেখা’ এই চিহ্নিত কথাটা আমার ভাল লাগে না। শ্রদ্ধেয় বিমলদা আমাকে বলেছিলেন, শোন! লেখা হাসিরও নয়, কান্নারও নয়। লেখা হল লেখা। তবে মজার লেখা উপভোগ্য লেখার একটা গঠন আছে। চরিত্রকেন্দ্রিক।

শিবরামবাবুর লেখায় আমরা সেই সব চরিত্রদের পাই। যেমন হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন, পিসিলা, জহর ইত্যাদি। এই চরিত্রদের তিনি খেলিয়েছেন। গল্প অনেক ক্ষেত্রেই সামান্য। রস তৈরি হয়েছে কথার পিঠে কথা আর সিচ্যুয়েশনের মাধ্যমে। কত নাম করব। গন্ধচুরির মামলা, খোলাখুলি ইত্যাদি ইত্যাদি। কোনও দিন তাঁকে দেখিনি নিজের লেখা, বই আর প্রাপ্যের হিসাব রাখতে। সংস্কারটা যে ছিল জমিদারের আর ত্যাগীর। সেই জন্যই বইটির নাম প্রথমে ঈশ্বর, তারপর পৃথিবী এবং সব শেষে ভালবাসা। এই মানুুষটিকে আমরা চিরকাল ভালবাসতে বাধ্য।