Saturday, September 1, 2018

অতনু ফিরে যাবে - সুনীল গংগোপাধ্যায়


এটা কি আগে এখানে ছিল, না ছিল না? একটা বেঁটে মতো গম্বুজ, তার সবদিকই নানারকম পোস্টারে মোড়া, একটা বড় ফিল্মের পোস্টারে এক যুবতী দু’চোখ দিয়ে হাসছে।
এক পাশে ছিল ধানক্ষেত আর জলা, রাস্তার অন্যপাশে দোকানপাট। হ্যাঁ, স্পষ্ট মনে আছে অতনুর, ধানক্ষেতের পাশে যে অগভীর জলাভূমি, সেখানে গামছা দিয়ে মাছ ধরত কয়েকটি কিশোর, মাছ বিশেষ পাওয়া যেত না, ঝাঁপাঝাঁপি, কাদা মাখামাখিই সার, কখনও হয়তো পাওয়া যেত কিছু কুচো চিংড়ি, বেলে আর পুঁটি। একদিন অতনু দুটো খলসে মাছ পেয়েছিল। সব মিলিয়ে এতই কম যে, নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যায় না, তাই এক একদিন এক একজন সবটা, কম হোক বা বেশি হোক, যার ভাগ্যে যেমন আছে। খলসে মাছের কথা বিশেষভাবে মনে থাকার কারণ, কই মাছের গরিব আত্মীয় হলেও এই মাছের গায়ে রামধনু রঙের ঝিলিক থাকত। সেই মাছ দুটো রান্না করার বদলে একটা কাচের বয়ামে জল ঢেলে তার মধ্যে রেখে দিয়েছিল অতনু। তিন দিনের বেশি বাঁচেনি। কই-মাগুর জাতীয় মাছ মরে গেলে খেতে নেই বলে মা ছোট খলসে দুটো ফেলে দিয়েছিলেন। এ গল্প অতনু যাকেই বলতে গেছে, সবাই তাকে শুনিয়ে দিয়েছে যে, খলসে মাছ এখন আর পাওয়াই যায় না, খলসে এখন বিলুপ্ত প্রজাতি। সেই ধানক্ষেত আর জলাভূমিও অদৃশ্য। এখন সেখানে সার সার এক ধরনের বাড়ি, চারতলা, মেটে রঙের। মনে হয় কোনো বড় সংস্থার কর্মচারীদের কোয়ার্টার। অদৃশ্য হওয়াই তো স্বাভাবিক, সীতারামপুর নামে পুর হলেও একসময় তো গ্রামই ছিল, এখন শহর হতে চলেছে, শহরের এত ধার ঘেঁষে কি ধানক্ষেত থাকে নাকি? অতনুদের ছেলেবেলায় এখানে রেলস্টেশন ছিল না, চার মাইল হেঁটে চকবাজারে যেতে হতো। এখন স্টেশন হয়েছে বলেই ধাঁ ধাঁ করে বদলে যাচ্ছে গ্রাম। পরিবর্তনগুলো ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিতে পারে না অতনু। অনেক দিনের ব্যবধান, ১৭ বছরে সে সীতারামপুর ছেড়েছিল, এখন তার বয়স ৪২। কিন্তু মাঝখানে কি সে আর কখনও আসেনি, তা তো নয়, বেশ কয়েকবার ঘুরে গেছে। কিন্তু স্মৃতির এমনই কারসাজি, কৈশোরের ছবিগুলো এখনও জ্বলজ্বল করে, মাঝখানে অনেক দিনের শূন্যতা। অবশ্য মাঝখানে এসে সে আগে দু’তিন দিনের বেশি থাকেনি, ভালো করে চারপাশটা তাকিয়ে দেখেনি।
শেষ এসেছিল সাত বছর আগে, মায়ের মৃত্যুর সময়। তখন আবার অতনুর ওদিকেও খুব ব্যস্ততা। একটা প্রমোশন নিয়ে দর কষাকষি চলছিল, তবু মা বলে কথা, আসতেই হয়, শেষ দেখা হয়নি, শুধু শ্রাদ্ধের জন্য তিনদিন। মাতৃশোকের চেয়েও মন বেশি অস্থির ছিল চাকরির জন্য, তখন এখান থেকে আফ্রিকায় টেলিফোন করারও সুবিধে ছিল না।
খাল ধালে একটা ছিল ভূতের বাড়ি। কৈশোরেরও আগে, বাল্যস্মৃতিতে একটা গা-ছমছমে ভাব। বেশ বড় তিনতলা বাড়ি, দেয়ালে দেয়ারে বট-অশথ গাছ গজিয়ে গিয়েছিল, ভূত ছাড়াও সাপ-খোপেরও অভাব ছিল না! আসলে হয়তো কোনো শারিকি গণ্ডগোলে পরিত্যক্ত বাড়ি, কোনো সমৃদ্ধ মুসলমানের সম্পত্তিও হতে পারে, দেশ ভাগের পর চলে গিয়েছিল ওপারে, এখনও ওখানে কাছাকাছি মুসলমানদের একটি পল্লী আছে। এখন সেই ভূতের বাড়ির জায়গায় একটি ঝকঝকে রিসর্ট, প্রচুর আলো ঝলমল করে, শহরের লোকেরা এখানে ছুটি কাটাতে আসে। ওরকম ভূতের বাড়ি আরও নানা জায়গায় ছিল, সবই হয়ে গেছে নিশ্চিহ্ন, হবেই তো, এরই নাম উন্নতি।
তবে, সেই রিসর্টের দিকে তাকিযে এখনও অতনু কল্পনায় সেই ভূতের বাড়িটা দেখতে পায়। তার মনে হয়, গ্রামে-ট্রামে ও রকম দু’একটা হানাবাড়ি থাকা বোধহয় উপকারীই ছিল, ওই সব বাড়িতে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ভয় ভাঙার ট্রেনিং হতে আস্তে আস্তে। অতনুরা প্রথম প্রথম ট্রেনিং হতো আস্তে আস্তে। অতনুরা প্রথম প্রথম ওই বাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়াত, একটা কিছু আওয়াজ শুনলেই দৌড়ে পালাত ভয়ে। একটু বয়েস বাড়লে সাহস করে পাড় দিয়েছিল বাগানে বাড়িটার কাছ ঘেঁষত না, বাড়িটার মধ্যে সত্যি সত্যি মাঝে মাঝে উৎকট শব্দ হতো, কেউ কেউ নাকি আগাগোড়া কালো সিল্কের বোরখায় ঢাকা এক মহিলাকে ধীর পায়ে দোতলার বারান্দায় হাঁটতে দেখেছে, কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপরই তিনি মিলিয়ে যেতেন হাওয়ায়। উনি রাবেয়া বেগম, মারা গেছেন সাতাশ বছর আগে।
কী করে যেন হঠাৎ একদিন ভয় ভেঙে গেল। মধ্য কৈশোরে চার-পাঁচজন বন্ধুর সঙ্গে অতনু উঠে গিয়েছিল দোতলায়। গাঢ় দুপুরে, যখন চারপাশে কোনো শব্দ থাকে না, সে সময় ভূতরা এসে পেছন থেকে ঠেলা মারে। কই কিছুই তো হলো না, কোনো ঘরেরই দরজা-জানলা নেই, চতুর্দিক প্রচুর ভাঙা কাছ ছড়ানো, আর ধুলোতে কিছু কিছু পায়ের ছাপ, ভূতেরা পায়ের ছাপ ফেলতে পারে কি না, তা ঠিক জানা ছিল না তখন। অনেক পায়রার বাসা ছিল।
সে দিনটার কথা খুব ভালোই মনে আছে অতনুর। কারণ সেদিন সে শুধু ভূতের বাড়ি জয় করেনি। সেইদিনই জীবনে প্রথম সে সিগারেট খায়, তার বন্ধু রতন শিখিয়েছিল। সিগারেট টানার মতন অমন নিরিবিলি জায়গা আর পাওয়া যাবে কোথায়? লেবু পাতা চিবিয়ে বাড়ি ফিরলেও কী করে যেন ধরা পড়ে গিয়েছিল মায়ের কাছে। মা কি কোনো শাস্তি দিয়েছিলেন? মায়ের দেওয়া শাস্তি কোনো মানুষই মনে রাখে না। বাবা চুলের মুঠি ধরে মাথাটা দেয়ালে ঠুকে দিতেন, সেটা মনে আছে।
সেই দিনটায় তাদের দলে একটা মেয়েও ছিল না? কী যেন নাম তার, চিনু, চিনু, সে একটা গেছো মেয়ে, তাকে নেওয়া হবে না, তবু এসেছিল জোর করে। রোগা-প্যাংলা চেহারা, সেই তেরো-চৌদ্দো বছর বয়সে তাকে মেয়ে বলেই মনে হতো না, বুকেও বোধহয় ঢেউ খেলেনি, হাফ-প্যান্ট আর শার্ট পরে থাকত। সিগারেট টানার সময় সেও জেদ ধরেছিল, আমায় দাও, আমিও খাব, আমিও খাব, কিন্তু তাকে দেওয়া হয়নি, কে যেন একটা চড়ও মেরেছিল তাকে। কোথায় হারিয়ে গেছে সেই মেয়েটা।
এবারে তিন সপ্তাহের ছুটিতে এসেছে অতনু। সীতারামপুরে তার আর কোনোও আকর্ষণ নেই, এখানে কয়েকটা দিন নষ্ট করার কোনোও মানে হয় না, হঠাৎ মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল, এসেছে সেই নস্টালজিয়ায়। আসার পরই মনটা পালাই পালাই করছে।
যৌথ পরিবার ছিল একসময়, তারপর অনেক ভাগ হয়েছে, মায়ের মৃত্যুর পর তার দাদা এসে নিজেদের অংশটা বিক্রি করে দিয়ে যায় এক কাকাকে। সেই কাকা অতনুর বাবার বৈমাত্রেয় ভাই, ছোটবেলায় খুব ভালোবাসতেন অতনুকে। সেই স্মৃতিতে এখানে আসা, কাকার পরিবার বেশ খাতির-যত্ন করছে তাকে, তবু অতনুর অস্বস্তি কাটছে না। কাকা বুড়ো হয়ে গেছেন, অসুখের কথা ছাড়া আর কোনো কথা জানেন না। দুই খুড়তুতো ভাইকেই অচেনা মনে হয়, দুই ভাইয়ের স্ত্রী খুব ঝগড়া করে। কিন্তু চাষের জমি আছে, তার থেকে উপার্জন অনিশ্চিত, বাজারে একটা জামা-কাপড়ের দোকানে সিকি ভাগ মালিকানা, সে আয়ও যথেষ্ট নয়।
মা যে ঘরটায় থাকতেন, সে ঘরটা এখন বৈঠকখানা। কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া বেতের চেয়ার, একটা তক্তাপোশ আর একটা টিভি। মায়ের কোনো চিহ্নই নেই। খুড়তুতো ভাইয়ের দুই স্ত্রীর মধ্যে একজন নিঃস্তান, অন্যজনের তিনটে ছেলেমেয়ে তিনটির বয়েস নয়, বারো, চৌদ্দ, মেয়েটিই বড়। অতনুর আর বিয়ে-থা করা হয়নি। ছোট ছেলেমেয়েদের সে ভালোবাসে। ওদের সঙ্গেই তার বেশি সময় কাটে। মাঝে মাঝে অতনু মনে মনে ওদের সঙ্গে তুলনা করে তার বাল্য-কৈশোর বয়সের। তখন এখানে প্রচুর ফাঁকা জায়গা ছিল, কিছু কিছু বাগান আর পুকুর ছিল, অতনু তার বন্ধুদের সঙ্গে হুটোপুটি করে বেড়াত, বাঁদরের মতন লাফালাফি করত অন্যদের বাগানের গাছে, ফল-পাকুড় খেয়েছে, লাঠির বাড়িও খেয়েছে। সন্ধের পরেও দেরি করে বাড়ি ফিরলে বকুনি। খেয়েছে বাবার কাছে। এখন তার খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়, বাড়িতে কিছুক্ষণ পড়তে বসে, আর বাকি সব সময়টা টিভি দেখে। বাড়ির বাইর কোথাও যায় না, খেলতেও যায় না, তাই তারা লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে। অতনু বুঝতে পারে, এরা হয়তো সারাজীবন এই গ্রামেই থাকবে, আর কোথাও যাবে না।
অতনুকেও ওদের সঙ্গে টিভি দেখতে হয়। অতনু খানিকটা কৌতূহল নিয়েই টিভির অনুষ্ঠানগুলো, বিশেষত বিজ্ঞাপন দেখে। কোনোও দেশের অনেকখানি সমাজের ছবি বিজ্ঞাপন দেখলেই বোঝা যায়। এখানকার বিজ্ঞাপন দেখে সে প্রায় হতবাক। মনে হয় যেন ইন্ডিয়া নামের দেশটা পুরোপরি ওয়েস্টার্নাইজড হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েদের কী সব চোখ ঝলসানো পোশাক, কতরকম গাড়ি, কমপিউটার দারুণ কেরামতি, আর কত টাকা খরচ হয় একটা বিজ্ঞাপনে! এসব দেখে হাসে অতনু। দূরে থাকলেও সে তো মোটামুটি খবর রাখে দেশের। ইন্টারনেটেও পড়া যায় কলকাতার খবরের কাগজে।
টিভিতে অনেকগুলো বাংলা চ্যানেল, তাতে সিনেমা দেখায়, আর হরেক সিরিয়াল কাহিনী, বিদেশের মতোন। এসব একটা সিনেমারও সে নাম শোনেনি, এখনকার অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও সে চেনে না। উত্তমকুমার চলে গেছেন, সে জানে, কিন্তু বসন্ত চৌধুরী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ, অরুন্ধতী, অনুপ, এঁরা কেউ নেই! পুরনোদের মধ্যে রয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, আর একালের একজন নায়িকাকে কেন যেন তার চেনাচেনা মনে হয়, যদিও তার একটা ফিল্মও সে আগে দেখেনি, অথচ কোথায় তাকে দেখেছে, তা মনে করতে পারছে না।
এই সীতারামপুরেও অতনুর পুরনো কালের চেনা অনেকেই নেই। তার স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে চার-পাঁচজন এখানকার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে চলে গেছে কলকাতায় বা বিদেশে। আর যারা রয়ে গেছে, তারা রাজনীতির কচকচি বেশ ভালোই ভোজে। কিন্তু অন্য কোনো বিষয়ে তারা প্রায়ই কিছুই খবর রাখে না। আফ্রিকা সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। যাদের সঙ্গে তুই তুই সম্পর্ক ছিল, তারা এখন তাকে তুমি বলে। এদের সবারই বিশ্বাস, বিদেশে যারাই থাকে, তারা সবাই খুব বড়লোক। এনআরআই-রা অনেক টাকা পকেটে নিয়ে দেশে বেড়াতে আসে।
অবশ্য এনআরআই বলতে ইউরোপ-আমেরিকার অনাবাসীদের কথাই সবাই ভাবে। তারা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী বা বড় বড় বিদ্বান। অতনু এর কোনোটাই নয়। ছোটবেলায় সে ভেবেছিল, ডাক্তার হবে। এখানে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ার পর সে গিয়েছিল চক বাজারের হাইস্কুলে। রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই ছিল, কলকাতায় গিয়ে ডাক্তারি পড়া যেত অনায়াসেই, থাকতে হবে হস্টেলে। সব যখন প্রায় ঠিকঠাক, তখন একদিন রাত্রির খাওয়া-দাওয়ার পর তার বাবা একটা সিগারেট ধরিয়ে টানছেন বারান্দায় বসে, হঠাৎ প্রবল ভাবে কাঁপতে কাঁপতে পড়ে গেলেন মেঝেতে, বুকে ছুরিবিদ্ধ মানুষের মতোন গড়াতে গড়াতে আর্তনাদ করতে লাগলেন। একজন ডাক্তারকে ধরে আনা হয়েছিল দু’ঘণ্টা বাদে, ততক্ষণে বাবার শ্বাস-প্রশ্বাস খরচ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে গেল অতনুর ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন।
দাদা তখন রেশনিং অফিসে কেরানির চাকরি পেয়ে বর্ধমানে পোস্টেড, ছোট বোনের বিয়ে হয়নি। অতনু পড়াশোনা বন্ধ করে এক বছর পড়ে রইল এখানে। তার পরেও থেকে যেতে পারত গ্রামের অন্য ছেলেদের মতো, সেই ষোলো বছর বয়সেই সংসারের অনটন দেখে চেষ্টা করছিল টুকটাক উপার্জনের। বাবা অনেক ধার রেখে গেছেন। কিছুদিন সে আরও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হাঁস-মুরগির ডিম কিনে এনে সাপ্লাই দিত বাজারের কাছের দুটো ভাতের হোটেলে। শুধু মা দুঃখ করে বলতেন, তোর আর পড়াশোনা হবে না রে তনু! আমার গয়না বিক্রি করে দেব, তুই তবু পড়। ক’খানাই বা গয়না মায়ের, তা বিক্রি করে শহরে গিয়ে বেশিদিন পড়াশুনা চালানো যায় না। তা ছাড়া ছোট বোনের বিয়ের সময় গয়নাগুলো লাগবে না?
মায়ের বড় ভাই থাকতেন পুনায়। তিনি সেখানে স্কুলশিক্ষক। তিনি প্রস্তাব দিলেন, অতনুকে তার কাছে পাঠিয়ে দিলে তিনি ওর পড়াশোনার দায়িত্ব নেবেন। অতনু চলে গেল পুনায়। এসবই যেন সাপ-লুডোর ওঠানামা।
সংসারে আর একটি খাওয়ার পেট বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় মামিমা প্রথম থেকেই অতনুকে পছন্দ করেননি। তাঁকে খুব দোষ দেওয়া যায় না, তাঁদেরও অভাবের সংসার আর বড় মামাও খানিকটা আলাভোলা মানুষ। তিনি অতনুকে ডাক্তারি পড়াতে পারেননি, তবু ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন হোটেল ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে পাস করার পরই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে সে চাকরি পেয়ে যায় আফ্রিকার কেনিয়ায়। সীতারামপুর গ্রামের একটি ছেলে চাকরি করতে যাবে কেনিয়ার হোটেলে! নিয়তির নির্বন্ধ।
আফ্রিকা থেকে মাকে নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছে অতনু। তখনই ছোট বোনের বিয়ে হয়। দাদা বাড়ির সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রাখেনি। আফ্রিকায় অতনুর চাকরি নিয়ে অনেক ঝঞ্ঝাট হয়েছে বেশ কয়েক বছর। ওখানে হোটেল ম্যানেজমেন্টে ইন্ডিয়ান ট্রেনিংয়ের চেয়েও সুইজারল্যান্ডের ট্রেনিং সার্টিফিকেটের কদর অনেক বেশি। কেনিয়ার ট্যুরিজম ও হোটেল ম্যানেজমেন্টে অনেক সুইস কাজ করে। তাদের সঙ্গে রেষারেষিতে অতনুর পদোন্নতি আটকে যায় বারবার। একবার তার কর্মস্থান-হোটেলটা বিক্রি হয়ে যায়, নতুন মালিকরা প্রথমে তাকে রাখতেই চায়নি, রাখলেও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের পদ তাকে দিতে চায়নি। সেই সময়েই মা মারা যান।
মাকে নিজের কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছিল অতনু। মা রাজি হননি। শুধু বলতেন, আফ্রিকা, ওরে বাবা! না না, ওখানে গিয়ে থাকতে পারব না। মা ভাবতেন, শুধু নেংটি পরা, বর্শা হাতে দুর্ধর্ষ ধরনের মানুষরাই সেখানে ঘুরে বেড়ায়। মাকে কিছুতেই বোঝাতে পারেনি অতনু যে নাইরোবি খুবই আধুনিক শহর, সেখানকার মেথররাও প্যান্ট-শার্ট ও জুতো পরে। মা না হয় স্বল্প শিক্ষিত মহিলা, ও রকম ধারণা থাকতেই পারে, কিন্তু এখানকার অনেক শিক্ষিত ভদ্রলোকেরও তো আধুনিক আফ্রিকা সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার নয়। যতবার সে দেশে এসেছে, প্রতিবারই কেউ না কেউ বলেছে, তুমি আফ্রিকায় পড়ে আছ কেন, বিলেত-আমেরিকায় চলে যেতে পারলে না? ওসব দেশে তো হোটেল অনেক বেশি। এবারেও একজন বলছে। কলকাতাতেও অনেক নতুন নতুন হোটেল খুলছে, তুমি এখানে কাজ পাও কি-না দেখো না! গত পাঁচ বছর ধরে অতনু নাইরোবির যে হোটেলে কাজ করছে, সেটা কলকাতার গ্র্যান্ড বা তাজের চেয়ে অনেক বড়। সেখানকার কাজে সে বেশ খুশি। একটি বেলজিয়ান মেয়ের সঙ্গে সহবাস করে।
কলকাতা শহরটা অনেকটা বদলেছে ঠিকই। এয়ারপোর্ট থেকে আসবার যে নতুন রাস্তাটা হয়েছে, সে রাস্তার পাশে পাশে নতুন নতুন প্রাসাদ দেখে সে মুগ্ধ হয়ে গেছে। তার মনে হয়, কলকাতার চেয়ে সে নাইরোবি শহর অনেক বেশি চেনে। কলকাতায় তো সে কখনও থাকেনি।
এবারে অবশ্য সে একটা ভালো জায়গা পেয়েছে। রাজেশ আগরওয়াল নামে মাড়োয়ারি ভদ্রলোকের ব্যবসা আছে কিনিয়া আর তানজানিয়ায়। তিনি নাইরোবিতে প্রায়ই যান এবং প্রতিবারই রয়াল ক্রাউন হোটেলে ওঠেন। ভদ্রলোক বাংলা বলেন মাতৃভাষার মতো। মেনটেন্যান্স ম্যানেজারের নাম অতনু ঘোষ দেখেই তিনি তার সঙ্গে আলাপ করেছেন। মাঝে-মধ্যে সন্ধেবেলা গল্প হয়ে অনেকক্ষণ।
অতনু নিজের কোয়ার্টারে তাকে নেমন্তন করেও খাইয়েছে, তিনিও অতনুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলেন কলকাতায়। তার নিজের বাড়িতে নয়, আগরওয়ালদের একটি ননফেরাস মেটালের কারখানা আছে টালিগঞ্জ অঞ্চলে, অতনুর থাকার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দেয়াল ঘেরা এলাকাটিতে রয়েছে সুসজ্জিত বাগান, একটি গাড়িও বরাদ্দ করা আছে তার জন্য।
অতনু অবশ্য মেট্রো ট্রেনে যাতায়াত করে বেশ নতুনত্ব বোধ করে। কলকাতা শহরের মাটিরতলা দিয়ে ট্রেন চলে, এ খবর তার না জানার কথা নয়, যদিও আগে কখনও স্বচক্ষে দেখেনি, তাই প্রথম দিনে সেই ট্রেনে ওঠা যেন মনে হয়েছিল আবিষ্কারের মতন।
রাত আটটা ন’টায় ট্রেন থেকে নামলে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মেয়েকে দেখা যায়। তাদের স্বাস্থ্য এত খারাপ কেন? ভাল করে সাজতেও জানে না। যে শহরের বার-নারীদের অবস্থা করুণ, সে শহরের নৈতিক স্বাস্থ্যও খারাপ হয়, অর্থাৎ অনেক সুখী সংসারের মধ্যেই নৈতিকতার পতন হয়েছে। সত্যি কি তাই? জাগতিক উন্নতি আর নেতিকতার পতন পাশাপাশি চলে! এই শহর থেকেই সবচেয়ে বেশি কিশোর ও যুবতী পাচার হয়ে যায় বাইরে, খবরের কাগজেই ছাপা হয়। সে সব মেয়েদের জায়গা হয় না এই উন্নতির মধ্যে!
ভাল পেনের ব্যবহার তো উঠেই গেছে। এখন সবাই সস্তার পেন দিয়ে লেখালেখি করে। অতনুর বাবার পকেট থেকে একটা শেফার্স পেন চুরি গিয়েছিল লোকাল ট্রেনে। এখন সেই সব পেন পকেটমাররা বেকার, সাত-আট টাকার ডট পেন মেরে কোনো লাভ হয় না। মেট্রো সিনেমার সামনে একজন সিড়িঙ্গে চেহারার প্রৌঢ় সেই পেন বিক্রি করতে এসেছিল অতনুকে। হোটেলে যারা কাজ করে, তাদের কাছে এই পেন যে কত গণ্ডা থাকে, তার ঠিক নেই। সীতারামপুরে বিলি করার জন্য অতনু তার হোটেলে নাম লেখা এই ধরনের পেন এনেছিল পাঁচ ডজন।
লোকটিকে দেখে অতনু চমকে উঠে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
সে চিনতে পেরেছে। কিন্তু সেটা জানানো ঠিক নয়। এই লোকটি তাদের সীতারামপুরের স্কুলের ইন্দুভূষণ স্যারের ছেলে বিশ্বনাথ, অতনুর সহপাঠী। অথচ এর মধ্যেই এত বুড়োটে চেহারা হয়ে গেছে। দারিদ্র্য আয়ু হরণ করে নেয়, স্বাস্থ্য, শরীরের জ্যোতি, সবই খেয়ে নেয়। অতনুর এখনও অটুট চেহারা, গায়ের রং কালো হলেও অনেকে তাকে সুপুরুষই বলে। বিশ্বনাথ ইস্কুল মাস্টারের ছেলে, অথচ তার এই পরিণতিং জুয়া খেলে নে, না নেশা করে? উন্নতির দৌড়ে সে পা মেলাতে পারেনি!
মস্ত বড় হোর্ডিং-এ বাংলা ফিল্মের এক নায়িকার মুখ দেখে তার খটকা লাগে। কোথায় একে দেখেছে? কোনও ফিল্মে নয়।
কলকাতার সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে রাজেশ আগরওয়ালের বেশ যোগাযোগ আছে। তার অনেক ব্যবসা, তা ছাড়াও ফিণ্ম প্রোডিউস করেন। এতগুলো ব্যবসার কথা মাথায় রাখেন কী করে? এত টাকা নিয়েই বা কী পরমার্থ হবে!
মাঝে মাঝেই তিনি পাঁচতারা হোটেলে পার্টি দেন। একটা শহরের, যাদের বলে গ্গ্নটারেট্টি, তারা অনেকেই আসেন, কিছু কিছু রাজনীতির লোকও। সার্থকভাবে ব্যবসা চালাতে গেলে টেবিলের তলা দিয়েও কিছু কিছু আদান-প্রদান করতে হয়। সবাই জানে। তবুও জিনিসটা চাপা দেবার জন্য মাঝে মাঝে সংস্কৃতির অনুষ্ঠানের আয়োজন করা বেশ সুবিধেজনক। বাঙালিদের ধারণা, যারা সংস্কৃতি ভালবাসে, তারা উচ্চ মার্গের মানুষ। তারা কখনও কোনও নোংরা ব্যাপারে জড়াতে পারে না।
রাজেশ আগরওয়াল অতি সজ্জন ও বিনয়ী ব্যক্তি। হয়তো সত্যি তিনি সংস্কৃতি প্রেমিক। পার্টিতে ঢোকার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে হাত জোড় করে তিনি নিজে সব অতিথিকে অভ্যর্থনা জানান, অনেককেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে নাম ধরে চেনেন। ভদ্রতাবশত তিনি অতনুকেও আজকের পার্টিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
হোটেল সংলগ্ন বিস্তৃত লনে পার্টি। সবুজ ঘাস ঘিরে চেয়ার, অতিথি অন্তত পঞ্চাশজন তো হবেই। মাঝখানে একটা অস্থায়ী মঞ্চে একটি মেয়ে গান গাইছে। আজকাল গায়িকাদের খুব স্বল্প পোশাক পরাই রীতি। সারা গা ঢেকে গান আজকাল পুজোর অনুষ্ঠানেও চলে না। গরম দেশ, তবু এর মধ্যে অনেক পুরুষেরই অঙ্গে কোট আর টাই। আর মেয়েদের শরীরের অনেকটাই খোলামেলা।
এত লোক হলে, ছোট চোট দলে ভাগ হয়ে আড্ডা হয়। দু’চারজন মদের গেলাস হাতে ঘুরে ঘুরে অনেকের সঙ্গে আরাপ করে। আর বেশির ভাগ অতিথি বসে থাকে একই চেয়ারে।
অতনু এখানে একজনকেও চেনে না। সে গ্রামের ছেলে, কলকাতায় কখনও পাত্তা পায়নি। তারপর পুনা থেকে চলে গেছে ধাদ্ধারা গোবিন্দপুরের চেয়েও অনেক দূরে কালো মানুষদের দেশে। এই ধরনের পার্টিতে এলে সে জানে একা একা বেশি মদ খেয়ে নিতে হয়। আর দেখতে হয় অন্যদের। হোটেল ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং থেকে সে জানে। মদ খেয়ে কখনও বেচাল হতে নেই, একটা সময়ে মদের গেলাস শুধু হাতে ধরে রাখলেও চুমুক দেবার বদলে মাঝে মাঝে ফেলে দিতে হয় মাটিতে।
অতনু নিজে থেকে কারও সঙ্গে আলাপ করে না, তবে অচেনা কেউ কথা বলতে এলে সে গুটিয়ে থাকে না। একটা কিছু হাসি-ঠাট্টার প্রসঙ্গ খুঁজে নেয়।
পার্শ্ববর্তী পাঁচ ছ’জনের দলের একজন সুবেশা তরুণী তার দিকে ঝুঁকে বলল, আপনার সঙ্গে আমাদের আলাপ নেই। আমার নাম সুদর্শনা রায় গুপ্ত, আমি একজন সাংবাদিক।
অতনু নিজের নাম জানিয়ে বলল, গ্ল্যাড টু মিট ইউ, আপনি কোন কাগজের?
সুদর্শনা নিজের কাগজের একটা কার্ড দিয়ে বলল, আপনি কোথায়?
অতনু বলল, আমি থাকি আফ্রিকায়। কয়েকদিনের জন্য এসেছি।
আফ্রিকা শুনেই একজন পুরুষ গলা বাড়িয়ে বলল, আপনি আফ্রিকায় থাকেন? কোথায়?
এই ধরনের বাঙালি আড্ডায় কথা জমাবার জন্য অতনুর একটা বাঁধা রসিকতা আছে।
সে বলল, আমি থাকি কেনিয়ার নাইরোবি শহরে। রবীন্দ্রনাথ এই শহর নিয়ে গান লিখেছেন, আপনারা জানেন?
এবার অনেকগুলি কৌতূহলী মুখ কাছে ঝুঁকে আসে। একজন বলল, রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকা নিয়ে একটা বড় কবিতা লিখেছেন জানি। কিন্তু লাইব্রেরি নিয়ে—
অতনু বলল, রবীন্দ্রনাথ নিজের নাম নিয়ে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। তাই রবি’র সঙ্গে কবি, ছবি,হবি এই সব মিল দিয়েছেন, মিল খুঁজতে খুঁজতে একবার নাইরোবীও পেঁৗছে গেছেন একটা গানে। সেই গানটা হল, সকালবেলার আলোয় বাজে, বিদায় ব্যথার ভৈরবী/ আন বাঁশি তোর, আর কবি… এরপর একটা লাইন হল নাই যদি রোস নাই রবি, সেদিন নাইরবি…
সবাই কলহাস্যমুখর হয়।
আর কিছু বলার আগেই একটা গুঞ্জন ও কিছু লোকের ব্যস্ততা দেখা যায় প্রবেশ মুখে। বিশিষ্ট কোনো অতিথি এসেছেন।
রাজেশ আগরওয়াল হাত জোড় করে ও কোমর ঝুঁকিয়ে সেই অতিথিকে নিয়ে আসছেন, অতিথি একজন মহিলা। সাদা সিল্কের শাড়ি পরা, তার থেকে ঝিলিক মারছে অনেক জরির চুমকি, মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা, পালিশ করা মুখ, খুব গ্গ্ন্যামারের ছড়াছড়ি।
অতনু সাংবাদিকটিকে জিজ্ঞেস করল, ইনি কে?
সে বলল, সে কী। আমাকে বলেছেন বলেছেন, আর কারুকে বলবেন না। লোকে আপনাকে গেঁয়ো ভূত ভাববে। সুরশ্রী মিত্র, বাংলা ফিল্মের সবচেয়ে নামী নায়িকা, মুম্বাই থেকেও ডাক এসেছে, চলে গেল বলে।
আর একবার তাকিয়ে দেখে বুঝল। কয়েকদিন আগেই টিভির কোনও ফিল্মে সে এই নায়িকাটিকে দেখেছে, গ্রাম্য মেয়ের ভূমিকায় সাজপোশাক ছিল অন্যরকম? কেন ওকে একটু চেনা চেনা লাগছিল তার কারণটাও বোঝা গেল, সীতারামপুরের গোল গম্বুজটার গায়ে ফিল্মের পোস্টারে এরই মুখের ছবি ছিল, যাতায়াতের পথে সে অনেকবার দেখেছে।
একটু বাদে রাজেশ আগরওয়াল তার এই প্রাইজড পজেশানটি সকলকে ভাল করে দেখাবার জন্য নিয়ে আসলেন প্রতিটি চেয়ারের সামনে। জনে জনে হাত তুলে নমস্কার করছে। উত্তরে মিষ্টি হাসি বিলোচ্ছেন নায়িকাটি।
অতনুর কাছে এসে সে একটু থমকে দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল নির্নিমেষে! তারপর অস্ফুট গলায় বলল, তনুদা?
অতনুরও আর চিনতে দেরি হলো না, সেও সঙ্গে সঙ্গে বলল চিনু! তাই না?
নায়িকা জিজ্ঞেস করল, তুমি এখানে কোথা থেকে এলে? তুমি তো হারিয়ে গিয়েছিলে।
অতনু বলল, এসেছি এক জঙ্গলের দেশ থেকে। দৃশ্যটি একটু বেশি নাটকীয়। তাই বেশিক্ষণ টানা যায় না। অভ্যেস মতন অতনুকেও একটু হাসি উপহার দিয়ে এগিয়ে গেল নায়িকা অন্যদের দিকে।
এই সেই দস্যি মেয়ে চিনু, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সেই যে রূপকথার গল্পে আছে, একটা ব্যাঙ একদিন হঠাৎ রাজপুত্র হয়ে গেল। এ যেন ঠিক তার উল্টো। সেদিনের সেই রোগা প্যাংলা মেয়েটা আজকের এই রূপসী!
মহিলা সাংবাদিকটি জিজ্ঞেস করল, আপনি একে পার্সোনালি চেনেন বুঝি?
অতনু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, সে অনেক ছেলেবেলায়।
সে বুঝিয়ে দিল যে, এই বিষয়ে সে আলোচনা চালাতে উৎসাহী নয়। সে চুমুক দিল গেলাসে। একটু পরেই এক যুবক এসে অতনুকে বলল, আপনাকে একবার ওদিকে ডাকছে।
আলোর বৃত্ত থেকে একটু বাইরে। আধো-অন্ধকারে একটা চেয়ারে বসে আছে নায়িকা। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন।
অতনুকে দেখে সে অন্যদের বলল, এই এখানে একটা চেয়ার দাও। আর তোমরা একটু যাও, ওঁর সঙ্গে আমার কথা আছে।
অতনু বসবার পর একটু ঝুঁকে এসে তার একটা হাত ধরে নায়িকা সম্পূর্ণ অভিনয়হীন গলায় বলল, তনদুা, তোমাকে কতদিন পর দেখলাম। আগরওয়ালজি বললেন, তুমি এখন আফ্রিকায় থাকো।
অতনু বলল, হ্যাঁ। চিনু, তুই কবে সিনেমার নায়িকা হয়েছিস? শুনলাম তার খুব নাম, এসব আমি কিছুই জানি না। তোর ভালো নামও তো আমি জানতাম না।
চিনু বলল, কেন তোমাদের ওখানে বাংলা ফিল্ম যায় না?
অতনু বলল, কী জানি। হিন্দি ফিল্ম কখনও সখনও প্রাইভেটলি দেখানো হয় শুনেছি। তাও আমার দেখা হয় না। তুই হিন্দিতেও করেছিস।
করেছি দু’একটা। সব বাঙালিরাই আমাকে চেনে, একমাত্র তুমি ছাড়া।
তারপর একটু দুষ্টুমির হাসি দিয়ে সে আবার বলল, কিংবা, একমাত্র তুমি আমাকে যেভাবে চেন, সেভাবে এখন আর কেউ চেনে না।
তুই কী করে নায়িকা হয়ে গেলি রে? চেহারাটাও বদলে গেছে।
ওসব কথা ছাড়ো। হয়ে গেছি কোনো রকমে। তুমি কেমন আছ, বলো। বিয়ে করেছ?
ভালোই আছি রে। না বিয়ে করিনি। তবে একজন বিদেশিনী মেয়ের সঙ্গে ভাব আছে। তুই?
আমার একটা বিয়ে ভেঙে গেছে। আর একটা, নাঃ, এখনও কিছু ঠিক নেই।
তুই আমাকে দেখে চিনলি কী করে? আমি তো তোকে চিনতে পারিনি, শুধু একটু একটু মনে হচ্ছিল, তোর নাকটা শুধু…
হ্যাঁ, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা আমাকে বলে নাকেশ্বরী। তোমার চেহারা তো প্রায় একই রকম আছে। পুরুষরা বিশেষ বদলায় না। আমাদের তো মেক-আপ টেক-আপ দিয়ে…
অতনু একটা সিগারেট ধরালো।
চিনু বলল, তুমি এখনও সিগারেট খাও? অনেকেই তো… আমিও ফিল্ম লাইনে এসে প্রথম প্রথম খুব খেতাম, এখন একদম ছেড়ে দিয়েছি, অন্তত সাত বছর, দাও, তোমার থেকে একটা টান দিই।
সিগারেটটা হাতে নিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল চিনু।
অতনু জিজ্ঞেস করল, তুই আর সীতারামপুরে যাস?
চিনু বলল, নাঃ। ওখানে তো ছিল আমার মামাবাড়ি। প্রায়ই যেতাম এক সময়, আমাদের বাড়ি ছিল ব্যারাকপুরে। তারপর বাবা বদলি হয়ে গেলেন নর্থ বেঙ্গলের মালবাজারে।
অতনু বলল, ও হ্যাঁ, মামাবাড়ি। ওঁরা আর কেউ নেই শুনেছি। তোর একটা ফিল্ম কয়েকদিন আগে দেখলাম টিভিতে। নামটা বোধহয় ‘আশালতা’, তাই না?
হ্যাঁ।
তাতে তুই একটা গ্রামের মেয়ে, ডুরে শাড়ি পরা, একটা সিনে আছে, তুই একটা পুকুর থেকে ডুব দিয়ে উঠে এলি… হ্যাঁরে চিনু, তুই ও রকম কোমর দুলিয়ে হাঁটা কোথায় শিখলি রে? গ্রামের মেয়েরা কি ওইভাবে হাঁটে?
তুমি কী যে বল তনুদা? সিনেমা করতে গেলে কত কী শিখতে হয়। গ্রামের মেয়েরা ওইভাবে হাঁটে না, ওসব মেক বিলিভ, অধিকাংশ সিনেমাই তো রূপকথা, তাই না?
তুই নাচ জানিস?
মাঝে মাঝে নাচতে হয়, কিন্তু তাকে নাচ বলে না।
একজন যুবক হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, মিস, আপনাকে ওদিক আসতে বলছেন আগরওয়ালজি। সবাই আপনাকে চাইছে।
চিনু রুক্ষ গলায় বলল, একটু পরে যাচ্ছি, এখন ডিস্টার্ব কোরো না।
ছেলেটি ফিরে যাবার পর চিনু বলল, একটু নিরিবিলিতে যে তোমার সঙ্গে গল্প করব, তার উপায় নেই। তুমি কতদিন আছ?
অতনু বলল, পরশু ফিরে যাব।
চিনু বলল, এই রে, এই দু’দিন আমার টানা শুটিং। আউটডোর। তুমি আসবে, ডায়মন্ডহারবারে? না থাক, শুটিং-এর সময় আমি তোমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে পারব না। তোমারও বোরিং লাগবে।
অতনু বলল, শুটিং দেখা আমার পোষাবে না।
আবার একজন যুবক দৌড়ে এসে বলল, মিস, আপনার নাম অ্যানাউন্স করা হয়ে গেছে, আপনাকে একবার সেন্টার স্টেজে দাঁড়াতে হবে।
চিনু বলল, ঠিক আছে। যাচ্ছি।
উঠে দাঁড়িয়ে সে অনেকটা আপন মনে বলল, নায়িকা টায়িকা হতে গেলে অনেক কিছু মূল্য দিতে হয়, সে তুমি বুঝবে না।
অতনু মনে মনে ভাবল, না বোঝার কী আছে? সব দেশেই তো এক।
চিনু আবার বলল, যে কোনো লাইনেই ওপরে উঠতে গেলে কিছু না কিছু মূল্য দিতে হয়ই, তাই না? আমাদের ফিল্ম লাইনেও… কোনো ইনহিবিশন রাখলে চলে না। যাই। তোমার সঙ্গে আবার কখনও দেখা হবে কিনা জানি না। তবু একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। বলব?
বল!
তনুদা, তোমার সেই দিনটার কথা মনে আছে? সেই ভুতুড়ে বাড়িটায়…
মনে থাকবে না কেন? তোর যে মনে আছে, সেটাই আশ্চর্যের।
তনুদা, জীবনে আমি অনেক অভিজ্ঞতা পার হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সেদিন, আমি যে তীব্র আনন্দ পেয়েছিলাম তার কোনো তুলনা হয় না। তোমাকে দেখে… সে রকম আর কখনও… চলি ওরা আর থাকতে দেবে না।
হঠাৎ কি চিনুর গলায় কান্না এসে গেল? মুখ নিচু করে সে দ্রুত পায়ে চলে গেল আলোর বৃত্তের দিকে।
অতনু আরও কিছুক্ষণ বসে রইল সেখানেই। সেই বট-অশ্বত্থের ফাটল ধরানো পোড়োবাড়ি। গা-ছমছমে দুপুর। সিগারেট খেতে চেয়েছিল চিনু, একদিন অতনুকে ধরে ঝুলোঝুলি, তাই বন্ধুদের বাদ দিয়ে শুধু চিনুকে নিয়ে এক দুপুরে চুপি চুপি সেই বাড়িতে গিয়েছিল অতনু।
সিগারেটে প্রথম টান দিয়েই কাশতে শুরু করেছিল চিনু, তার পিঠে ছোট ছোট চাপড় মেরে দিচ্ছিল অতনু, তারপর কী যেন হল, পর পর পাঁচটা চুমু খেয়েছিল সে। চিনু অবাক হয়নি, প্রথমবারের পর, পাখির বাচ্চা যেমন পাখি-মায়ের সামনে ঠোঁট ফাঁক করে থাকে, সেইভাবে চিনু এগিয়ে দিয়েছিল ঠোঁট।
তাদের দুজনেরই সেই প্রথম অভিজ্ঞতা। তার পর নদী দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেছে, সেই বাড়িটা আর নেই, চিনু কত বদলে গেছে। অনেক কিছুই বদলে গেছে, তবু চিনু যে আজ বলল, সে রকম তীব্রতা সে আর জীবনে পায়নি, তার চোখে জল এসে গেল… এই স্মৃতি নিয়েই ফিরে যাবে অতনু।

বন্ধু ও শত্রু আলবেয়ার কামু ও জঁ পল সার্ত্রে - শাহনেওয়াজ বিপ্লব


আলবেয়ার কামু (জন্ম : ৭ নভেম্বর ১৯১৩, মৃত্যু : ৪ জানুয়ারি ১৯৬০)



আলবেয়ার কামু এবং জঁ পল সার্ত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও এর পরের বছরগুলোতে ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও তাত্ত্বিক তো বটেই এবং সেই সঙ্গে অস্তিত্ববাদী দর্শনকে বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুবাধে দুজনকেই বিবেচনা করা হয় বিংশ শতকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা সাহিত্যিক হিসেবে।

আলবেয়ার কামু এবং জঁ পল সার্ত্রে- লেখালেখির জীবনের শুরু থেকেই দুজন ছিলেন একই পথের যাত্রী। তাঁরা উভয়ে একই সঙ্গে নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, দার্শনিক এবং দুজন একই সঙ্গে ছিলেন পত্রিকার সম্পাদকও; দুজনই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন কয়েক বছরের ব্যবধানে। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চিন্তার বাইরে ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও অনেক বিষয়ে মিল ছিল দুজনের মধ্যে। দুজনই খুব পছন্দ করতেন নারীসঙ্গ। 'নারীসঙ্গ কী খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখকের সত্যিকারের লেখক হয়ে ওঠার জন্য?'- ১৯৪০ সালে সার্ত্রে প্রশ্ন রেখেছিলেন তাঁর ডায়েরিতে। তারপর লিখেছেন, 'নারীসঙ্গবিহীন একাকী জীবন সত্যিই বিরক্তিকর আর কৌতূহলহীন।'

আর এর পরের ঘটনা তো সবারই জানা। সিমোন দ্য বোভোয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর প্যারিসের সব সাহিত্য আলোচনায়, ক্যাফে হাউসে অথবা ডিসকোতে সবাই সব সময় একই সঙ্গে দেখেছে সার্ত্রে আর বোভোয়ারকে।

অন্যদিকে আলবেয়ার কামুও ঠিক সার্ত্রের মতোই তাঁর বান্ধবী তানিয়াকে নিয়ে সাহিত্য আড্ডা বা সাহিত্য আড্ডার বাইরে যাতায়াত করতেন। পরে অবশ্য আলবেয়ার কামু তানিয়া ছাড়াও অন্য মেয়েদের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন এবং দুবার বিয়েও করেছেন।

১৯৪৩ সালের গ্রীষ্মে জঁ পল সার্ত্রের নাটক 'দ্য ফ্লাইজ' দেখতে গিয়েই কামুর সঙ্গে সার্ত্রের প্রথম পরিচয় হয়, তারপর নানা সাহিত্য আড্ডায় এমনকি ব্যক্তিগত জীবনদর্শনের দিক দিয়েও একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। দুজনই প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন অস্তিত্ববাদী দর্শনকে সাহিত্য ও শিল্পকলায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। দুজনই ছিলেন কমিউনিজমের প্রতি অনুরক্ত। ১৯৪৪ সালে আলবেয়ার কামু 'কমব্যাট' পত্রিকার সম্পাদক হয়ে বিপ্লবী অনেকগুলো কলাম লিখেন, যা সে সময় ফ্রান্সের জনগণের ভেতর বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। কামুর আমন্ত্রণে সার্ত্রেও মাঝেমধ্যে কলাম লিখেছিলেন 'কমব্যাট' পত্রিকায়। পরে আলবেয়ার কামুকে অনুসরণ করে জঁ পল সার্ত্রেও ১৯৪৫-এ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর পত্রিকা 'মডার্ন টাইমস'। তিনিও কামুর মতোই সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সব কলাম লিখতেন। ফলে একই পথের পথিক হিসেবে সাহিত্য, দর্শন আর সাংস্কৃতিক মিলের সুবাদে তাঁদের ভেতর ঐক্য আর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এমনকি ১৯৪৫ সালে আমেরিকায় গিয়ে 'ফ্রান্সের নয়া সাহিত্য'তত্ত্ব উপস্থাপন করার সময় সার্ত্রে ফ্রান্সের নতুন সাহিত্য যুগের প্রতিনিধি হিসেবে আলবেয়ার কামুর নাম ঘোষণা করেন, যেটিকে কামুর প্রতি সার্ত্রের বড় রকমের বন্ধুত্বের পরিচয় বলে অনেকেই মনে করেন।

অবশ্য তাঁদের এ বন্ধুত্ব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আলবেয়ার কামুর কমিউনিজমের প্রতি বিরাগ ও স্ট্যালিনের সমালোচনা, সার্ত্রের সঙ্গিনী বোভোয়ারের কামুর প্রতি আকর্ষিত হওয়ার ঘটনায় এবং অস্তিত্ববাদ বাদ দিয়ে উদ্ভটবাদ তত্ত্বের দিকে কামুর ঝুঁকে পড়া নিয়ে তাঁদের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। অবশ্য দুজনের ভেতর প্রথম বিরোধের সূচনা সিমোন দ্য বোভোয়ারকে নিয়ে। সিমোন দ্য বোভোয়ার ছিলেন সার্ত্রের আজীবনের বিশ্বাসযোগ্য সঙ্গিনী। কিন্তু সার্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার প্রথমদিকের দিনগুলোতে সিমোন দ্য বোভোয়ার কিছুটা আকর্ষিত হয়ে পড়েছিলেন কামুর প্রতি এবং এ ঘটনাকে সহজভাবে গ্রহণ করেননি সার্ত্রে। পরে এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে আলবেয়ার কামুর বান্ধবী তানিয়াকে, সার্ত্রে নিজের দিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন, যেটা অনেক পরে সিমোন দ্য বোভোয়ারকে লেখা এক চিঠিতে স্বীকার করেছিলেন সার্ত্রে। সেই চিঠি থেকে জানা যায়, তানিয়া সার্ত্রেকে জানিয়েছিলেন যে কামুর চেয়ে সার্ত্রেকেই অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য এবং ভালোমানুষ মনে হয়েছিল তানিয়ার কাছে।

এ ঘটনা ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কমিউনিজম নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ও স্ট্যালিনের সমালোচনায় মুখর হন আলবেয়ার কামু। অবশ্য ১৯৩৫ সালে ফ্রান্স কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সব সময় সরব ছিলেন কামু, যে কারণে ট্রটস্কিপন্থী আখ্যা দিয়ে কামুকে একবার বহিষ্কারও করা হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি থেকে। অন্যদিকে কমিউনিজমে মুগ্ধ সার্ত্রে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ না দিলেও নিজেকে মার্কসবাদী বলে দাবি করতেন, তিনিও কামুর মতো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে মানবাধিকার আর নাগরিক পরাধীনতার সমালোচনা করতেন, তবে সেটা কামুর মতো অতটা কঠোর ছিল না। যে কারণে কামুর সঙ্গে সার্ত্রে এবং কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা-কর্মীর বিরোধ তৈরি হয়েছিল।

এ ছাড়া অস্তিত্ববাদ বাদ দিয়ে উদ্ভটবাদ নামে খানিকটা অস্তিত্ববাদের বিরোধী মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করা নিয়েও সার্ত্রের সঙ্গে কামুর বিরোধ ছিল। আলবেয়ার কামু, জঁ পল সার্ত্রে এবং সিমোন দ্য বোভোয়ার- তিনজন মিলেই অস্তিত্ববাদী ধারায় কাজ করলেও পরে অস্তিত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় অন্যতম তাত্ত্বিক হিসেবে নিজের নাম ও অবদানের কথা অস্বীকার করেন কামু। মূলত ১৯৫১ সাল পর্যন্ত আলবেয়ার কামুর সঙ্গে জঁ পল সার্ত্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

আলবেয়ার কামু এবং জঁ পল সার্ত্রের পারস্পরিক শত্রুতা নিয়ে অনেক গুজব প্রচলিত থাকলেও দুজনের কেউ কখনো তা স্বীকার করেননি। তবে কামুর মৃত্যুর পর আলবেয়ার কামুকে লেখা এক খোলা চিঠিতে সার্ত্রে লিখেছিলেন, 'প্রিয় কামু, আমাদের দুজনের মধ্যে যতটা বন্ধুত্ব ছিল, ততটাই ছিল শত্রুতা; কিন্তু তার পরও আমি আজ স্বীকার করছি যে আগামী দিনগুলোতে আপনার অনুপস্থিতি অনুভব করব আমি। কারণ আপনিই ছিলেন প্যারিসের একমাত্র সাহিত্যিক, যিনি আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।' এ ছাড়া কামুর মৃত্যুতে সার্ত্রে শোক প্রকাশ করে লিখেছিলেন, 'অবধারিতভাবেই কামু আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রধানতম ব্যক্তিবর্গের একজন হয়ে উঠেছিলেন এবং ফ্রান্সের ইতিহাস ও তার নিজের শতাব্দীর তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র প্রতিনিধি।'

অবশ্য জীবদ্দশায় আলবেয়ার কামু নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার জন্য সুইডেনের স্টকহোমে গেলে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন সার্ত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে। জবাবে কামু বলেছিলেন, সার্ত্রের সঙ্গে আমার লেখালেখি বা ভাবনার যে বিরোধ, সেটিই সবার চোখে পড়ে। কিন্তু তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো বিরোধ নেই। তবে বলা দরকার যে সাহিত্য ভাবনায় সাহিত্যিকদের মধ্যে নানা রকম পক্ষ-বিপক্ষ আছে বলেই বিংশ শতকের সাহিত্য শক্তিশালী হয়েছে অন্য শতকগুলোর তুলনায়।

১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় কামুর মৃত্যুর পর আরো ২০ বছর বেশি বেঁচে ছিলেন জঁ পল সার্ত্রে। মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সার্ত্রে জানিয়েছিলেন, সাহিত্যিকদের মধ্যে আলবেয়ার কামুই তাঁর সবচেয়ে সেরা ও সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলেন।


উৎস ঃ এখানে ক্লিক করুন ..

অন্ধকারে বসে থাকেন আমার বাবা - জেরোম ওয়াইডম্যান


অনুবাদ : মোজাফ্ফর হোসেন

আমার বাবার একটা আজব অভ্যাস আছে-- তিনি একাকী অন্ধকারে বসে থাকতে পছন্দ করেন।

প্রায়ই আমি বেশ রাত করে বাড়ি ফিরি। সমস্ত বাড়ি অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো থাকে। আমি যতটা সম্ভব নিরবে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করি যাতে আমার মার অর্ধঘুমন্ত অবস্থার কোন ব্যঘাত না ঘটে। পা টিপে টিপে আমি আমার রুমের ভেতর যাই এবং অন্ধকারে পোষাক পরিবর্তন করি। অতঃপর একইভাবে পানি পান করার জন্য রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াই। ভেতরে ঢোকা মাত্রই বাবার সাথে ধাক্কা লাগার উপক্রম হয়। তিনি পায়জামা পরিহিত অবস্থায় রান্না ঘরের একটি চেয়ারে বসে আছেন। হাতের চুরুটটা তখনো জ্বলছে।


‘কেমন আছো বাবা?’

‘এই তো...!’

‘তুমি এখনো ঘুমুতে যাওনি কেন, বাবা?’

‘খুব শীঘ্রই যাবো।’-- তিনি বললেন।

কিন্তু তিনি যান না। আমার যতক্ষণ না ঘুম আসে আমি টের পাই, বাবা ঠায় বসে আছেন, জ্বলছে হাতের চুরুটটাও।

মাঝে মধ্যে আমি বইয়ের মধ্যে ঢুবে থাকি। মা ততক্ষণে ঘুমানোর জন্য ঘরটা প্রস্তুত করছেন। আমার ছোটবোনটা তার রুমের মধ্যে প্রবেশ করে। তার ঘুমানোর আগ পর্যন্ত চুল আচড়ানো থেকে শুরু করে এটা-ওটার শব্দ ভেসে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যে শুনতে পাই, মা বাবাকে ‘শুভরাত্রি’ বলে রাতের শেষ কথা সেরে নিচ্ছেন। আমি তখনও পড়তে থাকি। অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই আমার পানি পিপাসা পায়। স্বাভাবিকের তুলনায় আমি একটু বেশিই পানি পান করি। রান্নাঘরে পা দেওয়া মাত্রই বাবার সাথে আমার হোঁচট লেগে যায় প্রায়। বেশিরভাগ সময় আমি বেশ চমকে উঠি, বাবার কথা প্রায়ই ভুলে যাই। তিনি তেমনি করে চুরুট হাতে বসে থাকেন আর কি যেন ভাবেন।

‘তুমি এখনো শুতে যাওনি কেন, বাবা?’

‘এই তো গেলাম বলে।’

কিন্তু তিনি যান না। চুরুট হাতে সেখানেই বসে থাকেন আর কি যেন ভাবতে থাকেন। আমি বুঝে উঠতে পারি না কিছুই, বিষয়টা আমাকে বেশ পিড়া দেয়। একদিন আমি জিজ্ঞেস করেই বসলাম--

‘বাবা, তুমি সবসময় এতো কি ভাবো?’

‘কই, কিছু নাতো!’

একসময় আমি তার কাছ থেকে সরে আসলাম। কয়েক ঘন্টা পরে আবারো আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি খুব তৃষ্ণার্ত ছিলাম ফলত পানি খাওয়ার উদ্দেশ্যে রান্নাঘরে গেলাম। তিনি তখনো বসে ছিলেন। তাঁর হাতের চুরুট শেষ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু তিনি বসে ছিলেন পূর্বের ন্যায় ঠায়, রান্নাঘরের দেয়ালের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। খুব তাড়াতাড়ি আমি অন্ধকারের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে পানি পান করলাম। তিনি বসে ছিলেন প্রশান্ত-পলকহীন। আমার মনে হল, আমার অবস্থান সম্পর্কে তিনি অবগত নন। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

‘তুমি এখনো শুতে যাওনি কেন, বাবা?’

‘এক্ষুনি যাবো। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো না।’

‘কিন্তু,’ বললাম আমি, ‘তুমি সেই কখন থেকে বসে আছো! কি হয়েছে তোমার? কি নিয়ে ভাবছ এতো?’

‘ও কিছু না’, তিনি বললেন, ‘এমনিই, এই একটু বিশ্রাম নিচ্ছি আর কি!’

তাঁর বলার ভঙ্গিটা সব সহজ করে দিল। তাঁকে মোটেই চিন্তিত মনে হল না। তাঁর কন্ঠস্বর ছিল শীতল, অন্যসব সময়ের মতই। কিন্তু আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না-- অন্ধকারে একটি কাঠের চেয়ারে এভাবে একাকী বসে থাকার মধ্যে প্রশান্তির কি আছে? অন্য কি কারণ থাকতে পারে? আমি আর সব সম্ভাবনার কথা ভেবে দেখলাম। আমি নিশ্চিৎ, এটা টাকা-পয়সা জনিত কোন ব্যাপার না। আমাদের খুব বেশি টাকা নেই বটে তবে অর্থনৈতিক কোন সমস্যার কথা তিনি গোপন রাখেন না। সমস্যটা তাঁর স্বাস্থ্য নিয়েও নয়। তিনি স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ উদাসীন। পরিবারের অন্যকারো স্বাস্থ্যও আলোচ্য সমস্যার কারণ হতে পারে না। আমাদের যথেষ্ট টাকা-পয়সা না থাকলেও স্বাস্থ্যের অবস্থা ঢ়ের ভালো। তাহলে কারণটা কি? -- আমি শত হাতড়েও পাই না। তবে তাতে আমার চিন্তা দমে যায় না মোটেও, বরং দ্বিগুন শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে আসে আবার, বার বার।

হতে পারে তিনি তাঁর ভাইদের নিয়ে চিন্তা করেন। কিংবা তাঁর নিজের মা এবং তার দুই সৎ মা অথবা তাঁর বাবাকে নিয়ে ভাবতে থাকেন। কিন্তু তাই বা হয় কি করে! -- তাঁরা তো সবাই মৃত। তাছাড়া তিনি তাঁদের নিয়ে এভাবে ভাববেন না। তিনি যে আসলে দুশ্চিন্তা করেন তাও কিন্তু নয়, এমনকি তাঁকে দেখলে চিন্তিতও মনে হয় না। তাঁকে খুব প্রশান্ত মনে হয়। ঠিক তৃপ্ত না তবে খুব উৎকণ্ঠশূন্য। তাঁর ভাষায় -- শান্তিময়। কিন্তু তা কি করে সম্ভব, আমি বুঝে পাই না। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি খুব চিন্নিত হয়ে পড়ি।

তিনি কেন অন্ধকারে ঐভাবে বসে থাকেন? তিনি কি খুব অন্যমনস্ক হয়ে উঠেছেন আজকাল? কিন্তু সবে তাঁর বয়স তেপান্ন, এবং তিনি আগের মতই সকল বিষয়ে উৎসাহি। আমার তো মনে হয় কোন দিক দিয়েই তাঁর কোন পরিবর্তন ঘটেনি। তিনি এখনও সুফ খেতে খুব পছন্দ করেন। এখনো তিনি দিনের শেষভাগে পড়তে বসেন। এখনো লম্বা কলার বিশিষ্ট শার্ট পরেন। মোদ্দাকথা, তাঁর কোন পরিবর্তনই ঘটেনি। এমনকি পাঁচ বছর আগে যেমন দেখাতো এখনও তেমনই দেখায়। ‘স্বাস্থ্যটাকে বেশ ধরে রেখেছেন তো!’ -- অনেকে প্রায়ই বলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য, তিনি একাকী অন্ধকারে চুরুট হাতে ঠায় বসে থাকেন!

যদি তাঁর কথা ঠিক বলে ধরে নিই, আমার আর কিছুই বলার থাকে না। কিন্তু ধরো তিনি যা বলছেন সঠিক না। হতে পারে এটা এমন কিছু একটা যার আমি কোন কূল-কিনারা পাচ্ছি না। খুব সম্ভবত তাঁর কারও সহযোগিতার প্রয়োজন। কেনই বা তিনি কথা বলেন না, হাসেন না, কাঁদেন না? কেনই বা তিনি নিজেকে কোন কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখেন না? এইভাবে বসে থাকার কোন মানে হয়?

শেষের দিকে আমার ধৈর্যচ্যুত ঘটলো। হতে পারে কোন সঠিক কারণ না খুঁজে পেয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলাম। আমার ভেতরে একধরনের রাগ তৈরি হল।

‘কোন সমস্যা বাবা?’

‘কিছু না। এমনিতেই...।’

কিন্তু এইবার এই উত্তরে দমে যাওয়ার পাত্র আামি না, আমার রাগ এখন মাথায় চড়ে গিয়েছে।

‘তাহলে তুমি এখানে এভাবে একাকী এতো রাত পর্যন্ত বসে আছো কেন?’

‘খুব শান্তিময়! আমার বেশ ভালো লাগে, তাই।’

আমি বাড়িতেই আছি। কাল আবার তিনি এমনি করে বসে থাকবেন। আমি ঘাবড়ে যাব, চিন্নিত হব। না, আজ এর একটা বিহিত করতেই হবে।

‘আচ্ছা, তুমি কি নিয়ে এত ভাবো বলো তো? শুধু এই একই স্থানে বসো কেন? তোমার কিসের এত চিন্তা, সত্যি করে বলবে কি?’

‘কোন কিছুই আমার চিন্তার কারণ না। আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি। আমার বসে থাকতে ভালো লাগে, এটুকুই..। তুমি ঘুমুতে যাও।’

আমার রাগ দূর হয়ে যায়। তবে চিন্তার দাবানলে এখনো পুড়তে থাকি। একটা যৌক্তিক কারণ আমাকে খুঁজে পেতেই হবে। বিষয়টা খুব পাগলামো ঠেকছে। তিনি কেনইবা আমাকে কিছু বলছেন না? মনে হচ্ছে এর কোন কারণ না খুঁজে পেলে আমিই পাগল হয়ে যাবো। আমি আরও জোর দিয়ে বললাম--

‘কিন্তু তুমি কি নিয়ে ভাব, বাবা? বিষয়টি কি?”

‘ও কিছু না। টুকটাক এটা-ওটা নিয়ে। তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।’

আমি আমার উত্তর পাই না।

অনেক রাত হয়ে গেছে। রাস্তায় শূনশান নিরাবতা, অন্ধকারের কুন্ডুলি পাকিয়ে বসে আছে বাড়িটা। আমি সিঁড়ি বেয়ে শব্দহীন উঠে যাই। যেখানে পা পড়লে শব্দ হতে পারে আমি সেখানটা এড়িয়ে যায়। আমার চাবির সাহায্যে নিয়ে ভিতরে যাই এবং পা টিপেটিপে আমার রুমে প্রবেশ করি। পোষাক পাল্টে অনুভব করি, আমি তৃষ্ণার্ত। খালি পায়ে রান্নাঘরের দিকে যাই। আমি জানি, তিনি বসে আছেন। আমি অন্ধকারে তাঁর বাকানো শরীর স্পষ্ট দেখতে পাই। সেই একই চেয়ারে একইভাবে বসে আছেন -- হাটুতে কনুই চেপে, নিভন্ত চুরুট ঠোঁটে নিয়ে এবং পলকহীন দৃষ্টি সামনে নিযুক্ত রেখে। তাঁকে দেখে মনে হল না তিনি আমার অবস্থান টের পেয়েছেন। তিনি আমার আসার কোন শব্দ শুনতে পান নি। আমি দরজার গোড়াই শব্দহীন দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে পরখ করি। সবকিছুই শব্দহীন-আত্মনিবিষ্ট; কেবলই রাতের ফিসফাস শব্দ শোনা যায়। আমি ওখানে জড়বস্তুর ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে সেই শব্দ শুনতে পাই : কাটাওয়ালা ঘড়ির টিকটিক শব্দ, অনেকদূর থেকে একটা মোটরগাড়ির শব্দ ভেসে আসে, পিচের রাস্তায় বাতাসের কাগজকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে জাওয়ার শব্দ চাপা নিঃশ্বাসের মত ওঠে আর নামে। খুব অদ্ভূত সুখকর একটা অনুভূতি। আমার ঠোঁটের শুষ্কতায় টের পেয়ে যাই রান্না ঘরে প্রবেশ করার কারণ।

‘কি করছ বাবা?’

‘কিছু না।’-- তিনি বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বর চাপা, স্বপ্নের ভেতর শোনার মত শোনালো।

তিনি বিন্দু মাত্র নড়লেন না, দৃষ্টি সেই আগের স্থানেই নিবিষ্ট রইল। জানালা দিয়ে হালকা আলোক-ছায়া রুমে এসে রুমটিকে আরো অন্ধকার করে তুলেছিল। আমি রুমের মাঝখানে গিয়ে সুইসে চাপ দিলাম। তিনি একটা ঝাঁকি দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন, যেন তাঁকে আঘাত করা হয়েছে।

‘কি হয়েছে বাবা?’

‘কিছু না।’-- তিনি বললেন। ‘আমি আলো সহ্য করতে পারি না।’

‘আলোতে তোমার সমস্যা কি?’

‘কিছু না। আমি আলো পছন্দ করি না।’

আমি আলো বন্ধ করে দিলাম, সাবধানে পানি পান করালাম। আমাকে উত্তেজিত হলে চলবে না, নিজেকে নিজে বললাম। আমাকে বিষয়টির একেবারে তলানিতে প্রবেশ করতে হবে।

‘তুমি শুতে যাও না কেন? তুমি কেন এত রাত অব্দি অন্ধকারে এইখানে বসে থাকো?’

‘আমার ভালো লাগে।’-- তিনি বললেন। আমি আলোতে স্বাভাবিক হতে পারি না। আমি যখন য়্যুরোপে ছোট ছিলাম তখন আমাদের এই আলো ছিল না।’

আমার ভেতরটা হালকা করে কেঁপে উঠল এবং আমি প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আমার মনে হল, আমি বুঝতে শুরু করেছি। আমি অস্ট্রিয়াই তাঁর বাল্যকালের গল্পগুলো স্মরণ করলাম। আমি দেখতে পেলাম, বড় বড় বর্গা বিশিষ্ট বারে আমার দাদাভাই বসে আছেন। অনেক রাত হয়ে এসেছে। খদ্দেররা সব চলে গেছে। এবং দাদুভাই ঝিমুচ্ছেন। পোড়া কয়লার একটা স্তুপ দেখতে পেলাম, এখনো হালকা উত্তাপ ছড়াচ্ছে।

ইতোমধ্যে অন্ধকার গ্রাস করে ফেলেছে চারপাশ, এবং আরো অন্ধকার চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসছে। আমি ছোট্ট একটা বালককে দেখলাম, আগুনের পাশে একটা কাঠের মাস্তুলের ওপর গুড়িমুড়ি করে বসে আছে। তার উজ্জ্বল চোখ মৃত প্রায় আগুনের দিকে নিবিষ্ট।

এই বালকটিই আমার বাবা। আমি দরজার গোড়ায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখে ঐ সুখকর মুহূর্তটির অনুভূতি টের পেলাম।

‘তুমি বলতে চায়ছো, কোন সমস্যা নেই? তুমি অন্ধকারে বসে থাকো কারণ তোমার ভালো লাগে, তাই না বাবা? আনন্দে আমার চিৎকার দিতে ইচ্ছে করলো।

‘হুম। তাই। আমি বাতি জ্বললে চিন্তা করতে পারি না।’

আমি গ্লাসটি রেখে রুমে চলে আসলাম।

‘শুভরাত্রি, বাবা!’-- আমি বললাম।

‘শুভরাত্রি!’-- বাবা বললেন।

তারপর আমার মনে পড়ে, আমি ঘুরে তাকালাম এবং জিজ্ঞেস করলাম--

‘তুমি কি চিন্তা করো, বাবা?’

তাঁর কন্ঠস্বর মনে হল বহুদূর থেকে ভেসে আসছে।

‘কিছু না’, তিনি খুব সহজভাবে বললেন, ‘তেমন বিশেষ কিছু না।’

এই গল্পটির কলকব্জা
মোজাফফর হোসেন
অন্ধকারে বসে থাকেন আমার বাবাজোরোম ওয়াইডম্যানের ‘অন্ধাকারে বসে থাকেন বাবা’ গল্পটি মূডনির্ভর গল্প। গল্পে বাবার অন্ধকারে বসে থাকা এবং এ নিয়ে ছেলের ভাবনা ছাড়া আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা নেই। বাবা কেন অন্ধকারে বসে থাকেন তার উপযুক্ত জবাবও এখানে মেলে না। আলো ভাল লাগে না তাই অন্ধকারে বসে থাকেন, বাবার এমন উত্তরে ছেলে যেমন পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারে না, তেমনি পারে না পাঠকও। এভাবে রাতের পর রাত অন্ধকারে বসে থাকার যথেষ্ঠ কারণ এটি নয়। তার মানে গল্পটি গল্পের ভেতরে কোথাও লুকানো আছে, কিংবা তোলা আছে গল্পের বাইরে কোথাও। পাঠককে তার সন্ধান চালাতে হবে। প্রথমে গল্পের মূডটি ধরতে হবে। আর গল্পের মূড ধরতে হলে গল্পের চরিত্র ও আবহটাকে বুঝতে হবে। আমরা দেখেছি, হেমিংওয়ের ‘অ্যা ওয়েল লাইটেড প্লেস’ গল্পে এক বৃদ্ধ পান করে ভোর রাত পর্যন্ত পানশালায় বসে থাকেন। বিত্তশালি মানুষ, তবুও ঘরে ফেরবার তাড়া তার নেই। বিশ^যুদ্ধোত্তর কালে যে লস্ট জেনারেশন তৈরি হয়েছিল, ঐ বৃদ্ধ তাদেরই একজন। বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু -- দুটোই ছিল তার কাছে সমান অর্থহীন। শুরুতে এমন লস্ট জেনারেশনেরই একজন বলে মনে হয় আলোচ্য গল্পের বাবাকে। কিন্তু খানিক পরে জানা যায়, তিনি তা নন। তার স্ত্রী আছে, আছে মেয়ে ও ছেলে। পরিবারের স্বাস্থ্য ও অর্থ নিয়ে তার তেমন কোনো ভাবনা নেই। আপাতদৃষ্টিতে একটি সুখি পরিবারের মালিক তিনি। হেমিংওয়ের বৃদ্ধের মতো এমন হতাশাগ্রস্ত ও বিষাদগ্রস্ত তিনি নন। তার কাছে বেঁচে থাকার অর্থটা আছে; তবে তিনি বেঁচে থাকতে চান তার অতীত জীবনে। তিনি আলো বন্ধ করে সেই জীবনে চলে যান। তার ছেলেবেলায় বিদ্যুৎ ছিল না, বিধায় বৈদ্যুতিক বাতির উপস্থীতিতে তিনি সময়কে অতিক্রম করতে পারেন না। আলো তার কাছে একটা প্রতিকী অর্থ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আলো অফ-অন করার মধ্য দিয়ে দুটি কাল বদল করেন। এটা গল্পের ভেতরের লুকানো বিষয়। আর গল্পের বাইরে তোলা বিষয় হল-- বৃদ্ধ পরবাস জীবনযাপন করছেন। তার আসল দেশ অস্ট্রিয়া। তিনি আমেরিকার অধিবাসী। আমেরিকাকে তিনি নিজের দেশ ভাবতে পারছেন না। আবার স্মৃতিতে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রিয়া। তিনি এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। অন্ধকারে বসে থেকে তিনি তার অস্তিত্বের শেষ অবলম্বন-স্বরূপ স্মৃতিটাকে আকড়ে রাখতে চাচ্ছেন।

লেখকের বায়োগ্রাফিক্যাল স্ট্যাডি থেকে যানা যায়-- গল্পের বাবাই গল্পকার জেরোমের বাস্তব-জীবনের বাবা। শিশুকালে বাবার হাত ধরে তিনি অস্ট্রিয়া ছেড়ে আমেরিকায় আসেন। কর্ম জুটিয়ে নেন পোশাকশিল্পে শ্রমিক হিসেবে। জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন। বাবা যখন বলছেন তার আলো ভাল লাগে না তখন গল্পের ন্যারেটর তার বাবার সম্পর্কে পূর্বে শোনা গল্প থেকে উপলিব্ধ করে-- বাবা ছোট্ট শিশু হয়ে থিতু হয়ে আসা কাঠের আগুনের পাশে বসে আছেন। তখন বাবা মুখে কিছু ভাবছেন না বললেও তার ভাবনাকে ধরতে সমস্যা হয় না গল্পকথকের।

লেখক পরিচিতি
জেরোম ওয়াইডম্যান

১৯৫০ এবং ৬০’র দশকে বহুল পঠিত ছিলেন মার্কিন লেখক জেরোম ওয়াইডম্যান। তাঁর জন্ম ১৯১৩ সালে নিউ ইয়র্ক শহরে। মৃত্যু ১৯৯৮ সালে, একই শহরে। তিনি ছিলেন নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিক। ২২টি উপন্যাস এবং ৭টি ছোটগল্পের সংকলন লিখেছেন। ১৯৬০ সালে তিনি নাটকের জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পান। বাবার অধিবাসী হওয়ার বিষয়টি তাঁর লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে। ওয়াইম্যান জন্মসূত্রে মার্কিন হলেও তাঁর বাবা ছিলেন অস্ট্রিয়ান।



Friday, August 10, 2018

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র


আজকে আমরা ব্রেকিং ব্যাডের হাইজেনবার্গকে নিয়ে কথা বলবো না। আমাদের হাইজেনবার্গ এমন ড্রাগডিলার নন, বরং অনেক বেশি দুর্দান্ত একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। যিনি তার অনিশ্চয়তার বিখ্যাত সূত্র দিয়ে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। আজকে আমরা সেই সূত্রটার পাশাপাশি হাইজেনবার্গের কথাও একটু জানবো।

মূল ব্যাপারে ঢোকার আগে আসো হাই স্কুলের জ্ঞানটাকে একটু ঝালাই করে নিই। কোয়ান্টাম ফিজিক্স এর বিষয়বস্তু হচ্ছে অতি ক্ষুদ্রের জগৎ। সেই অতি ক্ষুদ্রের জগৎ নিয়ে আগে অতি সংক্ষেপে একটু কথা সেরে নিই।

ডেমোক্রিটাস প্রায় ২০০০ বছর আগে বলেছিলেন, পরমাণুকে ভাঙ্গা সম্ভব না, এজন্যেই এটার নাম ছিলো a-tom বা বিভাজন অসম্ভব। আমরা অবশ্য পরমাণুকে ভাঙলাম। দেখলাম, নিউক্লিয়াসে প্রোটন আর নিউট্রন আছে। আর তার চারপাশে ঘুরছে ইলেকট্রন। বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড আর নিলস বোর বললেন, ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

নিলস বোরের পরমাণু মডেল নিয়ে কাজ করতে করতে হাইজেনবার্গ একটা অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি হন। বোর বলেছিলেন, ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের বাইরে কক্ষপথের মধ্যে শক্তিশেল বানিয়ে সেখানে অবস্থান করে। হাইজেনবার্গ সেই ইলেকট্রনকে লোকেট করতে গিয়ে দেখেন যে পুরোপুরি বের করা যাচ্ছে না। নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রনের একটা ‘মেঘ’ টাইপের কিছু আছে। এখানে মেঘ বলতে আসলে ইলেকট্রনকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে, সেই সম্ভাব্য এলাকাটাকে বুঝাচ্ছে।

অর্থাৎ নিউক্লিয়াস থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে একটা গোলক চিন্তা করো। এই গোলকের পৃষ্ঠের কোনো এক জায়গায় ইলেকট্রন আছে। কোথায় আছে কেউ জানে না। ইলেকট্রনকে যত নিখুঁতভাবেই সনাক্ত করো না কেন, এই অবস্থান কখনই ১০০ ভাগ শিওর করা যাবে না। হাইজেনবার্গ দেখলেন, ইলেকট্রনের অবস্থান যত নিশ্চিত হচ্ছি, এর বেগ সম্পর্কে ততই অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছি। আবার বেগ নিশ্চিত করতে গেলে অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে…

তাহলে আমরা দুই ধরনের অনিশ্চয়তা পেলাম – একটা অবস্থানের অনিশ্চয়তা, আরেকটা হলো ভরবেগের অনিশ্চয়তা। অবস্থানের অনিশ্চয়তাকে প্রকাশ করা হয় Δx দিয়ে, ভরবেগের অনিশ্চয়তাকে প্রকাশ করা হয় Δp দিয়ে।

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র বলছে, এই দুটো অনিশ্চয়তার গুণফল কখনই শূন্য হবে না। সহজ বাংলায় বললে, একটি কণার অবস্থান সম্পর্কে তুমি যতই শিওর হবে, তার ভরবেগ বা মোমেন্টাম সম্পর্কে ততই অনিশ্চিত হয়ে যাবে। আবার কণার মোমেন্টাম সম্পর্কে তুমি যতই শিওর হতে থাকবে, তার অবস্থান নিয়ে ততই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আরেকভাবে বললে একটা কণার অবস্থান আর ভরবেগ দুটোকে একইসাথে সম্পূর্ণ নিশ্চিত করে আমরা কখনই জানতে পারব না।

তো, আমরা জানলাম, মানটা কখনোই শূন্য হয় না, তাহলে কেমন হয়? গুণফলটা একটা পজিটিভ বা ধনাত্মক সংখ্যা হয়। পজেটিভ সংখ্যাটার ন্যূনতম মান হলো (এইচ/৪*পাই)। খেয়াল করে দেখো, গুণফলের ন্যূনতম মান বললাম এটাকে। তার মানে হলো, গুণফল এর চেয়ে বড়ও হতে পারে। আসো, তাহলে এই কথাগুলোকে সমীকরণের মধ্যে ফেলে দেখি, হাইজেনবার্গ এই সূত্রটিকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে –

Δx.Δp >= h/4pi

চলো, রিভিউ করি তথ্যগুলো —

ডেলটা এক্স হলো অবস্থানের অনিশ্চয়তা। ডেলটা পি হচ্ছে ভরবেগের অনিশ্চয়তা। এই দুই অনিশ্চয়তার গুণফল একটা ধ্রুবক সংখ্যা বা কনস্ট্যান্ট নাম্বার, অর্থাৎ h/4pi। অর্থাৎ, Δx আর Δp এর গুণফলকে 4pi দিয়ে গুণ করলে h পাওয়া যাবে। আর এটাই আমাদের প্ল্যাংক কনস্ট্যান্ট।

তা এই প্ল্যাংক কনস্ট্যান্টটা দিয়ে তাহলে কী বোঝায়? কোনো ফোটন বা ইলেকট্রনের শক্তি বা এনার্জি আর কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সির যে অনুপাত, সেটাই হলো প্ল্যাংক কনস্ট্যান্ট। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জগতে প্ল্যাংক কনস্ট্যান্ট অনেকটা গণিতের পাই – এর মতন গুরুত্বপূর্ণ। এই সমীকরণ থেকে অনিশ্চয়তার ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হয়।

আচ্ছা, এভাবে দেখো ব্যাপারটা –

Δx আর Δp এর গুণফল যেহেতু সবসময় ধ্রুবক বা অপরিবর্তনীয়, ধরো সেই মানটা ১০০। কল্পনা করো, Δx আর Δp দুটোরই মান ১০।

তো, ১০ x ১০ = ১০০

এবার মনে করো, তুমি যে কোনো একটা অনিশ্চয়তা কমিয়ে আনছো। ধরলাম, Δp অর্থাৎ ভরবেগের অনিশ্চয়তাকে কমিয়ে ৫-এ আনলে। তাহলে, গুণফল ১০০ রাখার জন্য তোমাকে অবস্থানের অনিশ্চয়তাকে বাড়াতেই হচ্ছে, ১০ এর জায়গায় ২০ করে দিতে হচ্ছে।

২০ x ৫ = ১০০

এমন করে ভরবেগের অনিশ্চয়তাকে কমাতে কমাতে,

৫০ x ২ = ১০০

১০০ x ১ = ১০০

১০০০০০০ x .০০০১ = ১০০

একসময় গিয়ে তুমি খুব নিখুঁতভাবে একটা ফোটন বা ইলেকট্রনের ভরবেগ বের করতে পারলে। মানে প্রায় নিশ্চিত আর কি! তাহলে σp এর মান কত হবে? ভরবেগের অনিশ্চয়তা প্রায় নেই বললেই চলে, অর্থাৎ শূন্যের কাছাকাছি।

তাহলে গুণফল ১০০ রাখতে হলে অবস্থানের অনিশ্চয়তাকে কী করতে হবে? Δx হয়ে যাবে প্রকাণ্ড একটা সংখ্যা। তার মানে এই ফোটন বা ইলেকট্রন কোথায় আছে তা তুমি আর শিওর হতেই পারছো না, অনিশ্চয়তাটা অনেক বেশি।

আরেকটা উদাহরণ দেই –

ধরো, এক ঘণ্টাতে কোনো গাড়ি ৬০ কিলোমিটার যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি সেকেন্ডে (বা আরো ছোটো এককে) কতদূর যায়, সেটা নির্ধারণ করা মুশকিল। আবার গাড়িটা এখন ছুটছে, বুঝলাম। কিন্তু যখন ঠিক অমুক জায়গাটাতে আছে, তখন ভরবেগ কত? শূন্য তো না নিশ্চয়ই!

ধরা যাক, আমি চলন্ত গাড়িটার একটা ছবি তুললাম। ছবি দেখে তার অবস্থান সম্পর্কে তুমি একশোভাগ নিশ্চিত, কিন্তু ভরবেগ? ভরবেগ সম্পর্কে তুমি তখন ১০০% অনিশ্চিত! তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সমীকরণ এলো কিভাবে?

আলাদা আলাদা করে দুটোই যে মাপা যায়, এটা তো বোঝা যাচ্ছে। যতবারই একই সাথে দুটোকে মাপা হচ্ছে, ততবারই এদের গুণফল ন্যূনতম h/4pi হচ্ছে। এভাবেই সমীকরণের সূত্রপাত।

এবার একটা থট এক্সপেরিমেন্ট তোমার জন্য। ধরা যাক, ভরবেগ তুমি একদম নিশ্চিত করে বের করতে পারলে। অর্থাৎ Δp = শূন্য। তাহলে সেই মুহূর্তে এই কণার অবস্থানের অনিশ্চয়তা কত? ভেবে উত্তর পেলে কমেন্ট সেকশনে লিখে ফেলো দেখি!

এই সূত্রটাকে অনেক সময় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আরেকটি ঘটনার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, যার নাম দর্শক প্রভাব বা অবজার্ভার ইফেক্ট। দর্শক প্রভাব বলছে, তুমি যখনই কোন ইলেকট্রনকে ‘দেখবে’ বা সনাক্ত করবে, তখনই তার চেহারাসুরত বা আচরণ বদলে যাবে। বাবা-মা ঘরে ঢুকলে আমরা যেমন ভদ্র ছেলে-মেয়ে হয়ে যাই, অনেকটা সেরকম।

ইলেকট্রনকে যখন আমরা দেখি না, তখন সে তরঙ্গের মত আচরণ করে। ব্যাটাকে ‘দেখা’ মাত্রই তার ওয়েভ ফাংশন চলে গিয়ে পার্টিকেল বা “কণা” অবস্থা চলে আসে – এটাকে বলে অবজার্ভার ইফেক্ট বা দর্শকের প্রভাব। এই ঘটনার সাথে অনিশ্চয়তার সূত্রকে গুলিয়ে ফেললে হবে না।

অনিশ্চয়তার সূত্র যে সমীকরণ মেনে চলে, এটা অতি ক্ষুদ্র কণার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কেউ দেখুক আর না দেখুক, এই অনিশ্চয়তা সব সময়ই থাকবে, যদি কণাটা ইলেকট্রন এর মত ছোটো কোনো কণা হয়। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের চরম মজার কিছু ঘটনার মধ্যে এটা একটা। কিন্তু এটা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নয়।

ওয়ারনার হাইজেনবার্গ জন্মগ্রহণ করেন ১৯০১ সালের ৫ ডিসেম্বর, জার্মানির উর্জবার্গে। তিনি ১৯২৭ সালে, মাত্র ২৬ বছর বয়সে তার বিখ্যাত অনিশ্চয়তা নীতিটি প্রকাশ করেন! ১৯২৮ সালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন হাইজেনবার্গকে ফিজিক্সে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন, যদিও সে বছর তিনি নোবেল পাননি। পেয়েছেন ১৯৩২ সালে।

তিনি যে সময়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই গবেষণাগুলো করছিলেন, তখন ইউরোপে তথা জার্মানিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল শুরু হয়েছিল। পুরো জার্মানি জুড়ে নাতজি বাহিনীর প্রতিপত্তি, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর বিজ্ঞানীরাও অনেকে জার্মান জাতির বিশুদ্ধতার তত্ত্বে বিশ্বাস করতো, আর ইহুদীসহ অন্যান্য জাতিদের ঘৃণা করতো।

হাইজেনবার্গের গবেষণার সাথে আইনস্টাইন আর ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কাজ জড়িয়ে ছিল। আইনস্টাইন ছিলেন ইহুদি। হাইজেনবার্গ নিজে জার্মান নাতজিবাদে বিশ্বাস করতেন না, অন্য জাতের মানুষদের বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের নিজের সমান ভাবতেন। এজন্য নাতজি সংগঠন SS তার পেছনে লাগে।

১৯৩৫ সালে, জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর আর্নল্ড সমারফিল্ড অবসর গ্রহণ করেন। ফলে ওই পদ পূরণ করার জন্য প্রথম পছন্দ হিসেবে হাইজেনবার্গের নাম দিয়ে বিভাগ থেকে তিনজনের একটি তালিকা বানানো হয়। তখন পদার্থবিজ্ঞানের জাতীয়তাবাদী দল “ডয়েশে ফিজিক” হাইজেনবার্গের বিরোধিতা করে। ডয়েশে ফিজিক আইনস্টাইনের সকল কাজ এবং আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের (যেমন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের) উপর “ইহুদি পদার্থবিজ্ঞান” তকমা লাগিয়ে এগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।

ওরা কিছুতেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম অগ্রদূত হাইজেনবার্গকে ওই পদে বসাতে রাজি হয়নি। ওদের সমর্থকদের কাছে হাইজেনবার্গকে বারবার আক্রমণের শিকার হতে হয়। তিনি আইনস্টাইনকে এবং তার আপেক্ষিক তত্ত্বকে সমর্থন করেছিলেন বলে ১৯৩৭ সালে SS এর সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাকে ফিজিক্সের “হোয়াইট জিউ বা শ্বেতাঙ্গ ইহুদি” বলে গালি দিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন নোবেল জয়ী পদার্থবিদ ইয়োহানেস স্টার্ক। সেখানে তাকে “গায়েব” করে দেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করা হয়। এতো ধরনের হুমকি সত্ত্বেও নিজের নীতি থেকে সরে আসেননি হাইজেনবার্গ। উল্টো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সম্পাদকীয় লিখে।

মজার ব্যাপার হল, অতিষ্ঠ হয়ে একসময় হাইজেনবার্গের মা ফোন করেন ss এর প্রধান হেনরিখ হিমলারের মাকে এবং অনুরোধ করেন যেন তার ছেলের প্রতি এসব আক্রমণ বন্ধ হয়। ১৯৩৮ সালে, হিমলার নিশ্চিত করেন যেন হাইজেনবার্গের উপর আর কোনো আক্রমণ না আসে। তবে দুঃখের বিষয় হল, সমারফিল্ডের স্থানে হাইজেনবার্গকে আর বসানোই হয়নি। একাডেমিক স্ট্যান্ডার্ডের তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে উইলহেম মুলারকে বানানো হয়েছিলো বিভাগের প্রধান। তিনি না ছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী, না কোনো ফিজিক্স জার্নালে ছিল তার পাব্লিকেশন।

আরেকটা মজা হল, যখন হাইজেনবার্গের উপর তদন্ত করতে SS তিনজন তদন্তকারীকে পাঠায়, তখন তারা হাইজেনবার্গের ভক্ত হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি ডয়েচে ফিজিকের অনর্থক ঘৃণার বিরুদ্ধে হাইজেনবার্গের অবস্থানকেও তারা সমর্থন জানায়।

মহানএই বিজ্ঞানী কিডনি এবং গল ব্লাডারের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৬ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একজন সফল পিয়ানোবাদকও ছিলেন।

অনিশ্চয়তার সূত্রের জনক, ব্যক্তিগত জীবনে নীতিবোধের ব্যাপারে কিন্তু হাইজেনবার্গ অনিশ্চিত ছিলেন না। আমাদের বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ ব্রেকিং ব্যাডের ড্রাগডিলার হাইজেনবার্গের মতো ডেঞ্জারাস কেউ ছিলেন না। কিন্তু তার সাহস নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

অনিশ্চয়তার বিখ্যাত সূত্রের জনক নিজের নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বের নিশ্চয়তায় পুরোপুরি কনস্ট্যান্ট ছিলেন।

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/heisenberg_uncertainty_principle/

Thursday, August 2, 2018

E = mc2 কী এবং কেন


[ E = mcআইনস্টাইনের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সর্বাধিক পরিচিত সমীকরণ। সমীকরণটিতে ভর ও শক্তির মধ্যেকার একটি পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। আজ ১৪ই মার্চ অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত আমার “আপেক্ষিকতার তত্ত্বকথা” বইটি থেকে “ভর-শক্তি সম্পর্ক” অংশটি ভিন্ন নামে বিজ্ঞানযাত্রার পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে দেয়া হলো ]

বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি উল্লেখযোগ্য ফলাফল হচ্ছে ভর ও শক্তিকে অভিন্নরূপে দেখা। ভরের সাথে যেমন শক্তি জড়িত, তেমনি শক্তির সাথে ভর জড়িত। অর্থাৎ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে  ভর ও শক্তিকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলে প্রমাণ করা যায়। আপেক্ষিকতার তত্ত্ব যেহেতু আপেক্ষিক বেগে চলমান বস্তুর মধ্যেকার বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা সাপেক্ষে সকল ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেহেতু ভর-শক্তি সম্পর্কটিও  আমরা আপেক্ষিক বেগের আলোচনার মধ্য দিয়েই তুলে আনার চেষ্টা করবো। একটি ট্রেন যখন হুইসেল বাজাতে বাজাতে তোমার দিকে অগ্রসর হতে থাকে তখন সেই শব্দের তীব্রতা তোমার নিকট অনেক বেশি মনে হয়। আবার যখন তোমাকে অতিক্রম করে চলে যায় তখন শব্দের তীব্রতাও অনেক কমে আসে। আমরা জানি, শব্দ চলে তরঙ্গের আকারে। ট্রেন যখন হুইসেল বাজাতে বাজাতে তোমার দিকে অগ্রসর হতে থাকে তখন সেই শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলো ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে তোমার কানে প্রবেশ করে। আবার যখন তোমাকে অতিক্রম করে দূরে চলে যায় তখন ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে। ঘটনাটির গাণিতিক ব্যাখ্যা দেন বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান ডপলার। তাই তাঁর নামানুসারে ঘটনাটিকে ডপলার ক্রিয়া বলা হয়। ডপলার ক্রিয়া কেবল শব্দের ক্ষেত্রেই নয়, আলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি, আলো এক প্রকার তরঙ্গ। দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য একেক রঙের জন্য একেক রকম। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি বেগুনী আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম।



ক্রিশ্চিয়ান ডপলার ও ডপলার ক্রিয়া




একটি আলো যখন আপেক্ষিক গতিতে দূরে সরে যাবে তখন সেই উৎসের আলো তোমার কাছে লাল এবং যখন কাছে আসতে থাকবে তখন নীলাভ মনে হবে। নীল আলোর কম্পাঙ্ক বেশি, তাই নীল আলোর শক্তি, লাল আলোর তুলনায় বেশি। একটি স্পেস শীপে চড়ে যদি একজন নভোচারী খুব বেশি বেগে সূর্য অভিমুখে যেতে থাকে তবে আপেক্ষিকতার নীতি অনুসারে নভোচারীর কাছে মনে হবে যেন সূর্যই তার দিকে সেই বেগে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হবে যেন সূর্য থেকে নির্গত আলোকরশ্মি তড়িৎচৌম্বক বর্ণালীতে নীলের দিকে সরে গেছে। আবার যখন তিনি সূর্যকে অতিক্রম করে যাবেন তখন মনে হবে যেন সূর্য থেকে নির্গত আলোকরশ্মি তড়িৎচৌম্বক বর্ণালীতে লালের দিকে সরে গেছে। এর অর্থ, সূর্যকে অনেক



বেশি শক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু সূর্যের শক্তিতো সীমিত। তাহলে এই অতিরিক্ত শক্তি আসে কোথা থেকে। এর একটা কারণ হতে পারে সূর্যের আপেক্ষিক গতি (নভোচারী সাপেক্ষে)। এখানেও সমস্যা আছে। সূর্য তখনই তার শক্তি ছেঁড়ে দিবে যখন গতি মন্থর হতে থাকবে। নভোচারী তো চলছে সমবেগে, অর্থাৎ গতি মন্থর করার কোনো প্রশ্নই আসে না। সূর্যের গতি যেহেতু নভোচারী সাপেক্ষে সেহেতু সূর্য নিজেও তার গতি কমাতে পারছে না। তাহলে উপায়? হ্যা, একটা উপায় অবশ্য আছে বটে এবং সেটা হচ্ছে- সূর্যের ভর কমিয়ে। সূর্য যেহেতু আপেক্ষিক বেগ কমাতে পারছে না তাই তার অতিরিক্ত শক্তি আসছে সূর্যের ভর থেকে। আমরা জেনেছি, গতিশীল বস্তুর বেগ যতো বাড়ে ভরও ততো বাড়ে। এক্ষেত্রে সূর্য শক্তি ক্ষয় করছে আবার গতিও কমছে না। তাই বলা হচ্ছে, সেই শক্তি আসছে স্বয়ং সূর্যের ভর থেকেই। সেটা কি করে সম্ভব? কারণ পৃথিবী কাঠামো থেকে দেখলে সূর্যকে স্থির বলেই মনে হয়। অথচ আমরা পুরো কাহিনীটা তৈরি করেছি নভোচারী সাপেক্ষে সূর্যকে গতিশীল বিবেচনা করে। আসলে আপেক্ষিকতার নীতি থেকে বলা যায়, যে ঘটনা নভোচারীর জন্য বৈধ, সেটা পৃথিবীতে স্থির সকলের জন্যই বৈধ। সূর্য আলো বা তাপ উৎপন্ন করে নিউক্লিও ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে এবং এতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় হাইড্রোজেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকেও সূর্য ও অন্যান্য তারার শক্তির উৎস সম্পর্কে জানা যায়নি। তখন মনে করা হতো, সূর্যের শক্তির উৎস হচ্ছে মহাকর্ষ। আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সম্পর্কের পথ ধরে জানা সম্ভব হলো যে, আলো ও তাপশক্তি উৎপন্ন হয় ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং এতে সূর্য তার ভর হারায়। সূর্য প্রতিনিয়ত তার ভর হারাচ্ছে শক্তিতে রুপান্তরনের মাধ্যমে এবং গণনা করে দেখা গেছে, সূর্য প্রতি সেকেন্ডে চার মিলিয়ন টন ভর হারাচ্ছে। তাপকে আমরা বরাবর শক্তি বলেই জেনে এসেছি। তবে এখন একথা মানতেই হবে যে, তাপের সাথেও ভর জড়িত।  একটি বৈদ্যুতিক ইস্ত্রিকে গরম করলে কিছুটা হলেও এর ভর বেড়ে যায়। একটি জগে গরম পানি ঢাললে সেই জগের ভরও বৃদ্ধি পায় যদিও সেটা পরিমাপযোগ্য হবে না। আইনস্টাইন চিন্তা করলেন, শক্তির সাথে ভর জড়িত থাকলে ভরের সাথে শক্তি জড়িয়ে থাকবে না কেন। আর এই চিন্তা থেকেই তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত সিদ্ধান্তটি দিলেন- ভর আছে এমন সকল সাধারণ বস্তুই আসলে একেকটা জমাটবদ্ধ শক্তি। সেই হিসেবে তুমি নিজেই কিন্তু শক্তির আধার এবং সেই শক্তির পরিমাণ কতো সেটা জানলে অবাক হয়ে যাবে। তোমার ভরকে আলোর বেগের বর্গ দ্বারা গুণ করো। তাহলেই পেয়ে যাবে। ১৯৩২ সালে ককরফট ও আর্নেষ্ট ওয়ালটন নামক দু’জন বিজ্ঞানী তাঁদের তৈরি করা বৈদ্যুতিক ত্বরক যন্ত্রে একটি প্রোটন দ্বারা একটি লিথিয়াম পরমাণুকে আঘাত করান। এর ফলে উক্ত পরমাণু দুটির নিউক্লিয়াস একে অপরের সাথে মিলে গিয়ে হিলিয়ামের দুটি নিউক্লিয়াস গঠন করে। হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস দুটির ভর পরিমাপ করে দেখা গেলো এদের সম্মিলিত ভর, প্রোটন ও লিথিয়াম পরমাণুর ভরের তুলনায় সামান্য কম। তোমরা তো জানো যে, ভর বা শক্তির ধ্বংস বা বিনাশ নেই। তাহলে সেই সামান্য ভরটুকু গেলো কোথায়? বলা হয়, এই হারানো ভর হিলিয়াম নিউক্লিয়াস দুটিকে গতিশক্তি প্রদানে ব্যয় হয়েছে। আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম সূর্যের শক্তি আকারে ভর হারানোর উদাহরণ দিয়ে। এবার সহজ গাণিতিক হিসাব নিকাশের সাহায্যে পুরো বিষয়টি গণনা করে দেখানো যাক। আগেই বলেছি, সূর্যের তাপকেন্দ্রিন বিক্রিয়ার মূল কাঁচামাল হচ্ছে হাইড্রোজেন। এই প্রক্রিয়ায় দুটি নিউট্রন ও দুটি প্রোটন মিলিত হয়ে হিলিয়াম উৎপন্ন হয়। নিউট্রন, প্রোটন ও হিলিয়ামের ভর বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বের করেছেন।

২টি প্রোটনের ভর = ২ × ১.০০৮১৫ এ এম ইউ

= ২.০১৬৩০ এ এম ইউ।

[পারমাণবিক কণিকাগুলোর ভর এতোই নগণ্য যে এদেরকে কেজি বা গ্রামে প্রকাশ করা কঠিন। এতে অনেক বড় বড় সংখ্যার আবির্ভাব ঘটে। এ কারণে কণিকার ভর প্রকাশ করা হয় এ এম ইউ ইউনিটে। এ এম ইউ কে বিস্তৃত করলে হয় অ্যাটমিক মাস ইউনিট। ১ এ এম ইউ = ১.৬৬ × ১০-২৪ গ্রাম]

২টি নিউট্রনের ভর = ২ × ১.০০৮৯০৮ এ এম ইউ

= ২.০১৭৯৬ এ এম ইউ।

অতএব, ২টি প্রোটনের ভর + ২টি নিউট্রনের ভর = ৪.০৩৪২৬ এ এম ইউ

হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের ভর =  ৪.০০৩৮৭ এ এম ইউ

দেখা যাচ্ছে, হাইড্রোজেন যখন হিলিয়ামে পরিণত হয় তখন (৪.০৩৪২৬ – ৪.০০৩৮৭) = ০.০৩০৩৯ এ এম ইউ ভর কম থাকে। আবার ০.০৩০৩৯ এ এম ইউ = ২৮.৩ মেগাভোল্ট (১ এ এম ইউ = ৯৩১.১ মেগাভোল্ট)। অর্থাৎ ০.০৩০৩৯ এ এম ইউ পরিমাণ ভর থেকে ২৮.৩ মেগাভোল্ট এর বিপুল পরিমাণ শক্তি আলো ও তাপরূপে বেরিয়ে যায়। সূর্যের ভেতরে যেটা ঘটে সেটাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া। এই বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলো পরস্পরের সাথে জুড়ে গিয়ে নতুন পরমাণু উৎপন্ন করে। এ ধরণের আরো একটি প্রক্রিয়া আছে যেটাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া। এক্ষেত্রে একটি কণা দ্বারা অপর একটি পরমাণুর (আইসোটোপ) নিউক্লিয়াসকে বিদীর্ণ করা হয়। এখানেও কিছুটা ভর, শক্তি হিসেবে বের হয়ে যায়। কিন্তু সেই কিছুটা ভরকে যদি আলোর বেগের বর্গ দ্বারা গুণ করা হয় তবে সেই শক্তির পরিমাণ হয় ব্যাপক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে ধ্বংসলীলা সাধিত হয়েছে তার কারণও এই শক্তি। হিরোশিমাতে যে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়েছিলো সেটাতে ব্যবহার করা হয়েছে ইউরেনিয়াম ২৩৫ আইসোটপ এবং নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত বোমায় ছিলো প্লুটোনিয়াম ২৩৯ আইসোটপ। ইউরেনিয়াম ২৩৫ আইসোটপকে আঘাত করা হয় একটি নিউট্রন দ্বারা। এতে দুটি নতুন পরমাণু ও তিনটি নিউট্রন উৎপন্ন হয়। নতুন পরমাণুর মোট ভর ইউরেনিয়ামের থেকে কম থাকে। এ সময় দুটি নিউট্রন অকেজো হয়ে যায় বা ইউরেনিয়াম ২৩৮ আইসোটপ দ্বারা গৃহীত হয়। বাকি যে নিউট্রনটি থাকে সেটা আবার ইউরেনিয়াম ২৩৫ আইসোটপকে আঘাত করে আরো শক্তি উৎপন্ন করতে থাকে। এভাবে রিয়্যাকশন চলতেই থাকে। সেজন্য এই ধরনের বিক্রিয়াকে চেইন রিয়্যাকশনও বলা হয়। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমায় প্রায় ১,২৯,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।



যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ৬ আগষ্ট হিরোশিমায় (১) ও ৯ আগষ্ট নাগাসাকিতে (২) দুটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়


উৎস ঃ https://bigganjatra.org/e-mc2-%E0%A6%95%E0%A7%80-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8/



Wednesday, August 1, 2018

বাংলার প্রথম পত্রিকা ও পৃথিবীর প্রথম মহামারী ওলাওঠা - কুলদা রায়


প্রথম বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পন প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের ২৩ মে। সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান। কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিত সংবাদপত্রটিতে লিখতেন। শুরুতে সমাচার দর্পন সাপ্রাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হলেও পরে সপ্তাহে দুদিন প্রকাশিত হত।

জয়গোপাল তর্কালঙ্কার বাংলা সংবাদ রচনা ও সঙ্কলনে সম্পাদকের সহায়ক ছিলেন বলে তা উন্নতমানের সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সমর্থ হয়েছিল। সংবাদ, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বিষয়াদির বিবরণ এই পত্রিকায় স্থান পেত। সে আমলে প্রগতিশীল পত্রিকা হিসেবে এর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পত্রিকাটি অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল। তবে পরেও কয়েকবার এই পত্রিকা পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল।


সমাচারদর্পনের মত সাময়িকপত্রের মধ্যে দিয়ে শিক্ষিত বাঙালি প্রথম গদ্যরচনার রস গ্রহণ করতে শেখে। তখনকার বাংলা সাহিত্য বলতে সবই পদ্য রচনা ছিল। সমাচারদর্পনের প্রকাশ হবার ফলে পাঠকের সংখ্যা বাড়তে লাগল এবং আরো সাময়িকপত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পেল। এর ফলে বাংলা গদ্য সাহিত্যের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথও খুলে গেল।

সমাচারদর্পনের জনপ্রিয়তার ফলে আরো কয়েকটি সাময়িক ও সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে প্রধান ছিল সংবাদকৌমুদী (১৮২১) এবং সমাচারচন্দ্রিকা (১৮২২)। ১৮৪১ সালে সমাচার দর্পন বন্ধ হয়ে গেলেও পরে আরো কিছুদিন অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

এই সমাচার দর্পন পত্রিকা প্রকাশের ৬ মাস পরে পত্রিকাটিতে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদের লেখা প্রকাশিত তথ্য অনুসারে জানা যায় যশোরে ওলাওঠা রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব হয়েছে। শত শত লোক মারা যাচ্ছে। রোগটি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। দেড় বৎসর যাবৎ এই রোগটি মহামারি রূপে দেখা দিলেও তার কারণ অজানা। এই ওলাওঠা রোগটিই কলেরা রোগ নামে পরিচিত।

কলেরার ইতিহাস


পৃথিবীতে প্রথম কলেরা রোগটির প্রাদুর্ভাব বঙ্গদেশের ঘটে। সেটা গঙ্গানদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে স্বাস্থ্য-ইতিহাসবিদগণ মনে করেন। মহামারীরূপে পৃথিবীতে প্রথম কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটে ১৮১৭ সালে। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এটা এটা লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটায়। ১০ হাজার বৃটিশ সৈন্যো মারা যায়। এর কারণ হিসেবে চরম দরিদ্রতা, দূষিত পানীয় জলকে দায়ী করা হয়।
বঙ্গদেশ থেকে কলেরা রোগটি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে ১৮১৭ সালেই বানিজ্য স্থল ও জলপথে দক্ষিণ এশিয়া, চীন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়াতে যায়। ১৮২৭ থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয়বারের মত কলেরা মহামারী রূপে আক্রমণ করে এই সমস্ত দেশে। এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়ো এর বিস্তার ঘটে। এই সময়কালে আমেরিকাতে ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায় কলেরাতে।
এরপর ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভয়াবহভাবে কলেরার বিস্তার ঘটে।১৮৩৯ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত কলেরার মহামারীতে আক্রান্ত হয় উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা। প্রথমবারের মতো ব্রাজিলে আক্রমণ ঘটে।

১৮৬৩-১৮৭৫ পর্যন্ত সাব-সাহারা অঞ্চলে কলেরা আঘাত হানে।

১৮৮১-১৮৯৬ পর্যন্ত পঞ্চম এবং ১৮৯৯-১৯২৩ সাল পঞ্চম ও ষষ্ঠবারের মত পৃথিবীব্যাপী কলেরা মহামারী হয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন হরণ করে। মিশর, আরব, পারস্য, ভারত ও ফিলিপাইনে কলেরার আক্রমণ হয় অন্যান্য দেশের তুলনায় ভয়ঙ্কর। ১৮৯২ সালে জার্মানী ও ১৯১০-১৯১১ সালে নেপলসে কলেরার আঘাত ছিল বেশি ধ্বংসাত্মক। ১৯৬১ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে যে কলেরা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তা ছিল সর্বশেষ প্রাণঘাতী আক্রমণ। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে মারা যায় ১ লক্ষ মানুষ। ১৯৬৩ সালে পূর্ব পাকিস্থানে কলেরা মারাত্মকভাবে দেখা দেয়। ১৯ শতকে সারা পৃথিবীতে ১০ কোটি মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ১৮৪৭-১৮৫১ সালে রাশিয়াতে মারা যায় ১০ লক্ষ মানুষ।.১৯০০-১৯২০ সালে ভারতে মারা যায় আশি লক্ষ মানুষ।

১৮৮৩ সালে বিজ্ঞানী কক (Koch) Vibrio cholerae জীবাণু আবিষ্কার করেন। এটি একটি কমা (,) আকৃতির ব্যাকটেরিয়া যা কলেরা আক্রান্ত রোগীর মলে দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়ায়। শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশের পর এ জীবাণু ক্ষুদ্রান্ত্রের গায়ে লেগে যায় এবং সেখানে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এ সময় জীবাণু বিষ (Toxin) উৎপন্ন করে। এ বিষ রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্যাংলিওসাইড (ganglioside) নামে ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাইগুলিতে অবস্থান করে। এর ফলে জীবাণুর বসবাসের স্থানে ব্যাপকভাবে এডেনাইলেট সাইক্লেজ এনজাইমের (adenylate cyclase) কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। এ এনজাইম মূলত সাইক্লিক এএমপি (cAMP) তৈরির জন্য দায়ী যেটি ভয়ঙ্করভাবে অন্ত্রের নাড়াচাড়া বৃদ্ধি করে যার ফলে প্রচুর পাতলা পায়খানা হয়। প্রাথমিকভাবে কলেরা রোগে দেহের প্রচুর তরল পদার্থ ও Eletrolytes হারিয়ে যায়। কলেরা আক্রান্ত রোগী একদিনেই ৩০ লিটারের মতো তরল পদার্থ (মল) ত্যাগ করতে পারে। পানি শূন্যতায় মারা যায়।





বাংলার কলেরার দিনগুলোর 

সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার একটুখানি


সেই কালপর্বে ১৭৫৬ সালে পলাশীর আম বাগানে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ইংরেজরা পরাজিত করে। নয় বছর পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা-বিহার-উড়িশ্যার দেওয়ানী লাভ করে। তারা কর আদায়ের সুবিধার্থে বাংলাকে কয়েকটি বিভাগে ভাগ করে। মোগলদের আমলে যারা কর আদায় করতেন তাদের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নানা কায়দায় বেশি বেশি কর আদায়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

১৭৭০ সালে বাংলায় ভয়াবহ মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অনাহারে, অপুষ্টিতে, রোগে, শোকে তখনকার বাংলার এক তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়। মৃত লোকদের জমির খাজনা প্রতিবেশীর কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী আদায় করার নীতি গ্রহণ করে। সে সময়কার এক তৃতীয়াংশ লোক মন্বন্তর ও ইস্ট কোম্পানীর ভয়ে বনে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। এদের অধিকাংশ বাঘের পেটে, কুমিরের পেটে মারা যায়। বাংলায় মাত্র এক তৃতীয়াংশ মানুষ মাত্র বেঁচে ছিল। এই দুর্ভিক্ষের ফল বাংলার মানুষকে বয়ে বেড়াতে হয় বহুকাল ধরে।

এই দুর্ভিক্ষের মধ্যেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী পাঁচশালা পরিকল্পনা করে ১৭৭২ সালে। সে বছরই বাংলার গণজাগরণের প্রাণপুরুষ রাজা রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন। এবং এই বছর থেকেই কোলকাতায় ইংরেজরা তাদের অনুগত ধনী বাঙালীদেরকে বাবু নামে ডাকতে শুরু করে। ধনী মুসলমানদেরকে বলা হতে থাকে সাহেব।

১৭৯৩ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর মাধ্যমে নব কলেবরে জমিদারী পদ্ধতি চালু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনী। । বাংলাদেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময়কালে দেশজুড়ে ছিল ঘোর বিশঙ্খলা এবং কোম্পানি ও তার ইজারাদার জমিদার প্রভৃতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ। এ অসন্তোষ দেবী সিংহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, চোয়াড় বিদ্রোহ, বাঁকুড়ার বিদ্রোহ এবং ফকির সন্যাসীর বিদ্রোহ ঘটে।

১৭৯৩ সালে উইলিয়াম কেরি ভারতে আগমন করেন। ১৮৮০ সালে কোলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হয়। উইলিয়াম কেরি শ্রীরামপুরে খ্রিস্টান মিশনে চলে আসেন। এই সময় থেকেই বাংলা গদ্যের প্রচলন করার চেষ্টা করা হয়।

১৮১৮ সালে বাংলায় যে ওলাওঠা বা কলেরা রোগটি ছোবল মারতে শুরু করে তখন দ্বারকানাথ ঠাকুরের বয়স মাত্র চব্বিশ বছর। তার পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র এক বছর। এর দু বছর পরে বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মেছেন মহামারীর মধ্যে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামে আধুনিক ঔপন্যাসিকে্র জন্ম হয় ঠিক এর ২০ বছর পর। মহামারীর ৪৭ বছর পরে তিনি দূর্গেশনন্দীনী নামে প্রথম উপন্যাস লেখেন। তার পরের বছরই লেখেন ফকির-সন্নাসীর বিদ্রোহকালের সময় নিয়ে উপন্যাস কপালকুণ্ডলা। এই উপন্যাসে মন্বন্তর-উত্তরকালে বিপর্যস্ত বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার চিত্র পাওয়া যায়।

সমাচার দর্পনের ভাষা সহজ। তখনো যতি চিহ্নের ব্যবহার শুরু হয়নি। শুধু দাঁড়ি (।) চিহ্ন দেখা যায় একটি স্তবকের পরে। তবে পড়তে কষ্ট হয় না।


সমাচার দর্পন পত্রিকায় ১৮১৮ সালে যে কলেরা বা ওলাওঠার খবর পাওয়া যাচ্ছে, এই সংবাদগুলোর ভাষার দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায় বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে কলেরা-পীড়িত মানুষের অবস্থা ছিল অতি ভয়াবহ। মানুষ মরছে চিকিৎসার অভাবে। ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এ এক ভয়ঙ্কর অসহায় পরিস্থিতি।

সে সময়কালের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল। কোনো টেলিফোন, টেলিগ্রাফ তখনো আসেনি। ফ্যাক্স, ইমেইল চিন্তার অতীত। প্রতিটি এলাকায় সংবাদদাতা নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে প্রকৃত অবস্থার সামান্য বিবরণীই সংবাদপত্রে এসেছে। পরিস্থিতি ছিল আরো ভয়াবহ।
১৮৮০ সাল থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত লাতিন আমেরিকায় কলেরার যে মহাদূর্যোগ হয়েছিল, সেটা নিয়ে কলাম্বিয়ার ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ আশির দশকে লাভ ইন দি ডেজ অফ কলেরা উপন্যাস লেখেন। বইটি স্প্যানিশ ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৮ সালে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
বাংলায় যে কলেরার মহাদূর্যোগ হয়েছিল তা নিয়ে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য উপন্যাস রচিত হয়নি।


সমাচার দর্পনে প্রকাশিত

 সংবাদগুলোর কয়েকটি এখানে দেওয়া হল--


২১ নবেম্বর ১৮১৮। ৭ অগ্রহায়ণ ১২২৫।

যশোহর।-- যশোহরে যে২ লোকের ওলাওঠা হইয়াছিল তাহারা হরিতাল ভস্ম ঔষধি সেবন করিয়া রক্ষা পাইয়াছে এবং যাহারদিগের নাড়ি ত্যাগ ও হিমাঙ্গ প্রভৃতি মৃত্যুচিহ্ন হইয়াছিল তাহারাও ঐ হরিতাল ভস্ম দ্বারা রক্ষা পাইয়াছে হিন্দুস্থানমধ্যে পূর্ব্ব দক্ষিণ উত্তর পশ্চিম যত দেশ প্রদেশ আছে সম্বৎসরের মধ্যে ওলাওঠা রোগ না হইয়াছে এমত দেশ ও প্রদেশ দেখিলাম না ও শুনিলাম না কিন্তু দেড় বৎসর পর্যন্ত এ রোগ হইয়াছে তথাপি ইহার কারণ কেহ কোন স্থানে নিশ্চয় করিতে পারিল না ইহাতে অনুমান এই হয় যিনি মৃত্যু তিনি অন্ধকার হইতে বিষাক্ত বান নিক্ষেপ করিয়া লোক সংহার করিতেছেন।
২৯ এপ্রিল ১৮২০। ১৮ বৈশাখ ১২২৭

ওলাওঠা।--ওলাওঠা রোগে কলিকাতার এই২ ভাগ্যবান লোক মরিয়াছেন। বাবু সূর্য্যকুমার ঠাকুর ও বাবু মোহিনীমোহন ঠাকুর ও কোম্পানির ত্রেজুরির খাজাঞ্চি জগন্নাথ বসু ও কলিকাতার একশ্চেঞ্জ ঘরের কর্ম্মকারী শিবচন্দ্র বসু। এবং ইংগ্লণ্ডীয় সাত জন সাহেব মরিয়াছেন।
৬ মে ১৮২০। ২৫ বৈশাখ।

ওলাওঠা--ওলাওঠা রোগ এতদ্দেশে কতক পরাক্রম সম্বরণ করিয়াছে যেহেতুক যাহারদের২ ঐ রোগ হইতেছে তাহাদের মধ্যে অনেকে রক্ষা পাইতেছে কিন্তু সমাচার পাওয়া গেল যে মোং যশোহর প্রদেশে তাহার পরাক্রম অতিশয়। সেখানে কোন২ গ্রাম ঐ রোগে উচ্ছিন্ন হইয়াছে তাহাতে মুসলমান লোক মরিলে লোকাভাবপ্রযুক্ত তাহারদের গোর হওয়া ভার এবং হিন্দুলোকের প্রায় সৎকার হয় না। একবার নামে একবার উঠে ইহাতেই নাড়ী বসিয়া গিয়া ক্ষণেক কাল পরে মরে।
২৭ এপ্রিল ১৮২২ ।। ১৬ বৈশাখ ১২২৯

সহগমন।।–ওলাওঠা রোগে অনেক বাঙ্গালি মরিয়াছে তাহার মধ্যে ঐ [গয়া] মোকামে এক ব্রাহ্মণ মরিলে তাহার স্ত্রী সহগমনে উদ্যতা হইল তাহাতে গয়ার জজ শ্রীযুত মেং কিরিষ্টফর স্মিথ সাহেব গিয়া তাহাকে অনেক নিষেধ করিলেন তাহাতে সে ব্রাহ্মণী আপন অঙ্গুলী অগ্নিতে দগ্ধ করিয়া পরীক্ষা দেখাইল তাহা দেখিয়া জজ সাহেব আজ্ঞা দিলেন যে তোমার যে ইচ্ছা তাহা করহ। পরে সে স্ত্রী সহগমন করিল।
১ মে ১৮২৪। ২০ বৈশাখ।

ওলাওঠা।-- শুনা গেল যে নব্দ্বীপে রোজ২ ওলাওঠা আপন সৈন্য সন্নিপাত সমভিব্যাহারে গমনানন্তর অবিরোধে রাজ্য শাসন করিয়া অতিশয় প্রবল হইয়া বসিয়াছেন। এবং তাহার সহকারী হইয়া অনাবৃষ্টি ও গ্রীষ্ম সুখে কালক্ষেপণ করিতেছে। ঐ রোগরাজের আজ্ঞানুসারে সন্নিপাত সৈন্য মহোৎপাত করিইয়া বহু লোককে কাতর করিয়াছে এবং করিতেছে। এক দিবস ঐ রোগরাজ নবদ্বীপে বহু জনতা দেখিয়া কোপাবিষ্ট হইয়া সন্নিপাতকে কহিলেন তুমি আমার কর্ম্মে আলিস্য করিতেছ তাহাতে সন্নিপাত আপন ক্ষমতা প্রকাশ করিয়া এক দিবসেই ছত্রিশ জনের প্রাণ নষ্ট করিয়াছে এবং অদ্যাপিও ঐ রাগে প্রতিদিন দশ বারো জনকে নষ্ট করিতেছে তাহাকে নিবারণ করে এমত কাহার ক্ষমতা হয় না। ইহা দেখিয়া ভয়ে ভীত হইয়া বিদেশী যে সকল লোক নবদ্বীপে বাস করিতেছিল তাহারা পলায়নপর হইয়াছে ও প্রতিদিন ক্রন্দন ধ্বনিতে সুস্থ লোকেরো ভয় জন্মিতেছে এবং শোকাবিষ্ট লোকেরো শোকশান্তি হইতেছে এরূপ যদ্যপি আর কিছু কাল নবদ্বীপে ঐ সৈন্য সমভিব্যাহারে ওলাওঠা প্রবল হইয়া বসতি করেন তবে ঐ নবদ্বীপ দ্বীপমাত্র হইবেক।
২৭ আগষ্ট ১৮২৪ ।। ১৩ ভাদ্র ১২৩২

সহগমন।।–সিমল্যানিবাসি ফকিরচন্দ্র বসু ১ ভাদ্র সোমবার ওলাওঠারোগে পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়াছেন। ইহার বয়ঃক্রম প্রায় ৩৬ বৎসর হইয়াছিলো তাঁহার সাধ্বী স্ত্রী শ্যামবাজারনিবাসি শ্রীমদনমোহন সেনের কন্যা তাঁহার বয়ঃক্রম ন্যূনাতিরেক ২২ বৎসর হইবেক এবং সন্তান হয় নাই। ঐ পতিব্রতা স্ত্রী রাজাজ্ঞানুরোধে দুই দিবস অপেক্ষা করিয়া বুধবার প্রাতে সুরের বাজারের নিকট সুরধুনী তীরে স্বামিশবসহ জ্বলচ্চিতারোহণপূর্ব্বক ইহলোক পরিত্যাগ পুরঃসর পরলোক গমন করিয়াছে।
১৭ সেপ্টেম্বর ১৮২৫। ৩ আশ্বিন ১২৩২

ঢাকা।--ঢাকার পত্রদ্বারা ওলাওঠা রোগের বিষয় যেরূপ শোনা গেল তাহাতে প্রায় বিশ্বাস হয় না বিশেষতো গত মাসের শেষ সপ্তাহে আট শত লোক পঞ্চত্ব পাইয়াছে এবং বর্ত্তমানে মাসের প্রথম সপ্তাহে সাত শত লোক মারা পড়িয়াছে। পত্রলেখক সাহেব লিখিয়াছেন যে ইহাতে লোকদের মধ্যে অতিশয় ভয় জন্মিয়াছে এবং হাহাকার উঠিয়াছে লোকেরা স্থান ও কাষ্ঠের অভাবহেতু শব দাহ করিতে পারে না। এক্ষণে আদালত ও অন্য২ কার্য্যকর্ম্ম সকল বন্ধ হইয়াছে এবং লোকেরা পলায়ন করিতেছে। এই রোগে সকলেরই ভয় জন্মিতে পারে যেহেতুক কোন ঔষধেতে কিছু উপকার দর্শে না।
৩ সেপ্টেম্বর ১৮২৫। ২০ ভাদ্র ১২৩২

ওলাওঠা।।-- শহর কলিকাতার মধ্যে মধ্যে যেরূপ ওলাওঠা রোগের প্রাবাল্য হইয়াছে তাহার বর্ণনা করিতে লেখনি অসমর্থা যাঁহারা মফস্বলে আছেন তাহারা প্রায় ইহাতে বিশ্বাস করিবেন না কিন্তু তাঁহারা ভাগ্য করিয়া মানুন যে এ সময় তাহারা কলিকাতায় নহে। কলিকাতায় লোক প্রতিদিন মরিতেছে তাহার সংখ্যা করা সুকঠিন কিন্তু আমরা শুনিয়াছি যে এই সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন যদি চারি শত করিয়া ধরা যায় তবে প্রায় সমান হইতে পারিবে এবং কিছু কমও বা হয়। এ সপ্তাহে মুসলমান অধিক মরিতেছে বিশেষত আমরা শুনিয়াছি যে একদিনের মধ্যে ৫৭১ পাঁচশত একাত্তর জন লোক মরিয়াছে কিন্তু ইহাতে প্রায় বিশ্বাস হয় না যে হউক তাহার কারণ সকলেই কহিতেছে যে সম্প্রতি মুসলমানদের মহরমেতে একাদিক্রমে তিন চারি রাত্রি জাগরণ করিয়াছিল ও আর২ অত্যাচার করিয়াছিল এইহেতুক অধিক মুসলমান মরিতেছে। এবং যাহারা কদর্য্য গলির মধ্যে বাস করে তাহাদের মধ্যেও অধিক লোক মরিতেছে যেহেতু কদর্য্য স্থানের দুর্গন্ধেতে ও মন্দ বায়ুতে এ রোগ জন্মে।যাহারা বড় রাস্তার ধারে উচ্চ স্থানে বাস করে তাহাদের মধ্যে এত লোক মরে নাই। মুসলমানেরা এক হস্ত গভীর মৃত্তিকা খনন করিয়া কবর দেয় তাহাতে আরো মন্দ হয় যেহেতুক রাত্রিকালে শৃগালাদি আসিয়া মৃত্তিকার মধ্য হইতে শব বাহির করে পরে সেই সকল শব পচিয়া অতিশত দুর্গন্ধ হয়।

অনেকে ভয়েতে মরে ওলাওঠা রোগে ভয় অপেক্ষা প্রবল উপসর্গ আর নাই এবং অনেকে ঐ ভয়েতে রোগগ্রস্ত হয় পরে হঠাৎ গঙ্গাতীরে লইবার উদ্যোগ হয় তাহাতে রোগির যত সাহস-বৃদ্ধি হয় তাহা প্রায় সকলেই বিবেচনা করিতে পারেন। যখন রোগীকে কহা যায় যে তোমাকে গঙ্গাযাত্রা করিতে হইবে তখন সে ভাবে যে এই আমার অগস্ত্যযাত্রা। আরো আমরা দেখিতেছি যে রোগের প্রথমাবস্থাতে যাহারা সাহেবলোকদের ঔষদ সেবন করে তাহাদের ভেদ বমি তৎক্ষণাৎ বন্দ হয় এবং অনেকে রক্ষা পায় কিন্তু খেদপূর্বক লেখা যাইতেছে যে অনেক লোক রোগের প্রথমাবস্থাতে না আসিয়া শেষাবস্থাতে আইসে তাহাতে ঔষধ কিছু করিতে পারে না কিন্তু রোগ হইবামাত্র যত লোক ঔষধ সেবন করিয়াছে তাহারদের মধ্যে প্রায় অনেকে রক্ষা পাইয়াছে।
সম্প্রতি মোং শালিখাতে এক জন ভাগ্যবান লোক এই রোগে পীড়িত হইয়া গঙ্গাতীরে আসিয়া কফাভিভূত হইলে সকলে তাহার মৃত্যু নিশ্চয় করিয়া চিতা প্রস্তুত করিল ও মৃত ব্যক্তিকে চিতার উপরে তুলিয়া অগ্নি দিল। কিঞ্চিৎকাল পরে অগ্নির উত্তাপে সে উঠিয়া বসিল কিন্তু তাহার আত্মীয় অথবা উত্তরাধিকারী কোন ব্যক্তি তাহার মস্তকে যষ্ঠ্যাঘাত করিয়া তৎক্ষণাৎ খুন করিল এবং অগ্নির মধ্যে পুনর্বার নি:ক্ষেপ করিল। এই সমাচার অমূলক নয় যে সাহেব এই ব্যাপার প্রত্যক্ষ দেখিয়াছেন তাহার প্রমুখাৎ শুনা গিয়াছে।

শহর শ্রীরামপুরেও ওলাওঠা রোগ আগমন করিয়াছে কিন্তু বড় প্রবল হয় নাই চাতরা ও শ্রীরামপুর দুই গ্রামের মধ্যে প্রতিদিন তিন চারি জন করিয়া মরিতেছে।


কিন্তু রোগের প্রথমাবস্তাতে অর্থাৎ একবার কিম্বা দুইবার ভেদ হইলে যাহারদিগকে ঔষধ দেওয়া যায় তাহাদের মধ্যে প্রায় কেহ মরে না। সম্প্রতি চিকিৎসক নিযুক্ত করিয়া ঔষধ দেওয়াতে অনেকের রক্ষা হইতেছে। গত বুধবারে শ্রীরামপুরের যুগল আঢ্যের বান্ধাঘাটেতে ওলাওঠা রোগগ্রস্ত এক জন অনাথ বৈষ্ণবকে ফেলিয়া গিয়াছিল তাহার মুখে জল দিতে কোন লোক ছিল না পরে আমাদের প্রেরিত চিকিৎসক সেখানে গিয়া তাহাকে ওষধ দিতে লাগিল ও তিন দিবসের মধ্যে সে ব্যক্তি সুস্থ হইল। ঐ ঘাটে তৎকালে আর এক বেশ্যা অনেক পরিবারে পরিবৃতা হইয়া আসিয়াছিল এবং সেও ঔষধ খাইয়াছিল কিন্তু সে মৃতা হইয়াছে।
২২ ডিসেম্বর ১৮২৭। ৮ পৌষ।

ওলাওঠা।-- শুনা গেল যে উলাগ্রামে প্রাণনাশক গুণধাম ওলাওঠা সংপ্রতি তথায় অবস্থিতি করিয়া অনেককে কাতর করিয়াছেন তাহাকে কাতর করিবার নিমিত্তে কবিরাজসকলে সন্ধান করিতেছেন কিন্তু সে সন্ধান বলবান না হইবাতে ঐ ওলাওঠা ঐ চিকিৎসকদিগকে ঠাট্টা করিতেছে আর যাহার নিকটে ঐ রোগরাজ বিরাজ করিতেছেন তাহাকে ততক্ষণাৎ সন্নিপাত সঙ্গে দিয়া ধর্ম্মরাজের নিকটে পাঠাইতেছেন।